ভুল মানুষ

ভুল মানুষ

— চুল কাটান নি কেন?কয়টা সিগারেট খান সারাদিনে? আপনার কি একটাই শার্ট? (স্কুল ড্রেস পরা একটা মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বললো।)

–মানে কি? তুমি আমাদের পাশের বাসার মেয়েটা না? যাকে ঐ দিন রুপার সাথে গল্প করতে দেখলাম। (রুপা আমার ছোট বোন।)

–জ্বী। তাহলে রোজ লুকিয়ে আমাকে দেখেন ? তা মেয়েদের লুকিয়ে দেখতে খুব ভালো লাগে বুঝি ? (মুখ টিপেটিপে হাসছে আর বলছে মেয়েটা।)

–এই থামো । এই বয়সে এমন ইঁচড়ে পাকা হয়ে গেছো ! কোন ক্লাসে পড়ো তুমি ?

–আমি এইবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিবো।এই বয়সে না পাকলে আন্টি,কাকি,জেঠিমাদের বয়সে পাকবো নাকি?

–বেয়াদব একটা মেয়ে। যাও এখান থেকে। (ধমকের স্বরে মেয়েটাকে বললাম।)

অতঃপর মেয়েটা আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেছে।ইদানিং মেয়েটা যে আমাকে খুব বেশি অনুসরণ করছে।কেবল অনুসরণ করছে বললে ভুল হবে বেশ বিরক্তও করছে।ফাজিল একটা মেয়ে।
এই বয়সে এত পাকা মেয়ে আমি জীবনেও দেখি নাই।
সিগারেটটা খাওয়া শেষ করে নিচে নেমে আসলাম।

তারপর থেকে মেয়েটার ভাব দেখে এটা দিব্যি বুঝতে পেরেছি যে মেয়েটা আমাকে ভালবাসে।কিন্তু আমি মেয়েটাকে পাত্তা দেইনা বললেই চলে।এই বয়সের ছেলেমেয়েদের আবেগ একটু বেশি হয়ে থাকে।এগুলোকে পাত্তা না দেওয়াটাই ভালো।আমিও রোজ মেয়েটাকে এড়িয়ে চলতে লাগলাম।মেয়েটার নাম ছিলো মাসরুরা।

কিন্তু নাহ্ ! এই মেয়েতো নাছোড়বান্দা ! এভাবে আমায় বিরক্ত করা ছাড়বেনা। অবশেষে বাধ্য হয়ে মেয়েটার সাথে কথা বলতে লাগলাম।মেয়েটা আগে থেকেই আমার জন্য দুর্বল ছিলো। সেই সুযোগে একটু মজা কেন না নিবো বলুন? মেয়েটার সাথে প্রায় দু,মাস বেশ মজা নিলাম। দু’মাস পরে মেয়েটাকে সব খুলে বললাম যে ওর সাথে আমি মজা করেছি।আমি আসলে ওকে ভালবাসিনি। প্রতিউত্তরে মেয়েটা কিছুই বললো না।

দেখতে দেখতে সময় কেটে যেতে লাগলো।কিছুদিন পর রুপাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলো।আমি রোজ রুপাকে সাথে নিয়ে স্কুলে যেতাম আবার পরীক্ষা শেষে নিয়ে আসতাম।আদরের ছোট বোন বলে কথা।

কিছুদিনের মধ্যে রুপাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। আর মাসরুরার পরিবার বাসাটা ছেড়ে দিলো।মেয়েকে কলেজে ভর্তি করাবে সেই সুবাদে তারা অন্য বাসায় চলে গেলো।অবশ্য আমার জন্য খুব ভালো হয়েছে।কারণ এমন ইঁচড়ে পাকা মেয়ে চোখের সামনে না থাকাটাই ভালো।

এতটুকু পর্যন্ত সব ই ঠিক ছিলো। কিন্তু মাসরুরা চলে যাওয়ার পর কেন জানি আমি ওর অস্তিত্ব খুঁজতে লাগলাম।খুঁজতে খুঁজতে বছরগুলো কেটে যাচ্ছিলো।

কয়েকবছর পর …

–মাসরুরা না?

(নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জোয়ারভাটার দৃশ্য দেখছিলাম। ঠিক তখন খেয়াল করলাম একটু দূরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে।কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।)

–জ্বী , মাসরুরা ।

(নদীর পানির দিকে তাকিয়ে, এলোমেলো চুলগুলোকে কাঠিতে আবদ্ধ করতে করতেই উত্তর দিলো। ওর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিলো নদীর পানি হলো আয়না। আর মাসরুরা মন দিয়ে আয়না দেখছে আর চুলে খোঁপা করছে।)

–হেরে যাওয়া মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস খুব খারাপ হয়। পরবর্তিতে তা জিতে যাওয়া মানুষগুলোকে ভালো থাকতে দেয়না। যদিও তুমি হেরে গিয়ে জিতে গিয়েছো আর আমি জিতে গিয়ে হেরে গিয়েছি। (আমিও নদীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বললাম।)

–আপনার দেওয়া অবহেলাগুলো আমার সেখানেই জমা হয়েছে যেখানটায় রোজ সকালে আমার মা চুমু খায়। মাঝে মাঝে ভাবতাম, মোনাজাত ভুল ছিলো নাহ্, মোনাজাতে চাওয়া মানুষটাই ভুল ছিলো !

–তীব্র ব্যর্থতার এই দৃশ্য আমি রোজ দেখি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। তোমার স্মৃতিগুলো রোজ দরজার ওপাশ থেকে ব্যানার হাতে স্লোগান করে, “আমরা শোকাহত”।

–খুব অসহ্য রকমের সহ্য ক্ষমতা নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হয়, তাইনা?

–হু! আল্লাহর দেওয়া বিশেষ উপহার হলো মানুষের অদ্ভুত ক্ষমতা। একটা মানুষই পারে আরেকটা মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। মাসরুরা, চলোনা এখান থেকেই আবার নতুন করে সব শুরু করি।

–নিজের ভেতরের কিছুটা মূল্যয়ন বাঁচিয়ে রেখেছি নিজের জন্য। আপনার জন্য অবশিষ্ট কিছু নেই। আমি ভুল জায়গায় ভুল মানুষকে আপন করে ভুল করেছিলাম। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালোনা। এখন যদি নতুন করে শুরু করতে চাই তাহলে সেটা আমার নিজেকে ঠকানো হবে। অত বেশি মূল্যয়ন করবোনা যেটাতে আমার জন্য অবশিষ্ট কিছু থাকবে না।

–মাসরুরা , তুমি কি আমাকে ভালবাসো না?

–ভালবাসা! সেটাতো দূর্গন্ধযুক্ত, পঁচা, অর্ধগলিত, বস্তাবন্দী
মৃত লাশ।

–তোমার আমাকে ফিরে পাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই ?

–কিছু ইচ্ছেকে অনিচ্ছাকৃত ভাবে হলেও মেরে ফেলতে হয়।সেসব ইচ্ছেগুলোকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আগেই তার ঘাড় ভেঙ্গে নুয়ে দিতে হয়।ভুল মানুষকে গুরত্ব দেওয়া এক ধরনের ক্ষুধে পাপ।

–অনেক পাল্টে গেছো, মাসরুরা। সেই পাগলী মেয়েটার অস্তিত্ব এই মাসরুরার মাঝে আর নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেই অস্তিত্বটা।
আমাকে ক্ষমা করে দাও, মাসরুরা।

–ক্ষমা করা যায় না তাকে। যে পবিত্র ভালবাসায় থু থু ছিটিয়েছে। সবচাইতে কঠিন অভিনয়টা গাধারাই করে।ভালবেসেও না বাসা। আর সবচাইতে সহজ অভিনয় করে লম্পটেরা,ভালো না বেসেও ভালবাসার অভিনয় করা। সেদিন আমার বলার সুযোগ ছিলো না। তাই দাঁত দিয়ে কামড়ে হজম করেছিলাম আপনার এক একটা বিষাক্ত কথা।যেটা আপনার কাছে মজা ছিলো।
মনে রাখবেন,

শিখতে হয় মাথা নিচু করে আর বাঁচতে হয় মাথা উঁচু করে।

মাসরুরার এই কথাটি শুনে কেন জানি আমার মাথাটা নিচু হয়ে গেলো।হয়তো অতীতে করা পাপের জন্য । আর ও মাথা উঁচু করেই হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলো আমার নুয়ে থাকা দৃষ্টির অগোচরে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত