বাহন

বাহন

আমি জানতাম বাবার মধ্যে সমস্যা আছে।

মাকে বলেছিলাম। বলেছিলাম আশফাককেও। দুজনের একজনও আমার কথা শুনলো না।

আমার বয়স পাঁচ কি ছয় তখন। কে শুনবে আমার কথা?

আমার মা গৃহিনী আশফাক পড়ে ক্লাস ফাইভে। আমার কথা দুজনের একজনও কানে তুললো না।। তারপর এসেছিলো আমার সেই অভিশপ্ত ষষ্ঠ জন্মদিন।

অদ্ভুত ব্যাপার। ঐ বয়সের স্মৃতিগুলো সাধারণত ফিকে হয়ে আসে। অথচ আমার ক্ষেত্রে কাহিনী উল্টো। আমি শত চেষ্টাতেও ভুলতে পারি না।

আশফাক একদিন মাকে বলেছিল, “মা জানো আসাদ অন্ধকারেও দেখতে পারে।”

মা হাসলেন। বললেন, “ধুর বোকা। অন্ধকারে কেউ দেখতে পায় নাকি?”

-মা আসাদ পারে। তুমি দেখবা?

হিড়হিড় করে হাত ধরে আশফাক টেনে নিয়ে এল মাকে। আমাদের ঘরটা ছোট। আমি বিছানায় বসে বই পড়ছিলাম। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর টোনাটুনির গল্প। আশফাক দ্রুত ঘরের পর্দাগুলো নামিয়ে যতটা সম্ভব ঘর অন্ধকার করে ফেলার চেষ্টা করলো। আমি তখনও পড়ছি। আধার আর আলোর মধ্যে খুব বেশী তফাৎ নেই আমার কাছে। আশফাক মাকে বললো, “এখন দেখ।”

মা আমাকে বললেন, “খোকন তুই দেখতে পাচ্ছিস?”

আমি হাসলাম, “পাবো না কেন?”

মা বললেন, “বলতো আমার শাড়ীর রঙ কি?”

আমি বললাম, “সবুজ। পাড়টা সোনালী। ফুলটুল আকা আছে। ফুলগুলোও সোনালী।”

মা অবাক হয়ে গেলেন। “খোকন বইটা একটু পড়তো শুনি।”

আমি পড়তে শুরু করলাম, “গৃহস্থের ঘরের পিছনে বেগুন গাছ আছে। সেই বেগুণ গাছের পাতা ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে টুনটুনি পাখিটি তার বাসা বেঁধেছে। বাসার ভিতর তিনটি ছোট্ট-ছোট্ট ছানা হয়েছে। খুব ছোট্ট ছানা, তারা উড়তে পারে না, চোখও মেলতে পারে না। খালি হাঁ করে আর চীঁ-চীঁ করে। গৃহস্থের বিড়ালটা ভারি দুষ্টু। সে খালি ভাবে ‘টুনটুনির ছানা খাব।’ একদিন সে বেগুন…………………।

মা চোখদুটো রসগোল্লার মত করে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।

আশফাক বললো, “থাক হয়েছে আর পড়া লাগবে না।”

আমি চুপ করলাম। মা বললেন, “ওকে মনে হয় ডাক্তারের কাছে নেওয়া দরকার। তোদের বাবা আসুক।”


সে রাতে বাবা ফিরে আসার পর মা খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকে ভাত বেড়ে দিলেন। বাবা ভাত খাওয়া শেষ করে সোফায় বসে টিভি দেখতে শুরু করলেন। মা থালাবাসন ধুয়ে বসলেন বাবার কাছে। আমি আর আশফাক ঘরে। মা বাবা কথা শুরু করলেন। আমি নিজের ঘরে বসে সবটাই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।

মা বাবাকে বলছেন, “খোকনকে তো একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার।”

-কেন ওর কি হয়েছে?

-চোখে সমস্যা?

-চোখে কি?

-ও অন্ধকারেও দেখতে পায়।

-মানে কি?

-হ্যাঁ সত্যি কথা। আমি আজই দেখেছি।

-ধুর এমনটা হয় নাকি? ছোট বাচ্চা ফাজলামি করেছে হয়তো।

ব্যাপারটা পাত্তা না দিলেও রাতে বাবা আসলেন আমার ঘরে। আমি আর আশফাক শুয়ে ছিলাম। আশফাক শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে যায়। আমার একটু দেরী হয়। বাবা আমার মাথার চুল হাত দিয়ে এলোমেলো করে দিতে দিতে বললেন, “কিরে খোকন? তুই নাকি বিড়াল হয়ে গেছিস?”

আমি ফিক করে হেসে ফেললাম, “যাও! কি যে বল!”

-তোর মা বলল। তুই নাকি অন্ধকারেও দেখতে পাস?

-হ্যাঁ পাই তো। তুমি দেখতে পাও না?”

-না। এটা সবাই পারে না। কেন, জানিস?

-কেন?

-কারণ তুই স্পেশাল।

-আমি স্পেশাল?

-হ্যাঁ

বাবা আমাকে একটা চকলেট দিলেন। আমার পছন্দের চকলেট। মিমি চকোলেট।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কাউকে বলিস না। কেমন? এটা কাউকে জানানোর দরকার নাই।”

আমি বাবাকে খুবই ভালবাসতাম। বললাম, “আচ্ছা বাবা।”

বাবা হাসলেন। আমি দেখলাম বাবার চোখ দুটো উল্লাসে জ্বলজ্বল করছে। বাবা বললেন, “ঘুমিয়ে পড়।”

চাদরটা আমার গলা পর্যন্ত টেনে দিলেন বাবা।


বাবা সরকারি চাকরি করতেন। ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তিনি। তার চাকরিসুত্রে আমরা থাকতাম সিলেট। সেখানেই একটা স্কুলে পড়তাম আমি। আমি আর আশফাক একই সাথে। আমি ক্লাস টুতে আর আশফাক ফাইভে। ক্লাসে আমার একটা মেয়ের সাথে খুব ভাব ছিল। মেয়েটার নাম ছিল প্রিয়া। প্রিয়া ছাড়া অন্যদের সাথে তেমন মিশতাম না আমি। আমাদের সাথে আরো একটা ছেলে পড়তো। অভি নামের। গাট্টাগোট্টা, বেশ লম্বা ছেলেটা বেশ দাপটের সাথেই থাকতো আমাদের ক্লাসে। তার কথা না মানলে অন্যান্য ছেলেদের কপালে ভালোই প্যাদানী জুটতো। তার খুব ইচ্ছে ছিল প্রিয়ার সাথে ভাব জমানোর। প্রায়ই আসতো প্রিয়ার সাথে কথা বলতে। অজানা এক কারণে প্রিয়া দুচোখে দেখতে পারতো না তাকে। প্রিয়ার সাথে টেবিল শেয়ার করে বসার কারণে আমার ওপর অনেক রাগ ছিল তার।

সেদিন ক্লাস শেষে আমি আর প্রিয়া বের হচ্ছি এমন সময় পথ আঁটকে দাঁড়াল অভি। সাথে দুই চামচা। আমাদের ক্লাসেই পড়ে ওরা।

-প্রিয়া তোমার সাথে কথা আছে আমার।

-কি বলবা?

-এটা রাখ।

একটা চিঠি আর এক বাক্স চকোলেট বাড়িয়ে দিল প্রিয়ার দিকে। আমি বোকার মত বললাম, “এগুলো কি?”

-তোর সাথে কে কথা বলছে ইদুরের বাচ্চা? বাইরে যেয়ে দাঁড়া।

প্রিয়া অসহায় চোখে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, “চল প্রিয়া। যাই।”

অভির ঘুষিটা দড়াম করে আমার নাকে লাগলো। হুড়মুড় করে বেঞ্চের ওপর পড়লাম আমি। অভির দুই সাঙ্গোপাঙ্গো আমাকে টেনে তুলে দাঁড় করালো। অভি আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার উপর। প্রিয়া আমাকে বাঁচানোর জন্য অভির হাত কামড়ে ধরে ঝুলে পড়ল। অভি চটাশ করে চড় মারলো প্রিয়ার গালে। হইহল্লা শুনে দপ্তরী চাচা ছুটে এলেন। আমাদের ছাড়িয়ে নিয়ে গেলেন অফিস রুমে।

হেডমিস্ট্রেস ম্যাডাম আমাদের ফার্স্ট এইড দিলেন। পরদিন অভির বাবাকে স্কুলে ডেকে পাঠানো হল।

আমি আর প্রিয়া ভেবেছিলাম অভির ঝামেলাটা এখানেই শেষ কিন্তু আমরা ভুল করেছিলাম।


সপ্তাহখানেক পর। স্কুল থেকে ফিরছি। প্রিয়া আর আমার বাসা খুব কাছাকাছি হওয়ায় আমরা স্কুলে একসাথেই যাওয়া আসা করতাম। আশফাকের ক্লাস দেরীতে শেষ হয়। আমি আর প্রিয়া একাই স্কুল থেকে ফিরছিলাম। তখন অভি আবার আটকাল আমাদের। এবার প্রায় চার পাঁচজনকে সাথে নিয়ে। সিনেমার মত করে আমাদের ঘিরে ধরলো ওরা। অভির হাতে একটা ব্রাস নাকলস। একটা ঘুষিই যথেষ্ট আমাকে পরপারে পাঠাতে। আমার পেছনে দাঁড়ানো ছিল বল্টু। আমাদের সাথেই পড়ে ছেলেটা। আমার পিঠে লাথি মারতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম মাটিতে। প্রিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কটা লাথি খেয়েছিলাম আমার মনে নাই। হঠাৎ লাথির ঝড় থেমে গেল। আমার নাক আর মুখ থেকে রক্ত পড়ছে। কোনমতে মাথা উঠিয়ে তাকালাম ওদের দিকে। সবার চোখেই নগ্ন আতংক। ভাল করে তাকাতেই দেখলাম আমাদের সবাইকে ঘিরে ধরেছে অনেকগুলো কুকুর। মিশমিশে কালো গায়ের রঙ। চোখগুলো ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে। আকারে সাধারণ কুকুরের চেয়ে অনেক বড়। হা করা মুখ থেকে জিভ বেরিয়ে এসে লকলক করে ঝুলছে। লালা ঝড়ছে সেখান থেকে। একটা চক্র তৈরী করে আমাদের চারদিকে ঘুরছে ওরা। অভির দল ওদের দেখেই ভয় পেয়েছে।

প্রিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপছে। কুকুরগুলো ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো দলটার ওপর। ওদের ভয়ংকর চিৎকারে কেঁপে উঠলাম। আমি প্রিয়া কে শক্ত করে চেপে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ করেই কেউ একজন এসে আমাকে কোলে তুলে নিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, “বাবা”। আমি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। বাবার সাথে আরও একজন ছিলেন। তিনি প্রিয়াকে তুলে নিলেন।

সেদিন রাতে আমার জ্বর এল। ভয়াবহ জ্বর সারারাত প্রলাপ বকলাম আমি। শেষরাতের দিকে ঘুম পেল কিছুটা। তখন অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম আমি। অসংখ্য লোক কালো পোশাক পরে আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। মাটিতে একটা তারা আঁকা। সেটাকে ঘিরে রেখেছে একটা বৃত্ত। সবাই অদ্ভুত একঘেয়ে সুরে গুণগুণ করে কিছু একটা বলছে। মিশমিশে কালো কুকুরগুলোকেও দেখলাম। চোখ থেকে নীলচে আলো জ্বলছে সেগুলোর। তারাটার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি আমি। নেংটো অবস্থায়। গায়ে একটাও কাপড় নেই।


পরদিন সকালে আশফাকের কাছ থেকে ভয়ানক ঘটনাটা শুনলাম। অভি আর তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা নাকি বনে গিয়েছিল ঘুরতে। সেখানে কিছু একটা তাদের মেরে ফেলেছে। প্রত্যেককেই নাকি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। বীভৎস অবস্থা। আশফাক দাঁত বের করে পুরো সিনটা বর্ণনা করলো। বনবিভাগ বলছে জংলী কুকুর বা নেকড়ের কাজ। শিকারী টিমকে নাকি পাঠানো হয়েছে জঙ্গলে। সর্বসাধারণের জন্য জঙ্গলে প্রবেশ নিষেধ। জানিনা কেন আশফাককে আমি বলতে পারলাম না যে, পুরো ঘটনাটা আমার সামনেই ঘটেছে।

কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, ঝামেলা একটা আছে। বড় ধরনের ঝামেলা। আমার বা বাবার যোগ আছে এই ঘটনাটার সাথে। বাবা তার বন্ধুকে নিয়ে ঠিক সেই সময়ে সেখানে উপস্থিত হলেন কিভাবে? আর কুকুরগুলো আমাকে, প্রিয়াকে, বাবাকে বা বাবার বন্ধুকে ছেড়ে দিল কেন?

বিকেলে প্রিয়া এল বাসায়। অদ্ভুত ব্যাপারটা তখনই লক্ষ্য করলাম আমি। মেয়েটা একদম স্বাভাবিক। গতকালের ঘটনার সামান্যতমও মনে নেই ওর। শরীরে কোন ক্ষতচিহ্নও নেই। একই অবস্থা আমার নিজেরও।

পুরো ঘটনাটা কি স্বপ্ন ছিল?

রাতে বাবা এলেন আমার ঘরে। আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বললাম, “বাবা কি হয়েছিল আসলে?”

-আমি বলেছিলাম না? তুই স্পেশাল। ওই কুকুরগুলো ছিল তোর গার্ডিয়ান। তোর কিচ্ছু হতে দেবে না ওরা।

আমি অবাক হয়ে বললাম, “প্রিয়া?”

-ওকে সব ভুলিয়ে দিয়েছি আমরা। মনে রাখবি তুই একা নোস। তোর সাথে আরও অনেকেই আছে যারা তোর কোন ক্ষতি হতে দেবে না।

আমি অবাক চোখে বাবার হাসি হাসি মুখ আর জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কয়েকদিন এভাবেই কেটে গেল। আমি আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। সব কিছু স্বাভাবিক ভাবেই চলতে শুরু করেছিল আবার।

একদিন সকালে শুনতে পেলাম মা বাবাকে বলছেন, “কাল তো মারুফের জন্মদিন। তোমার অফিসের কয়েকজন
কলিগ আর ওর কিছু বন্ধুকে চলে আসতে বলবো ভাবছি। রাতে আমাদের সাথে খাবে।”

বাবা বললেন, “আমি অফিসের ওদের দাওয়াত করে আসবো। তুমি কাল ওর স্কুলে গিয়ে ওর বন্ধুদের বলে এসো”।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

আমি মনে মনে বেশ খুশীই হলাম। জন্মদিন আসলে খুশী হব নাই বা কেন?


সেদিন রাতে হঠাৎ করেই ঘুম ভাঙল আমার। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি গাড়িতে। গাড়ি চালাচ্ছেন বাবা। আমার পাশে আশফাক। আশফাক তখনও গভীর ঘুমে।

“বাবা?” আমি ডাকলাম।

-কি রে?

-কোথায় যাচ্ছি আমরা?

-সারপ্রাইজ আছে তোর জন্য।

-সারপ্রাইজ?

-হ্যাঁ।

আশফাককে ডাকার চেষ্টা করলাম আমি। ও ঘুমিয়ে কাদা। কয়েকবার ডেকে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। বাইরের দিকে তাকালাম আমি। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে যাচ্ছে গাড়িটা। চারদিকে পাহাড়সারি ডিঙিয়ে একটা ফাকামত জায়গায় এসে দাঁড়াল গাড়িটা। গাড়ি থেকে নেমে গেলেন বাবা। আচমকা অন্ধকার ফুঁড়ে যেন উদয় হল আরো দুজন লোক। একজন আশফাককে কোলে তুলে নিল। বাবা আমাকে কোলে তুলে নিলেন। হাঁটতে শুরু করলো তিনজনই। আকাশে বিশাল একটা চাঁদ। চারদিকের জঙল থেকে কুকুরের কান্নার আওয়াজ আসছে।

গায়ে কাটা দিয়ে ওঠা কান্না। মনে হচ্ছে যেন শতবছরের খুনখুনে বুড়ো হাপরের মত করে শ্বাস টেনে টেনে কাঁদছে। ভয়াবহ অবস্থা। আমাদের নিয়ে ওরা একটা ঝরণার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঝরনার পানিতে নেমে গেলেন বাবা আমাকে কোলে নিয়েই। ওর সঙ্গীরাও তাকে অনুসরণ করলো। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম আশফাকের ঘুম ভাঙ্গেনা কেন?

সামনে একটা সুড়ঙ্গমত আছে। বাবা ঢুকে গেলেন ভেতরে। ভেতরে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম। বিশাল বড় একটা হলঘরের মত পাহাড়ের ভেতরটা। ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে কমপক্ষে শখানেক মানুষ। সবাই কালো একটা আলখাল্লা পড়া। আমাকে দেখেই চাপা উল্লাসধ্বনি করে ঊঠলো তারা। দুদিকে সরে গিয়ে পথ করে দিল। বাবা আমাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন। ভেতরে একটা গোল বৃত্ত। মাটিতে খোদাই করে আঁকা। তার মাঝে একটা তারা। সেটাও মাটিতে খোদাই করে আঁকা। বাবা আমাকে তারাটার মাঝে নামিয়ে দিলেন। কালো আলখেল্লা পড়া দুজন লোক এগিয়ে এল। তারা আমার গা থেকে দ্রুত কাপড় খুলে নিল। সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। কারো চেহারা দেখা যাচ্ছে না। সবকিছু কেমন যেন পরিচিত মনে হল আমার।

ও হ্যাঁ।

এই দৃশ্য তো আমি আগেও দেখেছি।

স্বপ্নে।

যার কোলে আশফাক ছিল তিনি আরো কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে আশফাককে একটা বেদীর ওপর শুইয়ে রাখলেন। তারপর ভিড়ে মিশে গেলেন। বাবার দিকে তাকালাম আমি। বাবাও অন্যদের মত একটা আলখাল্লা পড়ছেন।

অদ্ভুত গা শিউরানো একটা অনুভুতি হল আমার।


বেশ লম্বা এক লোক বের হয়ে এলেন ভিড়ের মধ্যে থেকে। আশফাককে শুইয়ে রাখা হয়েছে যে বেদীতে সেই বেদীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। লোকটা দুহাত উচু করতেই সব থেমে গেল।

লোকটার গলার স্বর গম্ভীর, জোরালো, একঘেয়ে।

“আজ আমরা এখানে এসেছি আমাদের কাল্টকে নতুন একজন আইকন দিতে। এমন একজন বাহক যে ম্যাইন্যুর দেহকে নিজের দেহে ধারণ করবে। আদর্শ বাহক খুঁজে পেতে আমাদের অনেক দিন লেগেছে। অনেক শতাব্দী বলতে গেলে। অন্ধকারের দেবতা আজ আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। তাকে দেবলোক থেকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্বাসনের কাল আজ শেষ হতে যাচ্ছে।

যা আমাদের পুর্বপুরুষ করতে পারেননি তা আমরা পেরেছি। আমাদের দেবতাকে অপমান করা হয়েছিল। পাতালের দেবতার খেতাব দেওয়া হয়েছিল। শয়তান হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আর না। আঙ্গ্রা মাইনিয়ু আজ আবার ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে। এই শিশুটি ধারণ করবে তাকে নিজের মধ্যে। আমাদেরকে এই শিশুটি দেবে অপার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা দিয়ে একদিন আমরা রাজত্ব করবো সমগ্র পৃথিবীতে। আহুরা মাজদা, আহরিমান, বাহরাম কেউ আমাদের প্রভুর সামনে টিকতে পারবে না। স্বর্গ দখল করে নেবেন তিনি। তখন স্বর্গ চলে আসবে আমাদের হাতে। পাপের রাজত্ব কায়েম হবে সারা দুনিয়ায়।”

সম্মিলিত ভয়াবহ হুংকারে গোটা পাহাড়টা কেপে উঠলো। একজন লোক এগিয়ে এসে আমাকে একটা সোনালী পাত্র দিল। পাত্রের ভেতর গাঢ় লাল তরল। আমাকে সেটা পান করতে হবে বুঝতে পারলাম। নোনটা ধরণের অদ্ভুত ঝাঝাল তরলটা খেয়ে ফেললাম আমি।


তারপরের ঘটনা আমার ভালভাবে মনে নেই। যেটুকু মনে আছে সেটুকুও ভাষা ভাষা। আশফাক একবার মাগো বলে চিৎকার করে উঠেছিল। অসম্ভব সুন্দরী এক তরুণী এসে আমার গায়ে লাল রঙের কিছু একটা মেখে দিল। তরুণী আমাকে জড়িয়ে ধরে ছিল অনেকক্ষণ। খুব ভাল লেগেছিল আমার ব্যাপারটা। ভয়ংকর উত্তেজনা অনুভব করছিলাম আমি। এক সময় সব শান্ত। বাবা এসে আবার আমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সবাই লুটিয়ে পড়ে কুর্নিশ করছিল আমাকে। গুহাটা থেকে বাইরে বের হবার পর দেখলাম। আকাশে মেঘ। ঘন কালো মেঘ ঢেকে রেখেছে চাঁদটা। পুরো পাহারী পথের দুপাশে সারি বদ্ধ ভাবে দাড়িয়েছিল নীল চোখের অসংখ্য কালো কুকুর। বাবা গাড়ি স্টার্ট করলেন। গাড়ির বুটে একটা সাদা কাপড়ে মোড়া কোলবালিশের মত কিছু একটা তুলে দিয়েছিল ওরা। বাবা ড্রাইভ করা শুরু করলেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম। বাবার মনের কথা বুঝতে পারছি আমি। বাবা আশফাকের পর এবার আমার মাকে খুন করার প্ল্যান করছেন। গাড়ির দুলুনিতে এক পর্যায়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম আমি।


পরদিন সকালে আমাদের বাসাটা ছিল লোকে লোকারণ্য। বাসায় শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছিল। মা আর আশফাক নাকি পুড়ে মারা গেছে। বাবা একদম শেষ মুহুর্তে আমাকে বের করতে পেরেছেন। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ভরে আছে বাসার সামনের উঠানটায়। বাবার হাতে ব্যান্ডেজ। আমাকে বাচাতে গিয়ে নিজের হাত পুড়িয়ে ফেলেছেন উনি। চোখে পানি নিয়ে উঠানে শুইয়ে রাখা মা আর আশফাকের পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশদুটো দেখছেন। অবাক ব্যাপার বাবার মনের সবটাই বুঝতে পারছি আমি। তার সব গোপনীয়তা খোলা বইয়ের পাতার মত আমার কাছে। আরও অদ্ভুত হচ্ছে সামনে দাঁড়ানো প্রতিটা লোকেরই মনের কথা বুঝতে পারছি আমি। যেমন সাবইন্সপেক্টরের মন খারাপ তাকে চিটাগাং হিলট্র্যাকসে বদলী করা হয়েছে। কোথায় ঘুষ খাওয়ানো যায় চিন্তা করছেন।

পাশের বাসার জালাল সাহেব আমার জন্য দুঃখিত। মা মরা ছেলেটার কি হবে এই চিন্তায় তিনি গভীর ভাবে চিন্তিত।

পুলিশের লোকেরা মা আর আশফাকের লাশ দুটো গাড়িতে তুলে নিল। আমার দুঃখ হবার কথা, কিন্তু হচ্ছে না। চাপা একটা উল্লাস অনুভব করলাম।

বাবা তার অক্ষত হাতে আমাকে কোলে তুলে নিলেন।

১০
ব্যাপারটা আমি এখন জানি। আমার বাবা কয়েক হাজার বছর আগে নির্বাসিত শয়তান আঙ্গরা মাইন্যুর একজন উপাসক। পাপ আর অন্ধকারের দেবতা আঙ্গরা ম্যাইন্যুকে নির্বাসিত করেছিল আলোর দেবতা আহুরা মাজদা। পারসিক সভ্যতা অনুযায়ী এই দেবতা হচ্ছে শয়তান। আর এই শয়তানকে পুনরোজ্জীবিত করে দেহে ধারণ করার জন্য এমন একজন শিশু দরকার ছিল যার জন্ম হয়েছে এক পুর্ণিমায় এবং তার ষষ্ঠ জন্মদিনও হবে আরেক পুর্ণিমায়। আমিই ছিলাম সব দিক থেকে যোগ্য। মাইন্যুর দেহকে ধারণক্ষম শিশুকে বলা হয় শর্বর। আমি এখন তাই। মানুষ নামটা আমার জন্য আর না। ভয়ংকর এক পিশাচ এখন আমি।

মা জানতেন বাবার কাহিনী। তিনি ভালবাসা দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন বাবাকে ফেরাতে। পারেননি। বাবাকে, আমাকে ও আশফাককে রাতে না পেয়ে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। বাবা ফিরে এলে মা আশফাকের ব্যাপারে জানতে চাইলে বাবা সব খুলে বলেন। কিভাবে এক পুত্রকে শয়তানের বাহক করার জন্য আরেকপুত্রের বলি দিয়েছেন তিনি। মা স্বাভাবিক হতে পারেননি। পুত্র শোকে কাতর মা পুলিশে ফোন করতে চাইলে। বাবা মাকে খুন করেন তারপর। আশফাক ও মায়ের লাশ যার যার ঘরে রেখে বাসায় আগুন লাগিয়ে দেন।

মাইন্যু কে আমার দেহে প্রবেশ করানোর জন্য প্রয়োজন ছিল বাহকের নিকট আত্মীয়। এবং বয়ঃসন্ধিতে উপনীত হয়নি এমন কারো বলি দেওয়া। আশফাককে সেজন্যই বেছে নেওয়া হয়। বেচারার বুক চিরে হৃদপিন্ড বের করে আমাকে খাওয়ানো হয়েছে গতরাতে। নিজের ভাইয়ের হৃদপিন্ড খাওয়ার অনুভুতি কেমন হতে পারে?

১১
বেশ কয়েকবছর পরের কথা।

বাবার সাথে এসেছি কন্সট্রাকশন সাইটে। বাবা কি মনে করে যেন নিয়ে এসেছেন। বিশাল কন্সট্রাকশন। দায়িত্বে আছে সেনাবাহিনী। বাবা সিভিলিয়ান হিসাবে প্রজেক্টের কাজে আছেন। বহুতল ভবনের কাজ চলছে। ক্রেন দিয়ে মালপত্র ওপরে তোলা হচ্ছে। ক্রেনের অপারেটরের মনটা খারাপ। আজ বাড়ি থেকে বের হবার সময় স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়েছে। তার মনটা ভাল করে দেওয়া যাক। ক্রেনের বহন করা মালের দিকে তাকালাম আমি। লোহার রড। বাবা হেটে আসছেন আমার দিকে। আমার দিকে আসতে হলে উপরে ঊঠতে থাকা রডের নিচ দিয়ে আসতে হবে। আচ্ছা বাবাকে কুৎসিত ভাবে মেরে ফেললে কেমন হয়? যখন হেটে আসতে থাকবেন আমার দিকে তখন যদি আকাশ থেকে তীব্র বেগে শত শত লোহার রড তাকে মাটির সাথে গেঁথে ফেলে? বাবার চোখের দৃষ্টিটা কেমন হবে দেখা যাক।

বাবা হঠাৎ নিজের জায়গায় স্ট্যাচু হয়ে গেলেন। এখন একটা আঙুল নড়ানোর ক্ষমতাও নেই তার। বিস্ফোরিত চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। চোখে কি লেখা আছে আমি জানি। প্রাণ ভিক্ষে চাইছে বেচারা। আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ওপরের দিকে তাকালাম আমি। রডের ক্যারিয়ারটা হঠাৎ কাত হয়ে পড়লো একদিকে। বাবার মাথার ওপরেই ছিল সেটা। আমার দৃষ্টি লক্ষ্য করে বাবা উপরে তাকালেন। আমার উদ্দেশ্য বুঝতে উনার সময় লাগলো না। উনি প্রাণপণে প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন।

কয়েকশ লৌহদন্ড বল্লমের মত ক্ষীপ্রবেগে আকাশ থেকে খাড়া হয়ে নেমে এল।

ভয়ংকর চিৎকার চেচামেচি উপেক্ষা করে হাঁটতে শুরু করলাম। হঠাত কোথা থেকে যেন উপস্থিত হল বিশালদেহী একটা কুকুর। চোখদুটো গাঢ় নীল। আমার সাথে হাঁটতে শুরু করলো। আমি কোমল গলায় বললাম, “কিরে আমার পিছে হাঁটছিস কেন? আমি ম্যাইন্যুও নই, শর্বরও নই। আমি একটা পিচ্চি ছেলে। আমার নাম আসাদ।”

কুকুরটা লেজ নেড়ে আহ্লাদে গলে যাওয়ার একটা ভঙ্গি করলো। আমি পকেটে হাত দিলাম। দশটাকার একটা নোট খচখচ করে উঠলো পকেটে। কুকুরটাকে বললাম, “বিস্কুট খাবি?”

আবার লেজ নাড়লো কুকুরটা। আমি বললাম, “চল দেখি দোকান কই আছে।”

সে হুফ করে একটা শব্দ করে আমার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করলো। মাথার উপরে তপ্ত রোদ নিয়ে হেটে যাচ্ছি বিশ্বরোডের পাশের ফুটপাথ দিয়ে।

কুকুরটাকে বললাম, “তোর একটা নাম দেওয়া দরকার। লুসি নামটা কি তোর পছন্দ হয়?”

কুকুরটা আবার বললো, “হুফ।”

-আচ্ছা লুসিই সই।

দূরে একটা দোকান দেখতে পাচ্ছি। লুসিকে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম আমি।

…………………………………………………………….সমাপ্ত…………………………………………………………..

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত