অলস মাছের গল্প

অলস মাছের গল্প

আজকের কাজ কালকের জন্য কখনও ফেলে রাখতে হয় না।
তাহলে কী হয়?
পিছিয়ে পড়তে হয়। এ জন্যই তো পইপই করে বলি, দিনের কাজ দিনে শেষ করো।

দাদু, তুমিও এখন বই নিয়ে বসতে বলছো!
অতনু বলতে বলতে আদরের ভঙ্গিতে দাদুর কোলের ওপর উঠে বসে। দাদু অতনুকে কোলে টেনে নেন। তারপর নরম গলায় বলেন, এখন তুমি যদি কালকের স্কুলের পড়া না পড়ো তাহলে কী হবে জানো?

কী হবে?

ওই মাছটার মতো তোমাকেও পস্তাতে হবে।

কোন মাছ?

অতনু দাদুর কোলে বোয়াল মাছের মতো নড়ে ওঠে। দাদু তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, সে আরেক গল্প, তোমাকে পরে একদিন শোনাব।

গল্পের কথা শুনে অতনু অস্থির হয়ে ওঠে। দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, দাদু প্লিজ, গল্পটা বল না।

তাহলে পড়তে বসো।

কথাটা যেন অতনু শুনতেই পায়নি। সে এক নাগারে বলে যেতেই থাকে।
দাদু প্লিজ।
দাদু প্লিজ।
দাদু প্লিজ।

দাদুও কম চালাক নন। তিনি দু’পাশে মাথা নাড়েন চাবি দেওয়া পুতুলের মতো।
নো।
নো।
নো।

আচ্ছা ঠিক আছে। অতনু বলে, আগে গল্পটা বলো। তারপর পড়তে বসব।
দাদু এবার একটু নরম হন।
সত্যি বলছো তো!
সত্যি, সত্যি। তুমি বলো না মাছের গল্পটা।
অতনু অধৈর্য হয়ে গেলে তখন বাধ্য হয়েই দাদু গল্পটা বলতে শুরু করেন।

অনেকদিন আগের কথা।
কোনো এক দেশের ইয়া বড় এক পুকুরে অনেক মাছ একসঙ্গে মিলেমিশে থাকত। এর মধ্যে তিনটা মাছের ছিল দারুণ দোস্তী। তারা বিপদে-আপদে সব সময় একে অপরের পাশে থাকত। একদিন হলো কী?

কী হলো?

আরে! সে কথাই তো বলছি। দাদু অতনুকে থামিয়ে বলতে শুরু করলেন, মাছেদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তারা নিজেরা সে ভাষা বুঝতে পারে। মাছ ছাড়া সেই ভাষা আর কেউ বুঝতে পারে না। যেহেতু তারা কথা বলতে পারে ফলে তাদের একটা করে নামও ছিল। নাম ধরে তারা এক অপরকে ডাকতো। যেমন এই তিন মাছের একটির নাম ছিল জ্ঞানেশ্বর, আরেকটির নাম বুদ্ধিশ্বর, অন্যটি দীর্ঘশ্বর।

জ্ঞানেশ্বর বেজায় জ্ঞানী। সে আজকের কাজ কখনও কালকের জন্য ফেলে রাখত না। সে ছিল খুব সতর্ক। বিপদের আগেই উদ্ধারের উপায় ভেবে রাখত। প্রতিটা কাজ করার আগে শতবার ভাবত। আর এ কারণেই বিপদে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারত। বুদ্ধিশ্বরের ছিল বেজায় বুদ্ধি। বিপদে পড়লে উপস্থিত বুদ্ধিতে সে ঠিকই একটা উপায় বের করে ফেলত। অন্য মাছেরা তাকে বুদ্ধিতে হারাতে পারত না। এ নিয়ে তার অবশ্য একটু গর্ব ছিল। কিন্তু জ্ঞানেশ্বরের কথা হলো, কখনও নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে নেই। কিন্তু বুদ্ধিশ্বর সে কথা শুনত না। ঠিক তোমার মতো।

দাদু অতনুর গাল টিপে বললেন, এই তুমি যেমন এখন আমার কথা শুনছো না!
শুনছি তো, অতনু প্রতিবাদ করে বলে।
তাহলে পড়তে বসলে না কেন?

গল্পটা শুনেই পড়তে বসব।
ঠিক আছে, মনে থাকে যেন। দাদু পুনরায় গল্প বলতে শুরু করেন।

দীর্ঘশ্বর ছিল ঠিক তার উল্টো। তার আঠারো মাসে বছর। আজ করি, কাল করব- এই করে সে সব কাজ ফেলে রাখত। এ কারণে পরে দেখা যেত কোনো কাজই তার সময় মতো শেষ হতো না। অন্য মাছেরা তাকে খ্যাপাত ‘কচ্ছপ’ বলে!

কচ্ছপ কেন?
বারে! কচ্ছপও তো অলসতার কারণে কোনো কাজ সময় মতো শেষ করতে পারে না।
অ। তারপর কী হলো?

একদিন সত্যি সত্যি তাদের খুব বিপদ হলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখতে পেল জেলে পাড়া থেকে একদল জেলে এসেছে পুকুর সেচতে। বিপদ বুঝতে পেরে জ্ঞানেশ্বর বুদ্ধিশ্বর আর দীর্ঘশ্বরকে ডেকে বলল, ভাই চলো, সময় থাকতে আমরা এখান থেকে পালাই।

বুদ্ধিশ্বরের কথা শুনে দীর্ঘশ্বর খুব অবাক হলো, বলে কী! এত সুন্দর পুকুর ছেড়ে কেউ কোথাও যায় নাকি? আর যাবেই বা কেন?

জ্ঞানেশ্বর বলল, দেখছ না, জেলেরা জল সেচতে শুরু করেছে। জল সেচা শেষ হলেই আমাদের ধরবে। তারপর বাজারে নিয়ে গিয়ে আমাদের বিক্রি করবে। তখন জীবনের আর আশা থাকবে না।

কথা শুনে দীর্ঘশ্বর হাই তুলতে লাগল। দশটা না বাজলে তার ঘুমই ভাঙে না। কাঁচা ঘুম থেকে জ্ঞানেশ্বর তাকে ডেকে তুলেছে। চোখে তার এখনও ঘুম লেগে আছে। সে হাই তুলে বলল, কেন মিছেমিছি দুশ্চিন্তা করছো? জেলেরা তো অন্য কারণেও জল সেচতে পারে। তাছাড়া এই জল সেচতে আরো দুদিন লেগে যাবে। সুতরাং দেখাই যাক কী হয়!

এ কথা বলে দীর্ঘশ্বর হাই তুলতে তুলতে আবার ঘুমিয়ে গেল। তার এমন গা-ছাড়া ভাব দেখে বুদ্ধিশ্বর একটু সাহস পেয়ে বলল, দীর্ঘশ্বর ঠিকই বলেছে। এখনই এত ভয় পাওয়ার দরকার কী? বিপদ যখন আসবে তখন দেখা যাবে। বুদ্ধি একটা আমি ঠিকই বের করে ফেলব।

জ্ঞানেশ্বর বুঝতে পারল, এরা কেউ তার কথার গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারপরও সে শেষবারের মতো বলল, এখনও সময় আছে। এখনও পালানোর একটা পথ আছে। জল সেচা হয়ে গেলে তখন সে পথেও আর পালানো যাবে না। তোমরা যেমন ভাবছো তখন কিন্তু তেমন সময় পাবে না আর!

এত করে বলার পরও যখন কেউ যেতে চাইল না তখন জ্ঞানেশ্বর পালানোর সেই পথ দিয়ে একাই অন্য একটি জলাশয়ে চলে গেল।

এদিকে জেলেরা এত দ্রুত জল সেচতে লাগল যে, বিকেলে মধ্যেই পুকুরের জল শুকিয়ে গেল।
এখন উপায়!

শুকনো পুকুরে বুদ্ধিশ্বর আর দীর্ঘশ্বর এখন পালাবে কোথায়? এ যাত্রা আর রক্ষা নেই বুঝতে পেরে দীর্ঘশ্বর কপাল চাপড়ে কাঁদতে শুরু করল। সেই কান্নার শব্দ শুনে জেলেরা এসে খপ করে দীর্ঘশ্বরকে ধরে ফেলল।

বুদ্ধিশ্বর কিন্তু এত সহজে হাল ছাড়ল না। সে ঠাণ্ডা মাথায় এই বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় খুঁজতে লাগল। ভাবতে ভাবতে একটা উপায় পেয়েও গেল সে। জেলেরা টপাটপ মাছ ধরছে। তারপর কলা গাছের বাকল ছিঁড়ে সেগুলো দিয়ে মাছগুলোর ফুলকার সঙ্গে বেঁধে রাখছে, যাতে পালাতে না পারে। বুদ্ধিশ্বর একটুও শব্দ করল না। সে ধরা পড়া মাছগুলোর মধ্যে ঢুকে শক্ত করে সেই কলা গাছের বাকলের আঁশ কামড়ে মরার মতো ঝুলে রইল। জেলেরা বুদ্ধিশ্বরের এই চালাকি ধরতেই পারল না। দেখে মনে হলো সেও বুঝি অন্য মাছগুলোর সঙ্গে দড়িতে বাঁধা আছে।

সন্ধ্যার একটু আগে জেলেদের মাছ ধরা শেষ হলো। সারাদিন মজা করে মনের মতো মাছ ধরতে পেরে জেলের দল খুব খুশি। কাদামাটি মাখা মাছগুলো ধুয়ে পরিস্কার করার জন্য তারা সেগুলোকে পাশের জলাশয়ে নিয়ে এলো।

জলাশয়টা বেশ বড়। পানিও ছিল অনেক। জ্ঞানেশ্বর এই জলাশয়ের কথাই ওদের বলেছিল। সেই পানিতে বেঁধে রাখা মাছ যখন জেলেরা ধুয়ে নিচ্ছিল, তখন সুযোগ পেয়ে বুদ্ধিশ্বর জলাশয়ের পানিতে দ্রুত সাঁতার দিয়ে মিলিয়ে গেল। এক ডুব সাঁতারে সে জলাশয়ের মাঝখানে চলে এলো।

জ্ঞানেশ্বর তাকে জীবিত দেখে খুব খুশি হলো। কিন্তু দীর্ঘসূত্র কোথায়?
প্রশ্ন করতেই বুদ্ধিশ্বর সব ঘটনা খুলে বলল।

শুনে জ্ঞানেশ্বরের খুব মন খারাপ হয়ে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এক বাঁচে সাবধান, আর বাঁচে বুদ্ধিমান। কিন্তু এ জগতে অসতর্ক, অলসদের বেঁচে থাকা খুব কঠিন।

এবার বলো, তুমি যদি এখন পড়তে না বসো তাহলে কাল স্কুলে দীর্ঘশ্বরের মতো তোমাকেও বিপদে পড়তে হবে। তুমি কি তাই চাও?

না দাদু। অতনু দাদুর কোল থেকে নেমে পাশে সোফার ওপর বসল।
তাহলে পড়তে বসো।

বসছি, বলেই অতনু বইয়ের ব্যাগ আনতে ওর রুমে গেল। যাওয়ার আগে বলল, দাদু, আমি আর কখনও আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখব না।
প্রমিজ?

প্রমিজ।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত