অপরিচিতা

অপরিচিতা

আজ অফিস থেকে ফিরতে অন্য দিনের থেকে একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছিলো।অফিসের বস কি আর আমার কথায় চলে।তাছাড়া আজ জরুরি মিটিং ছিলো।তাই আসতে বড্ড বেশি দেরি করে ফেলি।বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই কাজের মেয়ে গজগজ করে উঠলো।সে সমস্ত কাজ সেরে তৈরি হয়েই বসে ছিল নিজের ঘরে যাবে বলে।প্রায় সারাটা দিন সে এখানেই থাকে।ঘরের সমস্ত কাজ,ছেলের দেখাশোনা সে একাই করে ।

-আজ আপনার এতো দেরি হলো কেনো?
-অফিসের জরুরী কাজ ছিল।বাবু কোথায়?
– বাবুকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি।

এই বলে বেরিয়ে গেলো।কিছুটা রাগ আমার উপর।

আমি ওর কথায় কান দিলাম না।দরজা বন্ধ করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।জলদি ফ্রেশ হয়ে নিলাম।
বাবুর কাছে গেলাম,সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।আমি বাবুর মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে ওর গালে একটা চুমু খেয়ে পাশে শুয়ে পরলাম।
খেতে ইচ্ছা হল না,তাই খেলাম না।রাতের খাবার টেবিলেই পরে রইলো।
ডিমলাইটের আলো জ্বলতে থাকলো ।
আজ মনে হয় চাঁদ ওঠেছে,জানালা দিয়ে এক ছিটে চাঁদের আলো ঘরের মেঝেতে পরে লেপটে আছে।সেই আলোতে ঘরটায় এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ।

ঘুম আসছিলো না,ঘড়ির টিক টিক আওয়াজ ক্রমশ নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছিল।বিছানায় শুয়ে আমি ছটফট করতে লাগলাম।গলাটা যেন শুকিয়ে আসতে লাগলো।

দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখা অপরিচিতার ছবির দিকে তাকালাম।মনে আছে আমার আর অপরিচিতার প্রথম দেখা হয় ক্যাম্পসে।সেখান থেকে পরিচয়।প্রথম দেখায় দুজনের একটু ঝগড়া হয়।ভুলবোঝা বুঝি নিয়ে।সেই ঝগড়ার কারণেই দুজনে কাছে আসার সুবিধা হয়ে ছিল।নাম ছিল তাসমিনা সুলতানা বর্ণি।তবে আমি অপরিচিতা বলেই ডাকতাম।দুজনের মাঝে অনেক ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়।আমি অনেক পছন্দ করতাম কখনো বলার সাহস ওয়ে ওঠেনি।তারপর দুজনে দীর্ঘদিন একসাথে পথ চললাম।একদিন বিয়ের জন্য প্রপোজ করি।কিছুদিন পর সেও রাজি হয়।অপরিচিতাও আমাকে পছন্দ করতো।

দুজন দুজনকে পছন্দ করতাম তবে বলা হয়ে ওঠেনি কখনো।সেদিন বই মেলায় বিয়ের জন্য প্রপোজ করি।হয়তো অপরিচিতা তা কখনোই ভাবতে পারেনি।এমন ভাবে প্রপোজ করে ফেলবো।এক গুচ্ছ চুড়ি দিয়ে।
প্রায় তিনমাস হয়ে গেছে সে অপরিচিতা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ওপারে।হঠাৎ করেই আমাকে একা রেখে না ফেরার দেশে একা চলে যায়।কথা দিয়েছিল যতদিন থাকবে আমার পাশে থাকবে।তবে….
বাবুর বয়স পাঁচ বছর হল।আজও সে মাঝে মধ্যে ঘুমের ঘোরে মা,মা করে ওঠে ।
আমিও তার মাকে খুব মিস করি।অনেকে আবার বিয়ে করে নেওয়ার কথাও বলেছেন।কিন্তু আমি সোজা না করে দিয়েছি।অপরিচিতা কিছু স্মৃতি বুকের এক কোণে রয়ে গেছে।কখনো অপরিচিতার স্থান কাউকে দিতে পারবো না।অপরিচিতার রেখে যাওয়া স্মৃতি গুলো নিয়েই আমি বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো । বাবুকে তার মায়ের অভাবটা যতটা পারি বুঝতে দেবো না…।
ঘড়ির টিক টিক আওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুম ধরে আসছিলো ।
– তুমি আজ খাওনি কেন?

হটাৎ কানের কাছে ফিস ফিস আওয়াজ শুনে ঘুমটা ভেঙে গেলো।চোখ খুলতেই দেখলাম এক ছায়ামূর্তিকে দ্রুত সরে যেতে।আমি চমকে বিছানায় উঠে বসেছি ততক্ষনে ।
দেখি ছায়ামূর্তি বিছানার একপাশে দারিয়ে বাবুর মাথায় হাত বোলাচ্ছে ।
– আজ এতো দেরি করে এলে যে… বাবু সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পরল ।- ছায়ামূর্তি বলে উঠলো ।
“অপরিচিতা – আমি অস্ফুটে বলে উঠলাম ।
– হ্যাঁ, তোমারই অপরিচিতা।

অনেকবার চেষ্টা করেছি এখানে আসার জন্য, কিন্তু অনুমতি হয়নি।কিছু নিয়মের ঘেরাটোপে বন্দি ছিলাম ।আজ অনুমতি পেলাম আসার ।
আমি কিছুই বলতে পারলাম না, মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিল না ।
অপরিচিতা বলে চলল – জানি তুমি আমায় ভুলতে পারবে না,তবুও তুমি বিয়ে করে নাও।এখন বাবুর মায়ের খুব দরকার।মায়ের ভালোবাসা থেকে ওকে বঞ্চিত রেখো না।আর তুমিও নতুন করে জীবন শুরু করো।আমিতো এখন অতীত হয়েই গিয়েছি।পারলে আমায় ভুলে যাও।
-পারবো না।তোমার স্থানে অন্য কাউকে বসাতে!
-তুমি সেই একঘুয়েই রয়ে গেলে।বাবুর কথা একটু ভাবো।আমি চললাম, হাতে আর সময় নাই।
– আবার করে দেখা হবে? আমি মৃদু স্বরে বলে উঠলাম ।
– জানিনা, ভালো থেকো।বাবুকে খুব ভালোবাসা দিও । বলতে বলতে অপরিচিতা অন্ধকারে মিশে গেলো ।
– তুমিও ভালো থেকো… ।

আমি চোখ মুছতে মুছতে বললাম। কখন যে চোখ জলে ভরে গেছে খেয়াল করি নি ।
এমন সময় বাবু ঘুমের ঘোরে মা মা বলে ডেকে উঠলো।
বাবুকে বুকে নিয়ে নিলাম।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত