মৃত্যুর ডাক

মৃত্যুর ডাক

গ্রামের নাম শশীনগর। ছোট খাটো একটা রেলস্টেশন আগে বটে তবে সেও বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে। স্টেশন থেকে একটা ভ্যান অথবা ঠেলাগাড়ি পেলে তো কপাল ভালো, আর যদি তা না হয় তবে দুই তিন কোষ হেটেই পারি জমাতে হবে। গ্রামে যেতে একটা সরু নদী পড়বে। খুব একটা পানি নাহ্ থাকলেও বর্ষা কালে খানিকটা পানি থাকে। নদী পেড়িয়ে একটা মাঠ আর মাঠের উপর পাশে শশীনগর। ওমমমমম যদিও নামে নগর যুক্ত আছে কিন্তু একেবারেই পাড়াগ্রাম বললেই চলে।

বিদ্যুৎয়ের আলো না থাকায় সন্ধ্যা নামতে নামতেই ঘরে ঘরে কুপি বাতি জ্বলে উঠে। তারপর চারিদিকে নিস্তব্ধতা বিরাজমান।

স্টেশন ঘেষে দিনে বেশ কতক ট্রেন গেলেও দাড়ায় মাত্র দুটো। একটা দুপুর পৌনে বারো টায় আরেকটা বিকেল ৫টায়। ঝাক ঝাক শব্দ করে আরও একটা ট্রেন চলে গেলো। ট্রেন থামার সময় এটা নয়। আরও ঘন্টা খানেক সময় বাকি আছে। কিন্তু আজ যেন নিয়মের বাইরেই গেলো সব কিছু। বেলা যখন ঠিক ১১ টা বাজে তখন কড়া হুইলসেল দিয়ে একটা ট্রেন থামলো শশীনগর গ্রামে। নিয়মের এমন বরখেলাম হয় আগে কখনো। স্টেশনটা প্রায় শনশান হলেও যে কয়েক জনই উপস্থিত আছে বেশ অবাকই হয়ে গেলো। আড় চোখে একে উপরের দিকে তাকাতে লাগলো। ঠিক তখনি ট্রেন থেকে একজন ভদ্রলোক নামলেন।

বয়স তিরিশের উপরে মুখে আধাপাকা খোচা খোচা দাড়ি। চুলগুলো ভালো করে উপরের দিকে তুলে দেওয়া। পোশাকের দিকেও বেশ পরিপাটি। দেখে মনে হলো শহর থেকে এসেছে। নিজের বিটকেস নিয়ে রাস্তায় দাড়ালো। আশে পাশে বেশ ভালো করে দেখে নিলো। তারপর একটা ভ্যানওয়ালাকে ডেকে বললো,,,

শশী নগর যাবে?
ভদ্রলোকের কথায় ভ্যান চালক খিক খিক করে হাসি দিয়ে বললো,
আজ্ঞে বাবু,যাবো ক্ষন।
ভদ্রলোক আর কথা না বলে ভ্যানে নিজের মাল পত্র নিয়ে উঠে বসলেন। গ্রামের পথটা মাটির। বেশ ঝাকুনি অনুভব হওয়াতে ভদ্রলোক একটু বিরক্তি স্বরেই বললেন,
আমার কোন তাড়া নেই আস্তেই চালান।
ভ্যান চালক গতি কমিয়ে দিলেন। তারপর আবার সেই বিদঘুটে হাসি দিয়ে বললেন,,,
আপনি তো মশাই প্রকৃতিকেই বদলে দিলেন। সেই ছোট কাল থেকে দেখে আসছি ১২টার আগে ট্রেন থামে না আর আজ কি না এগারোটাই?
ভদ্রলোকটি এবার মুখ খুললেন,,
আমার এক বন্ধু রেলওয়ে কাজ করে তার সুবাদেই এমনটা হলো।
-তা যাবেন কার বাড়িতে?
আবার প্রশ্ন করলো।

ভ্যান চালকের প্রশ্ন শুনে ভদ্রলোক একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। কপালে খানিকটা ভাজ পড়লো। তারপর ঠোটে দাত দিয়ে কামড় ধরে বললো,,,

আমি ঠিক নাম টা মনে করতে পারছি না তবে তিনি বলেছিলো মির্জাবাড়ির কথা বললেই নাকি সবাই চিনবে।
ভদ্রলোকের মুখ থেকে মির্জাবাড়ির কথা শুনেই ভ্যান দাড় করালেন। মুখটা নিমিষেই রক্ত শূন্য হয়ে গেলো।তারপর আমতা আমতা আর একরাশ ভয় নিয়ে বললো,,, আপনি মির্জাবাড়ি যাবেন?

ভদ্রলোক স্মিত হেসে বললো,, হ্যাঁ কেন কোন সমস্যা?? এমন ভাব করলেন যেন ভূতের বাড়িতে যাচ্ছি???
বলেই আরও একটু হাসলেন।
“ঠিক তা না তবে ওখানে তো…. ”
কথাটা অর্ধেক বলেই থেমে গেলো।
-ও সব বাদ দেন তো, ভূত প্রেত বলতে কিছু হয় নাহ্। এ সবই মানুষের ভ্রোম। আর তাড়াছা আমাকে খুব করে ধরলো ওই বাড়ীর বড় কর্তা। কি যেন সমস্যা হয়ে জমিজমা নিয়ে তাই আসতেই হলো।
-আপনি উকিল?

ভ্যানচালকের প্রশ্নে মৃদু হাসলো ভদ্রলোক।
কথায় কথায় ভ্যানটা এসে থামলো মির্জাবাড়ির থেকে একটু দুরেই, ভ্যান চালক স্পর্ষ্ট বলে দিলো আর যাবে নাহ্। দুরে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো বাড়িটা। ভদ্রলোক আর কোন কথা না বাড়িয়ে ভাড়া মিটিয়ে সামনের দিকে এগুতে লাগলো।

ভ্যানচালক ভয় ভয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

একটু দূরেই মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে বাড়িটা। বেশ পুরোনো হলেও এখনো সুন্দর্যের বিন্দু মাত্র ক্ষতি হয় নি। ধূসর রংয়ের বাড়িটা দেখেই বেশ অবাকই হলো ভদ্রলোক। নিখুত কারুকাজ আর নিপুন হাতের ছোয়া সব খানে। তবে বেশ কিছুদিন মেরামতের কাজ যে হয় নি সেটা যে কেউ বলতে পারবে।
বিশাল বড় বটগাছটা ছায়া দিয়ে রেখেছে বেশ কিছু অংশ। বট গাছে নিচে দাড়াতেই বেশ স্বস্তি পেলেন তিনি। শহরে এমন পরিবেশ আশা করা বড়ই দূষ্কর। সোজা হাত দশেক এগুলেই বিশাল লোহার দড়জা। বুঝতে বাকি রইলো না যে এটাই মেইন ফটক। ভিতরে কাউকেই দেখা যাচ্ছে নাহ্। বেশ শনশান বললেই চলে। দড়জার কাছে গিয়ে বেশ কিছুক্ষন ডাকাডাকি করলো,
ভিতরে কেউ আছেন? শুনতে পাচ্ছেন? কেউ আছেন?
অনেক ক্ষন পর কাশির আওয়াজ আসলো ভিতর থেকে।

লোহার দড়জা খুলে বেড়িয়ে আসলেন একটা লোক। বয়স ৫০ পেড়িয়ে। রোগাটে শরীর। শরীরে একটা মোটা মত মলিন আলখেল্লা,একটা চাদর। আর একটু পর পরই পানের পিক ফেলছেন। এসেই গম্ভীর গলায় বললেন,,
কী চাই এখানে??

-না মানে হয়েছে কী, আমাকে আসতে বলেছিলো কি যেন জমিজমার ব্যাপারে। তা বড় কর্তা কী বাসায় আছে?
ভদ্রলোকের কথা লোকটা বেশ নাক শিটকে বললো,
ও তাইলে আপনিই সেই লোক? আসুন তিনি বাড়িতেই আছেন।
কথাটা বলেই লোকটা বাড়ির ভিতরে ডুকে পড়লো, পিছু পিছু ভদ্রলোকও।
বাড়িতে ডুকেই প্রথমে যা চোখে পড়লো তা হলো বাড়ির মাঝখানে একটা বড় পুকুর। পানি গুলো বেশ সচ্ছিল। উপর থেকে দিব্বি মাছে উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। শান বাধা পাড়। আর পুকুরের চারি পাড়ে নানান রকমের গাছ লাগানো। সব মিলিয়ে বেশ রুচির মানুষ বলেই মনে হলো এই বাড়ির বড় দের।

আরও কিছু ক্ষন এগুতেই একটা বাগান চোখে পড়লো। বাগানে ফুল ফুটার কোন লক্ষন দেখা গেলো নাহ্। গাছ গুলো কেমন যেন শুকানো শুকানো ভাব। হয় তো বেশ কিছুদিন পানি দেওয়া হয় নাহ্।

আরও কয়েক পা এগুতেই একটা কাচারি ঘর পড়লো। বুঝতে বাকি রইলো না এখানে শালিস বিচার হয়ে থাকে। যেই না আর দুই পা এগুলো ঠিক তখনি কানে আসলো খিলখিল হাসির শব্দ।

হঠাৎই এমন হাসিতে বেশ ভয়ই পেয়ে গেলো ভদ্রলোক। তাছাড়া একটা বিষয় বেশ অবাক লাগছে এতো বড় বাড়িতে তো লোকের চলাচল বেশি হওয়ার কথা কিন্তু আসার পর গেটে একজন আর কাচারি ঘরের বারান্দায় আরেক জন এ ছাড়া আর কোন লোক চোখে পড়লো নাহ্।হাসির শব্দটা খুব কাছ থেকেই আসছে মনে হয়। নির্মল হাসিতে মনটা বাকুল হয়ে উঠলো রমনীকে একটু দেখার জন্য, ভদ্রলোকের ভাবনা যার হাসিতে এতো মধু সে দেখতে নাহ্ কতই সুন্দর হবে। এদিক ওইদিক ভালো করে খুজে দেখলো। কিন্তু নাহ্ কোথাও নেই কেউ। কিন্তু সামনে তাকতেই দেখলো একটা শ্যাম বর্ণের মেয়ে দাড়িয়ে আছে। আর অনরবত হাসছে। পরনে একটা শাড়ী। বয়স দেখে আন্দাজ করা মুসকিল। কত হবে এই বিশ? না তার একটু বেশিই।

ভদ্রলোক মেয়েটাকে দেখে বেশ নাখোস হলো। কারন যার আশা করলো সেটা মিললো নাহ্। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। একটা সিড়ি বেয়ে উপরে চলে গেছে। কিন্তু যাবে কোন দিক??? এই নিয়েই যখন বেশ ভাবনায় পড়লেন ঠিক তখনি উপর থেকে আওয়াজ আসলো,
উকিল সাহেব আসুন আসুন আসতে কোন সমস্যা হয় নি তো?

কণ্ঠটা শুনেই উপরে তাকালেন। দেখলেন একজন বৃদ্ধ চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আছে। সাদা লুঙ্গি সাদা পায়জামা। বড় বড় দাড়ি আর খুব ভালো করে ছাটা গোফ। বয়সের ভারে যদিও শরীরটা লুইয়ে পড়েছে কিন্তু সেটা দুর থেকে বোঝা বড়ই মুশকিল। মুখে একটা চাপা হাসি নিয়ে আবারও প্রশ্ন করলো,
তো কেমন দেখলেন আমাদের গ্রাম?
ভালো তো?
বলেই হো হো করে হেসে দিলো বৃদ্ধ।
মনে হলো ভবনের ইট একটা একটা করে খুলে পড়বে এখনি। গা টা বেশ ছমছমিয়ে আসলো ভদ্রলোকের।
দুই জনের মাঝেই বেশ নিরবতা বিরাজ করছে।
তারপর বৃদ্ধ চেয়ার থেকে উঠলেন।
তারপর বললেন,,, চলুন আপনাকে সব বুঝিয়ে দিই।
বলেই ভিতরের দিকে হাটা শুরু করলেন।
ভদ্রলোকও বেশ ধীর গতিতেই অনুসরন করলেন বৃদ্ধকে।

একটু সামনে এগুতেই একটা ঘর। ঘরটা বেশ অন্ধকার। চোখাচোখিও কিছু দেখা যাচ্ছে নাহ্, দেয়ালে মাকড়োশার জাল।

দড়জাটা বন্ধ হয়ে গেলো।

দুপুর বারোটা বেজে বিশ মিনিট।
একটা ট্রেনন এসে থামলো শশীনগর স্টেশনে। দেখে শহরের বাবু বলেই মনে হলো। একটা ভ্যানওয়ালাকে ডেকে বললো,
ওমমমমম মির্জাবাড়ি যাবে?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত