শীতের বুড়ি হারিয়ে গেছে

শীতের বুড়ি হারিয়ে গেছে

আজকাল বুড়ির বাড়িতে তার ছেলেমেয়ে,নাতি-নাতনী,মেয়ের জামাইদের একটু বেশিই আসা-জাওয়া হচ্ছে। বুড়ির জীবনের এই শেষ মুহুরতে হঠাত তার পরিজনের এই ভালোবাসার মানে বুড়ি ভালো ভাবেই বুঝতে পারে। বুড়ি আর কয়দিনই বা বাঁচবে এখনতো তার জমি-জমা ভাগ করে নেওয়ার সময় হয়েছে। বুড়ির স্বামী মারা গেছে প্রায় ২০ বছর হবে। এর মধ্যে তার ছেলেমেয়েরা সব শহরে চলে যায়। বুড়ির খোজ খবর কখনো দুই তিন বছর বা তারো বেশি সময় পরপর নিতো। বুড়ির ছেলের বউদের নিম পাতার রসের মত কথাগুলোও এখন মিষ্টি পাঁকা আমের মত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বুড়ির বড় ছেলের বউ এসে বলে:

-আম্মা, আপনি একাএকা এখানে থাকেন কেন? আমাদের সাথে শহরে চলেন না!
বুড়ি তার কথা শুনে মনে মনে একটু হেসে নেয়। এই বৌমার বাড়িতেই বেশ কয় বছর আগে গিয়েছিলো বুড়ি। দুইদিন থাকার পরেই বৌমার রাগ আর দেখে কে! রোজ রাতে ছেলে আর ছেলের বৌ এর ঝগড়া শুনতো তার ওখানে থাকা নিয়ে। নাতি-নাতনিরাও বেশ বিরক্ত ছিলো। বুড়ির জন্য একটা ঘর ছেড়ে দিতে হয় যে। আজ সেই বৌমাই এসে বলছে সেখানে থাকতে। বুড়ি নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বলে:

-থাক বৌমা, এখানে গ্রামেই ভালো আছি।
এরই মধ্যে কিছুদিন পর বুড়ির ছোট ছেলের বৌ এসে একই কথা বলে। তাদের সাথে শহরে থাকতে। বুড়ি এখনো ভুলেনি গতবার যখন গিয়েছিলো কথায় কথায় বুড়িকে খোটা দিতো, কাজ করাতো, গম্ভীরতা পুষে রাখতো।

মেয়ে, মেয়ের জামাই সবার কাছ থেকে একই ধরনের কথা শুনছিলো বুড়িটা। বুড়ির স্বামী এই গ্রামে অনেক জায়গাই রেখে গিয়েছিলো। তবে সন্তানেরা এই জায়গাগুলো বিক্রী করতে নিষেধ করেছিলো। তারাতো বছর বছর টাকা পাঠাতোই।তবে সে টাকা দিয়ে বুড়ি কিভাবে জীবন চালাতো সেটাবুড়িই ভালো জানে। আজ বুড়ির সকল পরিজন একত্রিত হয়েছে। আজ বুড়ির জায়গা ভাগাভাগি হবে। বুড়ি নিরব দশকের মত বসে আছে এর ছেলেরা কে কোন জায়গা নিবে সেটা নিয়ে আলোচনা করছে। বুড়ির আর কোন কাজ নেই বুড়ির দরকার কাগজে কিছু টিপসই তারপর বুড়ির যা খুশি হোক তাতে কারো মাথা ব্যাথা নেই। সকল জায়গা ভাগ করা শেষে এবার বুড়ি যে বাড়িতে থাকে সেটা ভাগ করার পালা। ৩ সন্তানের মাঝে বিরোধ লেগে যায় কে নিবে এই বাড়ি। হঠাত বুড়ি তাদের থামিয়ে দিলো।

বুড়ি বলল:
-বাকি সব জায়গা তোরা ভাগাভাগি করেনে। তবে এই বাড়িটা বাদে। এই বাড়িটা আমি আমার বাবুমশাই রতনকে দিবো।
তার এইকথা শুনে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক তুমুল অশান্তী সৃষ্টি হয়ে গেলো। কে এই রতন। আর এতটুকু জায়গা তাকে কেনো দেওয়া হবে। সবার প্রশ্ন বুড়ির প্রতি।

বুড়ি বলল:
-আমার বাবু মশাই রতন। এই গ্রামেই থাকে। গত বছর কলেরায় ওর বাবা মা মারা গেছে। এই পৃথিবীতে ওর কেউ নেই। তোরাতো আমার খোজনিস না। রতনও রোজ আমায় দেখতে আসে। কখনো আম কখনো বড়ুই, আমড়া,পিয়ারা নিয়ে ছুটে আসে। আমারে ছাড়া খায়না। আমিও দুটো ভাত খীর ওরে ছাড়া খেতে পারি না। ওরে নিয়েই বেঁচে আছি। তোরা এই ভিটেটুকু নিসনে।

বুড়ির সন্তানেরা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না যে একটা বাইরের অচেনা ছেলেকে এই বাড়িটা দিয়ে দিবে! কত মূল্য এই জায়গার। ছেলেটার প্রতি সেই রাগ হয় তাদের।
হঠাতই একটা ১২-১৩ বছরের ছেলে বুড়ি বুড়ি বলতে বলতে বাড়িতে ডুকলো। সে আসা করেনি যে বাড়িতে এতোলোকজন হবে। বুড়ির ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারলো এটাই বুড়ির বাবুমশাই রতন। সকলে এমনভাবে তার দিকে তাকাচ্ছিলো যেনো একোন মহাপাপ করে ফেলেছে। আসলে এই ছেলেটার প্রতি সবাই বিরক্ত ছিলো। এর জন্য কতটা জায়গা হারাতে হচ্ছে! বুড়ির উপরে কেউ না করতে পারে না

বুড়ির শেষ ইচ্ছা বলে কথা। ছেলেটাকেও মেনে নেওয়া যায় না, এতো অচেনা অজানা একটা ছেলে। হঠাত বুড়ি রতনকে ডেকে বলে:
-শোন বাবুমশাই, এরা আমার ছেলেমেয়ে। আমি আর ক’দিন বাঁচবো। এর পর তোর দেখাশোনা করারমত কেউ থাকবে না। এই বাড়ি আমি তোর নামে করে দিছি। তুই সবসময় এই বাড়িতেই থাকবি।
-তুমি কোথায় চলে যাবে বুড়ি? আর আমিই বা এই বাড়ি নিয়ে কি করবো! আমার বাড়ি চাই না। তুমি থাকলেই হলো।
-দুর পাগল, সবাইকেইতো একদিন চলে যেতে হয়। আর তোরতো আপনা বলতে আর কেউ নেই যে তোরে রেদে-বেড়ে খাওয়াবে। এই বাড়িটা থাকলে আর তোর সমস্যা হবে না।
-বুড়ি, তুমি জানো এবছর বন্যায় আমাদের গ্রামের পাঠশালাটা পুরো ভেঙে নদীর জলে ভেসে গেছে। সব ছেলেমেয়ে আর মাস্টারমশাই মন খারাপ করে বসে আছে। এই গ্রামে আর কোন জায়গা নেইগো পাঠশালা চালাবার। তুমি বরং তোমার এই বাড়িতে একটা পাঠশালা বানাও । তোমার বাড়িতে রোজ অনেক ছেলেমেয়েরা আসবে তোমায় অনেক ভালোবাসবে।

বুড়ির ছেলেমেয়েরা তাদের কথোপকথোন শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। হয়তো বাচ্চা বলে জমি, ভিটের প্রতি লোভ নেই কিন্তু এতো অল্প বয়সে এতোটা নিঃসাথভাবে কেউ অন্যের কথা ভাবতে পারে! আর এই রতন আসলেই বুড়িকে এত্ত ভালোবাসে যতটা না তার নিজের রক্ত ছেলেমেয়েরা ভালোবাসে। এই বাচ্চা ছেলেটার এমন মনমানসিকতা দেখে বুড়ির ছেলে-মেয়ের লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়। তারা এতোটা জায়গা পেয়েও সন্তুষ্ট হতে পারেনি আর বাচ্চাটা এই সামান্য জায়গাটাকে এতো মূল্যবান করে তুলতে চায়। বুড়ির ছেলেমেয়েদের রতনের প্রতি জমে থাকা রাগ, হিংসে এর মধ্যেই উদাও হয়ে যায়।

বুড়ির বড় ছেলে বলে:
-রতন ঠিক কথাই বলেছে। এই বাড়িতে পাঠশালা হলে সবারই সুবিধা হবে। পাঠশালা করতে যা যা উপকরন লাগবে সব আমিই দিবো।

বুড়ির বাকি ছেলেমেয়েরাও একমত প্রকাশ করে। রতনের কথার সাথে তার ছেলেমেয়েদের একমত দেখে বুড়ির আনন্দ যেনো আরো বেড়ে গেলো।
মাস্টার মশাই, বুড়ির ছেলেমেয়ে, গ্রামের শিক্ষারথী সবার প্রচেষ্টায় অবশেষে একটা পাঠশালা গড়ে উঠলো। রতন আর বুড়িতো বেশ খুশি। বুড়ির ছেলেমেয়েরা আবার শহরে চলে গেছে। তবে তারা এখন প্রায় মাসেই এসে বুড়ির, পাঠশালার আর রতনের খোজ খবর নিয়ে যায়। বুড়ির বাড়ি যেনো বাচ্চা ছেলেমেয়ে দিয়ে স্বয়ংসম্পুর্ণ হলোর

রোজ অনেক ছেলেমেয়েরা বুড়ির বাড়িতে পড়তে আসে। এতোদিন বুড়ির একটাই নাতি ছিলো রতন। কিন্তু এখন তার নাতি-নাতনির অভাব নেই। গ্রামের সব ছেলেমেয়েরাই বুড়ির খোজ নেয়। কখনো কেউ পিঠা নিয়ে আসে, কখনো ডালভাত। বুড়িকে ছারা গ্রামের ছেলেমেয়েরা দুটো ভাত খায় না। গ্রামের সকলের কাছেও বুড়ি বেশ আদরের আর পছন্দের। আজ বুড়ির বাড়িতে ভালোবাসার কোন অভাব নেই। বুড়ি বাড়ির উঠানে বসে পাঠশালার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া দেখছে আর ভাবছে জীবনে বেঁচে থাকতে শেষ বয়সে এর চেয়ে বেশি আর কিছুর দরকার হয়কি!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত