বজ্রপাত

বজ্রপাত

“তোমাকে না বলেছি, আমাকে এই সময়টাতে ফোন না দিতে? তবুও কেনো দিছো? তুমি কি ছ্যাঁচড়া হয়ে গেছো?”
আদ্রিতার সঙ্গে সময়টা আমার কিছুতেই ভালো যাচ্ছে না। কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছে আজকাল। আমাকে একটুও সময় দিতে চাচ্ছে না। অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে সে। কিন্তু আমি যে পারিনি। আমি এখনও আগের মত ভালোবাসি যে তাকে। কিন্তু সে আমাকে আর বুঝতে পারছে না।

আজ যখন ওর অফিস টাইমে আমি ফোন দিলাম তখনি উপরের কথাগুলো বলে ফোনটা কেটে দিলো। ভাবতে অবাকই লাগছে আমি নাকি ছ্যাঁচড়া হয়ে গেছি। কিন্তু আমি কি সত্যিই এমন হয়ে গেছি? কাউকে যদি ভালোবাসা হয়,তবে তাকে মিস করলে ফোন দিলে কি ছ্যাঁচড়া হয়ে যেতে হয়।
কিন্তু আমাদের রিলেশনের বয়স হয়েছে এই যে দিয়ে তিন বছর, কত না ব্রেককআপ হয়েছে। তবুও একসাথে আছি। বেলকনিতে বসে বসে পুরোনো দিনের কথাগুলো ভাবতে লাগলাম।

– আপনি খুব সুন্দর করে ছবি তুলতে পারেন।
নিজের আপন মনে ঘাসফড়িং এর ছবি তুলছিলাম। কোথা থেকে একটি মেয়ে এসে কথাটি বললো…
– ধন্যবাদ… কিন্তু আপনি জানেন কি করে?
– আপনার নাম না আবির হাসান?
– হুমম
– আপনার তোলা ছবিগুলো আমি একটা ম্যাগাজিন এ দেখেছি। সাথে আপনার ছবিসহ নামটা ছিলো।
– ওহহ গুড…

আমি টুকটাক ফটোগ্রাফি করি। ছবি তুলতে নানা পরিবেশে যেতে হয়। তাই একদিন ছবি তুলতে যেয়েই আদ্রিতার সাথে কথা হয়। একদিন আবার ছবি তোলার জন্য যায় সেই জায়গাতেই, সেদিনও.।।
– হাই মি. আবির
– আরে আপনি?
– হুমম, আমি আদ্রিতা।
– ওহহ।

এভাবেই কথাগুলো হতে থাকে আমার আর আদ্রিতার। আমি ওকে অদ্রি বলেই ডাকতাম। দুজনের মাঝে একসময় বন্ধুত্ব হয়, তারপর ভালোবাসা। তবে অদ্রিই আমাকে আগে বলেছিলো সে আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু এখন সে অন্যরকম করছে। আমাকে সে সময় দেয় না। ফোন দিলে কেটে দেয়।
– কি করিস রে বাবা? (মা)
মায়ের ডাকে ভাবনার ছেদ পড়লো।
– এই তো মা বসে আছি।
– মন খারাপ?
– কই না তো মা?
– অদ্রির সাথে কিছু হয়েছে?
– কই না তো মা… (মুচকি হেসে)

মা অদ্রির ব্যাপারে সবই জানো। মেয়েটি একটি অফিসে চাকরি করে। আর আমি ফটোগ্রাফার। মা চলে যেতেই ফোন দিলাম।
– হ্যালো অদ্রি…
– এই তোমার আক্কেল-জ্ঞান বলে কিছু নাই?
– মানে কি বলো?
– তোমাকে না বলেছি আমি অফিসে থাকা টাইম কোনো ফোন দিবা না, তবুও দাও কেনো?
– খুব মিস করি তো তোমায় তাই। কেনো মনে হয় তুমি হারিয়ে যাবে আমার থেকে তাই আগে থেকে তোমাকে যাতে না হারাতে হয় তার জন্য ফোন দিয়ে খোঁজ নিই।
– তুমি একটা স্টুপিড, ইডিয়ট।
– অদ্রি, এর আগেও তোমাকে ফোন দিতাম অফিস টাইমে, বাট তখন কিছু বলতে না। এখন দিলে অনেক কথা শোনাও। কেনো এমন করো তুমি? আমার কষ্ট হয় না?
– রাখো তোমার কষ্ট। তুমি কি জানো, অফিসে বসদের সাথে থাকতে হয় আমার। কত কাজ থাকে, নতুন ক্লাইন্ট আসে, মিট করতে হয়।
– ভালো বুঝলাম, যাও আর দিবো না।

কথাটি বলে ফোনটা রেখে দিলাম। কেমন যেনো গলা ধরে আসতে লাগলো। খুব খারাপ লাগে ওর ব্যবহার এ। তবুও তাকে ভালোবাসি আমি। কাল যাবো ওর অফিসের সামনে।

এখন ১১ টা বাজে। আমি অদ্রির অফিসের সামনে শিমুল গাছটার নীচে বসে আছি। অদ্রির জন্য আমি আর আগের মত ফটোশুট করতে পারি না। ফোন দিলাম অদ্রিকে। দুইবার রিং হওয়ার পর কেটে গেলো এমনি।

তারপর আবার দিলাম কিন্তু এইবার ধরলো ঠিক শেষ সময়ে।
– কি ব্যাপার? তুমি আবারো ফোন দিছো?
– অদ্রি, তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। একবার…
– রাখলাম, তোমার এই প্যাচাল শোনার সময় আমার নেই। কাজ আছে করবো এখন।
লাইনটা কেটে গেলো। আসলে ঐ কেটে দিলো। খুব অবহেলা করছে আমার সাথে ও। ঠিক তখনি দেখলাম ও ওর অফিসের বসের সাথে বের হচ্ছে হাত ধরে। এটা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। নিজেকে কেমন যেনো মনে হতে লাগলো। বুকের মধ্যে মনে হল শুরু হয়েছে বজ্রপাত। যা সামলানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।

চলে আসলাম বাড়িতে। সারাটাদিন কেমন করে যেনো গেলো বুঝতে পারিনি। না খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছি। আমি পারছিনা মেনে নিতে অদ্রির পরিবর্তন। রাতে ফোন দিলাম। ঠিক পাঁচবার বাজার পরে ধরলো..
– ঐ কি ব্যাপার কি? এতবার ফোন দিচ্ছো কেনো?
– মানে ফোন দেয়েটা কি নিষেধ আমার?
– জানো না আমি রাতে অফিসের কাজ করি। কাল ক্লাইন্ট আসবে, তার জন্য নতুন প্রজেক্ট এ কাজ করছি। রাখছি এখন বাই।

হুট করেই কেটে দিলো। আমি খেয়েছি কিনা জানতেই চাইলো না। আর আগে ও সব খবর নিতো। বলতো, কখনই আমাদের ভালোবাসা শেষ হবে না। কিন্তু না আজ ওর ভালোবাসা শেষ। কিন্তু আমারটা শেষ হয়নি।
অবহেলাতে কাটলো একটা মাস, রোজ ওর অফিসের সামনে যেতাম, আমাকে দেখতো, অপমান করতো, তাড়িয়ে দিত। আমি কিছুই বলতে পারতাম না। কারণ বড্ড ভালোবাসি যে তাকে আমি। কিন্তু আজ থেকে আমি আর যাবো না ওর কাছে। কোনো কল দিবো না। কিছুই করবো না… … …

***

– আমাকে কি আর একবার মেনে নেয়া যাই না আবির?
সেদিন সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমি। না কোনো কল দিতাম, না কোনো ভাবে দেখা করার চেষ্টা করতাম।

– হাহাহা তোমাকে কেনো মেনে নিবো? তুমি তো কিছু করোনি।
– আবির প্লীজ এভাবে বলো না। এই পাঁচ দিনে তোমাকে কতটা মিস করেছি বলো বোঝাতে পারবো না। প্রথম দুইদিন ভালো থাকলেও পরে আর নিজেকে সামলাতে পারিনি।
– হিহিহি, চাকরি করো জানতাম। বাট অভিনয় করো জানতাম না তো।
– জানি আবির তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না। তবুও তোমাকে ভালোবাসি আমি। আগের মতই বাসবো প্রমিস।
– ফিরে যাও…
– আবির জানো না, তোমাকে কতটা মিস করেছি। দুইদিন পর সারাক্ষণ তোমার কলের জন্য ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

অফিস শেষে রোজ শিমুল গাছটার নিচে তাকাতাম, তোমাকে দেখার জন্য, কিন্তু তোমাকে আর পেতাম না। তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগতো। আবির আমাকে মাফ করে দিয়ে ফিরে এসো প্লীজ…
– তুমি যে আমাকে ছেড়ে চলে যাবা না তার কি গ্যারান্টি আছে? আর শোনো, যার কাছে যে জিনিষ থাকে তার মুল্য থাকাকালীন সময়টাতেই দিতে হয়। না হলে পরে এর মুল্য বুঝতে পারলেও তখন সেই জিনিষটি আর কাছে থাকে না।
– আর একটিবার আমাকে গ্রহন করো…
– কাল চলে যাচ্ছি ইটালি। ওখানে সেটেল হবো। আমি আর চাই না তোমাকে। কেননা তুমি, ভালোবাসার মূল্য বুঝো না।

যোগাযোগ অফ করার ৭ দিন পরই অদ্রি আমার বাড়িতে আসে। নিরবে ছাদে বসে প্রকৃতি দেখছিলাম তখনি এসে কথাগুলো বলে। আমি আর সত্যিই চায় না তাকে। কারণ সে ভালোবাসার মুল্য বোঝে না। আমাকে সময় দিতো না। একটা ভালোবাসার সম্পর্ক সুন্দর হয় সময় দেয়ার মাধ্যমে। কিন্তু অদ্রি সেটা দেয়নি আমার।
আজ হয়ত তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তবে তার প্রতি ভালোবাসাটা থাকবেই। আমি চাইলে ফিরিয়ে দিতে না পারতাম। কিন্তু তবুও দিলাম, কারণ আমি যে তার কাছে দ্বিতীয়বার মুল্যহীন হবো না তার কি বিশ্বাস আছে?
বিশ্বাস একবারই তৈরী হয়। যখন সেটা ভেঙে যায় তখন শত চেষ্টা করেও আগের মত আর বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত