মনের বাক্স

মনের বাক্স

তোমার কোন নাম এই পরিস্থিতিতে আমার মনে পরছে না। কি করব শেষদিন তোমাকে দেখার পর থেকে কিছু মনে থাকেনা। আচ্ছা, তুমি এমন কেন? আমাকে একবার দেখতেও আসো নাই। ভূলে গেছ নাকি? মনে আছে? তোমাকে একবার দেখার জন্য প্রতিদিন বিকালে ছাদে এসে বসে থাকতাম? তুমি তো আমাকে পাত্তাই দিতেনা। বান্ধবীদের নিয়েই বিকেল পার করে দিতে। আর আমি? তোমাকে পাশে কল্পনা করে বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে আনমনেই হঠাত্ হেসে উঠতাম। তুমি অবাক হয়ে তাকিয়ে হেসে দিতে। তখন আমি? ছাদ থেকে দৌড়ে বাসায়। মনেই হতো না আমি ক্লাস নাইন এর একটা ছেলে। কিন্তু তোমাকে মনে হতো ক্লাস সেভেনের বড় আপু! তোমাকে কেন জানি খুব ভয় ও পেতাম। সামনে দেখলেই বুকের ভেতর warfaze এর ড্রমার চলে আসতো। রাতে সপ্ন দেখতাম- আমার ফাসি হচ্ছে। আর তুমি হচ্ছ জল্লাদ। জীবনে কোন বাংলা ছবিতেও মহিলা জল্লাদ দেখিনি কিন্তু কেনো জানি আমার ছবির জল্লাদ তুমি ছাড়া আর কেউ হয়না। কী ভীতিকর অবস্থা বলে বোঝাতে পারবো না। তখন তো বুঝতাম না, ভালবাসা থেকেই ভয় আসে। প্রথম সেদিন বুঝলাম যেদিন তোমাকে দেখলাম আমার ক্লাসের একটা ছেলের সাথে হাসতে। কি যে মেজাজটা গরম হয়েছিল সেদিন বুঝাতে পারবোনা।

পারলে তো সালাকে ওখানেই পুতে ফেলতাম! কিন্তু তুমি জানো আমি কি ভিতু। তাই কিছুই করতে পারিনি। খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন। আর ক্লাস না করে লেজ গুটিয়ে বাসায় চলে এসেছিলাম। তোমার উপরও অনেক রাগ হয়েছিল। কেন তুমি ওই ছেলের সাথে কথা বলবে? আমি আছি না? কথাটা ভেবেই পরেরদিন তোমাকে খুজলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস সেদিন তুমি স্কুলে আসনি। মেজাজ খারাপ তো দূরে থাক চিন্তায় পরে গেলাম তোমার কিছু হয়েছে কিনা। এখন কি করা? ভাবলাম তোমার বাসায় যাবো, কিন্তু কি কারণে? তোমার বাবা-মা যখন প্রশ্ন করবে আমি তোমার কে হই? তখন কি আঙ্গুল চুষবো? না বাবা বিশাল রিস্ক। তাই চিন্তাটা বাদ দিলাম। কিন্তু… পরক্ষণে মনে হল- বেটা, প্রেমে পরেছিস ঠিক আছে, তাই বলে এমন নদর পাঠাকে কে ভালবাসবে যার প্রেমের বেলুন প্রেমিকার কাছে যেতে যেতেই খালি হয়ে যায়? নাহ, রিস্কটা না নিলেই নয় বলেই দৌড়।

আমার এখনো মনে আছে, তোমার বাসার সামনে এসে দুই ঘন্টা কেবল পায়চারি করেছি। চোরের মতো এদিক ওদিক দেখছি। বাসার দারোয়ান অনেকক্ষণ ধরে আমাকে খেয়াল করল। তারপর যেই উঠে এগিয়ে আস্তে শুরু করেছি, তখনি মার খাবার ভয়ে বুকটা ফুলিয়ে বাসার গেটে ঢুকলাম। ঢুকে কলিং বেল চেপে বসলাম। দরজা খুলল না কেউ। নার্ভাস হয়ে পড়লাম, যেই আরেকবার বেল চাপতে যাবো, দরজা খুলে গেল। আমার শ্বাশুড়ি মা মানে তোমার মা। সালাম দিলাম

-আদিরা আছে, আন্টি?
-আছে, কিন্তু তুমিকে বাবা?
আসলেই তো? আমি কে? কে আমি? তাড়াতাড়ি মাথার ভেতর একটা যুক্তি দাড় করানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। এর মধ্যেই বাসার ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলো
-আমার স্কুলের স্কাউট লিডার ভাইয়া।
তাকিয়ে দেখি তুমি। আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছো। আবার বলে উঠলে
-কি? তাইনা ভাইয়া?
স্কাউট লিডার? আমি আবার কবে স্কাউট লিডার ছিলাম? মনে পড়লো না। কিন্তু তোমার চাহনি দেখেই বুঝে ফেললাম কাহিনী কি। আন্টিও দেখি উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছেন। তাড়াতাড়ি বললাম
-জী আন্টি।
-কিন্তু, তোমাকে আগে কখনো দেখিনি তো?
-ইয়ে মানে! আমি নতুন
-ও আচ্ছা বাবা এসো এসো।
হাফ ছেড়ে বাচলাম কিন্তু তখনো তোমাকে দেখে আবার গলা শুকিয়ে গেল। কি বলব বুঝে উঠার আগেই তুমি বললে
-আপনি বাসায় আসলেন কেন?
-তুমি স্কুলে আসনি কেন?
-আসিনি আমার ইচ্ছা, আপনি কেন এসেছেন? আমার কিছু হলো কিনা দেখতে?
আমি কথা না বলে ঢোক গিললাম। তুমি বললে
-কি? গলায় জোর নাই?
-মানে..
-মানে আবার কি?
আসলেই তো মানে কি? আমি কি এখানে বাতাসা খাইতে আসছি? তাহলে? বুকে সাহস নিয়ে বললাম
-তুমি ওই ছেলের সাথে আর কথা বলবা না। ও ভালো না।
-ও! (তুমি হাসছিলে) এই কথা বলতে এত দূর? আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে কার সাথে বলবো? আপনার সাথে?

কার সাথে বলবা এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিলো কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস পেলাম না। আর কথা না বলে বাসা থেকে বের হলাম। বের হবার সময় মনে হচ্ছিল তুমি অনেক খুশি হয়েছো আমি এসেছি বলে। তবুও ভয়ে তোমার দিকে তাকাতে পারিনি। যখন চলে যাচ্ছি তখন বললে

-আর কোনদিন বাসায় আসতে চাইলে এভাবে ২-৩ ঘন্টা বাইরে চোরের মতো ঘুরবেন না, সোজা চলে আসবেন। আমার অপেক্ষা করতে ভালো লাগেনা।

কথাটা শুনে বেক্কল হয়ে গেলাম। হিহি। এভাবে অভিমানে আর আশায় কেটে গেল টেন এর মাঝামাঝি। প্রতিদিন টিফিন সময়ে তোমাকে দেখতাম দূর থেকে, নিজেই হাসতাম। তুমি মাঝে মাঝে তাকিয়ে চোখ উল্টানি দিতে। আর আমি? হাওয়া। টেষ্ট পরিক্ষার আগে আমি আর থাকতে পারলাম না। একদিকে তুমি অন্যদিকে পরিক্ষা। কি করব আমি? শেষ পর্যন্ত ভেবেই ফেললাম কাল তোমাকে মনের কথা বলব। রাতভর অনেক কষ্টে একটা চিঠি লিখলাম। পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভয় হতে শুরু করলো, তুমি কি হ্যাঁ বলবে না আমাকে খুন করবে? গোসল করতে গিয়ে এই চিন্তায় আধাঘন্টা পরে বাথরুম থেকে বের হলাম। মা বললেন

-হয়েছে কি তোর? দেখি দেখি ইশ… জ্বরে দেখি গা পুরে যাচ্ছে। যা আজ স্কুলে যেতে হবেনা।
আমি সাথে সাথে মাকে বললাম
-না মা, আমাকে আজকে যেতেই হবে। জরুরি ক্লাস আছে।
এটা বলে খাবার শেষ করেই দৌড়। মা খুব অবাক হয়েছিলেন অবশ্য।

যাই হোক, টিফিন টাইম এ তোমাকে দেখে আমার বুক উঠানামা শুরু করলো। এখন কি করি। ভাবতে ভাবতে তোমার এক বান্ধবিকে গিয়ে বললাম

-‘Excuse me’ আপনি কি একটু আদিরাকে ডেকে দেবেন।
মেয়েটা খুব অবাক হলো। আমি বড় ভাই হয়ে হঠাত্ আপনি বললাম কেন তাকে, ভাবতে ভাবতে মেয়েটা উত্তর পেয়ে গেল। আমি তখন ঘেমে-টেমে একাকার। একদিকে জ্বর অন্যদিকে জীবন-মরণের প্রশ্ন। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম মেয়েটা গিয়ে বলছে
-এই আদিরা! মজনু এতদিনে সাহস পেয়েছে। যা, তোকে ডাকছে।
খুব লজ্জা পেলাম। আর কোন নাম পেল না শেষ পর্যন্ত মজনু? থাক বাবা, তাও তো গোপাল ভাড় বলেনি! হিহি। ভাবতে ভাবতেই আমার সপ্নের রাজকন্যা আমার সামনে হাজির। তখন তোমাকে দেখে আমার সবটুকু শক্তি নেই হয়ে গেল। কোনমতে বললাম
-চলো একটু অন্য কোথাও যাই।

তুমি কথাটা শুনেই হেসে দিলে। সেই বিখ্যাত ছাদের হাসি। আমি মনে মনে বললাম “এখন কি পালাব?” না আজকেই বলতে হবে। খুন হলেও আজি হবো। ভাবতে ভাবতে এক কোণায় এসে থামলাম। কিভাবে শুরু করবো ভাবতে ভাবতে যখন মুখটা খুলবো, তখনি তুমি ঠাশ করে বললে

-আপনি এত নার্ভাস কেন? যা বলবেন বলে ফেলুন। আমরা পেছনে এখন আরো এগারটা ছেলে লাইন মারছে। আপনি সব পুরনো হলেও বারো নম্বরে রেখেছি।

Exclusive পাবলিক। কথা শুনে তো আমি থ। আবার ওই পুরনো ভয়টা মাথায় উঠলো। কথা আর কি বলতে যাব মুখ খোলার আগেই আমি ধপাস! ওখানেই কাত। হায়রে কপাল! আমার জ্বর আসার আর সময় পেলনা। চেখ খুলে দেখি, পুরো স্কুল আমার মুখের উপর। আর তুমি একপাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে একাকার। আমি মনে মনে ভাবলাম “তুমি কাঁদছো কেন” ভাবতে ভাবতে তোমার দিকে যাবার জন্য যেই উঠে দাড়িয়েছি সেই তুমি মাথা তুলে আমার দিকে তাকালে। তোমার হাতে একটা কাগজ। কি ওটা? পরক্ষনেই আমার চোখ দুটো ফুটবল হয়ে গেল। আমি যে চিঠিটা লিখেছিলাম, সেটা তো বুকপকেটে ছিল, এখন নেই তবে কি….. ভাবতে ভাবতে আবার ধপাস। তারপর চোখ খুললাম, তখন আমি বাসায়। বাসা ভর্তি মানুষ। মনে হচ্ছে যেন আমি মারা গেছি। চোখ খোলার সাথে সাথেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন

-তোকে না যেতে বারণ করছিলাম? কি লাভ হয়েছে গিয়ে?
তারপর থেকে সাত দিন আমি বিছানায় জ্বর নামতেই চায়না। কি করবো বলো? তুমি না আসলে তো জ্বর নামবেনা। এই কথা তো মাকে বলা যায়না বললে আমাকে শুকিয়ে তেজপাতা বানিয়ে রেখে দিবে। আর তুমি তো বাসার কাছে থেকেই একবার আমাকে দেখতে আসলে না। এই কারণেই এই চিঠিটা লিখলাম।
ইতি
ভিতুর ডিম..

চিঠিটা পড়া শেষ হতেই আদিরা খেয়াল করলো তার বান্ধবিরা সব চারপাশ থেকে ঘিরে আছে। আদিরা বলল
-যা ভাগ!
এক বান্ধবী বলল “কেরে?” আদিরা কিছুনা বলে জটলা থেকে বের হয়ে আসলো। গজগজ করে বললো
-উজবুক একটা! চিঠি লেখাও শেখেনি দেড় বছর ধরে, এই প্রেম শিখেছে? মেয়েরা কখনো আগে বলে নাকি? আর আমি নাকি জল্লাদ! তাই না? খবর আছে আজকে। জ্বর সপ্তম আসমানে উঠাবো।
মাত্র টিফিন শেষ হলো। আদিরা রুম থেকে ব্যাগ নিয়ে বাইরের দিকে গতির সাথে রওনা। দিয়েছে। পেছন থেকে একটা কন্ঠ বললো
-এই আদিরা ক্লাস করবিনা? কই যাস?
-শ্বশুরবাড়ি…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত