শ্বশুরবাড়ির মাইর

শ্বশুরবাড়ির মাইর

তিথি তার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছে। আমি তিথির সামনে গিয়ে জোরে জোরে বলছি শীতকাল তো চলে গেল পিঠা খাওয়া হবে না নাকি! তোমার হয়তো ইচ্ছে হয় না কিন্তু আমার তো ইচ্ছে হয়। আচ্ছা তোমার যদি পিঠা বানাতে কষ্ট হয় তাহলে তো বলতে পারো! আমি আমার বোনের বাসা থেকে পিঠা খেয়ে আসব। আসলে কথাগুলো শাশুড়িকে উদ্দেশ্য করে বলছিলাম যাতে পিঠা খাওয়ার দাওয়াত দেয়। আর আমার উদ্দেশ্যও সফল হল শাশুড়ির কানে আমার আওয়াজটা ঠিক মতোই পৌঁছে গেছে। সামনের সপ্তাহে আমাদের দু’জনকে পিঠা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছে শাশুড়ি আম্মা। তিথি এই নাও আব্বা কথা বলবে তোমার সাথে।

— হ্যালো আব্বা ভালো আছেন। শরীরের অবস্থা কেমন!
— এইতো বাবা ভালোই আছি” তুমি কেমন আছো?
— আব্বা আমার কথা আর বইলে না!
— কেন বাবা কী হয়েছে?
— আব্বা আপনার মেয়ের জন্য আর ভালো থাকতে পারলাম কই?
— কেন আমার মেয়ে আবার কী করেছে?
— আব্বা এই শীতে আমাকে প্রতিদিন গরুর মতো চুবানি দেয়। আপনি বলেন তো এই শীতে মানুষ গোসল করে? আর আমাকে দিন একবার গোসল দিতেই হয়। শুধু মাত্র আপনার মেয়ের চাপে।

— বাবা দুঃখের কথা তুমি কার সাথে বলছো! তোমার শাশুড়িও আমার একই অবস্থা করে।
— কী বলেন আব্বা! তা আপনি প্রতিবাদ করেন নাহ্?
— বাবা প্রতিবাদ করতে গেলেই মুখ চেপে ধরে। আর মানসম্মানেরও একটা ব্যাপার আছে তো।
— আব্বা সবই কপাল, এখন বুঝতে পারছি তিথিও তার মায়ের মতোই হয়েছে। আমি খুবই কষ্টে আছি আব্বা।
— আচ্ছা এক কাজ করতে পারো?
— কী কাজ বলেন তো আব্বা?
— তিথি মামণি তোমার কাছে নেই তো?
— আরে আব্বা বলেন কী! সে থাকলে কী এই সব কথা আপনার সাথে বলতে পারি? সে শুনলে আমার মাথা ফাটিয়ে ফেলবে নাহ্। আপনি বলেন আমি দূরে আছি।

— আচ্ছা তুমি তোমার বউকে মানে তিথিকে শায়েস্তা করতে চাও?
— হ্যাঁ আব্বা অবশ্যই চাই, তবে কেমনে কী করব বলেন তো?
— তোমার শাশুড়ি নাহ্ তোমাকে সহ মামণিকে পিঠা খাওয়ার দাওয়াত দিয়েছে?
— হ্যাঁ আব্বা আম্মা তো কিছুক্ষণ আগেই দাওয়াত দিল।
— যাক আর কিছু করা লাগবে না তুমি দ্রুত চলে এসো তারপর খেলা হবে! এক ঢিলে দুই পাখি মারবো দেখ।
— আব্বা তারমানে এই সুযোগে আপনি আম্মাকেও শায়েস্তা করতে চান বলেন?
— আরে বাপু বেশি কথা বল কেন! আগে আসবে তো তারপর দেখো।
— আচ্ছা আপনি যা বলবেন সেই অনুযায়ী কাজ করব আব্বু
— আচ্ছা এখন রাখি, ভালো থেকো।

শ্বশুর বাড়ি যে যাব, এই শীতে তো রাস্তায় বাহির হতেই ভয় লাগছে। যাই হোক সেই সময় আসুক তারপর দেখা যাবে। তিথির অনেক জ্বালাতন আর অত্যাচার সহ্য করেছি একবার শ্বশুর বাড়ি যেয়ে নেই তারপর মজা দেখাব। বলে না চোরের দশদিন আর সাধুর একদিন তাইই দেখাব। দশ দিনের অত্যাচার অপমান আমি একদিনেই শোধ তুলব।
প্রতিদিন সকাল নয়টা দশটার সময় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হই। কিন্তু আজ শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার কথা তাই তিথি ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে। এই সকালে আমাকে বলে গোসল করে আসতে। মনে মনে এতো পরিমাণে রাগ হচ্ছে। আমি বললাম এই সকালে আমি গোসল করতে পারবো না৷ তুমি গোসল কর আমি গোসল ছাড়াই শ্বশুর বাড়ি যাব। তাওয়ালা মুরগী যেমন তার বাচ্চার দিকে গেলে ঝাপিয়ে ঠোঁকর দিতে আসে ঠিক তিথিও আমার এই কথা শুনে আমার দিকে ঝাপিয়ে আসলো। আমি একলাফে বেড থেকে ওয়াশরুমের দরজার সামনে গেলাম। তারপর শালিক পাখির মতো গোসল করে বেরিয়ে আসলাম। এদিকে তিথির সাজগোজ সব শেষ। অন্য মেয়েদের মতো আমার বউ সাজতে তিন ঘন্টা সময় লাগায় না।

অবশেষে বর্ষকালের ছাতার মতো বউটাকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় এখনো কুয়াশা কাটেনি রিক্সাওয়ালা তো দূরের কথা একটা কুত্তাও চোখে মিলছে না। কুয়াশায় হাঁটতে হাঁটতে একটা রিক্সা পেলাম। মনেহয় এর বউও বের করে দিছে। তা নাহলে এতো সকালে রিক্সা নিয়ে কেউ রাস্তায় বের হয়? যাই হোক লাউ গুড়গুড় করতে করতে শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে গেলাম। শ্বশুর বাড়ি এসে দেখি শ্বশুর শাশুড়ি আমার নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। এখন বাজে সকাল ১১ টা কিন্তু শ্বশুর আমার এখনো ঘুমাচ্ছে। এদিকে আমার সাথে বলল শাশুড়ি নাকি তাকে ঘুমাতে দেয় না। তাহলে কি শ্বশুর আব্বা আমাকে পাম দিয়ে আনলো। বুঝছি নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে। সমস্যা নেই আমি যখন একবার এসে পড়েছি তবে আমিও এর শেষ না দেখে ছাড়ছি না।

পুকুর পাড়ে বসে মাছ দেখছি আর রৌদ্রের তাপ নিচ্ছি। মাছগুলো বেশ কিলিবিলি-কিলিবিল করে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট ঢিল মারতেই আবার সবাই যেনো লুকিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে শ্বশুর এমন চমক দিল মনে হচ্ছে আমি শ্বশুরের বন্ধু। শ্বশুর আমার সাদা মানুষ, তার মনে কাদা নেই। আমি বললাম তা আব্বা ঘুম ভাঙলো তাহলে? আমি তো মনে করলাম আজ আর ঘুম ভাঙবে না আপনার আর আম্মার। যাই হোক আপনার দেখা তো মিললো এতেই শান্তি। আর বাবা বলো না তোমার আম্মায় আজ আমাকে উঠতে দিচ্ছিলো না। ও থাক তোমার ওসব শোনার দরকার নেই। তুমি কখন আসলে তাই বল? আমি বললাম এইতো আব্বা মাত্র দুই ঘন্টা হলো। যাই হোক আব্বা কি পরিকল্পনা করলেন সেটা বলেন।

হ্যাঁ বাবা ঠিক বলেছো এখন নিরালায় আছি এখনই শেয়ার করা উচিত। তা নাহলে তোমার আম্মা আবার কখন কোন কাজে পাঠায় আমাকে! আচ্ছা শোনো মনোযোগ সহকারে শুনবে, তুমি আর তোমার বউ মানে আমার মেয়ের সাথে এমন এমন খারাপ ব্যবহার করবে যেটা তীব্র মাত্রায় বাড়াতে থাকবে এক সময় তোমার বউ তোমাকে মারতে আসবে। আর আমি সেই সময়ই তোমার শাশুড়িকে তোমাদের রুমে পাঠিয়ে দেবো কোন একটা জিনিস আনতে। তখন তোমার শাশুড়ি নিজ চোখে দেখতে পাবে তার মেয়ের তোমার প্রতি দুর্ব্যবহার। আর এসব দেখার পর আচ্ছা মতো শিক্ষা দিবে তোমার বউকে..। ঠিক একই কাহিনী আমিও করব তোমার শাশুড়ির সাথে আর তুমি তিথি মামণিকে পাঠিয়ে দিবা আমাদের রুমে। তার মায়ের এমন খারাপ আচারণ দেখে তিথি ছিঃ ছিঃ করবে। তখন তোমার শাশুড়িরও ভালো রকম শিক্ষা হবে।

আচ্ছা বাবা আজ রাতেই কিন্তু কাজটা করতে হবে। বেশি সময় নেওয়া যাবে না তারা মা মেয়ে দুইটাই কিন্তু চালাক। আর শোনো খুব সাবধানে কাজ করতে হবে কিন্তু! কোন রকম ধরা যেন না পড়ি। আমি বললাম আব্বা সবই ঠিক আছে কিন্তু একটা কথা শুনতে হবে আপনার। আপনি ঝগড়াটা আগে করবেন তারপর আমি। আপনার দেখেই তো আমি শিখবো। শ্বশুর বলল আরে তুমি ছোট তুমিই শুরু কর। আমি তো আছি তোমার পাশেই। তাছাড়া তুমি আগে করলে তোমার লাইনটা আগে সমাধান হয়ে যাবে। আব্বা আপনি আমার চিন্তা করবেন না নাতো। আমি আগে আপনার দুঃখ ঘুচিয়ে দিব। অবশেষে বাবা বলল আচ্ছা আমিই আগে মুক্ত হই তারপর তুমি হইয়ো। আচ্ছা তুমি রাত ১১ টার সময় তিথিকে আমাদের রুমে পাঠিয়ে দিবা আমি তখনই তোমার শাশুড়িকে খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যাব। ঠিক ১১ টার সময় মনে থাকে যেন। আচ্ছা আব্বা আপনি চিন্তা কইরেন না আমি যথা সময়েই পাঠিয়ে দিব আপনার দজ্জাল মেয়েকে।

শীতের কনকনে রাত ১১ টা মানে অনেক তারপরও আমরা দুই জামাই শ্বশুর জেগে আছি শুধু মা,মেয়েকে শায়েস্তা করার জন্য। শ্বশুরের রুম থেকে ডুমডাম আওয়াজ আসছে তারমানে শুরু হয়ে গেছে। আমি তিথিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বললাম ঐ দেখো তোমার আব্বা আম্মা কেমন পরিমাণে মারামারি করছে। এই বয়সেও এই কাহিনী ছিঃ ছিঃ। পাড়ার লোক যদি শোনে তাহলে তো আমাকেই শুনতে হবে। যাও গিয়ে থামাও। তা নাহলে আমিই কিন্তু এই রাতে চলে যাবো।

তিথি সাপের মতো ফোসফোস করে উঠে গেল। আমি সরাসরি লাইভ দেখব বলে তিথির পিছু পিছু গেলাম। গিয়ে দেখি শ্বশুর শাশুড়ি ঘুমাচ্ছে আর টিভিটা অন আছে। সেখান থেকেই ডুমডাম আওয়াজ আসছে। মনে মনে বলছি শালার শ্বশুর তুমি ঝগড়া না করে ঘুমিয়ে পড়লে আগামীকাল তোমার উচিৎ শিক্ষা দিব। তিথিকে বুঝতে না দিয়ে আস্তে আস্তে রুমে চলে আসলাম। কিছুক্ষণ পর তিথি রুমে ঢুকে দরজাটা লক করলো। আমি ঘুমানোর ভান করে ঘাপটি মেরে আছি। খানিকটা পর দেখলাম আমার পিঠের উপর ডুমডাম পড়তেই আছে। মাইর খাচ্ছি আর অভিশাপ দিচ্ছি শ্বশুরের উপর। আজ শ্বশুরের বুদ্ধিতেই আমাকে শ্বশুরবাড়িতে মাইর খেতে হল।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত