“না” শব্দটা বের হবেনা

“না” শব্দটা বের হবেনা

বন্ধুকে যখন জড়িয়ে ধরলাম বন্ধু ভাবছে তাকে হয়তো কংগ্রাচুলেশনস জানাতে জড়িয়ে ধরেছি। এদিকে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। বুকের বাঁ পাশটা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছে। ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু দ্বিতীয় বার বিয়ে করতে যাচ্ছে। বিয়ে না, মোশাররফ করিমের ভাষায় এটাকে সাঙ্গা বলে। অবশ্য দ্বিতীয় বিয়েটাও প্রথম জনকেই করতেছে। প্রথমবার পালিয়ে বিয়ে করেছিল। এবার আনুষ্ঠানিক ভাবে করছে।

ভাত খেয়ে ঘুমানোর সময় বন্ধুর দেওয়া বিয়ের কার্ডটা আরেকবার দেখে নিলাম। কবে যে এভাবে আমি অন্য কাউকে কার্ড দিয়ে তার হিংসের কারন হবো কে জানে। একে একে তিন তিনটা বন্ধুর বিয়ে হয়ে গেলো। এদিকে আম্মা আমার বিয়ের নাম ও নিচ্ছেনা। তার কি নাতি নাতনির ও প্রয়োজন হয় না? এভাবে আর কতদিন ঘরে একা একা কাটাবে। আম্মা কে এভাবে একা একা সময় কাটাতে দেখে আমার কত কষ্ট হয় আম্মা কি বুঝেনা?

বন্ধুর বিয়ের প্রায় মাস খানেক পর একদিন রাতে খাওয়ার টেবিল সবাই মিলে খাচ্ছিলাম। খাওয়া দাওয়া শেষে যখন ঘুমোতে আসলাম তখন দেখলাম আম্মা একটা ছবি হাতে আমার রুমে ঢুকছে। আমার পাশে এসে বলল, “মেয়েটা কেমন দেখতো বাবা” আমি যেন উনার হাত থেকে মোটামুটি ছবিটা কেড়ে নিয়ে দেখতে লাগলাম। অবশ্য দেখার কি আছে। বিয়ে করতে পারলেই হলো। বিয়েই করতে পারছি না পছন্দ অপছন্দ দিয়ে কি হবে। দশ মিনিট মেয়ের ছবি দেখার পর আম্মা বলল “কিরে পছন্দ হয়েছে?” বললাম “হ্যা পছন্দ হয়েছে, হবেনা কেন”! আম্মা খুশি হয়ে বললেন “ঠিক আছে আমি তাহলে মেয়ের পরিবারের সাথে কথা বলে বিয়ের তারিখ ঠিক করছি” আমি ভদ্রতা রক্ষার্থে বললাম “এত তাড়াতাড়ি বিয়ে কেন? আমার এখনো বিয়ের বয়স হইছে নাকি আরো কিছুদিন অপেক্ষা করো” আম্মা কি যেন ভেবে বললেন “ভালো করে ভেবে বলছিস তো বাবা?” আমিও নিজের কথায় অটল থেকে নিজেকে বীর সৈনিক ভেবে বলে ফেললাম “হ্যা, এখানে ভাবার কি আছে, বিয়ে তো একদিন করবোই, এত তাড়া কিসের” আম্মা কিছু না বলে চুপচাপ চলে গেলেন।

আম্মা চলে যাওয়ার পর শুয়ে শুয়ে এক দফা লুঙ্গী ডান্স দিয়ে দিলাম। যাক এতদিনে তার সুবুদ্ধি উদয় হইছে। মনে মনে হবু বউকে নিয়ে কল্পনা করতে করতে সেদিনের মত ঘুমিয়ে পড়লাম। এমন শান্তিতে শেষ কবে ঘুমাইছি মনে নেই।

সেকেন্ড মিনিট, ঘন্টা দিন মাস ঠিকই চলে গেলো, আম্মা সেই যে একটা পাত্রীর ছবি দেখাইছিলো সেই থেকে এখন পর্যন্ত আর বিয়ের কথা মুখেও আনলো না। সেদিন বিয়ের জন্য রাজি হলে আজ এইদিন দেখতে হতো না। কেন যে সেদিন রাজি হলাম না!

সরাসরি আম্মাকে বিয়ের কথা বলতেও পারছি না। এত বড় বিপদ আমার কাছেই কেন আসলো? বন্ধুরা এখন আর একজনও অবিবাহিত নেই। সবাই বিয়ে করে ফেলেছে। আড্ডায় যখন ওরা তাদের বউয়ের প্রশংসা করে, আড্ডা দিতে দিতে যখন হঠাৎ ফোন করে ওদের তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে বলে তখন দুঃখে আমার বুক ফেটে যায়। সেই বুক লজ্জায় কাউকে দেখাতেও পারিনা। বুকের বদলে যদি অন্য জায়গায় তাকায়!

অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ের কথা আম্মাকে সরাসরি না বলতে পারলেও ইনডাইরেক্টলি বলতেই হবে। রাতে খাওয়া শেষে আম্মুর রুমে গিয়ে উনার পাশে বসতেই আম্মা বললেন “কিরে বাবা কিছু বলবি?” আমি কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিলাম না। কোনরকম আমতা আমতা করে বললাম,
– আম্মা আমার এত বড় খাটে একলা ঘুমাতে ভালো লাগেনা।
আম্মা নরম শুরে বললেন,
– ঠিক আছে তুহিন কে বলবো কাল থেকে যেন তোর সাথে ঘুমায়, আজকে রাতে একটু কষ্ট করে থাক।
– আম্মা আমি কি বলতেছি আর আপনি কি বলতেছেন??
– আচ্ছা ঠিক আছে তোর বাপ রে কমু তোর জন্য একটা ছোট দেখে খাট কিনতে।
আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আম্মার রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। পিতিবিকে বিদায় দেওয়ার সময় চলে এসেছে। কেউ একটু আমার দুঃখ বুঝে না। একটু বুঝলে কি এমন হয়?? রুম থেকে বের হয়ে কি মনে করে আবার ফিরে গেলাম আম্মার কাছে। লাস্ট একটা চেষ্টা করে দেখতে। আমাকে দেখে আম্মা আবার বলল “তোর যদি বেশি কষ্ট হয় আজ রাতটা নাহয় তুই তুহিনের কাছে চলে যা” এগিয়ে গিয়ে আম্মার মাথার পাশে বসে বললাম,
– আসলে আম্মা ওইসব কিছু না, আমার একটা কোলবালিশ লাগবে।
– ঠিক আছে কিনে দিমুনি কালকে।
এবার অনেকটা কাঁদো কাঁদো কন্ঠেই বলে ফেললাম,
– আম্মা এই কোলবালিশ সেই কোলবালিশ না।

আম্মা শোয়া থেকে উঠে বসে বললেন, “কালকে তুই সহ মার্কেট যাবো, তোর যেমন কোলবালিশ পছন্দ হয় নিয়ে আসিস, এখন যা তো একটু ঘুমাতে দে”

আম্মা কি বুঝেও বুঝতেছে না? নাকি আসলেই বুঝতেছে না, সেটাই বুঝতেছি না। দুঃখে বাপ্পারাজ হয়ে গেলাম, আর এদিকে আম্মার কোন খেয়ালই নেই।

দুই বছর পর….
বাজার করতে এসে একটা দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেলো। আম্মা যে মেয়ের ছবি দেখাইছিলো সেই মেয়েকে দেখলাম একটা ৪/৫ মাসের বাচ্চাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে ঢুকতেছে, তার মানে আম্মা যে মেয়ের ছবি দেখাইছিলো সেই মেয়ে বিয়ে করে একটা বাচ্চা ও আছে, আর আমি এখনো অবিবাহিত রয়ে গেলাম? এ জীবন কেমনে রাখি? বাড়ির দিকে দৌড় দিলাম।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দেখলাম আম্মা পাশের বাড়ির সীমার মায়ের সাথে সিঁড়ির উপর বসে বসে কথা বলতেছে। দূর থেকেই শুনতে পেলাম সীমার মা বলতেছে “ভাবি আমাদের তানভীরের তো বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, বিয়ে দিবেন না?” আম্মা সীমার মায়ের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল “আমার ছেলে ওইসব পছন্দ করেনা, দুই বছর আগে বিয়ের কথা বলেছিলাম, ও সরাসরি বলে দিয়েছে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবেনা, তাই আমিও ভাবছি আরো চার পাঁচ বছর দেখি”

চার পাঁচ বছরের কথা শুনে দুই বছর আগে বন্ধুর বিয়ের কার্ড দেখে যে অনুভূতি হয়েছিলো সেটা মনে হচ্ছে আবার ফিরে এসেছে। বুক ফেটে যাচ্ছে। ফেটে একেবারে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সামনে একটা গাছ কে জড়িয়ে ধরে মনে মনে মান্নার সেই দুঃখি কন্ঠে বলে উঠলাম ” না মা নাআ.. ওমন কথা বলোনা, তোমার ছেলে যে সইতে পারবে না, একবার শুধু বিয়ের কথা বলে দেখো, এই মুখ দিয়ে আর জীবনেও “না” শব্দটা বের হবেনা…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত