আদু ভাই

আদু ভাই

“এলাকার সবাই আমায় আদু ভাই নামেই চিনে। সবাই আমায় আদু ভাই বলেই ডাকে।”
এই টার ও একটা বিশেষ কারন আছে,”আমি উচ্চমাধ্যমিক পরিক্ষায় ৬ বার ফেল করেছিলাম।”
আমি পরিক্ষা তো ভালোই দিতাম কিন্তু তারপর ও রেজাল্ট খারাপ আসতো। সবাই ভেবেছিলো আমি হয়তো আর উচ্চমাধ্যমিক পাশ ই করতে পারবো না।বার বার ফেল করা দেখে লোক জনে আমায় আদু ভাই ডাকা শুরু করলো।আর সেই থেকে এই নামটা জনপ্রিয় হয়ে গেলো।সবাই এখন এই নামেই আমাকে চিনে।আমার নাম যে হৃদয় এই নামে আর কেউ আমায় চিনেনা।মাঝে মাঝে অপরিচিত কোনো লোক যদি আমার নাম জিজ্ঞাসা করে,তখন আমি হৃদয় বলতে গিয়ে আদু ভাই বলে ফেলি।

সবাই বলতো আমি নাকি আর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করতে পারবো না।”আদু ভাই যেমন বেচে থাকতে পারেনি আমি ও নাকি পারবো না।”

কিন্তু আমি লোকের কথায় কান দেয়নি,আমি হাল ছাড়েনি।
এই বার ৭ম বারের মাথাই আমি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি।যেদিন আমার রেজাল্ট দিলো সেদিন আমি ভেবেছিলাম,আগের বারের মতোই এই বার ও মনে হয় ফেল।

তাই আর রেজাল্ট দেখতে যাইনাই।রেজাল্ট দেখতে না যাওয়ার আর একটা কারন আছে।সেটা হলো আমার রেজাল্ট আমি তখন দেখেছিলাম যখম আমি ১ম, ২য় ও ৩য় বার পরিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু বার বার ফেল করা দেখে আমি আর রেজাল্ট দেখিনা।আমার রেজাল্ট আমার এলাকার লোক জনেই দেখে।আর আদু ভাই ফেল করছে, এই বলে আমার বাসার সামনে দিয়ে মিছিল করে।

আমি ভাবছিলাম এই বার ও হয়তো তাই ই হবে।
তাই তো রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে ছিলাম আমার রুমে আর ৮ম বারের বারের মতো পরিক্ষা দেওয়ার চিন্তা ভাবনা করছিলাম।

ঠিক এমন সময় হৈ চৈ শুনতে পেলাম।আমি ভাবলাম এই বার ও মনে হয় পাবলিক আমার ফেল করার খবর নিয়ে আসতাছে।কিন্তু না আমার ভাবনা টা ভুল।
আমি শুনতে পেলাম সবাই বলছে।
“পাশ করেছে আদু ভাই।”
জোর সে বলো আদু ভাই।

কথা গুলো শুনে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না।আমি ভাবলাম পাবলিক হয়তো মজা নিচ্ছে।কিন্ত পাবলিক এর এমন ভাবে মিছিল করা দেখে আমি বাসা দেখে বের হলাম।বের হয়ে যা দেখলাম আমি তো পুরাই অবাক।এলাকার কিছু ছোট ভাই দের হাতে ফুলের মালা।

“বয়সের দিক দিয়ে তারা আমার ছোট কিন্তু পড়ালেখার দিক দিয়ে তারা আমার থেকে এগিয়ে গেছে।”
আমি বাসা থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই ছোট ভাই গুলো আমার মালা গুলো পরিয়ে দিতে লাগলো।তার পর সবাই মিলে আমায় তোলা করে ফেললো।আর আমায় নিয়ে তারা মিছিল করতে লাগলো।যেন নির্বাচন এ নেতারা নির্বাচিত হলে, জনগন যেভাবে মিছিল করে।আমাকে নিয়েও সবাই এমন ভাবে মিছিল করতে লাগলো।সে দিন নিজেকে অনেক সেলিব্রেটি সেলিব্রেটি মনে হচ্ছিলো।

আমি যখন প্রথম বার উচ্চমাধ্যমিক পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলাম তখন আমার বয়স ছিলো ১৯ বছর।এই বার ২৬ বছরের মাথাই আমি পাশ করলাম।৭ বছরে পাশ করলাম উচ্চমাধ্যমিক।৭ বছরে পাশ করেছি সেটা বড় কথা না।বড় কথা হলো পাশ তো করেছি।

প্রায় কিছু দিন পর…
আমি তৈরি হচ্ছি ভার্সিটি তে এডমিশন নেওয়ার জন্য।
এমন সময় আমার ছোট ভাই রিমন বলে উঠলো।
—-কি রে ভাইয়া কোথাই যাচ্ছো?
এই যে রিমন এ আমার বয়সের দিক দিয়ে ৩ বছরের ছোট।কিন্তু পড়ালেখার দিক দিয়ে আমার থেকে অনেক সিনিয়র। রিমন অনার্স কমপ্লিট করেছে।আর আমি অনার্স এ এডমিশন নিতে যাচ্ছি।
—কোথাই আর যাবো এডমিশন নিতে যাচ্ছি।
আমার এই কথা শুনে রিমন
কিছু টা মন খারাপ করে ফেললো আর বলতে লাগলো।
—উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছো ৭ বছরে।আর অনার্স কমপ্লিট করতে যে কত বছর লাগবে আল্লাহ জানে।
—ঐ কত বছর লাগবে রে।
—এ ভাইয়া তুমি পড়ালেখা বাদ দাও। তার চেয়ে ভালো একটা বিয়ে করে ফেলো।আর সংসার শুরু করে দাও।
—চুপ বেশি কথা কস কেন?আমি অনার্স কমপ্লিট করেই বিয়ে করার চিন্তা ভাবনা করবো।
—ভাই অনার্স কমপ্লিট করতে করতে তোমার বিয়ের বয়স আর থাকবেনা।আর তোমার জন্য আমি ও?
—তুই কি রে।
—কিছু না যাও।
এই বলে রিমন রাগ দেখিয়ে চলে গেলো।

আমি ভার্সিটি তে আসলাম। আমি ভার্সিটির ভিতরে যাচ্ছিলাম নিচের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।এমন সময় কে যেন বলে উঠলো।

—আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
আমি উপরে তাকিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে।
আমি সালামের উত্তর টা দিলাম
—ওয়ালাইকুম সালাম।
—ভাইয়া কেমন আছেন?
–জি ভালো।আপনি?
–ভালো! ওকে ভাইয়া আসি।
এই বলে মেয়ে টা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেল।
তার হাসিতে যেন আমার চোখ আটকে গেল।আহ কি অপরুপ হাসি।আমার ভিতরে কেমন জানি একটা ফিলিংস আসতে লাগলো।

আমাকে দেখে প্রায় সব মেয়েই হাসে, কিন্তু এই মেয়েটার হাসি যেন অন্য রকম লাগলো।আমি তো মেয়েটার হাসি মাখা মুখ টা দেখে পুরো ক্রাশ খেয়ে গেলাম।মেয়ে টা দেখতেও কিন্তু সেই।
তো যাই হোক আমি এডমিশন নিয়ে বাসাই চলে আসলাম।

রাতে যখন ঘুমাতে গেলাম তখন হটাৎ করেই সেই মেয়েটার হাসি মাখা মুখ টা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
কিছুতেই ঘুম আসছিলো না।এরকম তো আমার আগে হয়নি।

“মেয়েটি চলে গেলো মুচকি হেসে”
“আর আমি গেলাম তার ঐ হাসি তে ফেঁসে।
আমি তো তাকে নিয়ে রীতি মতো কবিতা বানানো শুরু করে দিলাম।
যাই হোক তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।আমি আজ সকালে ভার্সিটি তে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হতে লাগলাম।পড়াশুনা করার জন্য যাচ্ছি না।কাল রাতে আমার ঐ ক্রাশ এর জন্য ঠিক মতো ঘুমাতে পারিনি তাই তার ঐ মুখ টা দেখতে যাওয়ার জন্য যাচ্ছি।
এমন সময় আবার ছোট ভাই এসে হাজির।
–ভাই তুমি বিয়া করবা কি না।

ছোট ভাই এর কথা শুনে মেজাজ টা খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার।একটা শুভ কাজে যাওয়ার সময় এসব শুনলে কি রকম লাগে।

আমি রিমন কে কিছু বললাম না।সোজা বাসা থেকে বেড়িয়ে পরলাম।
ভার্সিটি তে এসে গেট এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।উদ্দেশ্য একটাই ঐ মেয়ে টাকে এক নজর দেখার।
অবশেষে আমি ঐ মেয়ে টিকে দেখতে পেলাম।মেয়ে টা আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে।আমি আবার ও ঐ মেয়ে টির উপর ক্রাশ খেলাম।
এভাবে প্রায় ২ মাস চলে গেলো।এর মধ্যে প্রায় প্রতিদিন এ ঐ মেয়েটাকে দেখতে ভার্সিটি তে যেতাম। আর ঐ মেয়েটি আমাকে দেখেই একটা মুচকি হাসি দিতো।আমি প্রায় প্রতিদিন ই মেয়েটার হাসি দেখে মেয়েটার উপর ক্রাশ খেতাম।

আমার রাতে ঘুম হতো না সেই মেয়েটির কথা ভেবে ভেবে।
আমি তো পুরো পুরি সেই মেয়েটার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।আমি রাত জেগে সেই মেয়েটি কে নিয়ে কবিতা লিখি।তাকে ঘিরে আমি হাজার ও স্বপ্ন বুনে ফেলেছি।

আমার ধারনা সেই মেয়েটিও আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
আর খাওয়ার ই কথা আমি ছেলে কি দেখতে শুনতে কম নাকি।
ইদানীং আমি খেয়াল করলাম মেয়েটি আমায় যেন কিছু বলতে চাইছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম মেয়েটি আমায় কি বলতে চাইছিলো।আমি ও পারছিলাম না ভালবাসার কথা টা না বলে।
মেয়েটিও মনে হয় না বলে থাকতে পারছেনা।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমি এখন ও মেয়েটির নাম পর্যন্ত জানি না।

আজ আমি ভার্সিটির গেট এ দাঁড়িয়ে আছি।এমন সময় আমার ক্রাশ, মানে ঐ মেয়ে টি মুচকি হেসে হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো।

মেয়েটির হাসি আমি যত বার ই দেখেছি তত বার ই ক্রাশ খেয়েছি আর তার প্রেমে পড়েছি।
মেয়েটা আমার দিকে এগিয়ে আসছিলো আর আমার হার্টবিট টা বেড়ে যাচ্ছিলো।
মেয়েটা আমার সামনে এসে বলতে লাগলো।
—ভাইয়া আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
আমি মনে মনে বলছি,তোমার কথা শোনার জন্যই তো আমি অপেক্ষা করছি।
আমি একটু ভাব নিয়ে বলতে লাগলাম।
—-কি কথা বলেন?
মেয়েটা বলতে যাবে এমন সময় মেয়েটার ফোন টা বেজে উঠলো।
মেয়ে টা ফোন টা বের করে।
আমাকে বলতে লাগলো।
–ভাইয়া আজ না আমি কাল বলবো।কাল ঠিক ৫ টাই আপনি এখানে আসবেন প্লিজ।
এই বলে মেয়ে টি চলে গেলো।
আমি মনে মেয়েটার ফোন টা কে গালি দিতে লাগলাম। সালা বেজে উঠার আর সময় পেলি না।
আমি একহ্রাস দুঃখ নিয়ে বাসায় চলে আসলাম।
আমার আর রাতে ঘুম হলো না।বুঝতেই তো পারছেন।আমি শুধু অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন যে বিকাল ৫ টা বাজবে। আর আমি মেয়েটার মুখ দেখে শুনতে পাবো সে আমায় ভালবাসে।
দেখতে দেখতে রাত পোহালো।বিকাল যখন ৪ টা বাজে ঠিক তখন আমি আমার গোলাপ গাছ থেকে একটা গোলাপ ছিড়ে সেই যায়গায় পৌছে গেলাম।

আমি গোলাপ টা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।আমি ঘড়িতে দেখলাম ৪ টা ২০ বাজে।৫ টা বাজ তে আরো ৪০ মিনিট বাকি।এই ৪০ মিনিট ই যেন আর যাচ্ছে না।আমি যে আর দেড়ি সইছে না।

অবশেষে সেই মেয়েটা আসলো।
আমি মেয়ে টাকে দেখেই গোলাপ টা পিছনে লোকিয়ে ফেললাম।
মেয়ে টা আমার সামনে এসে বলতে লাগলো।
—ভাইয়া কিভাবে যে কথা টা বলবো আমি বুঝতে পারছিনা(হেসে হেসে)
আমার ও লজ্জা লাগছিলো।
—না বলে ফেলেন সমস্যা নেই।
এবার মেয়েটি বলতে লাগলো।

—ভাইয়া আমার বাসা থেকে বার বার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।কিন্তু আমি আর আপনার ভাই রিমন একে অপর কে খুব ভালবাসি।

মেয়েটার কথা শুনে আমার মাথা টা ঘুরতে লাগলো।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি।মেয়েটি আবার বলতে লাগলো।

—আমি রিমন কে বলেছি আমাদের বিয়ের কথা কিন্তু সে বলেছে আপনি বিয়ে না করলে নাকি সে বিয়ে করতে পারবেনা।প্লিজ ভাইয়া কিছু একটা করুন। আপনার হাতেই এখন সব কিছু।

আমি কি বলবো বুঝতাছি না।
আমি দুঃখভরা মন নিয়ে বলতে লাগলাম।
—ওকে আমি দেখছি ব্যাপার টা।
মেয়েটা এবার একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলতে লাগলো।
—আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।আমাকে এখন বাসায় যেতে হবে।আজ আসি ভাইয়া।
এই বলে মেয়ে টা হেসে হেসে চলে গেলো।
কিন্তু এবার এই মেয়েটার হাসি আমার কাছে তিতা তিতা লাগলো।
এহ কি বিশ্রী হাসি।

আমি গোলাপ ফুল টা বের করে মাটিতে ছুড়ে মারলাম।আর গোলাপ টার উপর গুনে গুনে দশ টা লাথি দিলাম। গোলাপ ফুল টাকে দেখে আমার খুব মায়া হতে লাগলো।

এই বেচারার কি দোষ।
সালা সব তো আমার কপালের দোষ।ভাবছিলাম কি আর হলো কি।
আমার বুকের ভেতর টা কেমন জানি চিন চিন ব্যাথা করতে লাগলো।
আমি আজ বুঝলাম রিমন কেন বার বার শুধু আমার বিয়ের কথা বলে।
নিজেই তো বলতে পারতি।তর প্রেমিকা দিয়ে বলানোর কি দরকার ছিলো। আমার ইমোশন নিয়ে খেলা করলি কেন তরা।

আমি বাসায় চলে আসলাম।বাসায় এসেই দেখতে পেলাম রিমন কে। তাকে দেখেই যেন মাথা টা বিঘরে গেলো আমার।

রিমন আমার কাছে আসতেই।
ঠাসসসসসসসসসস,
ঠাসসসসসসসসসসসস
দুইটা চর বসিয়ে দিলাম।
রিমন আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।
—ভাইয়া আমায় মারলে কেন।
মারছি কেন সেটা আমার ভাই না বুঝলেও তো আপনারা বুঝতে পারছেন।

আমি তাকে আর কিছু বললাম না।আমি আমার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে কাদতে লাগলাম।
মেয়েটি ছিলো আমার ক্রাশ,

বুঝতে পারিনি এভাবে খাবো বাশ।
প্রায় কিছু দিন পর…..

আজ আমার ভাই আর আমার ক্রাশের বিয়ে। পুরো বিয়ের ব্যবস্থা টা আমি করেছি।আমার ইচ্ছে ছিলো রিমন কেও ছ্যাকা খাওয়াবো। কিন্তু নিজের ভাই এর কষ্ট কি আর আমার ভালো লাগবে।

আমার ভাই আর আমার ক্রাশের বিয়ে টা দিয়ে আমার মাথা থেকে সব চিন্তা ভাবনা দূর করে দিলাম।
আর আবার মন দিলাম আমার পড়াশুনাই।আমাকে যে অনার্স কমপ্লিট করতেই হবে।যত বছর লাগে না কেন আমি অনার্স কমপ্লিট করবোই।উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি ৭ বছরে।অনার্স টা যেন পাশ করতে করতে আমার বিয়ের বয়স টা যেন পার না হয়ে যায়।এর জন্য সবাই দোয়া করবেন।

—সমাপ্ত—

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত