গান্ধীগিরি

গান্ধীগিরি

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় অনেকদিন পর বাড়িটা যেন আবার বিষ্ণু কে আবার আগের মত টানছে। মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়ার পর বাড়ি টা খাঁ খাঁ করতো।তখন বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করতো না তার । মা যখন ছিল তখন সে একটু ও বোঝেনি মা না থাকলে কি হয়।আসলে বাড়ি ফেরাটাই তখন ছিল যন্ত্রণার । বাড়ি ঢুকতে গিয়ে গলার কাছে কান্না দলা পাকাতো। পাছে বাবা বুঝতে পারে তাই বাড়ি তে ঢোকার আগে টক করে গিলে নিত কান্না টা। বাবার আর তার তখন কোনরকমে বেঁচে থাকার সংসার। এমনভাবে দীর্ঘ পাঁচটা বছর কাটিয়েছে বিষ্ণু ।তারপর একদিন বিনা নোটিশে ঘুমের মধ্যে বাবাও চলে গেল।ঘুম ভেঙে দেখলো বাবা তখনও ঘুমিয়ে আছে। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে লোকজন কে ডাকল।তারপর ডাক্তার এসে বলে গেল অনেক আগেই সব শেষ ।

তখন সদ্য বিষ্ণু চাকরি পেয়েছে ।সরকারি চাকরি ।বাবা দেখে গিয়েছে এটাই ওর সান্ত্বনা ।অনেক খেটেখুটে সে পেয়ে ছিল চাকরি টা।

কিন্তু বাবা চলে যাবার পর ওই পুরনো ঝরঝরে বাড়ি টাতে একা থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসতো বিষ্ণুর। বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা বিষ্ণুর চিরকালই খুব কম। সবার সাথে সহজে মিশতে পারেনা।একজনই ওর ছোট বেলার বন্ধু আছে সে হল রূপম। স্বভাবের দিক দিয়ে দুইবন্ধু দুই মেরুতে।তবু যেন কেমন করে বিষ্ণুর বন্ধু ছিল রূপম।রূপম স্মার্ট ঝকঝকে ছেলে ।মেয়েদের সাথে মেলামেশা করতে ওস্তাদ ।কত সুন্দর করে মন রেখে কথা বলতে পারতো ।আর বিষ্ণু এই পঁচিশ বছরের জীবনে একটাও মেয়ের সাথেও বন্ধু করতে পারেনি। একাকীত্বে ভরা তার জীবনের কথা বিষ্ণু রূপম কে গল্প করতো। কিন্তু বন্ধুর দেওয়া কোন পরামর্শই বিষ্ণুর পছন্দ হতনা। রূপমের মা খুব স্নেহ করতেন বিষ্ণু কে। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজে দেখে শুনে বিষ্ণুর বিয়ের ব্যবস্থা করলেন । একমাসের মধ্যে বিষ্ণুর সাথে পিয়াসের বিয়ে হয়ে গেল।

মফস্বলের মেয়ে পিয়াস। ছিপছিপে তন্বী চেহারা। বিষ্ণুর সাথে ঠিক মানানসই নয় ।তবে সে নিয়ে পিয়াসের তেমন কোন মাথাব্যথা নেই ।কিছুদিনের মধ্যে সে অগছালো পুরনো বাড়ি টাকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছে।বিষ্ণুর প্রতি তার খুব লক্ষ্য ।বিষ্ণুর জীবন টা একটু একটু করে ভরে উঠতে শুরু করেছে। সারা সপ্তাহ মুখবুজে ঘরের সব কাজ করে পিয়াস ।শনি রবিবার হলে যা শুধু একটু আবদার করে এদিক ওদিক যাবার।বিষ্ণু বোঝে সবটা ।তাই সে যথাসাধ্য চেষ্টা করে। কোন সপ্তাহে হয়তো সিনেমায় নিয়ে যায় আবার কোন সপ্তাহ আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যায় । পিয়াসের আন্তরিক ভালোবাসায় বিষ্ণু মুগ্ধ হয়ে যায়।আবার যে কোন দিন সে একটা ভালোবাসা মোড়া পরিপাটি সংসার পাবে তা যেন সে ভাবতেই পারেনি।

রূপমের আজকাল বিষ্ণুর বাড়িতে আসা যাওয়া টা বেড়ে গেছে।আগে যখন বিষ্ণু একা থাকতো তখন কতবার বলতো শনি রবিবার তার সাথে একটু থাকার জন্য ।কিন্তু তখন রূপম রাজি হতনা।আর এখন পরপর দুই শনিবার অযাচিত ভাবে সে এসে হাজির ।গত সপ্তাহে তো রাতেও থাকার ইচ্ছে ছিল। বিষ্ণু কোনভাবে তাকে বাড়ি পাঠিয়েছে।পিয়াস ও ঠিক পছন্দ করছে না।শুধু বিষ্ণু কি ভাববে তাই মুখে বলতে পারছেনা। পরের সপ্তাহে শুক্রবার সন্ধ্যায় বিষ্ণু অফিস থেকে বাড়ি ফিরে পিয়াস কে বলল ,
“শোনো কাল ভোরবেলা ভাবছি দক্ষিনেশ্বর যাব।ওখান থেকে বেলুড় মঠ ঘুরে বিকেলে ফিরব।”

পিয়াসের মুখে আলো ফুটে উঠলো।
“সে তো খুব ভালো হবে ।বিয়ের পর থেকে তো একবারও তো যাওয়া হয়নি।”
তারপরই কি ভেবে বলল ,
“কিন্তু রূপম দা যে বলে গেছে কাল এখানে খাবে।তুমি তাহলে এখনি ফোন করে দাও।”

“ঠিক বলেছো ফোন করে দিচ্ছি।”
রূপমকে ফোন করে সবটা জানায় বিষ্ণু ।কিন্তু অদ্ভুত ভাবে রূপম ও তাদের সাথে যাবার জন্য জিদ করে।বিষ্ণু কাটানোর চেষ্টা করলে রূপম বলে

“বউ পেয়ে পুরোনো বন্ধু কে ভুলে যাচ্ছিস।আমার মা না থাকলে তুই পেতিস পিয়াসের মতো মেয়ে কে।”

বিষ্ণুর বুঝতে বাকি থাকে না রূপমের উদ্দেশ্যে ।এক অচেনা বিপদের সঙ্কেত পায় সে ।আর চুপ করে থাকা ঠিক হবেনা ।পিয়াস কে সাবধান করতে হবে ।দ্বিধা কাটিয়ে পিয়াস কে এসব বলতে বিষ্ণুর খুব কষ্ট হচ্ছিল।তার বুকের ভেতর টা মোচড় দিচ্ছিল ছোটবেলার বন্ধুর এমন জঘন্য আচরন দেখে।পিয়াস বুদ্ধিমতী সে এই সুযোগে বলল

” তুমি আজ জানলে? আমি তো প্রথম দিন থেকে আঁচ করতে পেরেছি। এক কাজ করো কালকের যাওয়া টা বন্ধ করো। আর আমি দেখছি কি করা যায় ।কাল ওকে আসতে দাও।”

পরদিন সকালে উঠে পিয়াস তাড়াতাড়ি পায়েস রান্না করলো।বিষ্ণু কে শিখিয়ে রাখলো রূপম এলে যেন বলে পিয়াসের আজ মন ভালো নেই তাই কিছুতেই যেতে চাইছেনা।
সকাল সাতটায় সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরে রূপম হাজির ।কলিং বেল বাজতেই ব্যস্ত পায়ে দরজা খোলে বিষ্ণু ।বিষ্ণু কে ভালোভাবে লক্ষ্য করে রূপম বলল,
“কি রে রেডি হসনি।কখন যাবি?”
তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল ,
“পিয়াস কোথায়? ”
বিষ্ণু শান্ত গলায় বলল,
“ওর মনটা ভালো নেই।তাই কিছুতেই যেতে চাইছে না ।”

“সে কি নিশ্চয়ই তোর সাথে কোন ঝামেলা হয়েছে ।”

বাড়ির ভেতর সোজা ঢুকে যায় রূপম।পেছন পেছন বিষ্ণু ও যায়। রূপম দেখল রান্না ঘরে কি যেন করছে পিয়াস ।পিয়াসের ঠিক পাশে গিয়ে সে দাঁড়ায় ।তরপর বলল,
“কি পিয়াস আজ নাকি তুমি যাবে না। আমি কোন ভোরে উঠে তৈরি হয়ে এলাম আর এখন বলছো তুমি যাবে না?”
রূপমের কথা শুনে বিষ্ণু মনে মনে ভয় পায় ।পিয়াস কিভাবে সবটা সামলাবে তাই সে ভাবছে।যদিও পিয়াসের ওপর ভরসা আছে তার।এই কদিনেই সে বুঝেছে পিয়াস যথেষ্ট বুদ্ধিমতী।

ছলছল চোখে পিয়াস তাকায় রূপমের দিকে।তারপর হঠাৎ সবাই কে অবাক করে দিয়ে পিয়াস নীচু হয়ে প্রনাম করলো রূপম কে।

ঘটনার আচম্বিতে হতচকিত হয়ে যায় রূপম।

“একি একি কি করছো।”

“আমাকে একটা প্রনাম করতে দিন দাদা।আজ আপনি না এলে আমি নিজে যেতাম আপনার কাছে।”

সব দেখে শুনে বিষ্ণু তো অবাক। পিয়াস কি করতে চাইছে কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না।

“আসুন দাদা এখানে বসুন।”

বসার ঘরে সোফায় রূপম কে বসতে বলে পিয়াস ।তারপর রান্না ঘর থেকে সাদা কাঁচের বাটিতে নতুন গুড়ের পায়েস নিয়ে এসে সামনে রাখলো।

আমতা আমতা করে কোনক্রমে রূপম রলল

“এসব কি হচ্ছে পিয়াস ।আজ তো আমার জন্মদিন নয়।”
বলে সে বন্ধুর দিকে তাকালো।বিষ্ণুও সাথে সাথে পিয়াসের দিকে একমুখ কৌতূহল নিয়ে তাকায় ।উত্তেজনায় সে ভেতরে ভেতরে ফেটে পড়ছে ।

মাথা নিচু করে গলা কাঁপিয়ে ধীরে ধীরে পিয়াস বলল ,
“কিন্তু আজ যে আমার দাদার জন্মদিন ।”

রূপম বলল
“তোমার দাদা আছে নাকি জানি না তো ?তোমরা তো তিন বোন।”

“আমার নিজের দাদা নেই ঠিকই কিন্তু এক জেঠতুতো দাদা ছিল।সে আমাকে নিজের বোনের চেয়ে ও বেশি ভালোবাসতো।আজ দশবছর হল সে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মত চলে গেছে।”

শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকে পিয়াস ।তারপর চোখ মুছে বলল
“সে ঠিক আপনার মতো দেখতে ছিল দাদা।প্রথম দিন আপনাকে দেখেই আমার তার কথা মনে হয়েছে ।আপনি আমাকে কি চোখে দেখেন জানিনা । আমি কিন্তু আপনাকে নিজের দাদা বলেই জানি ।”

কিংকর্তব্যবিমূঢ় রূপম ফ্যাল ফ্যাল চোখে পিয়াসের দিকে তাকিয়ে আছে ।একটা চরম অনুশোচনা যেন ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে ওর চোখেমুখে ।

“দাদা এই পায়েস টা একটু খান।আমার হাতের পায়েস খেতে দাদা খুব ভালোবাসতো। প্রতি বছর এই দিনে আমি নিজের হাতে ওর জন্য পায়েস রাঁধতাম। আজ আপনি খেলে আমি খুব শান্তি পাবো। আমি জল আনছি।”
বলে পিয়াস রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় ।তারপর পেছন ফিরে বিষ্ণুর দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে মুচকি হাসে ।
এতক্ষণ বিষ্ণু মুগ্ধ হয়ে পিয়াসের কথা গুলো শুনছিল।কেমন যেন সবটা সত্যি বলে মনে করে নিয়ে ছিল সে।হঠাৎ পিয়াসের চোখের ভাষায় সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল । বুকের ভেতর এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস যেন ঢেউ খেলে গেল।

তারপর বিষ্ণু রূপমের সামনে এসে দাঁড়ায় ।মৃদু হেসে বলল,
“কি রে খাচ্ছিস না কেন?আজ কোন সকালে উঠে তোর জন্য পায়েস বানিয়েছে পিয়াস ।”

রূপমের চোখমুখ যেন পাল্টে গেছে।কেমন একটা অস্থিরতা ওর মধ্যে ।কি যেন ভাবছে।একটু থেমে বলল,

“এই তো খাচ্ছি ।”
বলে পায়েসের বাটি টা মুখের কাছে নিয়ে ঝটপট কয়েক চামচ মুখে দেয়।

: আস্তে খা।বিষম লেগে যাবে।এত তাড়ার কি আছে?”

“না না আমায় একটা কাজে যেতে হবে।”

“তুই তো আমাদের সাথে সারাদিন ঘুরবি বলে এলি।এর মধ্যে তোর কি কাজ পড়ল?”

কথাটা বলে মনে মনে হাসে বিষ্ণু ।সবটাই সে বুঝতে পারছে।এমন নিঁখুত অভিনয় পিয়াস করেছে যে রূপম এখন নিজের প্রতি চরম গ্লানিতে মরমে মরে রয়েছে ।

জলের গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকে পিয়াস ।তারপর রূপমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“চলুন দাদা আমি ভাবলাম মায়ের মন্দিরে যখন যাবো ঠিক করেছি তখন ঘুরেই আসি ।আপনাকে পায়েস টুকু খাইয়ে আমার মনটা একটু শান্ত হয়েছে।”

“না না আজ আমার হবে না।”
একেবারে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল রূপম।
“একটা বিশেষ কাজ মনে পড়ল।তোমরা যাও।”

পিয়াস ব্যস্ত হয়ে বলল,
“সে কি দাদা আপনি তো যাবেন বলেই তো এলেন।”

“আমি এখন আসি।পরে কথা হবে।”

একপ্রকার ছিটকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল রূপম।

পেছন পেছন গিয়ে সদর দরজা টা বন্ধ করেই হাসিতে ফেটে পড়ল পিয়াস ।তারপর হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়ল।বিষ্ণু ও হো হো করে হেসে তারপাশে বসে পড়ল আর বলল

সত্যি দারুণ উপায় বের করেছো।রূপমের মুখটা দেখলে। ওর স্মার্টনেস ভরা মুখটা যেন মুহূর্তে চুপসে গিয়েছিল ।

পিয়াস বিষ্ণুর বুকের কাছে ঘেঁসে বসে তারপর
একমুখ হাসি নিয়ে বলল
“একেই বলে গান্ধীগিরি।বুঝলে মশাই।”

এক অনাস্বাদিত তৃপ্তিতে আপ্লুত হয়ে পিয়াস কে কাছে টেনে নিল বিষ্ণু ।।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত