মাথার পাশে পরে আছে একটা চশমা

মাথার পাশে পরে আছে একটা চশমা

রিতু পিছে বসলেই পুরো শরীর কনকনে শীতেও গরম হয়ে যায়। সম্প্রতি আব্বার দেয়া ১১০সিসির ডিসকভার বাইক বিক্রী করে পালসারের ১৬০সিসি কিনেছি।

ছোটবেলা থেকে বাইকের প্রতি আমার প্রচন্ড দুর্বলতা আর সেটা যদি হয় পালসার তাহলে তো কথাই নেই। স্কুলে পড়তে বাইক চাইলেই আব্বা বলত, কলেজে উঠে নে, কলেজে উঠার পর আব্বার কথা বদলে হয়ে গেল

ইউনিভার্সিটিতে উঠে নে তারপর। ইউনিভার্সিটিতে উঠার পর ফার্স্ট ইয়ারেও বাইক পেলাম না, সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর বলতে বলতে শেষ পর্যন্ত সেকেন্ড ইয়ারের শেষের দিকে ১১০সিসির ডিসকভার বাইক কিনে দিয়েছে আব্বা। কেনার সময় আব্বাকে এত করে বললাম, আব্বা ১৫০সিসি কিনে দাও, সে কিছুতেই রাজী হল না। তার ধারণা বেশি সিসির বাইক কিনে দিলে আমি মোটরসাইকেল কে মোটসাইকেলের মতন না চালিয়ে রকেটের গতিতে চালাব।
আমার মনে হয়, কম সিসির বাইকের দাম কম, তেল খরচ কম হয় এইসব বিবেচনা করে সে আমাকে ১১০সিসি ধরিয়ে দিয়েছে। কারণ তেলের দাম তো তাকেই দিতে হবে।

বন্ধু-বান্ধবদের সাথে পাল্লা দিয়ে কখনোই পারতাম না, কখনো কোথাও ঘুরতে গেলে ওরা সাই সাই করে ছুটে যেত আমি পরে থাকতাম একদম পিছে। সবসময় পিছনে পরে থাকার কারণেই কেউ আমার বাইকে উঠতে চাইত না।
বন্ধুদের সবারই ১৫০ সিসির বাইক, এমনকি ইউনিভার্সিটির দারোয়ান যে, সে পর্যন্ত এপাচি ১৫০ সিসির বাইকের মালিক, কেবল মাত্র আমারই ডিসকভার ১১০। এ নিয়ে মনের মধ্যে অপমানের কোন শেষ নাই।

ফাইনাল ইয়ারে ওঠার পর থেকে আব্বার কানের কাছে গিয়ে আবারও ১৫০সিসির বাইকের জন্য ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দিলাম, কিন্তু সে বার বার একই বাক্যের চর্চা করল-
“টাকা কামিয়ে কিনে নাও গিয়ে”।

ফাইনাল ইয়ারের মাঝামাঝি আব্বার এই কথাটা হৃদয়ে তীব্র মাত্রায় দাগ কাটতে শুরু করল। এমন জেদ চাপছিল, ইচ্ছা হচ্ছিল ওই মুহূর্তে আব্বার কিনে দেয়া বাইক আব্বাকে ফিরিয়ে দিয়ে, মাটি কেটে হোক, দিনমজুর খেটে হোক টাকা জমিয়ে নতুন একটা ১৫০ সিসির বাইক কিনি, কিন্তু পরে ভেবে চিন্তে মনকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরীর আগ পর্যন্ত সবুর করতে বললাম।

দুটো জিনিস সামনের দিকে চ্যালেঞ্জের মতন হয়ে গেল।

১.আব্বাকে নিজের টাকায় বাইক কিনে দেখানো আর

২.টাকা জোগাড় করার জন্যে চাকরি।

অনার্স শেষ করে, চাকরির পিছে ছুটতে শুরু করলাম কিন্তু চাকরি তো হয়ে গেছে ‘সোনার হরিণ’ চাইলেই তার নাগাল পাওয়া যায় না।

চাকরি খোঁজার পাশাপাশি এলাকার একটা স্কুলে হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে ঢুকে পরলাম। মাসখানেক পরে ৪টা প্রাইভেট টিউশনি পেয়ে গেলাম, প্রাইভেটের পাশাপাশি বাসায় দুটা ব্যাচ পড়াতে শুরু করলাম।

শিক্ষকতার পাঁচ মাসের মাথায় বাইকের টাকা জমে গেল। পুরোপুরি টাকা জমে যাবার পর, বাইক কিনতে চলে গেলাম মার্কেটে। বাইক কিনতে গিয়ে দেখলাম পালসারের নতুন মডেল এসেছে ১৬০সিসির। এটা দেখার পর অন্য কোন বাইককে আর বাইকই মনে হলো না, পালসারের ফ্যান কিনা! শেষ পর্যন্ত ১৬০সিসিই কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

বাইক নিয়ে বাইরে বের হলে নিজেকে হিরো হিরো মনে হয়। সেকেন্ডে একশয় একশ স্পীড। এলাকায় ১৬০সিসির পালসার কেবল একটা এবং সেটা আমারই। আগে বন্ধুরা যারা আমার বাইকে উঠতেই চাইত না, তারা এখন দিনে একবার করে অন্তত কল করে। রিতুকে সময় দেবার পর, ওতো জনকে সময় দেয়ার সময় কই আমার? জীবন গোছানোর সময় হয়ে গেছে। ভাবছি চাকরি খোঁজা বন্ধ করে দিয়ে প্রফেশনালি শিক্ষকতা পেশা হিসেবে নিয়ে নিবো।
রিতু আমার খালাত বোন। রিতুর সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, তবে বাসায় সেরকম কিছু জানে বলে মনে হয় না। দুই পরিবারে আমাদের দু’জনের বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা চলছে। বিয়ের কথাবার্তা শুরু হবার পর থেকে রিতুকে নিজের সম্পদ বলে মনে হয়। বাইকে আমরা প্রায়ই এখানে সেখানে যাই। ডিসকভার থাকতে রিতু আর আমার মাঝখানটায় কিছুটা ফাঁকা থাকত, পালসারে পিছনের সিট উঁচু আর ছোট হওয়ায় রিতু আমার সাথে ঘেসে কোমরে হাত রেখে বসে। প্রায়ই ইচ্ছাকৃত ভাবে হাইড্রোলিক ব্রেক চেপে রিতু কর্তৃক একটা ধাক্কার উদ্রেক ঘটাই। ব্রেক কষতেই রিতু আমার পিঠের সাথে একটা করে মৃদু ধাক্কা খায়।

রিতু পিছে থাকলে পাশ দিয়ে কোন বাইক ওভারটেক করে সামনে চলে গেলে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, তাই রিতু পিছে থাকলে অন্যান্য সময়ের চেয়ে বাইক দ্রুত গতিতে ছোটাই।

আজও অন্যান্য দিনের মতই বার বার ব্রেক কষছিলাম, রিতু বার বার মিষ্টি করে একটার পর একটা ধাক্কা খাচ্ছিল আমার পিঠে।

বাসাবো ফ্লাইওভার দিয়ে তখন মালিবাগ রেলগেটের দিকে যাচ্ছিলাম, স্পিড ১১৭ থেকে ১২০ এর মতন ছিল, হঠাৎ বাম পাশের লেন থেকে একটা প্রাইভেট কার দ্রুত গতিতে সামনে চলে এলো, আমি দ্রুত হাইড্রলিক ব্রেক চেপে ধরে কন্ট্রোল করতে না পেরে বাইক সহ পরে গেলাম, সাথেই সাথে একটা আতঙ্কিত গলার একটা তীব্র চিৎকারের শব্দ হলো।

পায়ে বেশ ব্যথা পেয়ছি, দু তিনজন এসে আমাকে রাস্তা থেকে উঠতে সাহায্য করল, কোনরকম উঠে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাইকের পাশেই একটা গোল জটলা লেগে আছে। ন্যাংরাতে ন্যাংরাতে সামনে গিয়ে দেখলাম, একটা দেহ রাস্তায় পরে আছে, মাথাটা পুরোপুরি মিশে গেছে রাস্তার সাথে, দেখে চেনার মতন কোন উপায় নেই কে সে, তবে সে রিতুর মতনই লাল রঙের সালোয়ার-কামিজ পরিহিত, হাতে রোলাকের ঘড়ি, কফি কালারের ভ্যানিটিব্যাগ। রাস্তার সাথে মিশে যাওয়া মাথাটার কিছুটা দূরে পরে আছে একটা চশমা।

চশমা টা দেখতে ঠিক রিতুর চশমার মতন।
“মাথার পাশে পরে আছে একটা চশমা”

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত