নিঃসঙ্গ মা

নিঃসঙ্গ মা

নাজমা বেগমের চার বছরের ছেলেকে রেখে এক দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করে নাজমা বেগমের স্বামী। অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে নাজমা বেগম। তার স্বামী জমি জমাও তেমন রেখে যায়নি, যা দিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে পারে নাজমা। ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বামীর ভিটা ছেড়েও যেতে সাহস হয় না তার। বাড়ি ছেড়ে গেলে হয়তো দেবর আর ভাসুর ভিটা মাটি থেকে বেদখল দিবে। কিন্তু এখানে থেকেই বা সে কী করে ছেলেকে মানুষ করবে? চিন্তায় নাজমার ঘুম আসে না। গভীর রাতে ছেলে যখন ঘুমায়, নাজমা তখন একা একা দূর আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলে। কখনো কখনো ছেলে শাওনের মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে, সে দেখে তার মা জানালার কাছে বসে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ন মনে কাঁদছে। একদিন শাওন রাতে আবারও মাকে কাঁদতে দেখে পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। সন্তানের হঠাৎ স্পর্শ পেয়ে মা কেঁপে উঠলে। শাওনের থেকে নিজের চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করলো সে। নাজমা চায় না তার ছেলে তার চোখের পানি দেখে ফেলুক। অবুঝ ছেলের কোমল মনে কোন কারণে দুঃখের আস্তর জমা হোক সেটা নাজমা চায় না। নাজমা চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করে সফল হলো না। শাওন বিষণ্ণ মনে বলে উঠল,

-মা, তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কেন?
নাজমা থতমত খেয়ে যায় ছেলের এমন প্রশ্নে। অপ্রস্তুত অবস্থাতেই উত্তর দেয়,
-আকাশে তোর বাবা থাকে তো তাই।
-মা, বাবা আকাশে উঠল কী করে? আকাশ তো অনেক উঁচুতে।

শত ব্যথার মাঝেও ছেলের মিষ্টি মুখের কথাতে অল্প হাসির রেখা ফুঁটে উঠে নাজমার মুখে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মাথায় চুমু খেতে খেতে বলে

-বড় মানুষরা আকাশে যেতে পারে।
-মা, তাহলে বাবার মতো বড় হয়ে আমিও আকাশে যাব।
মুহূর্তেই ধক্ করে উঠে নাজমার বুকের ভিতর। একটা বাজপাখি ঝড়ের ন্যায় ডানা ঝাপটায় তার বুকে। অজানা এক ভয় আর শঙ্কায় কেঁপে উঠে তার বুক। ছেলের মুখ চেপে ধরে সে হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে বলে,
-না বাবা। এমন কথা কখনো বলবি না তুই। তুই আমার সাত রাজার ধন। আমার মাথায় যত চুল, আল্লাহ যেন তোকে তার সমান আয়ু দেয়। শাওনকে তার মা বুকের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরে আছে। শাওন তার মায়ের বুকের ধক্ ধক্ শব্দের হার্টবিট শুনতে পায়। খুব দ্রুত উঠানামা করছে সেই হার্টবিট।

কাপড় সেলাই করে
বাকী জীবনটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয় নাজমা। কিন্তু একা একটা আঠাশ বছরের মহিলার স্বামী মারা গেলে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও যে আরও অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়, সেটা নাজমার অজানা ছিল। চারপাশের মানুষজনের ঘৃন্য নজর পরে তার উপর। অনেকদিন সে এসব কঠোর হস্তে মোকাবেলা করে চলে। এর মাঝে অনেকে নাজমাকে বিয়েও করতে চায়। ছেলের অমঙ্গল অনাদরের কথা ভেবে নাজমা বিয়ে করতে রাজী হয় না।
যেদিন নিজের আপন ভাসুরের কুপ্রস্তাব পেয়ে বসে নাজমা, সেদিন সে বুঝে যায় যে, স্বামীর বাড়িতে সে আর থাকতে পারবে না। কারণ রক্ষক যদি ভক্ষক হয়ে যায় তবে আর কিছু করার থাকে না। নিরুপায় নাজমা শাওনকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসে। ভাইয়ের সংসারে ভাই-ভাবীর মাথার বোঝা হয়ে যায় নাজমা আর তার ছেলে। নাজমা অবশ্য ভাইয়ের বোঝা কিছুটা লাঘব করতে সেলাই মেশিনের কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও ঘরের একটা রুম যে নাজমা আর তার ছেলে দখল করে আছে, সেটা নাজমার ভাবীর চোখে ভালো ঠেকে না। তার ভাই তাকে ভালোভাবে রাখতে চাইলেও স্ত্রী’র চোখ রাঙানি উপেক্ষা করার ক্ষমতা নাজমার ভাই জহির মুন্সীর নেই।

বাবার বাড়িতে আসার মাস তিনেক পর হঠাৎ করেই নাজমার জন্য একটা ভালো প্রস্তাব আসলো। নাজমা হাইস্কুলে পড়ার সময় তাকে পছন্দ করতো ছেলেটা। নাম জামান। জামান বিয়ে করতে চেয়েছিল নাজমাকে, কিন্তু সে তখন বেকার থাকায় জহির মুন্সী বোনকে জামানের কাছে বিয়ে দেয়নি। জামান আট বছর সৌদিআরব থেকে এসেছে। সে এখন বিরাট পয়সাওয়ালা। দেশে এসে নাজমার এই করুণ অবস্থার কথা শুনে সে নাজমাকে বিয়ে করতে চায়। নাজমা ছেলের কথা ভেবে বিয়েতে অসম্মতি জানায়। জহির মুন্সী আর তার বউয়ের অবাক হওয়ার সীমা রইল না। দুজনেই কয়দিন খুব করে বুঝালো নাজমাকে। এমন ছেলে এখন আর সে পাবে না, জামানকে বিয়ে করলে শাওনের ভাগ্য খুলে যাবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পর্কে ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল নাজমা। সে জানে, জামানকে বিয়ে করলে তার জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে, কিন্তু শাওনকে সে নিজের কাছে রাখতে পারবে না। মামীর অনাদর অবহেলায় বড় হবে শাওন। জামান নাজমাকে বিয়ে করবে ঠিকই কিন্তু শাওনকে নিজের বাড়িতে রাখবে না, সেটা সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

নাজমা অনেক ভাবে জামানকে নিয়ে। কিন্তু তার সচেতন মন, বিবেক তাকে নিজের সুখের কাছে ছেলের সুখ বিক্রি করতে বাঁধা দেয়। ছেলের কান্নাভরা অসহায় মুখ তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠে। নাহ, সে পারে না। সাফ জানিয়ে দেয় তার ভাইকে, যদি তার ছেলেসহ কেউ তাকে মেনে নেয়, তবেই সে বিয়ে করবে। তার ভাবী বিরক্ত হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে। নাজমা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। ভাবীর কটু কথা শুনেই ভাইয়ের বাড়িতে পড়ে থাকে। সেলাইয়ের টাকা ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়েও ভাবীকে খুশি করতে পারে না সে। একদিন হঠাৎ জহির মুন্সী একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে বোনের কাছে। পাত্র একটু বয়স্ক, ক্যান্সারে স্ত্রী মারা গেছে। শাওনকে সহ মেনে নিবে বলেছে লোকটি। নাজমার মুখে হাসি ফোটে। ছেলেকে এক মুহূর্ত না দেখলে নাজমার অস্বস্থি লাগে। ছেলেকে বুকে না জড়িয়ে শুতে গেলে ঘুম আসে না তার। সেই ছেলেকে ছাড়া থাকার কথা নাজমা কল্পনাও করতে পারে না। ছেলেকে সাথে রাখতে পারবে ভেবে রাজী হয় নাজমা।

নাজমার বিয়ের দিন একটা অদ্ভূত ব্যাপার ঘটে গেল। বরযাত্রী আসার পর কেউ একজন নাজমার কানে কানে বলে গেল, বর বলেছে ছেলেকে আজ নিবে না সাথে। তিনদিন পর যখন ফিরানিতে আসবে নাজমা, তখন শাওনকে নিয়ে যাওয়া হবে। এ কথা শুনে নাজমা যারপর নাই অবাক হলো। বেঁকে বসলো সে। কিছুতেই কবুল বললো না। সে ছেলেকে জড়িয়ে ঠায় বসে রইলো। জহির মুন্সীকে অপমানিত হতে হলো সকলের কাছে। এমন ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে কত বড় কান্ড ঘটে গেলো। নাজমাকে বিয়ে করতে আসা লোকটাও একরোখা। কিছুতেই আজ শাওনকে সাথে নিবে না সে। বিয়ে ভেঙে গেলো।

এই ঘটনার পর নাজমার জীবনে নেমে এল ভয়ংকর তাণ্ডব। তার জিনিসপত্র বাহিরে ছুড়ে ফেলে দিল তার ভাই। ভাবীর মুখে তৃপ্তির হাসি। নাজমা তার বাবা-মায়ের কবরে গিয়ে কবর জিয়ারত করে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে ছেলেকে নিয়ে চলে গেল ঢাকা শহর। গার্মেন্টসে চাকুরি করে সে জীবিকা নির্বাহ করে। ছেলেকে ভালো স্কুলে ভর্তি করে দেয়। ছেলেকে বড় সাহেবদের সন্তানের সাথে পাল্লা দিয়ে চলাতে গিয়ে নিজে এক জোড়া জুতা বারবার মুচির কাছ থেকে মেরামত করে পরিধান করে। ছেঁড়া জামায় তালি দিয়ে পরে। তবুও সে এখন নিজেকে সুখী মনে করে। বিকেলে ডিউটি শেষে যখন সে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে যায়, তখন ধনীর ছেলেদের ভিড়ে নিজের ছেলেকে একই ইউনিফর্মে দৌড়ে স্কুলের গেট দিয়ে বের হতে দেখে বুকটা ভরে উঠে তার। কে বলবে তখন যে, শাওন বাবা ছাড়া এক অসহায় মায়ের সন্তান! শাওনকেও তখন বড়লোকের সন্তানের মতো লাগে। দিনশেষে রাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়ে নাজমা। সে বুকভরে ছেলের শরীরের গন্ধ নেয়। ছেলের কপালে চুমু দেয়। ছেলেও পরম মমতায় মায়ের আদর খায়। ছেলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে

-মা, এত আদর করো কেন আমায়?
-তুই আমার বাবা যে, তাই। তোর গায়ের গন্ধ আমার কাছে সুধা যে তাই।
ছেলে কিছু বুঝে কি না কে জানে? মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে সে।

নাজমা শরীরের রক্ত পানি করে ছেলেকে বড় করে। বি এ পাশ করায়। ছেলে পুলিশের এস আই পোস্টে জয়েন করে।এত বছর বুকে আগলে রাখা ছেলে মায়ের কাছে হুট করেই একদিন বলে বসে যে, সে একটা মেয়েকে ভালোবাসে। বিয়ে করবে তাকে। মা ছেলের সুখের কথা ভেবে আপত্তি করে না। ঘরে ছেলের বউ আসে। শাওনের পোস্টিং রাজশাহী। বউ নিয়ে সে চলে যায়। মা পরে থাকে বিশাল ঢাকা শহরের অনেক বড় একটা ফ্ল্যাটে। ছেলে তাকে বারো হাজার টাকা ভাড়ায় এই ফ্ল্যাটটাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে গেছে। বউ নিয়ে সে সরকারি কোয়ার্টারে থাকে। ছেলে যেদিন বউ সহ চলে যাচ্ছিলো, নাজমার কলিজাটা ফেঁটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। চিৎকার করে কেঁদেছিল নাজমা। সে বার বার বলেছিল, তাকে যেন সাথে নিয়ে যায়। সে একা থাকতে পারবে না। ছেলের বউ তাকে বুঝিয়ে বলে,
-মা, বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকবে এটাই তো নিয়ম। সরকারি বাসায় কাউকে কখনো শুনেছেন মা নিয়ে থাকতে? ওখানে স্বামী কেবল তার বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে। শাওন বউয়ের কথার কোন প্রতিবাদ করলো না। নির্বিকার হয়ে গেল নাজমা। প্রথম প্রথম খুব ঘনঘন ঢাকা টু রাজশাহীর বাসে করে ছেলের কাছে চলে যেত নাজমা। কিন্তু ছেলে যেদিন বলে বসলো

-মা, পাঁচদিন গেল, এসেছ। এবার চলে যাও। তুমি এখানে আসলে তোমার বউমা ঝগড়া করে আমার সাথে। মা হয়ে ছেলের সংসারে অশান্তি চাও তুমি? তোমাকে আমি কী না দিয়েছি? রানীর হালে রেখেছি তোমায়। তবুও কেন কয়দিন পরপর এখানে চলে আসো? নাজমা বেগম উত্তরে বলেছিল

-তোর গায়ের সুধামাখা ঘ্রাণ নিতে আসি বাবা। ঐ ঘ্রাণ একটানা কিছুদিন না নিলে আমার কেমন দমবন্ধ হয়ে আসে।
শাওন তখন মুখে আরও বিরক্তির রেখা টেনে বলেছিল

-এসব ন্যাকামি ভাল লাগে না। আমি বিকেলে ডিউটি থেকে এসে তোমায় ঢাকার গাড়িতে তুলে দিয়ে আসবো। ব্যাগ গুছিয়ে রেখো।

সেইবারের পর নাজমা আর মন চাইলেও ঘনঘন ছেলের বাসায় যায় না।

নাজমার এখন মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে। গায়ে ভালো কাপড়। ছেলের টাকায় আরামে চলে। কিন্তু এই আরাম এই সুখটাই যদি সে চাইতো, তবে তো সে কারও ঘরের ঘরণী হয়েই থাকতে পারতো। অনেক আগেই সে এই সুখটা পেত। রাতে ঘুমাতে গেলে নিঃস্ব নাজমার বুকের ভিতর কেমন যেন তরপায়। ছেলের মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। মনে হয় ছেলে তার চোখের সামনে তার পাশে শুয়ে আছে। ছেলে যেন তাকে প্রশ্ন করছে,

-মা, তুমি আমায় এত আদর কর কেন?

কিছুক্ষণ পরই নাজমার ভ্রম ভাঙে। সে বুঝে যে, শুধু এই ফ্ল্যাটটাতে না। পুরো পৃথিবীটাতে সে একা, বড্ড একা।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত