নাচ ও ভালোবাসা

নাচ ও ভালোবাসা

আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাব,এমন সময় নজরে পড়ল হেডলাইনটা, চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে খবর কাগজের ওই টুকরো খবরে চোখ বোলাতেই মনে পড়ে গেল আজ থেকে ছ বছর আগের এক সন্ধ্যার কথা।ইউনিভার্সিটির রিইউনিয়নে তখন আমি ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে,তার মধ্যেই অডিটোরিয়াম থেকে ‘কাহে ছেড়ে মোহে’ কানে আসতেই একবার যেতে ইচ্ছে করছিল, অনেকের মুখেই শুনেছি অনুরিমা নাকি খুব ভালো নাচ করে।তাই কোনভাবে এদিকটা সামলে নিয়ে গেলাম অডিটোরিয়ামে।সেদিন আমি আর ওর থেকে এক মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরাতে পারিনি,কি অপূর্ব নাচে ও!সেইদিন ওকে কিছু বলার সুযোগ পায়নি।

ফেসবুকে শুধু মেসেজ করেছিলাম-দারুণ নাচিস কিন্তু তুই, বাড়ী ফিরেও আমার দুচোখে যেন ওর ঘোর লেগেছিল।তার পর ইউনিভার্সিটি গিয়ে ওর সাথে দেখা হল লাঞ্চ ব্রেকে।ও আমার দিকেই এগিয়ে এসেই একটু হেসে বলল, ‘দাদা, সরি তোমার মেসেজের রিপ্লাই দিতে পারিনি,আসলে নেট ছিল না ফোনে,থ্যান্কস দাদা’। তারপরই আমি বললাম ‘সত্যি তুই দারুণ নাচিস।’ আর এই ভাবেই বেড়ে চলে আমাদের কথোপকথন।অনু বলেই ডাকি ওকে আমি।ও শুধু ভালো নাচে তা নয়,ভীষণ সরলও।আমি বেশ বুঝে গেছি যে ওকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।কিছুদিন পর নিজের মনের কথাটা ওকে জানিয়েই ফেললাম,ও মুখে কিছু না বললেও ওর লাজুক হাসি সব বলে দিয়েছিল আমাকে।এরপর আরো দুবছর এরম ভালো-মন্দ মিশিয়েই চলছিল । আমি তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি,অনু তখন কলকাতার বিশিষ্ট সব অনুষ্ঠানে নৃত্য প্রদর্শনেই ব্যস্ত থাকত ,ওর সাথে পরিচয় হতে লাগল বিশিষ্ট সব মানুষের।মাঝে মাঝে খুব অসহ্য লাগত ওর ব্যস্ততার কারণে ওর সাথে ঠিকভাবে যোগাযোগ না করতে পেরে।যাইহোক কিছুদিন পর আমাদের দুইবাড়ির থেকেই বিয়ের জন্য চাপ আসতে থাকে।আমি অনুকে হয়ত কিছুটা নীরাপত্তাহীনতা থেকেই বলেছিলাম ‘দেখ বিয়ের আগে যা নাচ করেছ,করেছ, বিয়ের পর আমাদের বাড়িতে থেকে ওসব আর করো না,তুমি বাড়িতে নাচ কোরো যতখুশি কিন্ত বাইরে পারফর্ম

কোরোনা আর।আমাদের বাড়ির বউ নাচতে যাবে আবার অন্য পুরুষের সাথে নাচ করবে এসব আমাদের বাড়ির কেউ মানবে না।’

অনু অত্যন্ত কষ্টের সাথে বলেছিল-তোমাকে সবার চেয়ে আলাদা ভেবেছিলাম আমি,তুমি যে বলতে তবে আমার নাচ নাকি তোমার প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে,আমার নাচ ই নাকি তোমাকে আকৃষ্ট করেছে,আর সেই তুমিই বলছ আমাকে নাচ ছেড়ে দিতে?এই সময় দাড়িয়েও এরম ব্যাকডেটেড ভাবনাচিন্তাধারা তোমাদের!আমি তোমাকে চিনতে পারছিনা ইমন।’

আমি-তোমার নাচ শুধু আমার জন্য আর কারোর জন্য নয়, তুমি তো আমাকে ভালবাসো, আমার জন্য এটুকু ত্যাগ করতে পারবেনা?

অনু-ঠিক বলেছ সত্যি কারের ভালোবাসার জন্য ছোট জিনিসকে ত্যাগ করলে তাতে কোন পাপ থাকেনা।কি বোকা আমি দেখো সত্যিভালোবাসা কে ছেড়ে একটা মিথ্যে তুচ্ছ ভালোবাসাকে নিয়ে বাস করে গেছি।আর নয়, আজ থেকে আমি ত্যাগ দিচ্ছি তোমাকে, আর কোনদিনও যোগাযোগ করার চেষ্টাও করবেনা আমার সাথে।
কাঁদতে কাঁদতে বেড়িয়ে যায় অনু

আমি অনেকবার ডেকেছিলাম দাড়ায়নি আর,ফোনও করেছিলাম বার কয়েক, ধরেনি।
তারপর আমিও কেমন একটা রাগে-আক্রোশে আর এই সম্পর্কটাকে জোড়া লাগানোর চেষ্টাও করিনি,আমার মনে হয়েছিল যে শুধুমাত্র নাচের জন্য আমাকে,আমাদের সম্পর্ককে,আমাদের কাটানো মুহূর্ত গুলোকে ভুলে যেতে পারে, সে মেয়ে স্বার্থপর ছাড়া আর কিছুই নয়।তারপর শুনেছিলাম সৌম্য নামের একজনের সাথে বিয়েও করেছিল।তার কিছুদিন পরে আমিও বিয়ে করি মায়ের পছন্দ এর মেয়ে শর্মিলির সাথে।ও নাচ জানেনা,চুপচাপ শান্ত সভাবের মেয়ে,মোটামোটি ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে আমাদের, গত তিনমাস হল আমাদের একটি শিশু কন্যাও হয়েছে।তার নাম রেখেছি রাই ।

আমার চোখের কোণে একফোটা জল এসে জমেছে,এমন সময় শর্মির ডাকে চমকে উঠলাম আমি
-কি গো কখন থেকে ডাকছি, শুনতে পাচ্ছোনা?মেয়েটা কখন থেকে কেঁদে চলেছে আমি কাজ করতে পারছিনা একটু সামলাওনা ওকে।খবর কাগজে কি আছে বাপু এত,মুখস্হ করতে বসেছ ত দেখছি
-আচ্ছা সর্মি রাই কে নাচ শেখাব কেমন, একটু বড় হলে।

-বাবাঃ ভূতের মুখে রামনাম যে,টিভিতে নাচের অনুষ্ঠান হলেও চট করে চ্যানেল টা সরিয়ে দাও,নাচ কোনদিন পছন্দ ও করোনা আর সেই তুমি বলছ মেয়েকে নাচ শেখাবে!
-হ্যাঁ শেখাব,আর রাইয়ের ভালো নাম টা ‘অনুরিমা’ রাখবে শর্মি?

-ও আচ্ছা এবার বুঝলাম,পেপারে ওই বাঙালী মেয়েটা,অনুরিমা সেনগুপ্ত র খবরটা পরেই এসব বলছ তুমি।।কি যেন ওই ‘কালিদাস সম্মান’ না কি একটা পেয়েছে বোধহয়।

-হ্যাঁ ঠিকই দেখেছ,আমি আর নাচ কে ঘৃণা করব না শর্মি,আমাদের মেয়েকেও নৃত্য শিল্পী করে তুলব দেখো তুমি,কই দাও রাই কে আমার কোলে দাও।
-এনাও,কি জানি কি হয় তোমার,নাচের প্রতি প্রেম জন্মালো দেখছি!
শর্মি মেয়েকে কোলে দিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল।

রাইয়ের কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে সত্যিই মনে হচ্ছিল আমি আসলে কোনদিন অনুকে ভালোইবাসিনি।সেদিন অনু একটুও সময় নষ্ট নাকরে আমার মত এক জঞ্জাল কে সরিয়ে দিয়ে খুব ভালোই করেছিল।তাই হয়ত সৌম্যর মত একজনকে পেয়েছিল যে তার সাধনা কে খুন করেনি বরং সেটাকে লালন-পালন করে তার বীজ চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে।কিন্তু আমার বুকটা চাপা একটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে।

একদিনের জন্যও কি আমি ভালোবাসিনি?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত