বিষাদ বেলা

বিষাদ বেলা

অামি অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হয়েছি শুনে বাবা অামাকে না জানিয়েই সজীবের পালা খাসিটা বিক্রি করে অামাদের সব প্রতিবেশীকে মিষ্টি খাওয়ালো

অার ঘটনাটা অামি জানলাম বাড়ি ফিরে। কারন অামি তখন মেসে ছিলাম। বাড়ি এসে দেখি সজীব মুখ ভাড় করে বসে অাছে। অামি ওকে অাদর করে গলা জড়িয়ে ধরে বললাম
-অামার ভাইয়াটার কি হয়েছে?
ও অভিমানী গলায় উত্তর দিল
-দাদাভাই, তুমি পাশ করলা কেন?ফেল করতে পারলা না?
অামিতো ওর কথা শুনে বোকা বনে গেলাম। হা করা মুখ নিয়ে বললাম
-অামার ভাই কি অামি পাশ করাতে খুশি হয়নি?
-না হই নাই। তুমি পাশ না করলেতো বাবা টুটুলরে(ছাগলের নাম)
বিক্রি করতো না।
টুটুল যে শুধু সজীবেরই প্রিয় ছিল তা না। অামিও যখন ছুটিতে বাড়ি অাসতাম টুটুল কি মমতায় অামার গায়ে মুখ ঘষতো! টুটুল কে বাবা বিক্রি করে দিয়েছে শুনে অামিও বেশ কষ্ট পেলাম। অার সজীবতো সব সময় লালন পালন করতো ওকে। ওর কতটা কষ্ট হচ্ছে সেটা অামি বুঝতে পারছি। বাবার উপর বড্ড রাগ হচ্ছে। অনার্স পাশ এ অার এমন কি! চাকুরি বাকুরি হলে সে অন্যকথা ছিল। এই পাশের জন্য বাবার ছাগল বিক্রি করে মিষ্টি খাওয়াতে হয়?
.
অামি যখন মনে মনে এই কথাগুলো ভাবছিলাম ঠিক তখনি বাবা কোথা থেকে যেন হাসি হাসি মুখ নিয়ে এসে অামাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-হাবিব, ওকে বুঝাতো তুই। অামার এই ছোট ছেলেটা কি বেক্কেলই রয়ে যায় কিনা কে জানে? বড় ভাই বড় পাশ দিছে, বি এ পাশ। কই সে খুশি হইবো। তা না; একটা ছাগলের জন্য কাইন্দা কাইন্দা শেষ হয়ে যাইতোছে। অাচ্ছা হাবিব, তুই ই ক দেখি, তুই অামার পোলা। এই রহমত চাষীর পোলা। তুই বি এ পাশ দিছস, তাও অাবার তিন নম্বর হইছিস, এইটা এলাকাবাসীরে জানাইতে হইবো না? অার এলাকাবাসীরে কি খালি হাতে জানানো যাইবো?
.
বাবা এটুকু বলে গভীর অাবেগে অামার কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পরম মমতায় তার দুই হাতে অাজলা ভরে অামার মুখটা ধরলো তারপর কাঁদো কাঁদো গলায় বললো
-বাজান, তুই অামার অান্ধার ঘরের প্রদীপ। গোবরে পদ্মফুল। তোরে অামি খেতে খামারে কাজ কইরা মানুষ করছি। তুই বড় পাশ দিছিস, এইবার তুই বড় চাকুরী করবি। এটুকু বলেই বাবা দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে বললো
-তুই তোর এই পাগলা ভাইটারে কইয়া দে যে, তুই চাকুরী কইরা ওরে সাইকেল কিইনা দিবি। সেই সাইকেলে টুং টাং বেল বাজায়া সে ইস্কুলে যাইবো।
সাইকেলের কথা শুনে সজীবের চোখ মুখে অানন্দের অাভা ফুঁটে উঠে। ও অামার গলা জড়িয়ে ধরে বলে
-দাদাভাই, সত্যি তুমি অামারে সাইকেল কিইন্যা দিবা?
অামি সজীবের কপালে একটা চুমু দিয়ে বলি
-হ্যারে ভাই, দিব।
.
বাবাও অামার কপালে একটা চুমা দিল তারপর সজীবের কপালে। তারপর বাবা লাঙ্গল কাঁধে অাবার মাঠে চলে গেল। অামি অপলক দৃষ্টিতে একটা শ্রমজীবী বাবার কাজে যাওয়ার দৃশ্য দেখছিলাম। সেই বাবা, যে কোনদিন অামাকে কাঁদা পানিতে হাত দিতে দেয়নি, গরুর রশিতে ধরতে দেয়নি, এমনকি অামাকে বাজারের ব্যাগটা পর্যন্ত বহন করতে দেয়নি। বাবার চিরকালই স্বপ্ন ছিল অামি বড় হয়ে বড় চাকুরী করে বাবার অভাব ঘুচাব। মায়ের গোল্ড ব্লাডারে পাথর। অপারেশন করাব। সজীবের সাইকেল কিনে দিব। ছোট বোনটাকে ভাল একটা ঘর দেখে বিয়ে দেব। অন্যের জমিতে কাজ করে বাবা পড়াশুনা করিয়েছে অামাকে। নিজেকে সব সময় বড্ড বেশী ঋনী মনে হয়। চাকুরির বাজার যে দামী! যদি অামার ভাল একটা চাকুরী না হয় তাহলে কিভাবে অামি অামার বাবার ঘামের দেনা শুধাব?
বাবা হয়তো ভাবছে অামি খুব সহজেই চাকুরী পেয়ে যাব। অার বাবা চায় অামি যেন চাকুরীই করি। অনেকবার অামি ছোট খাট ব্যাসা করবো বলে মনস্থ করেছি কিন্তু বাবা তাতে রাজী হয়নি। উনার ইচ্ছে উনার ছেলেকে বড় বড় লোকজন স্যার বলে ডাকবে। অামার বাবাকে অামার অধস্থন কর্মচারীরা দেখে বলবে ইনি অমুক স্যারের বাবা। কিন্তু অামার বাবার হয়তো বর্তমানের চাকুরীর বাজার সম্পর্কে ধারনা নেই। উনার সহজ সরল মন সব সময় এরকম ধারনাই পোষন করে যে, বড় পাশ দিলে বড় চাকুরী মিলে।
.
ইচ্ছে ছিল কিছুদিন বাড়িতে বাবা মাকে সময় দিয়ে ঢাকা গিয়ে চাকুরীর পড়াশুনা করব অার সেই সাথে বিভিন্ন কোম্পানীতে চাকুরীর চেস্টা করব। যেই কয়দিন চাকুরী না পাব এই কয়দিন অবারো অামার বাবার রক্ত ঘাম মেশানো টাকায় নিজের ভরন পোষন করতে হবে। একবার বাবার একটু চাপ কমাতে ভেবেছিলাম একটা-দুটো টিউশনী করাব কিন্তু ছাত্র ছাত্রীর বাবা মায়ের বিভিন্ন অাচার ব্যবহারে সে ইচ্ছে মরে গেছে। বাচ্চাদের পড়াতে গেলে বাবা মা এমন একটা ভাব ধরেন অার এমনভাবে গাইড দেন যেন অামাকে উনারা রোজের কামলার ন্যায় কিনে নিয়েছেন। এটা না ওটা পড়াও, অামার বাচ্চা ম্যাথ পারেনা ওকে ইংরেজি কম পড়িয়ে ম্যাথ ভাল করে পড়াও
তারপর ইংরেজিতে অাশি শতংশ নাম্বার না পেলে অাবার শুরু হয় টীচারেে দোষ। ৭০ পেল কেন? ৮০+ নাম্বার থাকলো না কেন? গনিত ম্যাথ দুটোতেই ভাল করলে অাবার ইসলাম শিক্ষাতে নাম্বার একটু কম পেলে বলবে, কি পড়াইলা বাবা তুমি?
খালি ম্যাথ অার ইংরেজি নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে? ইসলাম শিক্ষাতো সহজ সাবজেক্ট, এই বিষয়ে ৯০+ নাম্বার না পেলে হয়?
.
এতসবকিছুও বাবার মুখটা মনে করে সহ্য করে নিয়েছিলাম কিন্তু পড়ানোর সময় ছাত্রীর মায়ের পর্দার অাড়াল থেকে উঁকিঝুঁকি মাড়ার অভ্যাস অামার ভীষণ খারাপ লাগতো। এতটুকু বড় হয়েছি কেউ চরিত্র নিয়ে কথা বলতে পারেনি কিন্তু এখানে এসে নিজেকেও অন্য সব লোফার ছেলেদের কাতারে দাড় করাতে হচ্ছে। ফাইনালি টিউশন ছেড়েছিলাম এক ছাত্রর মায়ের নাস্তা নিয়ে খোটা দেওয়াতে। অামাকে বলেছিল বেতন দিবে ১০০০ টাকা কিন্তু মাস শেষে ৭০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো
-অার চেয়ো না। তোমাকে যে রোজ রোজ নাস্তাটা খাওয়াই সেটা কি তুমি হাজার টাকায় পেতে বলো?
.
এটা উনি ঠিক বলেছেন যে, উনি নাস্তা ভাল খাওয়াতেন কিন্তু অামিতো অামার নিজের পেটের জন্য টিউশনে যাইনি। গিয়েছি অামার বাবার দিকে তাকিয়ে। একজন অাদর্শ বাবার সন্তান হিসেবে এতগুলো ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা অামার ছিল না।
.
যাক সে কথা, বাড়িতে কিছুদিন থাকতে এসে অামি কখনো বুঝতে পারিনি অামার উপর অাল্লাহর এমন বদনজর পড়বে। বিকেলে বাবার অনুরুধে বাবার সাথে বাজারে গিয়েছিলাম। অটোতে যাচ্ছিলাম অামরা
। পথিমধ্যে একটা ট্রাকের ধাক্কায় অামি পায়ে ব্যাথা পেলাম। অামার চেয়ে বেশী পেল বাবা। নিজের সুস্থতা, বাবাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ঘরের বাজার করা ইত্যাদি দায়িত্ব অামার উপর পরলো। সজীবতো সবে সিক্সে পড়ে। অগত্যা কোন উপায় না দেখে অামি কিছুদিন বাড়ি থাকতে মনস্থ করলাম। কিন্তু অামার বাবা একজন দিনমজুর। অামিতো কাজও করতে শিখিনি। কি করে এ কয়দিন অামি পরিবারের ভরন পোষন করাব? চিন্তায় মাথা নুয়ে অাসছিলো। তবুও বাবা অামায় কাজে যেতে দিলেন না। বললো গরু ছাগল বিক্রি করে চলতে। গরুগুলোও অামাদের নিজের ছিলনা। দুটো গরু সত্তর হাজার বিক্রি করে অামরা পেলাম অাট হাজার। বাকী টাকা গরুর মালিকের।
.
এই টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসাও হবে না ঠিকমত

তবু কষ্ট করেই দিনাতিপাত করতে লাগলাম। একদিন খেতে বসে সজীব ভাত রেখে উঠে গেলো। কোন কথা বললো না। অামি জিজ্ঞাসা করলাম
-সজীব, খাবিনা ভাই? রোজ রোজ অালু ভর্তা অার হেলেঞ্চার শাক খাইতে ভাল লাগেনা।
.
সজীব কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো মাটিতে বেছানো চাটাইয়ে। অামার ভীষন কষ্ট হলো। অতটুকুন ছোট ভাই অামার ক্ষুধা পেটে নিয়ে শুয়ে পড়বে? খুব অপরাধ বোধ হলো নিজের কাছে। নিজেকে অনার্স পাশ ভাবতে লজ্জা বোধ হচ্ছে।
সজীবের শুয়ে পড়া দেখে অামিও ভাতের মধ্যে হাত ধুয়ে দিলাম। মা ফ্যাল ফ্যাল করে অামার দিকে তাকিয়ে অাছে। মায়ের চোখ কেমন লাল লাল দেখাচ্ছা অার চিক চিক করছে। বোধ হয় মায়ের চোখে কিছু পড়েছে, এই বলে মনকে চুপি চুপি শান্ত্বনা দিয়ে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। অামতা অামতা করতে করতে বড় জ্যাঠার ঘরে গিয়ে কড়া নারলাম। জ্যাঠা দরজা খোলল। মাথা নীচ দিকে রেখে বললাম
-জ্যাঠা, একটু তরকারী হবে? সজীবটা না খেয়ে শুয়ে পড়েছে।
জ্যাঠা হাসিমুখে অামাকে ভেতরে যেতে বললেন। তারপর একটা ছোট বাটীতে করে অাধা বাটী মুরগীর গোশতের তরকারী দিল। অামার খুশিতে মনটা ভরে গেল। জ্যাঠা অামাকে ভাত খাওয়ার জন্য জুড়াজুড়ি করলো। অামি খেলাম না। অামি ঘর থেকে বেরুতেই জ্যাঠা দরজা অাটকে দিল। অার সাথে সাথেই জ্যাঠীর চিৎকার শুনতে পেলাম। জ্যাঠাকে গালমন্দ করছে। কথাগুলো ছিল এমন
-তোমার ভাইয়েরতো খুব দেমাগ। কত কইরা কইলাম অামার রত্নাটারে হাবিবকে বিয়া করাতে। বিয়া কি অার এমনি এমনি দিতাম? ভাইজানরে কইয়া পোলার একটা চকুরীর ব্যাবস্থাওতো কইরা দিতাম। তবুতো তোমার দেমাগী ভাইয়ের দেমাগ কমলোনা। পোলারে নাকি জজ ব্যারিস্টার বানাইবো! কই অহন বানায় না কেন? অনার্স পাশ পোলায় অাইছে এখন সালুন মাগবার। হুহ

জ্যাঠা ফিসফিসিয়ে খালি একবার বললো
-অাস্তে রত্নার মা। পোলায় শুনবো।
.
অামি অার কিছু শুনার অপেক্ষা না করে ঘরে চলে এলাম। সজীবকে ডেকে তোলে গোশতর বাটীটা দেখালাম। ও বাটীটা দেখে “গোশত” বলেই একটা চিৎকার দিয়ে উঠলো। ওর চোখ দুটো অানন্দে চক চক করে উঠলো। দৌড়ে উঠে নিজেই থাল ধুয়ে ভাত খেতে বসলো। অামি অার মা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অাছি ওর মুখের দিকে।
সজীব প্রথম লুমকা মুখের কাছে নিল দারুন উত্তেজনায় কিন্তু পরক্ষনেই ও থেমে গেল। ও লুমকাটা মায়ের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
-মা, নেও। অাগে তুমি খাও।
মা খেতে চাইছেন না। সজীব জুড়াজুড়ি করে মাকে খাওয়াতে চাইছে অার বলছে
-মা, একবার মুখে নিয়ে দেখই না। গোশতের সালুন দিয়া ভাত কত্ত মজা।
অামি হাসতে হাসতে সজীবকে বললাম
-তুই কেমনে বুঝলি মজা? তুইতো এখনও এক লুমকাও খাসনি।
সজীব হাসিমুখে জবাব দিল
-দাদাভাই, গোশত যেমনেই রান্ধুন হোক না কেন, হগল সময়ই মজা হয়।
.
সজীবের জুড়াজুড়িতে মা এক লুমকা মুখে নিল। তারপর সজীব অামার দিকে এগিয়ে দিল। সজীব এক পিস মাংস নিজে নিয়ে অারেক পিস মাকে দেখিয়ে বললো
-মা, এটা নিপাবুরে দিয়া অাসো।
অামি মাকে যেতে না দিয়ে প্লেটে ভাত নিয়ে নিপার রুমে গেলাম। অামাদের দশ হাত লম্বা দুচালা ঘরে ঐ একটা মাত্রই পার্টিশান মাঝঘরে।এক পাশে নিপা থাকে। ওখানে ও একটা টেবিল অার চৌকি বিছিয়ে থাকে। অার অারেকপাশের চৌকিতে বাবা মা সজীবকে নিয়ে থাকে। অামি বাড়ি এলে সজীব অার অামি মাটিতে চাটাই পেতে শুই।
.
নিপার রুমে হাসি হাসি মুখে গিয়ে বললাম
-অামার বোনটা কি করে? তাকে এখন অামি নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দিব গোশত দিয়ে। নিপার চোখে লক্ষ করলাম পানি। ও চোখ মুছতে মুছতে বললো
-ঐ গোশত অামার গলা দিয়ে নামবেনারে দাদাভাই। তুই যখন জ্যাঠীর ঘরে গেলি অামি তখন টয়লেটে ছিলাম। অামি জ্যাঠীর সব কথা শুনছি।
মুহুর্তেই অামি নির্বাক হয়ে গেলাম। অামার খুশি খুশি মুখটা মলিন হয়ে গেল। অামার বোনটা অামাকে জড়িয়ে ধরে মুখ টিপে কাঁদতে লাগলো।
.
অামার জ্যাঠার ব্যাপারটা এবার একটু বলে নেই। জ্যাঠার দুই ছেলে মেয়ে।ছেলেটা ছোট অার মেয়ে বড়।জ্যাঠার ছেলে শিহাব ডিগ্রীতে পড়ে। বড় মেয়ে রত্না অাপা, যে অামার বছর তিনেকের বড়। চরিত্র অার অাচার ব্যবহার দুটোই খারাপ । সমানে ছোটখাট বিষয় নিয়ে ঝগড়া লাগে। রত্না অাপা কড়া কড়া কথার দ্বারা বহুদিন অামার সহজ সরল মায়ের চোখের পানি ঝড়িয়েছে। প্রথম যেখানে বিয়ে হয়েছিল সেখানে শ্বাশুড়ীর গায়ে জুতা ছুড়ে মাড়ার কারণে ছেড়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়বার বিয়ে হয়েছিল যে ছেলের কাছে সেই ছেলেকে জ্যাঠা নিজ খরচে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। এদিকে রত্না অাপা দেবরের সাথে খারাপ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এ কথা শুনে রত্না অাপার স্বামী দেশে এসে অারেক বিয়ে করে ফেলে অার তার দেবরও অার রত্না অাপাকে নেয়নি। অামার জ্যাঠা সুদ খায়। সেজন্য বাবার জ্যাঠাকে পছন্দ নয়।
.
বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর যখন পা একটু ভাল হলো তখন সিদ্ধান্ত নিলাম দু একদিনের মধ্যে চলে যাব। ঠিক তখনি একদিন সকালে কারো চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলো। উঠে উঠোনে দাড়িয়ে দেখি অামাদের এলাকার মেম্বার বাবার সাথে রাগ দেখাচ্ছেন। বাবা নাকি উনার কাছ থেকে জমির অাইল কাটবে বলে এডভান্স টাকা নিয়েছিল। এখনতো বাবা অার সে কাজ করতে পারবে না। তাই উনি চিল্লা পাল্লা করছে। উনার কথা হচ্ছে যে, বাবাকে উনি কন্টাক্ট করেছেন বলেই অন্য কারো সাথে কথা বলেন নি। এখন সব কাজের লোক ভাটি এলাকায় কাজ করতে চলে গেছে। এখন মেম্বার সাহেব পড়েছেন বিপাকে। বাবা যখন বললো যে, ছাগল বিক্রি করে টাকা ফেরৎ দিয়ে দিবেন উনি তাতেও রাজী না। উনার এক কথা, বাবা অসুস্থ তাতে কি? উনার দুই ছেলে অাছে না? ছেলেরা কাজ করবে। বাবাতো মেম্বার সাহেবের কথা শুনে হতবাক। যেই বাবা অামাকে কোনদিন বাজারের ব্যাগ বহন করতে দেয়নি সেই বাবা কি কখনো চাইবে যে, তার ছেলে মাটি কাটুক! অামি মেম্বার সাহেবকে অালাদা ডেকে নিয়ে বললাম। অাপনি চলে যান। একটু পরে অামরা দু ভাই অাসছি।
.
অামিতো কোনদিনও এসব কাজ করিনি। তাছাড়া অাইল কেটে কিছু মাটি নীচু জায়গায় নিয়ে ফেলে জমি সমান করতে হবে। তাই সজীবকে নিয়ে গেলাম। কিন্তু বাবাকে জানতে দেইনি যে অামরা মাটি কাটতে গিয়েছি। বাবা শুনলে ভীষন কষ্ট পাবে। দুই ভাই মিলে মাটি কেটেছি সারাদিন। রাতে বাড়ি ফিরতেই মা অামাদের দুই ভাইয়ের দুহাত গালে অাঁকড়ে ধরে সে কি কান্না! অামাদের হাতে ঠোসা পড়েছে। অামরা মাকে শব্দ করতে বারন করলাম। পিছে বাবা শুনে ফেলে। সে রাতে দু ভাইয়ের কেউই নিজ হাতে খেতে পারলাম না। অামাকে নিপা খাইয়ে দিল অার সজীবকে মা। মা অার নিপা দুজনেই বার বার চোখ মুছছিলো
। নিজের জন্য কষ্ট হচ্ছিলো না। কষ্ট হচ্ছিলো অামার অতটুকুন ছোট ভাইটার জন্য। অামি এমন অকর্মন্য যে, ছোট ভাইটাকে দিয়ে কাজ করালাম।
.
মাটি কেটে অামার হাতে ঠোঁয়া নেয়ায় অারো কয়দিন বাড়িতে থাকতে হলো। এর মাঝে বান্যি মেলার সময় চলে এলো। হাজীপুর বাজারের বান্যির দিন সবাই মুড়ি জিলাপী কিনে এনে খাচ্ছে

দেখলাম সজীব সোহরাব কাকুর ছেলের মুড়ি জিলাপী খাওয়া দেখছে খুব অাগ্রহ ভরা চোখে। ওর চোখেমুখে লোভের ছায়া। অামার ভীষন খারাপ লাগলো। সজীবকে ধরে এনে উল্টাপাল্টা থাপ্পর দিলাম দুটো অার বললাম
-এখনো ছোট অাছিস? তুই জিলাপী খাওয়া বাবু হইছিস? অন্যের খাওয়া দেখে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে লজ্জা করেনা তোর? সজীব কিছু বলছেনা। অপরাধীর মত নিচের দিকে তাকিয়ে অাছে। ওর চোখ দিয়ে অবিরাম জল ঝরছে। দু ফোঁটা জল গড়িয়ে অামার পায়ে পড়তেই অামি কেমন অাঁতকে উঠলাম। মনে হলো অামার কলিজায় কেউ ছুড়ি মেরেছে। অামি অার সজীবের দিকে তাকালাম না। দ্রুত পায়ে হেটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। ওমনি দেখি জ্যাঠীমা এক পুটলা জিলাপী নিয়ে হাসি হাসি মুখে অামাদের ঘরের দিকে অাসছেন। অামাকে দেখে দু পাটি বের করে অারো গাড়ভাবে হাসলেন। অামার হাতে জিলাপীর পুটলা দিয়ে বললেন
-নাও বাবা, বান্যির জিলাপি, সবাইরে নিয়া খাও।
অামি জ্যাঠীমাকে সজীবের হাতে পুটলাটা দিতে বললাম। অামার কেন যেন কিশ্বাস হচ্ছিল না যে কি করে জ্যাঠিমা এক পুটলা জিলাপি দিয়ে দিল! মনে মনে ভাবলাম হয়তো সজীবকে তখন ফ্যাল ফ্যাল করে সোহরাব কাকার ছেলের হাতের জিলাপি খেতে দেখে নিয়েছিল তাই দিয়ে গেছে। সজীবের হাতে জিলাপি দেখে অামার ভীষন ভাল লাগলো।
.
সজীব মন ভরে জিলাপি খেল। দেখে অামার কি যে তৃপ্তি লাগলো। অানন্দে অামার চোখে পানি চলে এল। বিকেলের দিকে একবার গেলাম জ্যাঠাদের ঘরে জ্যাঠীকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনি রত্না অাপা জ্যাঠীকে বলছে
-মা, পুরু গোষ্ঠী সু্দ্ধ ঐ কুকুর খাওয়া জিলাপি খেয়ে নিয়েছে।জ্যাঠীও সুর মেলালো। বললো
-কুকুরও কি অার যাই তাই মুখ দিয়েছে? একেবারে মাটিতে ফেলে দুপায়ে পাড়া দিয়ে তারপর চেটে চেটে খেয়েছে। অামি অার ও ঘরে না ঢুকে নিজ ঘরেই ফিরে এলাম। সজীব তখনো হাত চাটছে। অামি নিপাকে গিয়ে এ কথা বললাম। বলে পেছনে ফিরে দেখি বাবা। অামাদের দুই ভাই বোনেরইতো তখন গলা শুকিয়ে গেছে। বাবার পা তখন ভালর দিকে। তবে ডাক্তার অারো দু সপ্তাহ রেস্টে থাকতে বলেছে। বাবা অাস্তে অাস্তে অামাদের কাছে এসে বসলো। তারপর সজীব অার মাকেও ডাকলো

সবাই একসাথে বসে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাবার চোখে মুখে এক অাকাশ বিষাদ। অনেকদিন শেভ করেন না তাই মুখে দাড়ি গোঁফের জটলা। বাবা কিছুক্ষন চুপ থেকে হঠাৎই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় বললো
-অামি তোগোর অাকাইম্মা বাপ। অামি অামার পোলাপানগোরে পেট ভইরা খাওয়াইতে পারিনা। তোরা অামারে মাফ কইরা দিসরে বাজান। অামি কিছুই বলতে পারলাম না। কেবল দু হাতে মুখ চেপে ভীষন কান্না করলাম।
.
একদিন রাতে মায়ের প্রচুর পেট ব্যাথা শুরু হলো। মায়ের চিৎকারে অামাদের সবার ঘুম ভেঙে গেলো। মা মরে গেলাম, মরে গেলাম বলে চিৎকার করছিলো। নিপা অার সজীবও অাম্মার সাথে সাথে চিৎকার করছিল। অামি অার বাবা মাকে পানি খাওয়াচ্ছিলাম। মায়ের পেটে সরিষার তেল মালিশ করে দিচ্ছিলাম। একটা প্যারাসিটামলও খাইয়ে দিলাম। যদিও অামি জানতাম যে, প্যারাসিটামলে ভাল হবার ব্যাথা এটা না। মায়ের গোল্ড ব্লাডারে পাথর। অপারেশন না হলে ভাল হবে না। কয়দিন পর পরই মা এভাবে চেঁচায়। অামার দুঃখী বাবা অনেক চেস্টা করছেন মায়ের অপারেশনের খরচ যোগাতে কিন্তু উনি পেরে উঠছেন না।
.
পরদিনই মায়ের মাটির বেঙ্ক ভেঙে টাকা নিয়ে ঢাকায় চলে গেলাম। নানান দুশ্চিন্তা অার ক্লান্তিতে বাসে ঘুমিয়ে গেলাম। বাসের হেল্পারের ডাকে ঘুম ভাঙলো। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টিকেট দেখাবো এমন সময় দেখি প্যান্টের পকেট কাটা।
ঘুমের মধ্যে কোন পকেটমার এ কাজ করেছে হয়তো। অামার মধ্যে তখন হতাশার পাহাড় বয়ে যাচ্ছে। হেল্পার অবশ্য অামাকে দয়া করলো। অামাকে ঢাকা পোঁছে দিল। মেসে তখন সিট নেই অামার। বন্ধু রিয়াজুল মেসে গিয়ে উঠলাম। একেবারে খালি হাতে গিয়ে ওর মেসে উঠেছি দেখে সেও বোধ হয় তেমন খুশি হতে পারেনি। খুশি না হলেও কিছু করার নেই। অামার অার যাওয়ার জায়গা ছিল না। বন্ধুর টাকায় এক সপ্তাহ খেলাম। এরপর একটা কোম্পানিতে নিয়োগ দিল। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। জবটা হয়ে গেলে এক মাসেই সব দুঃখ মুছে যাবে। বন্ধুর থেকে একটা শার্ট ধার করে পড়ে গেলাম। কিন্তু ব্যাংক ড্রাফটের টাকাটা বন্ধু দিতে রাজী হল না
সাফ বলে দিল
-খাচ্ছিস, পড়ছিস এটাই কি যথেষ্ট না? অাবার টাকাও চাইছিস? দোস্ত শুক্রিয়া অাদায় কর অার লিমিট বজায রাখ। রিয়াজুলের কথায় অামি স্তম্ভি ফিরে পেলাম। ঠিকইতো বলেছে ও। ও যে অামাকে খেতে থাকতে দিচ্ছে সেটাইতো অনেক।
.
বাহিরে গিয়ে সোহরাব কাকার নাম্বারে বাবাকে ফোন করলাম। বললাম ৫০০ টাকা পাঠাতে। অামি এক ঘন্টা বিকাশ এজেন্টের দোকানে বসে অপেক্ষা করলাম। বাবা ঘন্টাখানেক পর বাজারে গিয়ে টাকা পাঠালেন। পুকুর পারের সাজনা গাছ বিক্রি করে টাকা পাঠিয়েছেন। যত সাজনা হয়েছে সব সাজনা নিয়ে যাবে এ চুক্তিতে। নিপা সাজনা খেতে খুব ভালবাসে। বাড়িতে থাকাকালীন ও একদিন বলেছিল
-দাদাভাই, এবার অনেক সাজনা হয়েছে। ইচ্ছেমত খেতে পারব। এবার বুঝি ওর অার সাজনা খাওয়া হলনা।
.
ব্যাংক ড্রাফট করে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। বিশাল অফিসে। অফিসের ভেতর ঢুকতেই নিজেকে কেমন বেমানান বেমানান লাগছে। সকাল এগারোটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত বসে থাকার পর অামার ডাক পড়লো। অামি ভেতরে গেলাম। অামাকে এমন কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হল যার একটিও অামার জানা ছিলনা। হাতে ফাইল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। বুঝে গিয়েছিলাম চিকুরীটা পাব না। এদিকে চাকুরী না হলে রিয়াজুলও ওর মেসে থাকতে দেবে বলে মনে হয়না। বাড়িতে অভাব অনটন। ওরাই ঠিকমত খেতে পড়তে পায়না তাই বাড়িতেও টাকা চাওয়া যাবেনা। মেসে যেতেই রিয়াজুল বললো, বাবা ফোন দিয়েছিল ওর মোবাইলে। অামার চাকুরীর ব্যাপারে জানতে চেয়েছে। বাবাকে এমন নিষ্ঠুর সংবাদটা কি করে দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাই অার বাবাকে ফোন দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না কিন্তু অামার বাবার কন্ঠটা শুনতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে। রিয়াজুলকে বললাম
-দোস্ত তুই একটু ফোন করে বাবাকে জানিয়ে দেতো অামার চাকুরীটা হবেনা সম্ভবত। অার লাউডস্পীকারে কথা বল যেন, বাবার কন্ঠটা শুনতে পাই।
অামি বেশ অাগ্রহ নিয়ে কথাগুলো বললাম কিন্তু রিয়াজুল মুখে বিরক্তির স্বর টেনে বললো
-অামার ফোনে টাকা নেই। এসব ফালতু ঢং নিজের টাকা দিয়ে কর গিয়ে।
তোর মোবাইল অাছে না?
.
চোখে যখন অন্ধকার দেখছিলাম তখন অামার পুরাতন এক ছাত্রীর বাসায় গিয়ে জানতে চাইলাম তারা তাদের মেয়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর রেখেছে কিনা।
ছাত্রীর মা জানায় তারা প্রাইভেট টিউটর রেখে দিয়েছে। অামি হতাশ বদনে যখন চলে যাচ্ছিলাম তখন ছাত্রীর মা অাবার পেছন থেকে ডাকলো
-তোমার কি টাকার সমস্যা?
-জ্বি না মানে অান্টি…..
-ভেতরে এসো।অল্প কিছু খেয়ে যাও।
খাওয়ার কথা শুনে লোভ সামলাতে পারিনি। এই অান্টি খাওয়ায় ভাল। অাগেও বলেছি উনি খাওয়ার জন্য অামাকে তিনশো টাকা কম দিতে চেয়েছিলেন একবার। রিয়াজুলের মেসে উঠে এক প্লেট ভাতের বেশী খেতে পারিনি কখনো। অার যেহেতু একজনের তরকারী দুজন মিলে খেতাম তাই তরকারীও অল্পই ছিল। কোন কোন বেলা অামার জন্য তরকারীও থাকেনা শুধু ডালটা থাকে। এঁটো পানির মত সেই ডাল দিয়েই কয়েকবেলা পেটের ইঁদুর দৌড়ানো বন্ধ করেছি।তবু অামি ভাবি অামার বন্ধু রিয়াজুল অনেক বড় মনের মানুষ। ও থাকতে না দিলে কোথায় যেতাম অামি!
.
কতদিন পেট ভরে খাইনা। অান্টি হয়তো পেট ভরে ভাত খাওয়াবে ভেবেই ভেতরটা কেমন নেচে উঠলো অামার। অামি একবারও না করলাম না। এমনভাবে বাসায় ঢুকলাম যেন এ বাসায় অামার খাবার প্রাপ্য। অামি অান্টির অনুমতি ছাড়াই বাথরুমে গিয়ে হাত পা ধুয়ে নিলাম। অামার অার তর সইছেনা। চোখের সামনে গরম ভাতের ছবি ভেসে উঠছে বার বার। অামি হাত পা ধুয়ে এসে ড্রাইনিং রুমে বসলাম। অান্টি বললেন
-অাচ্ছা বাবা, শেফালী(কাজের মেয়ে) খাবার নিয়ে অাসতে অাসতে তোমার সাথে কাজের কথাটা বলেই ফেলি।অান্টির মুখে অাবারো খাবার কথাটা শুনে বেশ ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে খাবার জিনিসটা হীরা পান্না টাইপ কিছু। অার এই মুহুর্তে অামার পেটে এত ক্ষুধা যে, অামার মনে হচ্ছে কেউ অামাকে একটা চাকুরী দিলেও অামি এতটা খুশি হব না যতটা খুশি কেউ পেট ভরে খাওয়ালে হব। অান্টি অামাকে উনার ছয় বছরের বাচ্চাকে স্কুলে অানা নেয়ার কাজ দিতে চাইলেন। যে এই কাজটা করবে তার কাছেই অান্টি উনার ছেলেকে পড়াবে। বলেছে বেতনও ভাল দেবে। এই মুহুর্তে খাওয়ার লোভে অামি ভাল মন্দ কিছু বিচার বিবেচনা না করেই রাজী হয়ে গেলাম। অান্টির মুখে হাসি ফুটলো। সেই সময় শেফালী একটা ট্রেতে করে এক কাপ চা অার তিনটা শুকনো টোস্ট বিস্কুট নিয়ে এলো। অামার অার খাওয়ার রুচি হলোনা। অামি না খেয়েই চলে এলাম। অান্টি পেছন থেকে ডাকলো কিন্তু অমার অার সাড়া দিতে ইচ্ছে হল না। প্রায় দু কিলো রাস্তা হেটে রিয়াজুলের মেসে গেলাম। গিয়ে দেখি দুপুরের খাবার ও একাই খেয়ে নিয়েছে। অল্প ভাত পর্যন্ত নেই অামার জন্য। অামি খাবারের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললো
-তুই না তোর এক্স ছাত্রীর বাসায় গেলি?অামিতো ভেবেছি ওখান থেকে খেয়ে অাসবি।
.
অামি অার কিছু বললাম না। পেটে প্রচুর ক্ষুধা নিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়িতে দেখলাম অাড়াইটা বাজে। অামার প্রচুর পেট ব্যাথা শুরু হলো। রিয়াজুলকে ডেকে একটা সেকলো টেবলেট দিতে বললাম। ও বললো একটা টেবলেটই অাছে। সকালে ওটা না খেলে নাকি ও নাস্তা করতে পারবে না।এটুকু বলেই ও ঘুমিয়ে গেল।
অামার পেটের ব্যাথায় চিৎকার দিতে ইচ্ছে হলো। রিয়াজুলকে বার বার বলা সত্বেও ও যখন ট্যাবলেট দিচ্ছিল না তখন রাগে অামি ওকে ঘুমের মধ্যেই বেশ কয়টা কিল ঘুষি দিলাম। ওর গলা চেপে ধরলাম। তারপর ও টেবলেট দিল। সেটা খেয়ে পাক্কা দুই গ্লাস পানি খেলাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রিয়াজুলের মেস ছেড়ে চলে গেলাম। অান্টির ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার অফারটা গ্রহন করলাম। অান্টির কাছ থেকে দুশো টাকা এডভান্স নিয়ে হোটেলে গিয়ে ভাত খেলাম। রাতে থাকার কোন জায়গা না পেয়ে অগত্যা রিয়াজুলের মেসেই গেলাম। গিয়ে দেখি রিয়াজুল মেসে নেই। গ্রামে চলে গেছে। তাড়াহুরা করেই নাকি ওর বোনের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। অামি মেস থেকে বের হব এমন সময় অামার ফোন বেজে উঠলো। রিয়াজুল ফোন দিয়েছে। রিসিভ করতেই ওর বাড়ির ঠিকানাটা দিয়ে দ্রুত চলে যেতে বললো সেই সাথে অামাকে দুই হাজার টাকাও পাঠিয়ে দিল। ঘটনার অাকষ্মিকতায় অামি হতবম্ভ হয়ে গেলাম। তবু থাকার জায়গা নেই ভেবে রিয়াজুলের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
রাত দুটোর দিকে রিয়াজুলদের বাড়ির কাছের স্টেশনে পৌঁছালাম। রিয়াজুল অামার জন্য বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল সেখানে। ও অামাকে ওদের বাড়ি নিয়ে গেলো। সবাই অামাকে জামাই অাদর করে বরন করলো। অামি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। অামি গোসল করে পেট ভরে বিয়ে বাড়ির খানা খেলাম। অামাকে দেখতে অনেকেই ভীড় করেছে। অামার সবকিছু কেমন গোলমাল লাগলো। পরসমাচারে যা জানতে পারলাম তা হল যে, রিয়াজুলের বোনের বিয়েটা একটা দুর্ঘটনায় ভেঙে গেছে। অামাকে এখন ওর বোনকে বিয়ে করতে হবে অার বিনিময়ে রিয়াজুলের বাবা যে করেই হোক অামার একটা চাকুরীর ব্যাবস্থা করবে।
.
রিয়াজুলদের অনেক টাকা পয়সা। ওর বাবা এলাকার মেম্বার।
যদিও বাবা মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করাটা অন্যায় এই বোধটা অামার মধ্যে ছিল তবু অামার তখন যে খারাপ অবস্থা তাতে বিয়েটা করে ফেললে জীবনের একটা গতি হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল। তাছাড়া রিয়াজুলের বোন একটু কালো হলেও দেখতে খারাপ না। যদি এই সমস্যাটা না হত তাহলেতো রিয়াজুলের বোনকে কখনো অামার সাথে বিয়ে দিত না। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে, বিয়েটা অামি করে নিব। পরে বাবা মাকে কোনরকমে মানিয়ে নিতে পারব।
.
রিয়াজুলের বোন রাহাকে বিয়ে করে ফেললাম। অামাদের বাসরও অনেক অনেক ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। অামাকে সাহেবী অাদর যত্ন করা হচ্ছে। গতকাল বন্ধু রিয়াজুলের ব্যবহার অার অাজকের বরগিরি রিয়াজুলের ব্যবহারে কত পরিবর্তন! অামাকে সাহেবী খাওয়া দেয়া হলো সকালের নাস্তায়। কিন্তু খাবার খেতে বসেই অামার সজীব,নিপা,বাবা-মার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। তাই খিদে নেই বলে না খেয়েই উঠে পড়লাম। সবাই অামাকে খাওয়ার জন্য সে কি জুড়াজুড়ি! অামি পাত্তা দিলাম না। বাবার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল।
.
রিয়াজুল অামাকে নিয়ে ওদের উপজেলার মার্কেটে শপিং করতে নিয়ে গেল। অনেক শপিং করে দিল। একটা ব্লেজারের অর্ডারও দিয়ে এলো। এক সপ্তাহ রিয়াজুলদের বাড়ি থাকার পর অামি ব্লেজার পরে বাবা মাকে দেখতে গেলাম। শ্বশুড় অাব্বা অামার হাতে কড়কড়া এক হাজার টাকার দশটা নোট ধরিয়ে দিলেন। তবু অামি রিয়াজুলের থেকে চেয়ে অারো পাঁচ হাজার টাকা নিলাম সজীবের জন্য সাইকেল কিনব বলে। রিয়াজুলকে বললাম চাকুরী করে ওর দেনা শোধ করে দেব। ও অামার পিঠ চাপড়ে বললো
-দেনা কিসের রে? তুইতো এ বাড়ির জামাই। এ বাড়ি তোর কাছে ঋনী, তুই না।
.
অামি সবার জন্য অল্প শপিং করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সাইকেল দেখে সজীব কি পরিমান খুশি হবে ভাবতেই অামার মনে অানন্দ দোল খাচ্ছিল।
.
জীবনের প্রথম অনেক ভাল লাগা নিয়ে বাড়ি প্রবেশ করলাম। গিয়ে দেখি অামাদের ঘরের সবাই গালে হাত দিয়ে দাওয়ায় বসে অাছে। ভেবেছিলাম অামাকে দেখে সজীব দৌড়ে এসে বলবে
-ও মা দেখ। দাদাভাইরে কেমন বাবু সাহেবের মত লাগতাছে।
নিপা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে। মা-বাবা সজীবের সাইকেল দেখে খুশি হবে কিন্তু না। তা হল না। বাড়ি গিয়ে অামি যা শুনলাম তা শুনার জন্য অামি প্রস্তুত ছিলাম না। নিপা নাকি প্রেগন্যান্ট। অার এর জন্য দায়ী জ্যাঠার ছেলে শিহাব। জ্যাঠী দাবি দিয়েছে যদি অামি রত্নাকে বিয়ে করি তবে শিহাবকেও নিপাকে বিয়ে করাবে। এ ছাড়া না।
.
অামি স্তব্দ হয়ে গেলাম। অামার কলেজ পড়ুয়া বোন এমন একটা ভুল কি করে করলো বুঝতে পারছিনা। অামার শরীর যেন অাস্তে অাস্তে রক্তশূন্য হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে অাসছে,মাথাটা প্রচুর ব্যাথা করছে, বুকটায় ভীষন জ্বালাপুড়া হচ্ছে। এ সমস্যার কোন সমাধান খোঁজে পাচ্ছি না অামি। অাস্তে অাস্তে হাটতে হাটতে গিয়ে অামি অাকাশের দিকে মুখ করে তাকালাম। তারপর যিনি অাকাশে থাকে তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললাম
-রিমোট কন্ট্রোল তোমার হাতে বলে যা ইচ্ছা তাই করবে তুমি? অামাকে এ সমস্যার একটা সমাধান দাও,দাও,দাও।
হঠাৎ করেই ঘর থেকে মায়ের চিৎকারের অাওয়াজ শুনা গেল
-ওরে নিপারে, মারে অামার,এইটা কি করলিরে তুই মা?কথা ক মা,একবার অামার লগে কথা ক।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত