আতরের গন্ধ

আতরের গন্ধ

মুর্শেদ সাহেবের মনটা বেশ ফুরফুরে। হাল্কা গুনগুনও করছেন মুখে। চারপাশের মাঠ জুড়ে চাঁদের আলো ছড়িয়ে। মুর্শেদ সাহেব মাথা তুলে দেখলেন; নাহ, পূর্ণিমা নয়, প্রতিপদের পর তিন চারদিন গড়িয়েছে বোধহয় – অর্ধেক খাওয়া চাঁদ। তবে তাতেই অন্ধকার গুটিশুটি মেরে দূরে ঝাঁকড়া গাছগুলির তলায় জমাট বেঁধেছে।

এই রাতদুপুরে রাস্তা পুরো ফাঁকা। শুধু সরসর শব্দে সাইকেল গড়িয়ে চলেছে, সঙ্গে প্যাডেলের আওয়াজ। মুর্শেদ সাহেবের ঘাড় উপচানো বড় কালো চুল আর বুক অব্দি ঝুলে আসা কুচকুচে কালো দাড়ি। দূরথেকে মনে হতে পারে দুধসাদা পাজামা পাঞ্জাবির উপর একটা সাদা টুপি ভেসে চলেছে।

আশেপাশে জনিমানিষ্যির চিহ্নমাত্র নেই। মাঠটার নাম গোরের মাঠ। মাঠ পেরিয়ে কুলদা গ্রামে আজ মুর্শেদ সাহেবের নিমন্ত্রণ ছিল। মুর্শেদ সাহেব আলেম মৌলভী মানুষ। ওখানে মজলিশে কোরআন পাঠের পর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। একটু ভালো করে খেতে গিয়েই রাত হয়ে গেছে। রাস্তাটাও কম নয়। গোরের মাঠের আঁকাবাঁকা আল বরাবর মোরাম ফেলা রাস্তাটা মাইল সাত আটেক হবে। মাঠের এদিকে কুলদা আর ওপাশে মুর্শেদ সাহেবের গ্রাম পাকুড়সিনি। তবে মুর্শেদ সাহেবের নাকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা হাল্কা মিষ্টি গন্ধ এসে লাগছে – ফাইন, বেশ পাতলা আতরের। কিন্তু মুর্শেদ সাহেব বরাবর মোটা আরবি আতর ব্যবহার করেন। পাতলা ঝিলঝিলে আতর তাঁর পছন্দ হয় না। একটু ঘামেই তার গন্ধ উবে যায়। মনেও করতে পারছেন না আজ মজলিশে কেউ তাঁকে আতর দিয়েছিল বলে। প্রথমে বাম তারপর ডানহাত মুঠো করে হাতের উল্টোপিঠ শুঁকে দেখলেন; না কোনো গন্ধ নেই। আতর কেউ দিলে তো ওখানেই লাগিয়ে প্রথমে পরখ করেন! শুধু পাঞ্জাবিতে মোটা আরবি গন্ধ আছে। কিন্তু হাত সরিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরতেই আবার সেই পাতলা জেসমিন ফুলের মতো গন্ধ।

মুর্শেদ সাহেবের মনে কু ডাকতে লাগে। বড়দের কাছে শুনেছেন কাছে পিঠে মারা যাওয়া কারো আত্মা থাকলে নাকে মিষ্টি গন্ধ আসে। মুর্শেদ সাহেব জোরে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেন। আর বিড়বিড় করে সুরা পড়তে থাকেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এমনি এক পরিষ্কার রাতেই মুর্শেদ সাহেবের দিদি মারা গেছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই অস্বাভাবিক সব কথা বার্তা বলতেন। মারাও যান অস্বাভাবিক ভাবে। মুর্শেদ সাহেবের দিদির নাম ছিল মাকসুদা বিবি। মরার আগে কয়েকদিন ধরেই তিনি নাকে নানান সুবাস পেতেন। বাইরে একা বেরোলেই নানান আওয়াজ কানে আসতো। সেদিন রাতেও আকাশ ছিল এমনি পরিষ্কার। পরিষ্কার আকাশে মাঝরাতে জিনেরা চলাফেরা করে। গরমে সেদিন ঘুম আসছিল না। নাকে একটা মিষ্টি গন্ধ এসে লাগছিল। ঐ গরমেও গন্ধটা কেমন শান্তি দিচ্ছিল – পাতলা ফিনফিনে গন্ধে মনটা আরাম পায়। তারপর কী মনে হতে দাওয়া থেকে উঠোনে নেমে আসেন। মনে হচ্ছিল, সামনের তেঁতুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কেউ ডাকছে। মাকসুদা বিবির চোখ যায় তেঁতুল গাছের মাথায়। তখন গাছের মাথার উপর চাঁদ। পরিষ্কার চাঁদের তলায় গাছের মাথার উপর যেন সাদা একটা কী ভেসে ভেসে চলে গেল – জিনের ভেলা।

সকালে মাকসুদা বিবিকে পাওয়া যায় উঠোনে। মুখে গ্যাজলা। মুখ গুঁজে পড়ে। মরে কাঠ হয়ে গেছে।
কথাগুলো মনে পড়তেই মুর্শেদ সাহেবের কান খাড়া হয়ে ওঠে। মাথা নিচু করে রাস্তার দিকে প্রাণপণে তাকিয়ে সাইকেল চালাচ্ছেন। গন্ধটা এখনো যায়নি – লেগেই আছে নাকে। গোরা মাঠের শেষে গ্রামের শুরুতেই বিশাল বড়ো গোরস্থান। গোরস্থানের পাশ দিয়েই রাস্তা গ্রামে ঢুকেছে। গোরস্থানের লম্বা লম্বা খেজুরগাছগুলো দেখা যাচ্ছে এখান থেকে। পুরোনো কবরের উপর শেওড়া, গাবজড়া ইত্যাদি গাছ জড়াজড়ি করে জন্মেছে। ঝুল কালো অন্ধকারকে ওরাই ধরে রেখেছে।

গোরস্থানের কাছে এসে সাইকেল থেকে নেমে পা টিপে টিপে চলতে লাগেন মুর্শেদ সাহেব। তিনি কোনোদিন গোরস্থানের পাশ দিয়ে রাতে আওয়াজ করে যান না। গোরস্থানের আত্মারা রাতে জাগ্রত থাকে – ব্যাঘাত হতে পারে ওদের। মৌলভী মানুষের সম্মান প্রদর্শন বটে। মুর্শেদ সাহেব হেঁটে প্রায় গোরস্থানের মাঝামাঝি। কানে এলো মেয়েলি কণ্ঠের আর্ত চিৎকার। সঙ্গে ফোঁপা গোঙানি। চমকে পাশে তাকিয়ে মুর্শেদ সাহেব দেখেন – কাঁচা কবর। আজ সন্ধ্যেতেই কবর দেওয়া হয়েছে বোধহয়। মুর্শেদ সাহেব আবার সুরা পড়তে থাকেন। এখন নাকে পাতলা আতরের গন্ধ আরো বেশি করে এসে লাগছে। সার সার কবরের সামনে একা মুর্শেদ মৌলভী দাঁড়িয়ে। চোখ কবরটার দিকে। শুয়ে থাকা মানুষের বুক যেমন উঠে পড়ে, কাঁচা কবরটাও ঠিক তেমনি উঠছে পড়ছে। সঙ্গে জোরে জোরে মুগুর মারার মতো আওয়াজ। মুর্শেদ সাহেবের পা আলগা হয়ে আসে। ছোটারও ক্ষমতা নেই আর। কবরের ভাঙা বাঁশগুলো খোঁচা খোঁচা হয়ে এদিক ওদিক আধবোজা কবরগুলোতে গেঁথে রয়েছে। কিন্তু নতুন কাঁচা কবরটার উপর আঁচড়ের দাগ। চাঁদের আলোয় পরিষ্কার কবরখানা ধুকপুক ধুকপুক করছে। কবরখানার মাটির ভেতর থেকেই গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে আসছে স্পষ্ট। মুর্শেদ সাহেব গলার তাবিজ চেপে ধরে আরো জোরে জোরে সুরা পড়তে পড়তে গ্রামের দিকে এগোতে থাকেন।

হঠাৎ চিল চিৎকারে কবর ফুঁড়ে যেন বেরিয়ে এলো একখানা হাত। ইশারায় ডাকতে থাকে মুর্শেদ সাহেবকে।

মুর্শেদ সাহেব পড়িমড়ি করে ছুট লাগান চোখ বন্ধ করে। বেশিদূর যেতে পারেননি। গোরস্থান শেষেই রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েন মুর্শেদ মৌলভী।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত