কাফে-দে-জেনি

কাফে-দে-জেনি

রাত বারোটায় প্যারিসে থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ভাবলুম যাই কোথায়? হোটেলে? তাও কি হয়! খাস প্যারিসের বাসিন্দা ছাড়া আর তো কেউ কখনো তিনটের আগে শুতে যায় না। আমার এক রুশ বন্ধুকে প্যারিসে সকাল হওয়ার আগে কখনও বাড়ি ফিরতে দেখিনি। রাত তিনটে-চারটের সময় যদি বলতুম, “রবের, চল, বাড়ি যাই” সে বেড়ালছানার মত আমার কোটের আস্তিন আঁকড়ে ধরে বলত, ‘ এই অন্ধকারে? তার চেয়ে ঘণ্টাতিনেক সবুর করো, উজ্জ্বল দিবালোকে প্রশস্ত রাজবর্ত্মা দিয়ে বাড়ি ফিরব। আমি নি নিশাচর, চৌর, না অভিসারিকা? অত সাহস আমার নেই।’
জানতুম মঁ পার্নাস বা আভেন্যু রশোসূয়ারের কোনো একটা কাফেতে তাকে পাবোই। না পেলেও ক্ষতি নেই, একটু কফি খেয়ে, এদিক-ওদিক আঁখ মেরে ‘নিশার প্যারিসের’ হাতখানা চোখের পাতার উপর বুলিয়ে নিয়ে আধা-ঘুমো-আধা-জাগা অবস্থায় হোটেলে ফিরে শুয়ে পড়ব।
জুনের রাত্রি। ন-গরম, না-ঠাণ্ডা। প্লাস দ্য লা মাদ্‌লেন দিয়ে থিয়েটারের গানের শেষ রেশের নেশায় এগিয়ে চললুম। গুন্‌ গুন্‌ করছিঃ

 

‘তাজা হাওয়া বয়– খুঁজিয়া দেশের ভুঁই।

ও মোর বিদেশী যাদু কোথায় রহিলি তুই?

 

ভাবছি রাধারে চেয়ে কৃষনের প্রেম ছিল ঢের বেশি ফিকে। অথচ ত্রিস্তানের প্রেম কি ইজলদের চেয়ে কম ছিল? না, জর্মনরা অপেরা লিখতে পারে বটে, ইতালিয়েরা গাইতে পারে বটে ও ফরাসীরা রস চখতে জানে বটে। বলেও, ‘খাবার তৈরী করা তো রাঁধূনির কর্ম, খাবেন গুণীরা। আমরা অপেরা লিখতে যাব কোন দুঃখে?’
দেখি, হঠাৎ কখন এক অজানা রাস্তায় এসে পড়েছি। লোকজনের চলাচল কম। মোটরের ভেঁপু প্রায় বাজেই না। চঞ্চল দ্রুত জীবনস্পন্দন থেকে জনহীন রাস্তায় এসে কেমন যেন ক্লান্তি অনুভব করলুম। একটু জিরোলে হত। তার ভাবনা আর যেখানেই থাক প্যারিস নেই। কলকাতায় যে রকম পদে পদে না হোক বাঁকে বাঁকে পানের দোকান, প্যারিসেও তাই। সর্বত্র কাফে। প্রথম যেটা চোখে পড়ল সেটাতেই ঢুকে পড়লুম।
মাঝারি রকমের ভিড। নাচের জায়গা নয়। ক্যানেস্তারা ব্যাণ্ড বা রেডিওর বাদ্যি-বাজনা নেই দেখে সোয়াস্তি অনুভব করলুম। একটা টেবিলে জায়গা খালি ছিল; শুধু একজন খবরের কাগজের ফেরিওয়ালা, কালো টুপীতে সোনালি হরফে ‘ল্য মাতাঁ’ লেখা চোখ বন্ধ করে সিগারেটে দম দিচ্ছেন, সামনে অর্ধশূন্য কফির পেয়ালা। আমি একটু মোলায়েম সুরে বললুম, ‘মসিয়ো যদি অনুমতি করেন–‘। ‘তবে এই টেবিলে কি অল্পক্ষণের জন্য বসতে পারি?’ এই অংশটুকু কেউ আর বলে না। গোড়ার দিকটা শেষ না হতেই সবাই বলে, ‘বিলক্ষণ, বিলক্ষণ।’ কিন্তু ল্য মাতাঁর হরকরা দেখলুম সে দলের নয়। আমার বাক্যের প্রথমার্ধ শেষ করে যখন ‘বিলক্ষণ, বিলক্ষণ’ শোনবার প্রত্যাশ্যায় থেমেছি, তিনি তখন চোখ মেলে মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আমার অনুরোধ শব্দে শব্দে ধীরে ধীরে পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘মসিয়ো যদি অনুমতি করেন তবে?–তবে কি?’ এ হেন অপ্রয়োজনীয় অবান্তর প্রশ্ন আমি হিল্লি-দিল্লী-কলোন্‌-বুলোন্‌ কোথাও শুনিনি। কি আর করি, বললুম, ‘তবে এই টেবিলে অল্পক্ষণের জন্য বসি।’ ল্য মাতাঁ বললেন, ‘তাই বলুন। তা না হলে আপনি যে আমার গলাকাটার অনুমতি চাইছিলেন না কি করে জানব? যারা সকল্পন বাক্যের পূর্বার্ধ বলে উত্তরার্ধ নির্ণয় করো না, তারা ভাষার কোমর কাটে। মানুষের গলা কাটতে তাদের কতক্ষণ? বসুন।’ বলে ‘ল্য মাতাঁ’ চোখ বন্ধ করে সিগারেটে আরেক-প্রস্ত দীর্ঘ দম নিলেন। অনেকক্ষণ পরে চোখ না মেলেই আস্তে আস্তে বললেন, যেন কোন ভীষণ প্রাণহরণ উচাটন মন্ত্র জপে যাচ্ছেন, ‘ভাষার উচ্ছৃংখলতা, তাও আবার আমার সামনে।’
আমি বে-বাক অবাক। এ আবার কোন্‌ রায়বাঘা সাহিত্যরথী রে বাবা। কিন্তু রা কাড়তে হিম্মৎ হল না, পাছে ভাষা নিয়ে ভদ্রলোক আরেক দফা, একতরফা রফারফি করে ফেলেন। আধঘণ্টা টাক কেটে যাওয়ার পর ল্য মাতাঁ ঝাঁকুনি দিয়ে যেন ঘুম ভাঙালেন। ঠাণ্ডা কফিতে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ফরাসী জানেন বলে মনে হচ্ছে।’ কথাটা ঠিক প্রশ্ন নয়, তথ্য নিরূপণও নয়। আমি তাই বিনীতভাবে শুধু ‘ওয়াঁও, ওয়াঁও’ গোছ একটা শব্দ তথ্য বের করলুম। অত্যন্ত শান্তস্বরে ল্য মাতাঁ বললেন, ‘ভাষা সৃষ্টি কি করে হল তার সমাধান সাধনা নিষ্ফল। এ জ্ঞানটা প্যারিসের ফিলোলজিস্ট এসোসিয়েশনের ছিল বলেই তাদের পয়লা নম্বর আইন, তাদের কোনও বৈঠকে ভাষার সৃষ্টিতত্ত্ব, গোড়াপত্তন নিয়ে কোনও আলোচনা হবে না। তবু অনায়াসে এ-কথা বলা যেতে পারে যে, সৃষ্টির আদিম প্রভাতে মানুষের ভাষা ছিল না, পশুপক্ষীর যেমন আজও নেই। আজও পশুপক্ষীরা কিচির মিচির করে ভাব প্রকাশ করে। মানুষ কিন্তু ‘ওয়াঁও, ওয়াঁও’ করে না!’
লোকটার বেআদবী দেখে আমি থ’ হয়ে গেলুম। ল্য মাতাঁ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফের্না র‍্যুমোর নাম শুনেছেন?’ গোস্‌সা হয়ে, বেশ উম্মার সঙ্গে বললুম, ‘শুনিনি।’
‘শুনিনি।’ ল্য মাতাঁ অতি বিজ্ঞের অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, জানেন না, অথচ কী গর্ব যে জানেন না। এই গর্ব যেদিন লজ্জা হয়ে সর্ব অস্তিত্বকে খর্ব করবে, সেদিন সে লজ্জার জ্বালা জুড়োবেন কোন পঙ্ক দিয়ে? ও রেভোয়া।’ বলে ল্য মাতাঁ গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।
ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরে লোকটার কথা খানিকক্ষণ ধরে ভাবতে লাগলুম। তারপর আপন মনেই বললুম, ‘দুত্তোর ছাই, মরুক গে।’ একটা খবরের কাগজের সন্ধানে ওয়েটারকে ডেকে বললুম, ‘কেনো একটা বিকেলের কাগজ, সকালেরটা বেরিয়ে থাকলে তাই ভালো।’ ওয়েটার খানিকক্ষণ হাবার মত আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি বিদেশী, মসিয়ো, তাই জানেন না, আমাদের ক্লিয়াঁতেল-গাহকরা সবাই জিনিয়স। কাফের নাম ‘কাফে দে জেনি’, ‘প্রতিভা কাফে।’ এন্‌রা কেউ খবরের কাগজ পড়েন না। তবে সবাই মিলে একটা সাপ্তাহিক বের করেন–গ্রীক ভাষায়। তার একখণ্ড এনে দেব?’ আমি বললুম ‘থাক’। এসিরিয়ন কি ব্যাবিলনিয়ন যে বলেনি সেই অন্ততঃ এ পুরুষের ভাগ্যি।
ততক্ষণে দেখি আরেকটা ভদ্রলোক ‘ল্য মাতাঁর শূন্য চেয়ারখানা চেপে বসেছেন। বেশ মিষ্টি মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আপনি বুঝি ফের্না র‍্যুমোর বন্ধু?’ আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘ফের্না র‍্যুমো কে?’ ভদ্রলোকটি আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘কেন? এই যার সঙ্গে কথা বলছিলেন–‘ হালে পানি পেলুম : হাল মালুম হল। বললুম, ‘না, এই প্রথম আলাপ।’ ‘ও, তাই বলুন। আমার নাম পল রনাঁ। আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুশী হলুম।’ ‘বিলক্ষণ, বিলক্ষণ, আমার নাম ইরশাদ চৌধুরী।’ শুধালুম, ‘মসিয়ো কি গ্রীক খবরের কাগজ পড়েন?’ রনাঁ উত্তর দিলেন, ‘আপনি আমাদের কাগজটার কথা বলছেন তো? না, আমি গ্রীক জানিনে। কিন্তু ওয়েটারটা জানে; আঁরিকে ডাকব? সে আপনাকে তর্জমা করে শুনিয়ে দেবে। তবে তার ফারসী বোঝাও এক কর্ম।’
গোলকধাঁধাটি আমার কাছে আরো পেঁচিয়ে যেতে লাগল। জিজ্ঞেস করলুম, ‘মসিয়ো র‍্যুমো কি ‘ল্য মাতাঁর কাজ করেন?’ রনাঁ বললেন, ‘পেটের দায়ে। এক কাপ কফি মেরে সে তিন দিন কাটেতে পারে। কিন্তু চার দিনের দিন? বছর দশেক পূর্বে তার একটা কবিতা বিক্রি হয়েছিল। পয়সাটা পেলে ভালো করে এক পেট খাবে। হালে যে কবিতাটা ‘ল্য মেরক্যুরে পাঠিয়েছিল, তারা সেটার কোঠ ঠিক না করতে পেরে বিজ্ঞাপন ভেবে মলাটে ছাপিয়েছে। কিন্তু টাকার দুঃখ তার এইবার ঘুচল বলে। বাস্তাইয়ের জেলে ফাঁসুড়ের চাকরীটা খালি পড়েছে। র‍্যুমো দরখাস্ত করেছে। খুব সম্ভব পাবে। ফাঁসী দেওয়াতে ওয়াকিবহাল হয়ে যখন নূতন কবিতা ঝাড়বে তখন আর সব চ্যাংড়াদের ঘায়েল করে দেবে।’
জিজ্ঞেস করলুম, ‘আপনি কিছু লেখেন?’
‘লেখাপড়াই ভুলে গিয়াছি, তা লিখব কি করে?’
‘লেখাপড়া ভুলে গিয়েছেন মানে?’
‘মানে অত্যন্ত সরল। আমি ছবি আঁকি। ছবি আঁকায় নিজেকে সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃতিতে লোপ করে দিতে হয়। কবিতা, গান, নাচ এক কথায় আর সব কিহচু তখন শুধু অবান্তর নয়, জঞ্জাল। নদী যদি তরঙ্গের কলরোল তোলে তবে কি তাতে সুন্দরী ধরার প্রতিচ্ছিবি ফোটে? ঝাড়া দশটি বছর লেগেছে, মোশয়, ভাষা ভুলতে। এখন ইস্তেক রাস্তার নামও পড়তে পারিনে, নাম সইও করতে পারিনে। বেঁচে গেছি। জীবনের প্রথম প্রভাতে মানুষ কি দেখেছিল চোখ মেলে?–যুগ যুগ সঞ্চিত সভ্যতার বর্বর কলুষকালিমা মুক্ত জ্যোতির্দৃষ্টি দিয়ে? তাই দেখি, তাই আঁকি।’
লোভ সম্বরণ করতে পারলুম না। বললুম, ‘সৃষ্টির প্রথম প্রভাতে মানুষ তার অনুভূতির প্রকাশ কি ‘ওয়াঁও, ওয়াঁও’ করে নি?’ দেখলুম রনাঁ বড় মিষ্টি স্বভাবের লোক। বাধা পেয়ে বাঘা জিনিয়সের মত তেড়ে এলেন না। পুরুষ্টু গালে টোল লাগিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, র‍্যুমো বলেছে তো? ও তার স্বপ্ন; আর স্বপ্ন মানেই ছবি। স্পর্শ নেই, গন্ধ নেই, শব্দ নেই; এমন কি সে ছবিতে রঙও নেই, কম্পজিশন নেই। সে বড় নবীন ছবি, সে বড় প্রাচীন ছবি। সে তো আত্মদর্শন, ভূমা দর্শন।’
জিজ্ঞেস করলুম, ‘সে ছবি বুঝবে কে? তাতে রস পাবে কে? আমাদের চোখের উপর যে হাজার হাজার বৎসরের সভ্যতার পলস্তরা।’
রনাঁ বড় খুশী হলেন। মাথা হেলিয়ে দুলিয়ে বললেন, ‘লাখ কথার এক কথা বললেন, মসিয়ো। তাই বলি প্রাচ্য দেশীয়রা আমাদের চেয়ে ঢের বেশী অসভ্য, অর্থাৎ সভ্য। চিরকাল মুক্তির সন্ধান করেছেন বলে তাদের চোখ মুক্ত। চলুন আপনাকেই আমার ছবি দেখাব।’ জানালার পাশে বসেছিলাম, পর্দাটা সরিয়ে বললেন, ‘এই আলোতেই আমার ছবি দেখার প্রশস্ততম সময়।’
বৃথা আপত্তি করলুম না। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
রাস্তায় চলতে চলতে রনাঁ বললেন, ‘আদিম প্রভাতের সৃষ্টি দেখতে হলে প্রদোষের অর্ধনিমীলিত চেতনার প্রয়োজন।’
তেতলার একটি ঘরের দিয়ে ঢুকলুম। ডাক দিলেন, ‘নানেৎ।’
ঘরের চারদিকে তাকাবার পূর্বে নজর পড়ল নানাতের দিকে। শোফায় অর্ধশায়িতা কিশোরী না যুবতী ঠিক ঠাহর করতে পারলুম না। এক গাদা সোনালি চুল আর দুটি সুডৌল বাহু। রনাঁ আলাপ করিয়ে দিলেন, ‘মসিয়ো ইরশাদ; নানেৎ–আমার মডেল, ফিয়াঁসে, বন্ধু। নানেৎ, জানালাগুলো খুলে দাও।’
চারিদিকে আকিয়ে আমার কি মনে হয়েছিল আজ আর স্পষ্ট মনে নেই। ছাত থেকে মেঝে পর্যন্ত ছবি আর ছবি। আগাগোড়া যেন ক্যানভাসে মোড়া। শোফাতে, মেঝেতে, কৌচে, চেয়ারে সর্বত্র ছবি ছাড়ানো। অদ্ভুত সামঞ্জস্যহীন অর্থবিহীন অতি নবীন না বাহু প্রাচীন গালগোল পাকানো বস্তুপিণ্ড, না জ্বরের বেঘোরে, ঘোরপাকখাওয়া আধাচেতনার বিভীষিকার সৃষ্টি? পাঁশুটে, তামাটে, ঘোলাটে, ধোঁয়াটে এ কি?
হঠাৎ কানে গেল, রনাঁ ও নানেতে যেন আলাপ হচ্ছে।
‘নানেৎ।’
‘মন আমি (বন্ধু)’
‘দেখেছ?’
‘তুমি ছাড়া কি কেউ কখনো এমন সৃষ্টির কল্পনা করতে পারত?’
‘নানেৎ।’
‘প্যারিস, পৃথিবী তোমাকে রাজার আসনে বসাবে।’
না বন্ধু, আমার আসন চিরকাল তোমার পায়ের কাছে। নানেৎ, মা শেরি (প্রিয়তমে)।’
‘মন আমি।’
নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে এলুম। দেখি প্রভাতসূর্য ইফেল মিনারের কোমরে পৌঁচেছে। চোখাচোখি হতে যেন স্বপ্ন কেটে গেল।
‘রবেরের মুখে তাই–‘
হামেশাই;
‘নিশার প্যারিসে’ কভু হাবা ওরে, বলি তোরে, কাফে ছেড়ে বাহিরিতে নাই।’

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত