অতিথি

অতিথি

বাসায় টিভি দেখছিলাম , তখন রিতা আমার পাশে এসে বলে” আচ্ছা কেউ যদি এসে তোমাকে আব্বু বলে ডাকে তাহলে কেমন হয় ।

আমাকে কে আবার আব্বু বলে ডাকবে ” এ বলে আমি আবার টিভির দিকে নজর দিলাম । যখনই বুঝতে পারলাম আসল ঘটনা । আমি চিৎকার দিয়ে বললাম সত্যি বলছ ।
সে একটু লাজুক কন্ঠে বলে ” সত্যি ।

আমি সাথে সাথে তাকে জড়িয়ে ধরলাম । তার গালে কপালে অনেকগুলো চুমু দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম” আজকে আমি অনেক খুশি তুমি আজকে আমাকে জীবনের সবচেয়ে খুশির সংবাদ দিয়েছ ।
ঠিক সেই সময়ে মা পিছনে এসে হাজির , মা এসে বলে এত চেঁচামেচি কিসের । মার কথা শুনে তাড়াতাড়ি রিতা আমার কোল থেকে নেমে যায় ।

আমি মাকে বললাম ” মা একটা খুশির সংবাদ আছে । আমাদের ঘরে একজন নতুন অতিথি
খুব শিগ্রই আসতেছে । যে আপনাকে কিউট ভাবে দাদি বলে ডাকবে ।

আমার কথা শুনে মা রীতার পাশে এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় । রিতার হাত ধরে জিজ্ঞেস করে ” সত্যি বলছো মা আমি দাদি হবো ।

রিতা মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয় ।
সাথে সাথে মা তার হাত ধরে তাকে সোফায় নিয়ে বসায় । মা চিৎকার দিয়ে বলে আরে কে কোথায় আছিস তাড়াতাড়ি আয় মিষ্টি নিয়ে আয় । মা এর চিৎকার শুনে আমার ছোট ভাই বোন এসে হাজির । যখনই তারা নতুন অতিথির কথা শুনতে পেল । দুজনেই তাদের ভাবী কে ঘিরে বললো ” আমরা তাহলে পুপু আর চাচা হয়েছি ।
সবাই শুধু রিতাকে নিয়ে ব্যস্ত । আমার দিকে কেউ তাকালো না আমাকে কিছু বললেও না ।

নিজেকে তখন কেমন জানি নিজেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে আর ভাই মনে হচ্ছিলো । কিন্তু দেখতে গেলে নতুন অতিথি আসার পেছনে আমার অবদান টাই বেশি । অথচ সবাই রিতা কে নিয়েই ব্যস্ত । সেদিন খুব জেলাস ফিল করছিলাম ।

মা রিতা কে বলল সংসারে কোন কাজ কাম না করার জন্য । নতুন অতিথি না আসা পর্যন্ত সংসারের সব কাজ উনি দেখে রাখবেন ।

তারপর রিতা যখন টুকটাক কাজ করতে যায় ।
মা তখন ইচ্ছে মত তাকে বকা শুনিয়ে দেয় ।
বাবা আমাকে এখন আর তেমন ব্যবসায় কাজে ব্যস্ত থাকতে দেন না । বাবা বলেন এসময় তোর বৌ মার পাশে থাকা দরকার । যতটা পারিস তাকে সময় দিবি । ব্যবসার কথা তোকে চিন্তা করতে হবে না ব্যবসা আমি দেখি রাখবো ।
ছোট বোন তার রুমে অনেক খেলনা এনে জমা করে রেখেছে । কত নানান রঙ-বেরঙয়ের খেলনা । আমি যখন ছোট বোনকে জিজ্ঞেস করলাম এত খেলনা দিয়ে কি হবে ।

আমার বোন তখন বলে সে তুমি বুঝবে না ” আমি সারাক্ষণই বাবুর সাথে এই খেলনা নিয়ে খেলবো ।
আমার ছোট ভাই , নতুন একটা ক্যামেরা, একটা ডায়রি আর একটা ছবির অ্যালবাম বাসায় এনে রেখেছে ।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করছিলাম এসব দিয়ে কি হবে।

ছোট ভাই বললো ” ক্যামেরা দিয়ে বাবুর ছবি তুলে সব অ্যালবামে জমা করে রাখবে ।
তারপর ডাইরিতে বাবুর সম্পর্কে সবকিছু নাকি লিখে রাখবে। কখন সে উঠে দাঁড়াতে পেরেছে কখন সে হাঁটা শিখেছে কখন সে কথা বলা শিখেছে কখন তার দাঁত পড়েছে। কখন সে প্রথম স্কুলে গিয়েছে । বাবুর প্রতিটা মুহূর্ত নাকি

সে ডাইরিতে লিখে রাখবে । তারপর বাবু বড় হলে । সে ডায়রি আর ছবির অ্যালবামটা তাকে গিফট করবে।
তাদের সবার পাগলামি দেখলেই আমি মাঝে মাঝে হাসতাম । আসল তারা যে শুধু পাগলামি করতো তা না । আমি আর রিতাও কম ছিলাম না । নতুন অতিথিকে নিয়ে আমাদের দুজনের মাঝে অনেক তর্ক-বিতর্ক চলতো।
আমি একদিন একটা কাজে মার্কেট গিয়েছিলাম । হঠাৎ একটা দোলনা দেখলাম ঝুনঝুনি বসানো। দোলনা টা আমার খুব পছন্দ হয়েছে তাই আমি সেটা নিয়ে নিলাম ।

বাসায় এসে রিতাকে বললাম বাবু এই দোলনার মধ্যে ঘুমাবে ।
রিতা তখন রেগে গিয়ে বলে ” তুমি এতো বোকা কেনো । দোলনাতে ঝুনঝুনি দিয়ে কি হবে ।
বাবুকে যদি ঘুম পাড়িয়ে এই দোলনায় শুইয়ে দেই , ঝুনঝুনির টুনটুন শব্দে বাবুর ঘুম ভেঙে যাবে । আর শোনো বাবু দোলনায় ঘুমাবে না ,

সে ঘুমাবে ঠিক আমাদের দুজনার মাঝখানে, চুপটি করে।
সেদিনও রিতার সাথে আমার তর্ক হয়েছে ,
বাবুর নাম নিয়ে । আমি বলছিলাম বাবুর
নাম আমি রাখবো তিন চার টা নাম ও বললাম। কিন্তু আমার কোন নামই তার পছন্দ হল না । সে বলল বাবুর নাম সে রাখবে , ছেলে হলে আমার নামের সাথে মিল রেখে ,আর মেয়ে হলে তার নামের সাথে মিল রেখে বাবুর নাম রাখা হবে।

বাবুর জন্য এখন থেকেই রিতা , ছোট ছোট জামা কাপড় বালিশ । বাবুদের যা যা প্রয়োজন
সব কিছু কিনে বাসায় রেখে দিয়েছে ।
বাবুকে নিয়ে তার কত যে প্লান ।
ধীরে ধীরে নতুন অতিথি আসার সময় হয়ে যায় । রিতা কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়
তখন ডাক্তারবাবু বলেছিলেন বাবুকে নাকি বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সে আমাদের সবার সাথে রাগ করে।
আমাদের সবার স্বপ্ন সে ভেঙে দিয়ে , সে আবার সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেছেন।

 

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত