শুধু একটি ফোন কল

শুধু একটি ফোন কল

ক্রীং ক্রীং…………… ক্রীং ক্রীং……………
সুদীপের ঘুমটা আচমকা ভেঙ্গে গেলো ফোনের শব্দে। হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে থাকা টেবিল থেকে ঘড়িটা উঠিয়ে দেখে রাত প্রায় ১০.৩০ বাজে। আজ অফিস থেকে ফিরে সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন চোখ লেগে গেছে সুদীপ বুঝতে পারেনি। ফোনটা না বাজলে আজ হয়তো আর ঘুমটা ভাঙতোই না। কিন্তু ভ্রূ-জোড়া একটু কুঞ্চিত হলো তার। মনে মনে ভাবতে থাকে সে এতো রাতে কে তাকে ফোন করতে পারে? আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব কেউই তেমন নেই বললেই চলে তার। অফিসও তো এখন বন্ধ। তাহলে? নাকি ঘুমের ঘোরে ভুল শুনলো সে? সেরকম কেউ তো নেই যে তাকে এতো রাতে ফোন করতে পারে।

ক্রীং ক্রীং…………… ক্রীং ক্রীং……………
ওই আবার বাজছে ফোনটা। না তাহলে ভুল শোনেনি সে। যেই হোকনা কেন বারবার যখন ফোন করছে তাহলে নিশ্চয় তাকে চেনে এবং কোনো দরকারেই তাকে ফোন করছে। এই ভেবে সুদীপ খাট থেকে নামলো। পায়ে পায়ে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো সে। ফোনের রিসিভারটা তুলে কানে ধরে শুধু “হ্যালো” এইটুকুই বলতে পেরেছে সে। ওপাশ থেকে একটি মেয়েলি স্বর ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলো,
“কী ভাবেন আপনি নিজেকে? মজা পেয়েছেন? একটা মেয়েকে এইভাবে কষ্ট দিতে আপনার লজ্জ্বা করে না? নিজেকে পুরুষ মানুষ বলেন কোন মুখে? একটা মেয়ের সর্বনাশ করে নিশ্চিন্তে বসে আছেন? একবারও ভেবেছেন তার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে? নাকি সে মরলো না বাঁচলো সেসব এ আপনার আর এখন কিছুই যায় আসে না? মজা নেওয়ার বেলায় তো ভালই ছিলেন। আর দায়িত্ব নেওয়ার বেলাতেই সব দম শেষ? ধিক আপনার মতো পুরুষদের। কাল থেকে আর নিজেকে পুরুষ বলে পরিচয় দেবেন না। আমি শিবানী কে পইপই করে বারণ করেছিলাম যে এইসব লোকের সাথে যেন না মেশে। কিন্তু সে আমার কথা শুনলে তো। প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছিলো। এখন বুঝুক আপনাদের মতো কীটদের লাই দিলে তারা কি করতে পারে। আপনাদের মতো মেরুদন্ডহীন অপদার্থদের মন দিলে কি হতে পারে সে এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। পুরুষ নামের কুলাঙ্গার একটা।“

কথা কটা শেষ হতেই ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল খচ করে। সুদীপ রিসিভারটা হাতে ধরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষ্ণ। মুখের কথা হারিয়ে গেছে ওর। মনে মনে ভাবছে কে এই ভদ্রমহিলা যাকে ও চেনে না জানে না অথচ ওকে যা নয় তাই বলে গেলো। ফোনে কলার আইডিও লাগানো নেই সুদীপের যে সে নম্বরটা পাবে বা তাতে ঘুরিয়ে ফোন করবে। সুদীপ বুঝতে পারছে ওর এখন কি করা উচিৎ। তাকে তো কিছু বলার সুযোগও দেওয়া হলো না। এক তরফা যা নয় তাই শুনে গেলো ও। বরং বলা ভাল বাধ্য হলো। আচমকা কিসব ঘটে গেলো তার সাথে? এসব তো তার মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো।

যাই হোক নিজের হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে সুদীপ চোখেমুখে জল দিতে বাথ্রুমে গেলো। ওখানে গিয়ে কিছুক্ষ্ণ ধরে চোখে মুখে ভালো করে জল দেওয়ার পর সুদীপের মাথা একটু পরিষ্কার হলো। মনে মনে ভাবলো হয়তো মেয়েটি ভুল করে তাকে ফোন করে ফেলেছে অন্য কাউকে করতে গিয়ে। কারন সচেতন বা অচেতন কোনোভাবেই সে কোনো মেয়ের সাথে মেশেনি। তাহলে ক্ষতি করার প্রশ্নই আসছে না। তাই এইসব নিয়ে বেশি না ভেবে সে আবার বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মনে হলো রাতে যা ঘটেছে তা আসলে কোনো স্বপ্ন ছিলো। আসলে কিছুই ঘটেনি। তাই ওসব দিকে বেশি মাথা না ঘমিয়ে সে নিজের রোজনামচার জীবনে জড়িয়ে পড়লো। সেদিনও সারাদিন অফিসের খাটাখাটনিতে ক্লান্ত সুদীপ বাড়ী ফিরে তাড়াতাড়ি কোনোরকমে খেয়ে শুয়ে পড়লো। যদিও সারাদিন মনের কোনে একটা খচখচানি তার আগের দিন রাতে ফোন কলটা নিয়ে ছিলো তবু সেটাকে বেশি পাত্তা না দিয়ে সে বিছানায় শুয়ে পড়লো। আর বিছানায় শুতে না শুতেই রাজ্যের ঘুম তার দু-চোখে জড়িয়ে এলো।

সুদীপ। সুদীপ রায়। ২৭ বছর বয়স। পরিবার বলতে মা ও বাবা। তাও তারা থাকেন দেশের বাড়ীতে। এখানে এই শহরে সে একাই থাকে। বন্ধুবান্ধবও নেই তার তেমন খুব একটা। সারাদিন অফিসের কাজ নিয়েই ব্যাস্ত থাকে। সকাল বেলা উঠে কোনোরকমে দৌড় লাগায় অফিসে আর সেখান থেকে বাড়ী ফিরতে মোটামুটি রাতই হয়ে যায় প্রায়। আর সপ্তাহের শেষের দিন গুলো সে বাড়ী যায়। ফলে এই শহরে থেকেও সুদীপের পরিচিতি একদমই নেই। ফলে সেদিনের সেই ফোন কলটা তাকে একটু ভাবনায় ফেলেছিলো বইকি।

সেদিনও আগের দিনের মতই সুদীপের ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো ফোনের আওয়াজে। ঘুম ভাঙ্গা চোখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সে রাত ১০.৩০ বাজছে। মানুষের কি আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? প্রতিদিন এই রকম বেয়াক্কেলে সময়ে ফোন করা? তাদের না হয় কোনো কাজ নেই, তাই বলে কি সুদীপেরও কোনো কাজ নেই? নিজের মনে গজগজ করতে সুদীপ উঠে গিয়ে ফোনের রিসিভারটা কানে লাগায়। ওপাশ থেকে শুনতে পায় “হ্যালো”। গলার স্বরটা শুনে সুদীপ থমকে যায়। সুদীপ আশাও করেনি আবার এই গলার স্বরটা তাকে শুনতে হবে। কালকের সেই মহিলা কন্ঠস্বর। নিজের থেকেই সুদীপের গলা দিয়ে আওয়াজ বেড়িয়ে এলো, “বলুন।“
-“আচ্ছা লোক মশাই তো আপনি! কাল আপনাকে এতোকিছু বললাম। তারপরও আপনি কি করে চুপ করে বসে থাকতে পারেন বলবেন? চক্ষুলজ্জ্বা কি একেবারেই নেই? নাকি মানুষই নন? গায়ে কি গন্ডারের চামড়া? শিবানীকে কষ্ট দিয়ে কি পাচ্ছেন বলুন তো? আপনার তো কোনো হেলদোলই নেই সে বাঁচল কিনা তাও জানতে চান না। আর এদিকে সে কেঁদেকেটে শেষ হয়ে যাচ্ছ। ………………”

মেয়েটির হয়তো আরো কিছু বলার ছিলো। কিন্তু সুদীপ আজ কথার মাঝে তাকে থামিয়ে বলে উঠলো,
-“জানি না আপনি কে বলছেন। কোথা থেকেই বা আমার ফোন নম্বরটা পেয়েছেন। তবুও আমার মনে হচ্ছে আপনি কোথাও একটা ভুল করছেন। আপনি যাকে খুঁজছেন সে কিন্তু আমি না। কোনো শিবানীকে আমি চিনি না। নিজেকে অহেতুক চালাক ভাববেন না। হয়তো আপনি তার উপকারই করতে চাইছেন। কিন্তু তার কাছ থেকেই একটু জেনে নিন আসল নম্বরটা। না জেনে শুনে একজন অচেনা মানুষকে আপনি বিরক্ত করে চলেছেন। অভদ্রতা করে চলেছেন। এরপর থেকে একটু খোঁজ খবর নিয়ে কথা বললে খুশি হব। আর আমায় এইভাবে বারবার ফোন না করলেই ভালো হয়। নইলে এবার আমি পুলিশে যেতে বাধ্য হব।“

একটানা এতোগুলো কথা বলে সুদীপ আজ নিজেই ফোনটা নামিয়ে রাখলো। এক গ্লাস জল খেয়ে মাথা ঠান্ডা করলো সুদীপ। মাথাটা একটু ঠান্ডা হলে সুদীপের মনে একটা অপরাধ বোধ কাজ করতে লাগলো। অতোগুলো কথা মেয়েটাকে বলা হয়তো ঠিক হলো না। মেয়েটি তো আর ইচ্ছে করে তাকে এরকম ভাবে অপমান করতে চায়নি। ভালোভাবে বললেও তো হতো। আজ পর্যন্ত সুদীপ এইরকম ভাবে কারো সাথে ব্যবহার করেনি।

কলার-আইডিও নেই যে আরেকবার ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নেবে সে। একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করতে থাকে তার মধ্যে। রাতে ঘুমটাও সেদিন ঠিক করে হয় না।

পরেরদিন সারাটা সময় সুদীপের মনটা কোনো এক অজানা কারনে ভারাক্রান্ত হয়ে রইলো। হয়তো মেয়েটিকে আঘাত করার জন্য? হয়তো ক্ষমা না চাইতে পারার জন্য? নাকি অফিসের চাপ? জানে না সুদীপ সঠিক কারনটা। কেনো যেন সে শুধু চায় মেয়েটি আরেকবার ফোন করুক তাকে। সে একবার ক্ষমা চেয়ে নিক মেয়েটির কাছ থেকে। সন্ধেবেলা বাড়ী ফিরে মনে প্রানে সুদীপ শুধুই এইটুকু চাইতে থাকে।

সেইদিন ভগবান হয়তো সুদীপের ডাক শুনেছিলেন। সেদিনও ফোন এসেছিলো। তবে অন্যান্য দিনের মতো ওতো দেরী করে নয়, আরো আগে। সুদীপ সেদিন ফোনের কাছেই বসে বসে একটা প্ত্রিকা পড়ছিলো। ফোনটা বাজতেই বেখেয়ালে রিসিভারটা তুলে কানে দিলো সে। ওপাশ থেকে একটা চেনা গলার স্বর ভেসে এলো তার কানে,
“ক্ষমা করবেন। আমার উচিৎ ছিলো আপনাকে কোনো কিছু বলার আগে একবার নিশ্চিত হয়ে নেওয়া যে ঠিক লোককে ফোন করছি কিনা। আমার কোনো কথা আপনাকে আঘাত করে থাকলে আমি দুঃখিত। কিছু মনে করবেন না দয়া করে।“
-“আরে না না। ঠিক আছে। আমিও তো কাল আপনাকে অনেক কড়া ভাষায় অনেক কিছু বলে ফেলেছি। আপনিও কিছু মনে করবেন না দয়া করে।“
-“ তবুও আমার উছিত ছিলো একবার নিশ্চিত হয়ে নেওয়া। আসলে আমার বন্ধু শিবানীর খুব মন খারাপ। ওর ভালোবাসার মানুষের সাথে মান-অভিমান। সেই কারনে তাকে বকাবকি করার জন্যই শিবানীর ফোন থেকেই নম্বরটা নিয়েছিলাম। কিন্তু তাড়াহুড়োর মাথায় যে একটা সংখ্যা ভুল টুকেছি তা খেয়াল করিনি। ফলে ফোন লাগলো আপনার কাছে। আমি ভীষণ দুঃখিত আপনাকে যা নয় তাই বলে বিরক্ত করার জন্য।“
-“ না না। অতো দুঃখিত হবেন না। আপনার পরিস্থিতি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছি। আমিও ভীষণ লজ্জিত আপনাকে ওইভাবে কাল কটুকথা বলার জন্য। আমার নাম সুদীপ। আপনার নামটা জানতে পারি?”
-“ তিথি।“
-“ সুন্দর নাম। পরিচিত হয়ে আনন্দ পেলাম।“
-“ ধন্যবাদ। তাহলে আপনি আর আমার উপর রেগে নেই তো?”
-“ না না। আমি ওতোটাও অমানুষ না। ওতোটাও ইতর না।“
-“ এইভাবে বলে আর লজ্জা দেবেন না দয়া করে। এমনিও শিবানী সব শুনে আমায় যা নয় তাই বলেছে। অনেক কষ্টে সাহস যোগাড় আজ আপনাকে ফোনটা করলাম।“
-“ হা হা। না আমি এমনি মজা করছিলাম। আমি কিছু মনে করিনি।“
-“ আচ্ছা তবে রাখি?”
-“আচ্ছা।“

মনের ভেতর যে পাথরের ভাড়টা সারাদিন সুদীপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো তা যেন লাঘব হলো তার। ভীষণ হালকা লাগছে নিজেকে সুদীপের। ক্ষমা চেয়ে প্রোথিত পাষাণ ভার কমে গেছে তার। যাক যার শেষ ভালো তার সব ভালো।

(২)

পরেরদিন যথা নিয়মে সূর্যোদয় হয়। দৈনন্দিন নুন-হলুদের কালচক্র নিজের নিয়মে ঘুরতে থাকে। সুদীপও নিজের রোজকার কাজকর্মে মিশে গেলো। তবুও কোথাও একটা কাঁটা মনের কোনে খচখচ করতে থাকে তার। কোথাও এক অসম্পূর্ণতা তাকে ঘিরে রেখেছে। একটা মুল্যবান কিছু হারানোর ব্যথা। কোথাও মনের কোনে একটা চাপা ইচ্ছে কাজ করছে তার। তিথি কি তাকে আজ ভুলেও একটা ফোন করবে? একবার কি শোনা যাবে তার গলা? কেনো এরকম হচ্ছে তার কোনো সদুত্তর সুদীপের কাছে নেই। সে নিজেও জানে না তার মন কি চায়।

বাড়ীতে আসার পর থেকে একটা অস্বাভাবিক ছটফটানি সুদীপের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারনে অকারনে বারবার ফোনের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। এক গভীর প্রতিক্ষায় তার মন হারিয়ে গেছে। সুদীপের মনের কোনে থাকা ইচ্ছে পুরন করে ফোনটা বেজে উঠলো। সুদীপ উৎসাহের সাথে ফোনটা তুলতেই ওপাশে সেই চেনা গলা বলে উঠলো, “চিনতে পারছেন?”

গলা শুনে সুদীপের মনে একটা খুশির সুরলহরী খেলা করে গেলো। মনের ময়ুর আনন্দে পেখম তুলে নেচে উঠলো। খুশি খুশি গলায় সুদীপ বলে উঠলো, “আপনাকে চিনবো না? তা কখনো হয়?”
তিথি বললো, “জানি না কেনো আজ আপনাকে ফোন করতে ইচ্ছে করলো। বিরক্ত করছি না তো?”
-“না না একদমই না। আমি এখন ফাঁকাই আছি। ভালো করেছেন ফোন করেছেন। আপনার সাথে না হয় কিছুক্ষন গল্প করা যাবে।“

এইভাবেই সুদীপ ও তিথির মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং তা সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলে। কখন যে ওরা দুজনে একে অপরের খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠলো তা ওরা নিজেরাই জানে না। প্রত্যেকদিন ওদের মধ্যে ফোনে কথা হতো। একে অপরের সারাদিনের সমস্ত খোঁজ খবর না নিলে ওদের দিনটাই যেন অপূর্ণ থেকে যেতো। মনের কথা একে অপরকে খুলে বলতে পারতো ওরা। কখনো কোনো মানসিক বাঁধা পায়নি তারা পরস্পরের কাছ থেকে। কখনো তাদের দেখা হয়নি। কিন্তু এই ফোনের বন্ধুত্বে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

কিন্তু কখন যে সুদীপের কাছে এই বন্ধুত্বে দুটো ডানা লেগে গেছিলো তা সুদীপ নিজেই জানতো না। কখন যে তিথি ওর মনের অধিকাংশ জায়গা দখল করে নিয়েছে তা বোঝেনি সুদীপ। আস্তে আস্তে নিজের সমস্ত মনটাই তিথিকে দিয়ে ফেলেছে সুদীপ। এখন এমন অবস্থা যে তিথির সাথে একদিন কোনো কারনে কথা না হলে সুদীপের দিনটাই বিস্বাদ লাগে। সুদীপ বুঝতে পারে যে ও কখন না জানি তিথিকে ভালবেসে ফেলেছে। তবু নিজেকে সময় দিলো সুদীপ, নিজের মনকে বুঝতে। যখন সে স্থির হলো না যে সে সত্যি তিথিকে ভালোবাসে তখন ঠিক করলো তিথিকে বলবে। ফোনের মধ্যেই বলবে।

সুদীপ ঠিক করলো আজ যখন তিথি ফোন করবে ও তখনই তিথিকে বলবে। তিথিও যেমন প্রত্যেকদিন ফোন করে সেরকমই ফোন করলো। কথা কিছুটা হলো ঠিকই কিন্তু আজ তিথির কেমন একটা লাগছে সুদীপের গলাটা। কেমন যেন আনমনা, ছাড়া ছাড়া। তাই তিথি জিগ্যেস করলো “ কিছু বলতে চাও সুদীপ? তোমায় আজ অন্যরকম লাগছে। কি হয়েছে?”

সুদীপ চুপ রইলো কিছুক্ষন। তিথি আবার ডেকে উঠলো “সুদীপ?”

সুদীপ বলে উঠলো, “আমার তোমায় কিছু বলার আছে তিথি।। একটু শোনো।“
-“কি বলবে সুদীপ?”
-“ আমি তোমায় ভালো বেসে ফেলেছি তিথি। জানি না কবে, কখন বা কিভাবে? শুধু জানি যেদিন থেকে তুমি আমার জীবনে এসেছো আমার জীবনটাই পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বন্ধুত্ব কখন ভালোবাসার রূপ নিয়েছে আমি জানি না। অন্য কিছু এখন আর আমার ভালো লাগে না। সবসময় মনে যেন তোমার কাছে যাই। তোমার কাছে থাকি। তোমায় আমি ভীষন ভালোবাসি তিথি। আমার শীতল শুকনো জীবনে তুমি এসেছো বসন্ত হয়ে। আমার জীবন নুতন রঙে রাঙা হয়েছে শুধু তোমার ছোঁয়ায়। আমায় ছেড়ে যেয়ো না তিথি। আমায় বিয়ে করবে তুমি?”
-“…………”
-“তিথি কিছু তো বলো।“
-“এ তুমি কি করলে সুদীপ? কেনো ভালোবাসলে আমায়?”
-“কেন তিথি? কি হয়েছে?”
-“সুদীপ আমি অন্যের কাছে দায়বদ্ধ, অন্যের বাগদত্তা। আমি নিজেকে সঁপে দিয়েছি অন্যের কাছে।“
-“তিথি!!!!!!!!!!!!!”
-“হ্যাঁ সুদীপ। আমি অন্যের। অন্যের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর থেকে বেরোনো যাবে না।“
-“………………”
-“ সুদীপ তোমায় আজ আমার জীবনের আরেকটা অধ্যায় বলি শোনো। আমি যখন ছোটো ছিলাম আমার বাবার খুব শরীর খারাপ হয়। সেইসময় বিজয় কাকু ভীষন রকম ভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ান। সেই ঋণ শোধ করতে বাবা তার ছেলে অনিমেষের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেন। তুমি তো জানোই আমার বাবা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাই বাবার কথার দাম রাখতে আমি অনিমেষকেই নিজের স্বামী হিসেবে স্বীকার করেছি। ছোটো থেকেই জানতাম আমার স্বামী হবে অনিমেষ। সবসময় চেষ্টা করেছি ওকে ভালো রাখতে, ওকে খুশি রাখতে। যাতে অনিমেষ সুখে থাকে ভালো থাকে তাই করেছি। এই করতে গিয়ে আমি কিন্তু নিজের অস্তিস্ব হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমিও যে একটা মানুষ, আমারও যে কিছু প্রত্যাশা কিছু থাকতে পারে তা ভুলেছিলাম। তারপর কোন এক জাদুবলে তুমি ঢুকলে এক ঝলক তাজা বাতাসের মতো। আমি নতুন ভাবে বেঁচে উঠলাম। নিজের হারিয়ে জাওয়া অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম তোমায় পেয়ে। সুদীপ আমিও তোমায় কখন যেন ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো পরিণতি নেই। তাই ভেবেছিলাম তোমায় কোনোদিন জানাবো না। বুঝতে পারিনি তুমিও আমায় ভালোবাসো। নইলে এতোদিন চুপ থাকতাম না। আমি যে পারবো না সুদীপ বাবাকে কষ্ট দিতে। বাবা যে অনেক কষ্টে আমায় মানুষ করেছে। বাবার স্বপ্ন ভেঙ্গে সেখানে নিজের স্বপ্ন গড়তে আমি অপারগ সুদীপ।

তুমি ভালো থেকো সুদীপ। যে রঙের কথা তুমি বললে তাতে পারলে অন্য কারো নাম লিখো। জীবনের ক্যানভাসে আমার রঙ থাকলেও নামটা অন্য কারো হক। আমি অন্তত দুঃখ পাবো না। পাতলে আমায় ভুলে যেও আর নিজের জীবন আনন্দের সাথে কাটিও। আমাকে আর কোনোদিন ফোন কোরো না সুদীপ। তুমি ভালো থেকো।“
-“…………………”

ফোনটা যেন কখন কেটে গেছে। সুদীপ এতোটাই বাক্রুদ্ধ যে ও খেয়াল করেনি কখন তিথি ফোনটা রেখে দিয়েছে। ও ভাবতেও পারেনি তিথির এরকম কিছু থাকতে পারে। ও যে তিথিকে ভীষন ভালোবাসে। কিভাবে থাকবে ও তিথিকে ছাড়া? জলভরা চোখে সুদীপ জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। রাত তার শান্তির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে শহরময়। চাঁদ তার জ্যোৎস্নাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে শহরের উপর শামিয়ানা সজ্জিত করেছে, যাতে শহরের মানুষ ভালো থাকে। সুদীপ ভাবলো কাল আবার সকাল হবে। শহর মাতবে নিজের ছন্দে। দৈনন্দিন নুন-হলুদের চক্র আবার নিজের জায়গা করে নেবে প্রত্যেকের জীবনে। শুধু সুদীপের জীবনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হল সেটা আর কোনোদিনও কেউ ভরাতে পারবে না। যে উপহার একবার দেওয়া হয়ে যায় তা ফেরানো যায় না। সুদীপ নিজের হৃদয়টাকে তিথিকে উপহার দিয়েছে। ওটা যে তিথির কাছেই আছে আর ওখানেই থাকবে। ওটা তার। অন্য কারো না। ভালো থাকুক তিথি। সুখে থাকুক। ও সারাজীবন দূর থেকে তিথিকে ভালোবাসবে।

এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস সুদীপের চোখের এক বিন্দু জলকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে এলো আর হারিয়ে গেলো অতল আকাশের বুকে………….।।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত