একটু উষ্ণতার জন্য

একটু উষ্ণতার জন্য

মসজিদের নগরী ঢাকায় শীতে প্রায় প্রতিরাতেই কোনো না কোনো গলিতে ওয়াজ-মাহফিল বসে। খুব ছোটবেলায়, যখন আমার আম্মু ছিল তখন পাবনা আজকের

মত ছিল না। খানিকটা গ্রাম্য ছিল।বাসার পাশে বিশাল বড় মাঠে জালসা হোতো। এলাকার মেয়ে জামাইরা বাপের বাড়ি আসতো। পাশের এলাকার লোকেরা আসতো। দুই থেকে তিন রাত ওয়াজ হোতো।হ্যাজাক লাইট, মাইক আর হুজুরের বয়ান চারিদিকে উৎসব উৎসব লাগতো। আমি আম্মুর কোলে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতাম আব্বু বাসায় আসবে কখন। আব্বু আসতো রাত এগারোটার দিকে। তখন সবে বড় হুজুর সালাম বিনিময় শুরু করতো।ওয়াজ চলতো ভোর রাত্রির পর্যন্ত। আমি আব্বুর কাঁধে বসে যেতাম। ঘুরে আবার বাসায় আসতাম।আব্বু আম্মুর মাঝে শুয়ে ওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম। আমি এখন একুশের তন্বী তরুণী। সেই ছোটবেলাটা হারিয়ে গেছে। আমার শৈশব হারিয়ে গেছে দশ পয়সায় কেনা লজেন্স আর আট আনার নারকেল দেয়া আইসক্রিমের সাথে।
এক সন্ধ্যায় দেখলাম আমি বড় হয়ে গেছি।দাদী বাড়ির গোবর লেপা উঠোনে তুলসী তলায় দেয়া প্রদীপ ঘিরে বাঁশ গাছের মাথার উপর দিয়ে আর চাঁদ দেখে মুগ্ধ হচ্ছি না।ভাইবোনরা একসাথে বলছি না ‘দ্যাখ লিমাপু, দ্যাখ জয় চাঁদটা আমাদের সাথে সাথে যাচ্ছে । ‘

একদিন হারিয়ে ফেললাম রেডিওর সন্ধ্যে। ভাইবোন, চাচা,আব্বু, দাদুভাইয়ের সাথে মারামারি করে রেডিওর স্ট্যাটিসস্টিক এর শব্দে বিরক্ত হয়ে রেডিওকে দুই তিন থাপ্পড় দেয়া নাই। বাতির আগুনে চুল পোড়ে কিনা দেখতে যেয়ে চুল পুড়িয়ে ফেলার বাতিগুলো নাই হয়ে গেল।হ্যারিকেনের সলতে কে তুলবে, কাঁচ কে মুছবে তাই নিয়ে নেই হট্টগোল।

হারিয়ে ফেললাম তিলে গজা, এক টাকার বাঁশি,মেলার পুতুল নাচ আর নৌকাবাইচ।
আরো কিছুদিন পর দেখলাম আরো বড় হয়ে গেছি। চেয়ারম্যানের বাড়ির হৃষ্টপুষ্ট ছাগল কিভাবে চুরি করে খাব সেই চিন্তাটা হারিয়ে গেল। নজরুল কাকাদের বাড়ির মুরগীগুলো আর চুরি হওয়ার ভয় পায় না।স্কুলের ডাব চুরি করতে আমি উঠবো নাকি শাকিল উঠবে তাই নিয়ে আর মারামারি হয় না।

হারিয়ে গেল বসন্তবৌরি পাখিটা। হাত রাখা হয় না ঘুঘুর কবোষ্ণ বুকে। আমার একটাকা দামের শখের ঢাউস ঘুড়িটা ভোকাট্টা হয়ে উড়ে গেল কোথায় আর খুঁজে পেলাম না। বনের বিযুক্ত বাঘের গায়ের ঘ্রাণের মত করে সব কেমন একা একা হয়ে গেল।

এক সন্ধ্যায় ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি কোথাও কেউ নেই। প্রিয় মানুষেরা এতটাই দূরে গেছে তাদের নাগাল পেতে পারছি না। সে এক ভীষণ শীতার্ত সময়। চারিদিকে কি ভীষণ ঠান্ডা। দূরে কোথাও কাঠ ফাটার শব্দ ছিল। একটু উষ্ণতার জন্য হেঁটেছি এতটা দূর।
কোনো এক ডিসেম্বরেই

আম্মুকে কবরে নামিয়ে দিতে দেখেছিল আট কি সাত বছরের বাচ্চাটা। কোনো এক ডিসেম্বরেই মানুষের নির্মমতায় আস্থা হারিয়ে হৃদয় ভাঙার দুঃখ পেয়েছিল মেয়েটা।
ঘুরে ফিরে সেই ডিসেম্বর। একটা মাসকে চাইলেই আমরা
ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে গায়েব করে দিতে পারি না।
ছোটবেলায় ওয়াজ শুনে আব্বুর বুকে মাথা

রেখে আম্মুর গায়ে পা তুলে ঘুমানোর উষ্ণতার রেশ আমি আজও খুঁজে পাই এইসব বিষণ্ণ রাতে। এখনো শীতের রাত গুলোয় ওয়াজ মাহফিল হলে আমি কান পেতে শুনতে শুনতে ঘুমাই। একটা ফড়িং ধরার জন্য তাকাই এই শহরের জ্বলে যাওয়া ঘাসে ।এই শহরে আমি উষ্ণতা খুঁজে পাই না। এ শহর বড় রংবাজ প্রেমিক আমার।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত