টেরোরিস্ট

টেরোরিস্ট

– ভাই আজকে কিন্তু শফিক কে খুন করার ডিল আছে। (সিয়াম)
– হুমম.. কখন?
– আজ রাতেই..আপনি খালি অর্ডার দিবেন। বাকিটা আমরা করে দিবো।
– নাহ, খুনটা আমিই করবো। তবে বাকি কাজ তোমরা করবে। কোনো প্রমান যেন না থাকে। (আমি)
– আচ্ছা ভাই..

কথাগুলো বলছিলাম আমার গ্যাং এর এক ছেলের সাথে। নাম সিয়াম। এ কাজে বেশ পটু সে। খুন করার প্রমান কিভাবে প্রমান লোপাট করা যায় সেটা ও ভালো করেই জানে। আর যাকে খুন করার কথা বললাম সে হল ইসলাম এর নামে একজন শয়তান। দাড়ি টুপিতে এমনকি নামাজে সে সারাদিন ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু রাত হলে চলে তার অপকর্প। নারীদের ধর্ষন আর নেশাযাত কিছু বিক্রি করায় তার সবচেয়ে বড় কাজ। একটা ব্যাবসায়ীর মেয়েকে সে ধর্ষন করেছে। ফলে তিনি আমাকে টাকা দিয়েছে ওকে মারার।

আজ রাতে মিশন শেষ করে যখন বাড়িতে ফিরছি। তখন চারিদিকে কুয়াশা ভরে গেছে। বাইকের আলোতে সামনের কয়েক হাত দেখা যাচ্ছে। আসতে আসতে বাইক চালিয়ে আসছি। তখনি শুনি কারো আত্ব চিৎকার। চিৎকারটা আসে রাস্তার পাশের ঝোপটা থেকে। চারিদিকে কেমন নিরাবতা ভর করেছে। তবে ভেসে আসছে মেয়েটির আত্বচিৎকার।

কোমর থেকে লোড করা পিস্তলটি বের করে হাতে নিয়ে সামনে এগুলাম। সেখানে যেয়ে দেখি..
দুইটা ছেলে মাথায় নামাজি টুপি পরে একটা মেয়েকে টানতে টানতে ঝোপের আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে।
পিস্তলটা কোমরে গুজলাম..

– কে এখানে..? (আমি)
তারা দুজন থমকে দাড়ালো। কিন্তু মেয়েটিকে ছাড়লো না। বারবার বলছে আমাকে ছেড়ে দে, আমাকে ছেড়ে দে..
– তুই কে..? (ওরা)
– কেনো? জানাটা কি খুব দরকার? (আমি)
– খান*** বা** বল কে তুই…?

কথাটি শোনা মাত্রই মাথায় রাগ উঠে গেল। পিস্তলটি বের করে একজন এর বুক বরাবর গুলি করলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে পড়ে গেল। ঝোপ থেকে সামনে আসতেই..

– নিলয় ভাই আপনি..? দুঃখিত ভাই..ভুল হয়ে গেছে। আমাকে প্লীজ মাফ করে দেন?
– শালা, তোদের মত জানোয়ারদের জন্য আজ ইসলামের পবিত্রতা হারাচ্ছে। তোরা দাড়ি, টুপি পরে ভালো মানুষ সেজে আজ সমাজের মানুষদের নষ্ট করছিস। তোদের মত পশুদের জন্য মুসলিম সমাজ আজ সবার কাছে খারাপ হতে যাচ্ছে। তোরা খালি অমানুষ না। তোরা ধর্মকে ব্যাবহার করে সবস্ত খারাপ কাজে লিপ্ত হস।

আর কিছু না বলে দুইটা গুলি করলাম ওর কপাল বরাবর। চারিদিকে আবার নিরাবতা বিরাজ করলো। এবার মেয়েটির দিকে তাকালাম। কোমরের কিছু অংশে কাপড় ছেড়া। আমাকে দেখে সেখানটা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করলো..

– কে তুমি? (আমি)
– নেহা.. (কান্না করতে করতে সে বললো)
– ওহ, বাসা কোথায়?
– —- গ্রামে, এখানে কাজের জন্য এরা এনেছিলো, কিন্তু এরা আমাকে…
– হুমম বুঝেছি, এখন ভয় নেই। যাও বাসায় যাও।

কথাটি বলে সেখান থেকে রাস্তায় আসলাম। কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারছি আমার পিছনে নেহা আসছে। রাস্তায় এসে চারিদক একবারর দেখে নিলাম। নাহ রাস্তা পুরো ফাকায় আছে। শিরদাড়া দাড়িয়ে উঠল, এই রাতে এই মেয়েটাকে ঐ পশু দুটো ধর্ষন করতো কোনো কাক পক্ষীও জানতে পারতো না। অথচ সকাল হলেই, কিছু নামধারী সমাজ সেবকরা পত্রিকার খাতায়, খবরে লেকচার মারতো,
“ধর্ষনের বিচার চাই””

মুচকি হাসলাম একটু। তখনি পাশে তাকিয়ে দেখি নেহা দাড়িয়ে কাপছে। হুমম শীতে কাপছে। গায়ে সেরকম কোনো গরম কাপড় নেই। তাই আমার গা থেকে বড় জ্যাকেটি খুলে দিলাম। দ্বিধা চোখে একটু তাকিয়ে থেকে পরে নিল।

আমি বাইকে উঠে বসতেই সে এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
– কোথায় যাবা? (আমি)
– জানিনা..
– মানে..তোমার বাসাতে যাও।
– আর বাড়িতে যেয়ে কাজ নেই। সৎ মায়ের সংসারে না থেকে মরে যাওয়া অনেক ভালো।
– আমার সাথে যাবা..?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নেহা হুট করে আমার বাইকের পিছনে উঠে বসলো। জিগাস করলাম..
– আমার সাথে যাবা, ভয় লাগছে না?
– কিসের ভয়..?
– আমিও তো ছেলে,
– তো, তাদের মত জানোয়ার নাকি? যারা মেয়েদেন সম্মান দিতে জানে না তারা মানুষ না।
– আমি যে আরো খারাপ, দেখলে না কিভাবে তাদের মেরে দিলাম?
– জানিনা,আমি যাবোই…

আর কিছু না বলে আমি বাইকে স্টার্ট দিয়ে চলে আসলাম নেহা কে নিয়ে। বাড়ি বলতে পূরোনো একটা বাড়ি। যেখানে আমি ছাড়া কেউ থাকে না। বাইকটি বাড়ির সামনে রাখতেই বললাম..
– এটা হল আমার বাড়ি। (আমি)

কিছু না বলেই নেহা হাটতে হাটতে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে লাগলো। আর আমি ঢোকার আগেই একবার গেটের পাশে থাকা মা নামটি ভালো করে দেখে নিলাম। মনে মনে হাসলাম..হায়রে সমাজ, তুই জানতে চাস না কেনো আমি টেরোরিস্ট। কেনো আমি মাস্তান?

বাড়িতে ঢুকে নেহাকে একটা রুমে দিয়ে এসে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। ঠিক তখনি কেন জানিনা নেহার কথা মনে পড়ছে। কেমন, মায়াবী চোখ তার, শুকনো মুখে হাসিটে যেন এখনো লেগে আছে।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝিনি।।

– এই যে স্যার, উঠুন। অনেক বাজে..

সচারচার আমাকে কেউ ঘুম থেকে ডাকে না। কিন্তু আজ কে ডাকছে আমায়? রাগ ও বিরক্তি নিয়ে চোখ মেলে তাকাতেই দেখি নেহা হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লাফ দিয়ে উঠে বসললাম..
– আরে তুমি? (আমি)
– হুমম,,ঘুম থেকে ডাকলাম রাগ করলেন?
– আরে না ঠিক আছে।
– হুমম এখন উঠুন, বাজার করে আনবেন।।ঘরে তো কিছুই নেই যা দিয়ে রান্না করবো।
– বাইরে থেকে খাই।
– এখন আর সেটা হবে না। রোজ বাজার করতে হবে। আমিই রান্না করবো..এখন উঠুন তো..

বাধ্য ছেলের মত ফ্রেশ হলাম। বাজারে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি। কেনো জানিনা নেহার কথা শুনতেই আমার খুব ভালো লাগছে। বাধ্য ছেলের মত বাজার করে বাসায় আনলাম।

– এই যে নাও তোমার বাজার, মাংস, সবজি সব আছে।
– হুমমম,,এখন যান আপনার কাজ করেন।

নিজের রুমে এসে পিস্তলটি কোমরে গুজলাম। আজ একটা হারামিকে খুন করতে হবে। খুন করাটা যে আমার পেশা। আমি এমন ছিলাম না। কিন্তু হতে হয়েছে।
আজ যাকে খুন করবো সে হল দেশদ্রোহী। সমাজের কাছে সে একজন ভালো নেতা। কিন্তু আমরা জানি সে একটা লম্পট। সব ধরনের রাহাজানিতে লিপ্ত সে।

খুন করে বাড়িতে আসতেই..
– কি ব্যাপার মি. এম সময় কই ছিলেন? সেই দুপুর থেকে আপনার জন্য বসে আছি। এখন বিকেলও শেষ হতে চললো।
– সরি আসলে,…
– এসব ছেড়ে দিতে পারেন না??
– হাহাহাহাহা….রান্নাটা বেশ করোতো..ভাবছি তোমাকে রেখে দিবো।
– আমি কি যাচ্ছি নাকি??

এভাবেই কেটে যায় কয়েকটা দিন। একদিন বাড়িতে এসে দেখি নেহা কাঁদছে..
– কি ব্যাপার, তুমি কাদছো কেনো?
– ——
– কি হল..
– আমি আপনার এখানে আর থাকবো না।।
– মানে??
– কেনো থাকবো? লোকে তো খারাপ ভাবে। কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের মাঝে।
– কে বলেছে..
– জানিনা..

নেহা চুপ করে কেঁদেই চলেছে। আমি তখনি ওর হাত ধরে কাজি অফিসের দিকে নিয়ে গেলাম।
ঠিকঠাক ভাবে আমাদের বিয়েটা হয়ে গেল। আজ আমাদের বাসর রাত।

যথারিতি রুমে ঢুকে দেখি নেহা বউয়ের সাজে বসে আছে। কাছে যেয়ে বললাম..
– এখন খুশি তো তুমি?
– হুমমম..তবে এসব কাজ ছেড়ে দিলে আরো খুশি হবো।
– নাহ নেহা, এই কাজ ছাড়ার কথা বলো না।
– কেনো.?
– তাহলে তোমাকে একটা গল্প বলি..

আমার যখন ১৬ বছর বয়স তখন আমার বাবা মা মারা যায়। গরীব ছিলাম বলে নিজেই পরিশ্রম করতে থাকি। একটা চায়ের দোকানে কাজ করতাম আর স্কুলে যেতাম। রোজ স্কুল থেকে এসে চায়ের দোকানে যেতাম কাজ করতে।
একদিন এক ভদ্র লোকের গায়ে হুট করেই গরম চা পড়ে যায়।
– ঠাসসস..কু**** দেখে কাজ করতে পারিস না? শালা..
– আমি তো ইচ্ছে করেই ফেলিনি। (আমি)
– মা***** আর একটা কথা বললেই তোকে তরম তেলে ফেলে দিবো।

কথাটি বলে যেই না থাপ্পড় দিতে যাবে তখনি, শর্মিলা মাসি এসে হাত ধরে বলে..
– এই যে কোট পরা লোক, নিজের বাইরে টা ভালো কিন্তু ভিতরে এত নোংরা কেনো?

কিছু না বলেই মাসী আমার হাত ধরে নিয়ে আসে এই বাড়িতে। মাসী একটা ব্যাংকের কেরানী পদে চাকরি করতো। তিনি সব কাজ করতো। আমাকে বলেছিলো..
– নিলু, তুই কোনো কাজ করবি না। স্কুলে যাবি খালি আর পড়াশোনা করবি।
– ঠিক আছে মাসী।।

আমি মুসলিম হয়েও সেদিন থেকে মাসীর সাথে থাকি। কোনোদিন বুঝতে দেয়নি মা বাবার অভাব। সুখ ছিলো কপালে আমার। কিন্তু সেটা বেশিদিন থাকিনি।।একদিন রাত করে বাড়িতে আসার পথে কিছু কুত্তা*** মাসীকে ধর্ষন করে খুন করে বাড়ির সামনে রেখে যায়। তারপর থেকেই আমি টেরোরিস্ট। মাস্তান।
..
কথাটি বলে দেখি নেহা চুপচাপ বসে আছে। আমি আর কিছু না বলে পাশে যেয়ে শুয়ে পড়লাম।
– তোমার কোন কষ্ট হবে না নেহা। আমি খুন করি, কিন্তু তোমার এতে কোনো প্রভাব পড়বে না।

(পরেরদিন)
সকাল এ বাজার করে এনে দিতেই দেখি নেহা নেই।
– আমি বাজার রেখে রুমে আসতেই শুনি..
– পুলিশ তোমাকে চারিদিকে ঘিরে ফেলেছে।

লাফ দিয়ে উঠলাম। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পুলিশ।ঘিরে রেখেছে। তখনি নেহা আসলো…
– নেহা কোনো চিন্তা করো না..পুলিশ কিছুই করতে পারবে না।
– তাই নাকি নিলয়..টেরোরিস্ট নিলয়?.17 টা খুনের আসামি নিলয় তাই নাকি?
– তুমি এসব কিভাবে জানো?

তখনি পিছন থেকে অনেক পুলিশ বের হল। আমি অবাক হয়ে নেহার দিকে তাকালাম। তার মুখে জয় করার এক হাসি। সে হাসিতে আমি আজ বিদ্ধস্ত।
– তো মি. নিলয়, খুব জ্বালিয়েছেন আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্ট দের। আসলে তোমাকে ধরার জন্য আমার এত সব প্লান সেই প্রথম থেকেই। সেদিন জানতাম তুমি খুন করবে। তবে প্রমান রাখবে না। তাই সাজানো প্লানে তুমি সেদিন পড়ে গেলে। তবে প্রমান আছে আজ। তোমার বলা প্রমান।

নেহার দিকে তাকালাম। অজান্তেই কেঁদে ফেলেছি। নেহা আমাকে ঠকায়নি। ঠকিয়েছে আমার বিশ্বাসটাকে। খেলা করেছে আমার বিশ্বাস নিয়ে। কোনো কথা না বলে চুপ থাকলাম।। আর নেহা আমাকে নিজেই ধরে এনে ফেললো হাজতে।

“আজ আমি বন্দী,
তবে হারিয়েছে বিশ্বাস।
খেলা করলি দুই আমায় নিয়ে।
নিতে পারছি না বাঁচার নিঃশ্বাস।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত