ছোটগল্প:পরোটা

ছোটগল্প:পরোটা

১।।
কেন জানি মন চাইল হোটেলে গিয়ে পরোটা খাব। সাথে সাথে আমার তিন বান্ধবীকে ফোন দিলাম। ‘অই, কাইলকা কিন্তু সকালে কলেজে যাওয়ার টাইমে হোটেলে নাস্তা করুম। বাসায় নাস্তা করিস না। চলে আসিস, ঠিকাছে?’
ওরা খুশি হয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, ঠিকাছে।’
পরেরদিন রওনা দিলাম কলেজ। যাওয়ার পথে সিরাজ মিয়ার হোটেল। লোকেরা বলাবলি করে, ‘এই হোডেলে যেইডা রান্দে হেইডাই মজা লাগে।’

আমরা চার বান্ধবী হোটেলে ঢুকে চার সিটঅলা টেবিল দখল করে বসলাম। বয়কে বললাম, দুটো করে পরোটা, খাসির পায়া নেহারু দেও আর খাওয়ার পরে দই দিবা।
চলে এলো পরোটি। আমরা খাওয়া শুরু করে দিলাম।

২।।
এমন সময় একটা লোক কি জানি বলতে বলতে ঢুকলেন হোটেলে। গলার স্বর মোটা। মাতবর কিছিমের। ড্যামকেয়ার ভাব। দেখতে ভাল লাগে। আমি তাঁকে ট্যারচোখে দেখতে লাগলাম। লোকটা আমার দিকে তাকালে আমি আরেক দিকে তাকিয়ে থাকি।

লোকটা আমাদের পাশের টেবিলে বসতে বসতে বললেন, অই, ’থাবড় ছাড়া পরোডা ল।’
থাবড় ছাড়া পরোটার কথা শুনে আমরা ফিক করে হেসে ফেললাম। চয়নিকা হাসিতে ওস্তাদ। সে বলে, ‘আয় আল্লা এইডা কিডা কইল? থাবড় ছাড়া পরোটা? পরোটারে কেউ থাবড়ায় নাকি?’ হাসি আর চেপে রাখতে পারছি না। চয়নিকা হাসির সাথে আবার ঠকর ঠকর কাশে। লোকটা দেখলে কি শরম! তাই মুখ চেপে হাসছি। মুখের হাসি দেখা না গেলে কী হবে, হাসির ঠেলায় সারা শরীর কাঁপছে।

একটা ছেলে ছুটে এসে ওই লোকটাকে বলল, ‘চাচা পরোডা কয়ডা দিমু, সাথে কী খাইবেন?’
‘আমি খাইতে থাহি আর তুই দিতে থাক, কয়ডা-ময়ডা বুঝি না! পেট ভরুন্তি কথা। নেহারু দিবি। আর হোন হোন বেটা, কতা না হুইন্না দৌড় মারিছ না। নেহারুর আগে কি দিবি জানছ? কাগজী লেমু, হোঁয়ার ছালাদ, ছালাদে চুক্কা দই দিবি আর গেলাস খলাইয়া পরিস্কার পানি আন, বুঝজছনি বেডা? যা দৌড়।’
ছেলেটা মুচকি হাসি দিয়ে দৌড়ে গিয়ে কাজে লেগে গেল।

আমাদের খাওয়া শেষ হচ্ছে না। চিমটি দিয়ে একটু একটু করে খাচ্ছি। হাসির চোটে বিষুম খাচ্ছি। খাই আর ট্যারাচোখে দেখি লোকটাকে।

সবকিছু এলো ঠিকঠাক মতো। লোকটা শুরু করলেন খাওয়া। বয় ছুটোছুটি করে বারবার গরম পরোটা এনে দিচ্ছে আর তিনি খাচ্ছেন। তিনি পরোটা ছিঁড়ে নেহারুর জোলে চুবিয়ে চুবিয়ে খাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে লেবুটা চিপে নিচ্ছেন, সালাদও খাচ্ছেন। আবার নেহারুর বাটিটা ঠোঁটে লাগিয়ে সুরুত করে লম্বা টান দিয়ে জোল খাচ্ছেন। বেশ মজা করে খাচ্ছেন তিনি। বয় এসে বলল, ‘চাচা, পরোডা দ আষ্টডা দিছি, আরো দিমু?’ চাচা পরোটা চিবাতে চিবাতে বললেন, ‘দই ল, দইয়ের লগে বুইত্তামারা একটা খিরমোহনের গোডা দিবি, যা, লইয়া আয়।’

চাচা খাওয়া শেষ করে দাঁত খিলাচ্ছেন আর অড়ড়-গড়র করে ঢেকুর তুলছেন। চাচার খাওয়ার মধ্যে একটা আর্ট আছে, ভাবও আছে। পাশের একটা লোক মাথা ঝাকিয়ে চাচাকে লক্ষ করে বললেন, ‘দেকলেই বুঝা যায়, খাউইয়া বেডার পুত।’

চাচা চেয়ার থেকে উঠে বিল দিতে যাচ্ছেন। এমন সময় একটা লোক ঢুকল হোটেলে। লোকটা চাচাকে সালাম দিয়ে অবাক হয়ে বলল, ‘চাচা আপনি এখানে ক্যামনে?’
চাচা বললেন, ‘নাছতা করলাম। হোনলাম এই হোডেলের পাক নাহি বালা। তাই নাছতা করতে চইলা আইলাম আরকি।’
লোকটা অবাক হয়ে বলল, ‘আপনি এই হোটেলে এসে নাশতা করলেন? আমি কি স্বপ্ন দেখতাছি নাকি। চাচা দাঁত খিলাতে খিলাতে বললেন, ‘কেন, অইছেডা কি?’
লোকটা চাচার কানে কানে কি একটা বলতেই চাচা গড়রৎ করে বমি করে দিলেন। গগগ ওয়াক করে বমি। সমানে বমি। বমি করে ভাসিয়ে ফেললেন হোটেলের ফ্লোর।

যারা বসে খাচ্ছিল তারা কেউ পা তুলে ফেলেছে, কেউবা প্লেট উপরে তুলে ধরেছে কেউবা নাকে-মুখে রোমাল দিয়ে বাঁকা হয়ে বসে আছে।

লোকটা চাচার মাথাটা ধরলেন। চাচা দু’পা একটু ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বমি করতে করতে সামনে ঝুলে পড়েছেন। মনে হচ্ছে তাঁর নাড়িভুড়ি বের হয়ে আসতে চাইছে।
এর মধ্যে আরেকটা বিপদ শুরু হয়ে গেল। দুটো বিড়াল ছুটে এসে বমির ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। বিড়ালের হর হর গড় গড় শব্দ। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম।

৩।।
বমির তোড়ে চাচার চোখ লাল হয়ে পানি বেরিয়ে আসছে। লোল-বিজলায় মাখামাখি মুখ, দাড়ি, সার্ট-প্যান্ট।

সাথের লোকটা গামছা এনে চাচার হাতে দিল। তারপর হঠাৎ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে লোকটা মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘আয় হায় হায়রে চাচা, দেকছেন্নি কারবার। দুই বিলাইয়ে বমিগুলান চাইট্টা-চুইট্টা খাইয়া ছাফা কইরা ফালাইছে।’
চাচা মুখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘বালৈছে।’

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত