স্বপ্ন পূরণ

স্বপ্ন পূরণ

বৃহৎ পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল সদস্য তন্ময় । ছাত্র জীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল সে । তার ইচ্ছা ছিল ভবিষ্যৎ জীবনে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার । কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হঠাৎ তার বাবার মৃত্যু হওয়ায় একেবারে নির্মম সত্যের মুখোমুখি পড়ে গেল সে । মা, দুই বোন আর ছোট এক ভাই এর দায়িত্ব তার উপর এসে পড়লো । মাঝ পথে লেখা পড়া বন্ধ করে দিয়ে তাকে রোজগারের রাস্তায় নামতে হল । তা ছাড়া অন্য আর কোন পথ খোলা ছিল না তার সামনে । অদৃষ্টের কী নিষ্ঠুর পরিহাস ! পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহৃদয় এক ব্যক্তির সহায়তায় একজন মাঝারি শিল্পপতির অফিসে সে হিসাব রক্ষকের কাজে নিযুক্ত হল । সেখান থেকে যা রোজগার হত, তাতে বহুকষ্টে কোন রকমে সংসারটাকে সে টেনে নিয়ে চলছিল । তার যা পড়াশুনা তাতে যে এর চেয়ে ভাল মাইনের চাকরি পাওয়া যায় না, তা তন্ময় ভাল করেই জানে । তাই এ সবের মধ্যেই প্রাইভেটে বি-এ পাশ করে একটি সওদাগরি অফিসে বেশী মাইনের কেরানীর চাকরিতে বহাল হয় সে । অফিসের চাকরি ছাড়াও বাড়ী বাড়ী গিয়ে প্রাইভেট টিউশন করে অতিরিক্ত কিছু অর্থ উপার্জন করা শুরু করে সে । তারপর থেকে মোটামুটি কিছুটা স্বচ্ছলতা দেখা দেয় তার সংসারে । অক্লান্ত পরিশ্রম আর চেষ্টায় তন্ময় তার বোনদের ভাল পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় । ভাইয়ের পড়াশুনা তখনও চলছিল ।

প্রতি মানুষই স্বপ্ন দেখে – প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু স্বপ্ন থাকে, থাকে কিছু বাসনা । কিন্তু অভাবী সংসারে একমাত্র উপার্জনশীল মানুষ হিসাবে তন্ময়ের সুপ্ত বাসনা সুপ্তই থেকে যায় । কখনও কারও কাছেই সে প্রকাশ করে না তার মনের ইচ্ছা । এদিকে ছেলের বয়স বেড়ে যাচ্ছে দেখে ক্রমাগত তাকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকেন তার মা । অনেক ওজর আপত্তি করেও মায়ের করুণ এবং কাতর মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজী হয় সে । এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সুন্দরী, বিনয়ী বি-এ পাশ মেয়ে তনিমার সাথে তার বিয়ে হয়ে যায় । অবশ্য বিয়ের আগে স্বাভাবিক আলাপচারিতায় একদিন তন্ময় তার অবস্থার কথা সম্যক ব্যক্ত করে তনিমার কাছে । তাকে বলে, ” বিয়ের পর স্বামীর সংসারে এসে মেয়েরা অনেক কিছু পেতে চায় । তোমার জেনে রাখা ভাল, এই অনেক কিছু পাওয়ার বাসনা পূরণ করার ক্ষমতা আমার নাই । অনেক ঘাত প্রতিঘাত, ঝড় ঝাপটার মধ্যে অনেক কষ্টে নিজেকে আমি ধরে রেখেছি । তবে নেহাতই যদি আমাকে তোমার পছন্দ হয় এবং আমাকে যদি তুমি বিয়ে করো, আমি প্রতীজ্ঞা করছি তোমাকে সুখে রাখার, সুখী করার চেষ্টায় আমার কোন ত্রুটি থাকবে না।” স্বাভাবিক লজ্জার কারণে কী উত্তর দেবে প্রথমে ভাবতে না পেরেও তনিমা বলেছিল, ” তোমার এই কথার জবাব আমি এখনই দিতে পারলাম না, ঠিক সময়েই এর উত্তর তুমি পেয়ে যাবে।” ঠিক দুদিন পর তন্ময়ের মাসতুতো বোন তথা তনিমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুপ্রিয়া এসে বলে, ” কি ব্যাপার রে দাদা, তনিমাকে কি জাদু করলি রে দাদা ? ও যে রামনামের মত তোরই নাম জপ করছে সব সময় । বলে কিনা তোকে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করতে পারবে না ও । যদি একবেলা খেয়েও থাকতে হয়, এমনকি উপবাসও করতে হয় তবুও তোর সাথেই ও জীবন কাটাতে চায়।” তন্ময় তার কথার জবাব পেয়ে যায় ও নিশ্চিন্ত হয় ।

আসলে তনিমারা তন্ময়দেরই প্রতিবেশী । তন্ময়দের বাড়ীর কাছাকাছিই ওদের বসবাস । সেই ছোটবেলা থেকে সে তন্ময়কে দেখে আসছে । তার স্বভাব, তার মানসিকতা, মা, ভাই, বোনদের প্রতি তার কর্তব্যনিষ্ঠা, তার সহনশীলতা, হাসিমুখে সব রকম পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার অসীম ধৈর্য ইত্যাদি নানান গুণ সম্পর্কে সে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল । তাই মনে মনে তার প্রতি সে অনুরাগী এবং আকৃষ্ট । তার সাথে বিয়ের কথা উঠতে সে মনে মনে খুশীই হয় । তার মতে অর্থ যদিও একটা বিরাট ব্যাপার, তবে অর্থই সব কিছু নয় । তন্ময়ের সাথে বিয়ে হলে সে প্রকৃত অর্থেই সুখী হবে, এটা ছিল তার দৃঢ় বিশ্বাস । তাই কিছুটা লজ্জাজনিত কারণে সে তন্ময়ের সেদিনের কথার জবাব সরাসরি না দিয়ে বান্ধবী সুপ্রিয়ার মাধ্যমে তার মনের ইচ্ছা ও ভাব প্রকাশ করে দিয়েছিল তন্ময়ের উদ্দেশে ।

আড়ম্বরহীন কিন্তু মিষ্টি পরিবেশে একদিন তন্ময় অনিমার বিয়ে হয়ে যায় । এই প্রথম জীবনে খুশীর বাণ ডাকে তন্ময়ের । তনিমা শ্বশুর বাড়ীতে এসে ভালবাসা আর আদর যত্নে মন জয় করে নেয় শাশুড়ি, দেওর, ননদদের । স্বামীর উপর তার অগাধ বিশ্বাস । যে মানুষটা নিজের সব শখ, আহ্লাদ, সুখ বিসর্জন দিয়ে সংসারের জন্য এত কিছু করতে পারে, তার জন্য তনিমাও সব কিছু করতে পারে । হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সংসারটার জন্য যে সব স্বার্থত্যাগ করতে পারে, তার জন্য কিছু করতে পারা তো সত্যিই গর্বের তনিমার কাছে । তার মন, মানসিকতা, শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালবাসা সব সে উজাড় করে দিতে চায় স্বামীর জন্য ।

দিন যায়, মাস যায়, কেটে যায় অনেকগুলো বছর । এতদিনে তনিমা জানতে পেরেছে তার স্বামীর সামান্য একটা বাসনার কথা । তন্ময় প্রতিদিন সাইকেলে অফিস যায় । স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও যেতে হলে হয় রিকশায় বা পায় হেঁটে যায় । তার অফিসের সহকর্মী বন্ধুদের অনেকে মোটর বাইক, স্কুটার বা কেউ কেউ আবার নিজের গাড়িতে অফিস যায়। তাদের দেখে নয়, তন্ময়ের বহুদিনের ইচ্ছে সেও যদি একটা স্কুটার বা মোটর বাইক কিনতে পারতো । ইচ্ছে হত স্ত্রীকে পিছনে বসিয়ে বেড়াতে যাওয়ার । কিন্তু সংসার চালিয়ে আর কটা টাকাই বা সে সঞ্চয় করতে পারে যে চুয়াল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা খরচ করতে পারে এই জন্য ? অগত্যা মনের ইচ্ছা মনেই হারিয়ে যায় তার । তনিমার মনে যাতে কষ্ট না হয় তাই সে তার কাছেও এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে না । তবুও কোন এক মুহূর্তে তনিমা জানতে পেরে যায় তার মনের ইচ্ছার কথা । সে মনে মনে ভাবে এই মানুষটার সামান্য এই ইচ্ছাটুকুও কি পূরণ করা যায় না ?

মাস দুয়েক পর অপ্রত্যাশিত ভাবে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে তনিমা শিক্ষকতার একটা চাকরি পেয়ে যায় । সে মনে মনে ভাবে ঠাকুর এতদিনে মুখ তুলে চাইলেন । হাতে যেন স্বর্গ পেয়ে যায় সে । ভাবে এতদিনে স্বামীর ইচ্ছে পূরণের একটা সুযোগ এসে গেছে এবং তাকেই এই কাজটা করতে হবে । একদিন স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে মাইল দুই দূরে শহরের এক মোটর বাইক ডিলারের দোকান থেকে তনিমা কিস্তিতে একটা বাইক কেনার কোটেশন নেয় । দশ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট দিলে আর মাসে মাসে পনেরো শ’ টাকার কিস্তিতে একটা বাইক কেনা যায় ।

দু-একদিন পর তনিমা তন্ময়কে বলে, ” তুমি একটা মোটর বাইক কেনার কথা ভাবছিলে না ? তা একটা কিনেই নাও না । ” ” কি করে কিনি বলতো ” , তন্ময়ের কথায় স্পষ্ট হতাশা । “এতগুলো টাকা আমি কোথায় পাবো, কিভাবে জোগাড় করি বলতো ?” — তার জিজ্ঞাসা ।” তার চেয়ে এই ভাল । আমার মত মানুষের বোধ হয় এই রকম ইচ্ছা পোষণ করাই উচিৎ নয় ,” তন্ময় বলে । তনিমা বলে, ” তা কেন হবে, আজকাল তো কিস্তিতেও মোটর বাইক কেনা যায় ।” তন্ময় বলে, ” তা যায় কিন্ত, ডাউন পেমেন্ট আছে আর মাসে মাসে ই-এম-আই এর টাকা, কি করে দেবো আমি ?”

তনিমা তখন বলেছিল, ” তুমি ডাউন পেমেন্টের টাকাটা দাও, ই-এম-আই গুলো আমি দেবো ।” তন্ময় জিজ্ঞেস করে। ….
-তুমি কোথা থেকে দেবে? আর তাছাড়া ডাউন পেমেন্টের টাকাটাই বা কি করে জোগাড় করবো আমি ?
– আমি এখন চাকরি করছি । এতদিন তো তুমি একাই এই সংসারটাকে টেনে
নিয়ে গেলে । মনে করো আমি চাকরি করি না । মাসে মাসে যে টাকাটা পাচ্ছি
তার থেকে ই-এম-আই দিয়েও তো যা বাঁচবে, তাতো সংসারের কাজেই লাগবে ।
অত ভাবছো কেন ?

– আচ্ছা দাঁড়াও, সিরিয়াসলি একটু ভেবে দেখি ব্যাপারটা নিয়ে । আচ্ছা তনিমা, আমার যে একটা রেকারিং আছে ব্যাঙ্কে, সেটা ভেঙ্গে ডাউন পেমেন্টের টাকাটা দেওয়া কী সমীচীন হবে ?

– কেন হবে না ? যে টাকাটা জমেছে, সেটা তুলে নাও, আর রেকারিংটা যেমন
চলছে চলুক । তাছাড়া কিস্তির টাকাটা শেষ হয়ে গেলে আমার মাইনের
টাকাটাও তো থাকছে প্রতি মাসে । ততদিনে আমার বেতনও তো বেড়ে যাবে ।
সুতরাং আর অত ভাবাভাবি নয় ।

– তবে চলো, একটা কোটেশন নিয়ে আসি ।
– সে আমি আগেই নিয়ে এসেছি ।

পরের দিনই তারা দুজনে ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা তুলে ডিলারের দোকান থেকে একটা ঝকঝকে মোটর বাইক নিয়ে ঘরে আসে । স্বপ্ন পূরণের আনন্দে তন্ময় বিহ্বল হয়ে পড়ে। তনিমার প্রতি শ্রদ্ধায় তার মন ভরে ওঠে । তনিমা স্বামীর স্বপ্ন পূরণে অংশীদার হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করে ।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত