একটুকরা ভালোবাসা

একটুকরা ভালোবাসা

আজ আমাদের দশম বিবাহবার্ষিকী। দীর্ঘ সাত বছর থেকে যাওয়া আসার অভ্যাস থাকায় জায়গাটা আমার বেশ পরিচিত। প্রতিবারের মতো এবারো শাওনের কবরের ওপরে পলাশ ফুলগুলো রাখলাম। ফুল গুলোর রঙের তীব্রতার থেকে আমার মনের মেঘের ঘনত্ব বেশি। আমি জানি বৃষ্টি নামা খুব প্রয়োজন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে বৃষ্টি নামে নি। আর নামবেও না! আল্লাহ এতো কিছু সহ্য করার ক্ষমতা আমাকে কেন দিয়েছো? সব সহ্য ক্ষমতা এক নিমিষে তুলে নেও না কেন? আমি তো এভাবে বাঁচতে চাই নি..!!

পাশের মানুষটার শুন্যতা আমাকে গুমরে গুমরে মারছে। বাড়িতে ফিরে এলাম ।শূন্য ঘরে এসে দেখি কি বিশাল শূন্যতার পাহাড়। এ শূন্যতা কি কোনোদিন শেষ হওয়ার!! সবার তো দিন ফুরোয়, আমার কি দিন ফুরোবে না।স্কুল দিনগুলোর কথা মনে পড়েছে।সেই যে আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানের দিন অরভিন গোলাপ দিয়ে আমাকে বললে
– ইরা তুই যখন কলেজ পাশ করবি তখন আমি তোকে বিয়ে করব!

আমি জানতাম শাওন আমাকে স্কুল লাইফ থেকে চায়।প্রচণ্ড রূপে চায়। আমিও মানুষটাকে সবকিছুর বিনিময়ে চেয়েছি, পেয়েছিও।কিন্তু আটকে রাখতে পারিনি। অন্যদের মতো আমার গল্পের ক্লাইম্যাক্সটাও এক ছিল।কোনো গল্পই হিরো হিরোইন দিয়ে চলেনা।একটা দুটো চরিত্র ক্লাইম্যাক্সটা বদলাতে আগমন করে।গল্পের মাঝে ভূল বুঝোবুঝি ,কান্না আবেগ আবার ভালোবাসার প্রমান দিতে এদের তুলনা নেই।ভালোবাসার ডেফিনিশনটা এদের কাছে আলাদা। এদের মধ্যে অনেকে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পাগলামি করে,আবার অনেকে ভালোবাসাকে সুখী রাখার জন্য সারাজীবন নিজের সাথে পাগলামি করে যায়। হ্যাঁ! এরা ভালোবাসতে জানে।কিছু ভালোবাসা না পাবার আশা নিয়েও বেঁচে থাকে।

আমার গল্পের সেই অনুর জন্যই আমরা এক হতে পারি।হয়ত এতকিছুর পরেও ভাগ্য আমরা এক হয় চাইনি। ভরাচোখ নিয়ে আমাদের বিয়ের দিনটার কথা মনে পড়ছে ! হলুদের ফাঁকে শাওন লুকিেয় ফোন দিলে মা ফোন ধরলে কি ভীষণ লজ্জায় যে পড়েছিলাম!! শাওনও হ্যাংলার মতো আমার জন্য রাখা কথাগুলো না বুঝে মাকে বলেছিল। কথাগুলো আমার আজও জানা হয়নি!! মনে পড়ছে বাসরঘরে দুইজন আসামির মতো মাথানিচু করে বসেছিলাম। স্কুল লাইফে আগে খাতা দেখানো নিয়ে যে মানুষটার সাথে প্রায় ঝগড়া হতো তার মুখ দেখে রোজ ঘুম থেকে উঠতে হবে জেনেও ঝগড়া আসছিল না!!

সেদিনের আমার সকল সাজ তার জন্যই ছিল। অথচ দুজনেই কেমন লজ্জায় মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। শাওনকে ছাড়া একটা মুহূর্ত বাঁচতে পারবো ভাবিনি। অথচ দীর্ঘ সাত বছর ধরে আমি বেঁচে আছি। বাস্তবতা হয়তো ইরাকে শাওন নামটা ভুলতে দেয়নি। কিন্তু সময়ের সাথে যোগ্য গৃহকর্মীর ভূমিকায় অভিনয় করার দারুন ক্ষমতা দিয়েছে।শাওনের মৃত্যুর পর থেকে শ্বশুর বাড়িতে আমার নতুন ভাবে আপ্যায়ন শুরু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ির এমন আপ্যায়ন প্রায় সব নারীয় পেয়ে থাকে। এর মধ্যে শাওনের মৃত্যুর সময় আমি দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা।ঠিক এক সময়ে আমার একমাত্র ননদ তারা কানসিভ করায় তাকে আমার শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এইসময় নাকি অন্তঃসত্ত্বা মাকে সম্পূর্ণ বেডরেস্টে থাকতে হয়। অথচ আমার বেলায় বিষয়টি ভিন্ন।

আমি বাবার বাড়িতে যাবার কথা বলাতে শ্বশুড় বাড়ির মানুষের আপত্তির শেষ ছিলনা।আমার শ্বাশুড়ি মা তো বলেই বসলেন;
_মহারাণীর কথায় মনে হচ্ছে আমরা তো আর মা হয়নি!আর এই অবস্থায় টুকটাক কাজ করলে শরীর ভালোই থাকে বাপু।
কি অদ্ভুত! যত নিয়ম আমার ক্ষেত্রে।কারন আমি উনার মেয়ে নয়।আর স্বামীহারা নারীর এতো শখ আহ্লাদ থাকতে নেই। মা- বাবা এসব শুনে আমাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে আমার ও আমার সন্তানের কথা ভেবে আমার দ্বিতীয় বারের মতো বিয়ে দিয়তে চান।কিন্তু আমি তাতে রাজি ছিলাম না।সমাজের মানুষের আমার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে থাকে।রাস্তাঘাটে যুবতী নারীর একা চলা আমাদের দেশে পাপ।ওপর থেকে আবার বিধবা। আমরা সমাজে নারীর অধিকার বলে হাজার স্লোগান করি না কেনো নারীর অবস্থা কিন্ত বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।কারন আমরা নারীরা মানুষ নয়,আমরা মেয়ে মানুষ।

আমি আমার সন্তানের কথা ভেবে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিই।যাকে সময় দেবো বলে যোগ্যতা থেকেও উঠে দাড়ায় নি অাজ যখন সে নেই তখন সময়টা রাখা বড় বেমানান। দরজার খোলার শব্দে আমার খেয়াল ভাঙলো। হ্যাঁ অনু এসেছে।
– ইরা তুইএসময়ে শুয়ে আছিস ? শরীর খারাপ করছে নাকি?
– আমি একদম ঠিক আছি। তুমি ফ্রেশ হয় আসো আামি খাবার বাড়ছি।
অনু শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলছে
– ইরা গত সাত বছর ধরে তুই আমার প্রতি, পূর্নতার প্রতি সব দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি রাখিস নি। আর রাখবিও না।কিন্তু নিজের প্রতিও কিছু দায়িত্ব থাকে।তুই বরং কিছুদিন বাইরে থেকে ঘুরে আয়।
– কে বলেছে আমার মন ভালো নেই।
– দেখ এই সময়টা তোকে আটকে রাখার ক্ষমতা আমার নেই।তুই বাইরে গেলে তুই যে ভালো থাকবি সেটা তুই ভালো মতো জানিস।মানুষটা আমাকে বোঝে প্রচুর।আমি জানি অনু সাধ্য মতো ভালোবাসে।যতদুর ভালোবাসলে একটা মানুষ সমাজ নিয়ম সবকিছুর বাইরে গিয়ে ইরাদের স্ত্রী রূপে গ্রহন করতে পারে ততটা।
-ইরা দু মিনিটের মধ্যে যদি খাবার না পাই তাহলে পেট ফুটো হয়ে মারা যাবো।
-মা আমারো সেম কন্ডিশন।বাবার তো পেট ফুটো হবে বলছে।আমি তো সেই জায়গায় অনেক ছোট।
-হয়েছে তোমাদের বাবা মেয়ের! তাহলে এবার খেতে বসে পড়ো।
খাওয়া দাওয়া শেষে নিয়মমাফিক পূর্নতাকে ঘুম পাড়িয়ে ভাবছি একটু বেলকোনিতে বসবো। আজ সময়টা একটু অন্যভাবে কাটাবো।

প্রতিবছর এইদিন আমার শাওনের সাথে থাকার পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করতে কেটে যায়।সময় ব্যাপক ভাবে বদলাচ্ছে ।আমি নিজের চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছে হিসেবের নেশায় নিজেকে ঠিক সাত বছরের আগের ইরা বানিয়ে রেখেছি।পাশের সাত বছরের ছায়াসঙ্গীকেও বাধ্য করেছি।সারাদিনে আমার অফুরন্ত সময়। যদিও সেই সময়ের একটুকুও অনু নিজের বলে দাবি করেনা।যেন মেরুদন্ড যুক্ত নির্জীব মানুষ। সবকিছু নতুনভাবে শুরু করবো ভাবি।হয়ে ওঠেনা।বাস্তব অনেকটা আলাদা।
-ইরা কাল থেকে তোর সামার ভ্যাকেশন শুরু।মাত্র কয়েকদিন ছুটি।তুই বরং কোথাও থেকে ঘুরে আয়।
কি আজব! মানুষটা জানে দীর্ঘ সাত বছর থেকে আমার আড়াল হওয়ার কারন।অনুর কি মনে হয়না সেও আমার সাথে যাবে।পৃথিবীতে এমন মানুষও হয়?
– আচ্ছা অনু তোমার কখনো মনে হয়না তোমারও আমার সাথে যাওয়া উচিত?
মানুষটা বড্ড আজব। সবকিছু কেমন যেন আড়াল করে রাখে।ওকেও তো আমার বোঝা উচিত!
-এইযে ম্যাড্যাম ইরা, আমার যাওয়ার কথা না ভেবে বরং প্যাকিং করে নিন। অবশ্য এবার পূর্নতাও বলছিল বাইরে যেতে চায়।
– কাল সন্ধ্যের ট্রেনে তাহলে বেরিয়ে পড়বো।আচ্ছা অনু এবার বরং তুমিও চলো আমাদের সাথে?
অনু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।হে আাল্লাহ আমি কিছু ভুল বলে ফেললাম নাতো?অনুর চোখ ইতিমধ্যে ছলছল করা শুরু করেছে।এই বুঝি বৃষ্টি নামল! কি আজব! মানুষটা কাদঁতেও জানে।অথচ সাত বছর সংসারে থেকেও আমি বুঝতে পারিনি।দায়িত্ব পালনের নেশায় আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলি।কিছু চরিত্র নিজের অজান্তে নিজের হয়ে অভিনয় করে।
-ইরা, ,,,,,,,,

অসমাপ্ত ডাক দিয়ে অনু ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।অনু কি আজ কাঁদবে?আমার ছোট্ট একটা বলা কথাও যে কাউকে কাঁদাতে পারে জানতাম নাতো।অনুর ভালোবাসার কোনো মূল্য আমি দিতে পারিনি।অবশ্য ও তো আমাকে কোনো মূল্য ছাড়া ভালোবাসে।একি দোটানায় পড়ে গেলাম।একদিকে শাওনের ভালোবাসার স্মৃতি আমায় গুমরে গুমরে মারছে, অন্যদিকে আমি নিজে খুন করে চলেছি অনুর ভালোবাসাকে।যে মানুষটা সাতটা বছর আমার জন্য কাটিয়ে দিতে পারলো, তার ভালোমন্দ বিচার নিশ্চয় আমার জন্য অকর্তব্য নয়।আমি ধিরে ধিরে অনুর বেডে বসলাম।অথচ দীর্ঘ সাত বছর ধরে নিজ আগ্রহে আমি এঘরে আসিনি।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অনু ঘুমানোর চেষ্টা করছে।মেয়েরা সচারচর অনেক বেশি কষ্ট চাপা দিতে নিজেকে শান্তনা দেয়, আর ছেলেরা ঘুমিয়ে চোখের জল আড়াল করে। পূরুষ মানুষের জীবনের এরকম অনেক কষ্ট লুকানোই থাকে যা বুঝতে না পারায় অনেক নারীকে স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করে যেতে হয়।পুরুষ মানুষের কষ্ট প্রকাশে কি অনেক বিধিনিষেধ।
-অনু, পূর্নতা কিন্তু রাগ করেছে তোমার ওপর
-একি।কেনো?
-তোমার মেয়ে তুমি জেনে নাও
-বল না প্লিজ
-তুমি ঘুরতে যেতে চাইছো না তোমাকে আর কি বলবো।
-অনু ,তুমি গেলে আমারও ভালো লাগবে।

পৃথিবীতে সব মানুষের ভেতর একটা অবাক করা গুন থাকে।এই এক মানুষের ভেতর আর কত গুন দেখবো।এতকিছু বললাম কোনো উত্তর দিচ্ছে না।কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
-ইরা তুই ,,,,
-কথা না বাড়িয়ে ব্যাগ গোছাও
-মানে
-এ কোন ঘরে এসে পড়েছি আমি!!! উঠতেও মানে বসতেও মানে!!
-সাতবছর পর এটা মনে হলো
-হুম।
-কি হুম!!!
-এক মিনিটের মধ্যে ব্যাগ গোছানো শুরু না করলে,,,,

অবশেষে আমরা তিনজন গন্তব্যর উদ্দেশ্যে বের হয়েছি।ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে দু এক পা করে ইরা অনুর সম্পর্ক এগোচ্ছে। জানালার ধারে বসাতে আলোর বেশ অভাব বোধ হচ্ছে না।বাতাসে আমার চুল উড়ে যাচ্ছে, অনুর মুখে হালকা হাসি।আমি অবিরাম অনুর সামনে হেসে চলেছি।অনু পূর্নতাকে কোলে নিয়ে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।কেনো জানিনা অনুকে জড়িয়ে ধরে জন্মের কান্না কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।কান্নাতে চোখ ,মুখ ,জিহ্বা বের হয়ে আসার উপক্রম। ভরা কামরাতে কাঁদলে মানুষ কি বলবে।অনু একচোখে তাকিয়ে থাকা বন্ধ করছে না। ট্রেনের একঘেয়েমি শব্দ, অনুর তাকানো আমাকে কাঁদিয়ে ফেলে ছাড়বে।আমি সত্যিই জানিনা কেনো কাঁদছি। জন্মের কান্না আসছে চোখে। এ কান্না কি আদৌ থামার।কান্নারা জন্ম নিয়ন্ত্রন জানলে ভালো হতো।
-এই ইরা কি হলো তোর?কাঁদছিস কেনো!!!
-কই কাঁদছি নাতো!!

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত