মামসিয় ন্যাড়া

মামসিয় ন্যাড়া

বহুকাল আগে মামসিয় নামে এক ন্যাড়া ছিল। এই পৃথিবীর বুকে তার সহায় সম্পদ বলতে কিছুই ছিল না শুধুমাত্র তার বৃদ্ধা মা ছাড়া। সেই মাকে মামসিয় একদিন জিজ্ঞেস করলো: আচ্ছা মা! বাবাকে আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন! উনি আমার জন্য কি কোনো মিরাসই রেখে যান নি মানে জায়গা-জমি, টাকা-পয়সা, মাল-সামানা ইত্যাদি?

বৃদ্ধা বললেন: ‘কেন, রেখে গেছেন তো! ওই যে দেয়ালে ঝুলছে একটা বন্দুক! ওটা তোমার বাবার ছিল’। মামসিয় দেয়াল থেকে বন্দুকটা পেড়ে তার কাঁধে নিলো এবং রাতের আঁধারে বাইরে বের হলো শিকার করতে।

সামান্য পথ যেতেই তার নজরে পড়লো অদ্ভুত একটা প্রাণী। ওই প্রাণীটার এক পাশে আলো জ্বলে অন্যপাশে মিউজিক বাজে। মামসিয় ওই প্রাণীকে লক্ষ্য করে গুলি করলো। একটু পরে সামনে এগিয়ে দেখলো প্রাণীটা মারা যায় নি তবে আহত হয়েছে। মনে মনে বললো: এই প্রাণীটাই আমাদের জন্য অনেক কিছু। ওকে বাসায় নিয়ে যাবো। তার শরীরের আলো ব্যবহার করবো আর মিউজিক উপভোগ করবো। এই বলে সে প্রাণীটাকে কাঁধে নিয়ে রওনা হলো বাড়ির দিকে। বাসায় পৌঁছে ঘরের দরোজায় ঠক ঠক শব্দ তুলতেই মা উঠে এসে জিজ্ঞেস করলো: এতো রাতে কে এল আবার। মামসিয় বললো: আমি তোমার ছেলে মা!

মা বললেন: এতো তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে! খাবারের ব্যবস্থা করে না এলে কিন্তু দরোজা খুলবো না আমি। মামসিয় বললো: খালি হাতে আসি নি মা! এমন এক প্রাণী শিকার করেছি পৃথিবীর কোনো বাদশাও এরকম প্রাণী শিকার করতে পারে নি কোনোদিন। দরোজা খোলো মা! তেলের কুপি বাতি আর জ্বালাতে হবে না তোমার। ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

বৃদ্ধা ঘরের দরোজা খুলে দিলো। দেখলো তার ছেলে একটা প্রাণী শিকার করে এনেছে যার একপাশে আলো জ্বলে অপর পাশে মিউজিকের শব্দ হচ্ছে। মামসিয় জন্তুটাকে ঘরের ভেতর নিয়ে রাখলো রুমের উপরের কার্নিশে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকিয়ে। এরপর মামসিয় পায়ের ওপর পা রেখে সকল দুশ্চিন্তা আর টেনশনমুক্ত হয়ে পার্থিব জগতের হিসাব-কিতাব মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়ে একটু প্রশান্তির হাই তোলার চেষ্টা করলো। এমন সময় ঘরের দরোজায় ঠক ঠক শব্দ করলো কেউ।

এক বৃদ্ধ মহিলা! মামসিয়র ঘরে ওই প্রাণীটাকে দেখতে পেল এবং দ্রুত গিয়ে বাদশাকে জানিয়ে দিলো এবং বললো: হে বাদশাহ! এই প্রাণী তো আপনার কাছেই শোভা পায় ওই ন্যাড়া মামসিয়র ঘরে নয়। তাহলে কেন বসে আছেন এখনও। বাদশাহ তাড়াতাড়ি করে পেয়াদা পাঠিয়ে দিলো মামসিয়র বাড়িতে এবং তাকে নিয়ে আসা হল বাদশাহর কাছে। বাদশাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো: তুমি প্রথমবারের মতো শিকারে গিয়েই অদ্ভুত একটা প্রাণী নিয়ে এসেছো শুনলাম। ওই প্রাণীটা নাকি এমন যে কেবল বাদশাহর জন্যই সেটা মানায়, ঠিক আছে?

মামসিয় তার দু’চোখে হাত রেখে বললো: জি বাদশাহ সালামাত! আপনি যথার্থ খবরই শুনেছেন।

বাদশাহ বললো: তাড়াতাড়ি যাও! ওই প্রাণীটা নিয়ে আসো! ওটা তোমার মতো মানুষের জন্য নয়।

বাদশাহর আদেশ শুনে মামসিয় তার দুই হাত দু’চোখের ওপর রেখে বললো: জি বাদশাহ নামদার! আপনি যথার্থই বলেছেন! আমি এক্ষুণি যাচ্ছি আমার শিকার করা প্রাণীটা নিয়ে আসছি আপনার জন্য। মামসিয় প্রাসাদের বাইরে গিয়ে দ্রুত ফিরে গেল ঘরে এবং তার শিকার করা প্রাণীটা নিয়ে এলো বাদশার দরবারে। বাদশাহ মনে মনে ভাবছিল মামসিয়কে কী পুরস্কার দেওয়া যায়। ভেবে কোনো সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পারলো না বাদশা না। অবশেষে তার চোখ পড়লো মন্ত্রীর ওপর। সঙ্গে সঙ্গে চীৎকার করে বাদশাহ বলে উঠলো: হ্যাঁ! পেয়ে গেছি! ‘মন্ত্রী’! মন্ত্রী বললো: বাদশাহ সালামত! কী পেয়েছেন?

বাদশাহ বললো: মন্ত্রিত্ব! তোমার মন্ত্রিত্বটা তাড়াতাড়ি মামসিয়কে দিয়ে দাও! এই ছাড়া মামসিয়র জন্য আর কোনো পুরস্কার আমি খুঁজে পেলাম না। মন্ত্রী বললো: ঠিক আছে! তবে আজ রাতে না। কাল তাকে মন্ত্রিত্ব বুঝিয়ে দেবো।

মন্ত্রী এইটুকু সময় নেওয়ার একটা কারণ ছিল। কারণটা হলো এই মন্ত্রীর একটা যাদুর টুপি ছিল। টুপির নাম ছিল বাবা টুপি।মন্ত্রী যখনই কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তো এই টুপির সঙ্গে পরামর্শ করতো এবং সমাধান হয়ে যেত। মন্ত্রী দ্রুত ওই টুপির সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য বেরিয়ে গেল। বাবা টুপিকে জিজ্ঞেস করলো: তুমি তো দেখছো আমি কী সমস্যায় পড়েছি। জানি না কোত্থেকে হুট করে এই মামসিয়র উদয় হলো। এখন সে আমার মন্ত্রিত্ব খেয়ে ফেলতে চাচ্ছে। তুমি বলো তো কী করে আমি আমার মন্ত্রিত্ব এই ন্যাড়াকে দেই, যে ন্যাড়া মন্ত্রিত্ব সম্পর্কে কোনো ধারনাই রাখে না!

যাদুর টুপি বলে উঠলো: হে মন্ত্রীবর! চিন্তা করো না! এই সমস্যার সমাধান তো পানির মতো সহজ। কাল বাদশার দরবারে যাও! বাদশাহকে বলো: আপনি যদি এই মামসিয় সম্পর্কে জানতে চান তাহলে তাকে আপনার জন্য চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ নিয়ে আসতে বলো। আর তুমি তো জানোই! চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ আনতে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না। পরদিনই ভোরে ভোরে মন্ত্রী গিয়ে হাজির হলো বাদশার কাছে। বাদশাহ তাকে দেখে বললো: এতো ভোরে কেন এসেছো! মন্ত্রী বললো: বাদশাহ সালামাত! আমি রাতের বেলা একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে দেখলাম আপনি মামসিয়কে পরীক্ষা করার জন্য চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ আনতে পাঠিয়েছেন। ন্যাড়া মামসিয়ও গেছে আপনার জন্য দুধের সন্ধানে। আপনি এখন এক কাজ করুন! ওকে দুধ আনতে পাঠিয়ে দেন। এই ফাঁকে আমরা স্বপ্নের তাবির নিয়ে ভাবি।#

‘মামসিয় ন্যাড়া’ (২)

বাদশাহ উজিরের কথা শুনে হাসতে হাসতে বললো: ভালোই স্বপ্ন দেখেছো মন্ত্রী। তুমি তো নিজেই জানো চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ আনতে পাঠিয়ে আমাদের অর্ধেক সৈন্যকেই হারিয়েছি। আমাদের কোনো লাভ হয় নি। আর তুমি এখন বলছো একটা ন্যাড়াকে পাঠাবো, তাও একা! কী করবে ও!

মন্ত্রী বললো: যে প্রথম শিকারে গিয়েই এমন অদ্ভুত জানোয়ার শিকার করতে পারে যার একপাশে আলো জ্বলে অপর পাশে বাজে মিউজিক, তার জন্য এ কাজ মোটেই কঠিন নয়।

বাদশাহ ভাবলো উজির তো একেবারে অসংলগ্ন বলছে না। তিনি আদেশ দিলেন যেন ন্যাড়াকে নিয়ে আসা হয়। তাই করা হলো। মামসিয়কে নিয়ে আসার পর সে বাদশাকে বললো: বাদশাহ সালামত! আমি তো নিজেই আসতাম আপনার খেদমতে। আমাকে পুরষ্কৃত করার জন্য এতো তাড়াহুড়ার দরকার তো ছিল না।

বাদশাহ বললো: তোমার পুরষ্কার তো রয়েছে ঠিকই। তবে পুরষ্কার গ্রহণ করার আগে আমার জন্য তুমি চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ নিয়ে আসো!

মামসিয় মনে মনে বললো চল্লিশ মাদি ঘোড়া মানে কী? আমাকে কেন এ কাজে পাঠানো হচ্ছে? কিন্তু মুখে কিছু বললো না। উল্টো বরং বাদশাকে বললো: ‘ঠিক আছে। এক্ষুণি যাচ্ছি’।

তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে গেল এবং মাকে বললো: মা! ওঠো! একটা রুটি আমার রুমালে দিয়ে দাও। এক্ষুণি বেরুতে হবে।

বৃদ্ধ মা বললো: বাবা! ওরা তোমাকে মেরে ফেলতে চায়। বহু পালোয়ান এ পর্যন্ত এ কাজে গিয়ে মারা গেছে। তারপরও তুই কী করে চল্লিশ মাদি ঘোড়ার দুধ আনতে সাহস করছিস?

মামসিয় বললো: উপায় তো নেই মা! এ পথে যদি আমার প্রাণও যায় কিচ্ছু করার নেই, যেতেই হবে,বাদশাহর আদেশ।

মা বললো: তুই বাদশাকে গিয়ে বল তোকে যেন চল্লিশ মশক শরাব, চল্লিশ বোঝা চুনাপাথর আর চল্লিশ বস্তা তুলা দেয়।

মামসিয় ফিরে যায় বাদশার দরবারে। মায়ের কথা অনুযায়ী ওইসব বুঝে নিয়ে ফিরে যায় মায়ের কাছে। মা তাকে বলে: বাবা! শরাব,চুনা আর তুলা নিয়ে চলে যাও সমুদ্রের কাছে। সেখানে উপকূলে একটা বড় হাউজ বানাবে এই চুনা আর তুলা দিয়ে। ওই হাউজে শরাব ঢালবে। তারপর ওর আশেপাশে একটা গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে থাকবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবে আকাশ কালো করে মেঘ ধরেছে এবং বিজলি চমকাচ্ছে। সমুদ্রের পানি উথলে উঠছে এবং পাহাড়ের মতো এক রূপকথার মাদি ঘোড়া উঠে আসছে সমুদ্রের বুক চিরে। তার পেছনে পেছনে আরও উনচল্লিশটি ঘোড়ার বাছুর উঠে আসছে। তারা সমুদ্র থেকে উঠে এসে সবুজ ঘাসের চারণভূমিতে চরে বেড়াবে।

বিশাল ঘোড়া আর তার বাচুরগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়বে এবং পানির সন্ধানে ফিরে আসবে হাউজের দিকে। তুমি সাবধানে থাকবে। কিছুতেই যেন তোমাকে দেখতে না পায়। চল্লিশ ঘোড়া শরাবের হাউজের পাশে আসবে এবং পানির গন্ধ শুঁকবে তারপর ফিরে যাবে। আবারও তৃষ্ণা পাবে এবং হাউজের শরাবের গন্ধ শুঁকে ফিরে যাবে চারণভূমিতে। তৃতীয়বারের মতো তারা ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে ফিরে আসবে এবং সবাই পেটপুরে ওই শরাব খাবে। এ সময় তুমি খুব ক্ষিপ্র গতিতে লাফ দিয়ে ওই বড় মাদি ঘোড়াটার পিঠে চেপে বসবে। এরপর হাতে শক্ত মুষ্টি করে জোরে ঘুষি মারবে ঘোড়ার কপালে। ঘোড়া কিন্তু বাতাসের গতিতে ছুটবে এবং তার সাথে বাচ্চাগুলোও’।

মামসিয় মায়ের কথামতো সবকিছু করলো। সমুদ্রের তীরে হাউজ বানিয়ে শরাব দিয়ে পূর্ণ করলো। এরপর সত্যি সত্যি মেঘ করলো আকাশে। সমুদ্র উথলে উঠলো এবং পাহাড়ের মতো বিশাল মাদি ঘোড়া উঠে এলো সমুদ্রের ভেতর থেকে। চারণভূমিতে চরে বেড়িয়ে দুই দুইবার পানির সন্ধানে হাউজে এসে শুঁকে চলে গেল এবং তৃতীয়বারে পেট পুরে শরাব খেল। মামসিয় এবার মায়ের কথামতো জোরে হ্রেষাধ্বনি তুলে বাতাসের গতিতে চড়ে বসলো ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়া ছুটলো বাতাসের বেগে। সেইসঙ্গে তার বাছুরগুলোও। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পৌঁছে গেল শহরে। সেখান থেকে সোজা চলে গেল তাদের বাড়িতে। ঘোড়ার দুধ দুইয়ে নিয়ে পাঠিয়ে দিলো বাদশাহর জন্য।

এদিকে মামসিয়র মা যখন দেখলো চল্লিশ ঘোড়া নিয়েই তার ছেলে এসে হাজির, তাড়াতাড়ি বাদশার দরবারে গিয়ে খবরটা দিলো। বললো: মামসিয় শুধু চল্লিশ ঘোড়ার দুধই আনে নি বরং ওই ঘোড়াগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে তার ভাঙাচোরা ময়লা বাড়িতে। বাদশাহ সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিলো মামসিয়কে নিয়ে আসার জন্য। মামসিয় এলে তাকে জিজ্ঞেস করলো: তুমি নাকি চল্লিশ মাদি ঘোড়াকেও নিয়ে এসেছো!

মামসিয় বললো: বাদশাহ এবারও যথার্থ খবরও পেয়েছো।

বাদশাহ বললো: সেগুলোকে নিয়ে আসো আমাদের এখানে।

মামসিয় ঘোড়াগুলোকে নিয়ে এলো এবং বাদশার আস্তাবলে রেখে দিলো। বাদশাহ এবার উজিরকে বললো: এবার তো তোমার পদটা মামসিয়কে দিতেই হয়।

উজির বললো: জি হুজুর! তবে আজ না, কাল।

উজির ধৈর্য ধরলো এবং রাতের বেলা বাবা টুপিকে বললো: তুমি তো জানো আমি আমার মন্ত্রীত্ব ছাড়তে পারবো না। তাও আবার এমন একজনের হাতে যার এই পৃথিবী সম্পর্কে মানুষ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। খোদা জানে এই আপদ কোত্থেকে উদিত হয়েছে আমার মন্ত্রীত্ব খাওয়ার জন্য। এখন বলো কী করবো আমি। মেরে ফেলো আমাকে।

বাবাটুপি উজিরের অবস্থা দেখে বললো: অ্যাতো উতলা হচ্ছো কেন। এর সমাধান তো পানির চেয়েও সহজ। শোনো! কাল ভোরে ভোরে বাদশার দরবারে গিয়ে বলবে মামসিয়কে যেন বলে ওই ড্রাগনটাকে মেরে ফেলতে যে বাদশার অর্ধেকের মতো সিপাহিকে মেরে ফেলেছে। বলো একাজের জন্য একমাত্র মামসিয়র মতোই পালোয়ানই উপযুক্ত।

বাবাকোলার কথা শুনে উজিরের মুখে হাসি ফুটলো। #

‘মামসিয় ন্যাড়া’ (৩)

ভোরে ভোরে মন্ত্রী বাদশার দরবারে গিয়ে হাজির। বাদশাকে বললো: আমি রাতে স্বপ্নে দেখলাম আপনি মামসিয়কে পাঠিয়েছেন ড্রাগনকে হত্যা করতে। মামসিয় গিয়ে সত্যি সত্যি ড্রাগনকে মেরে ফিরে আসে। আপনি ওকে পাঠিয়ে দেখুন….

বাদশাহ এ কথা শুনে হেসে দিয়ে বললো: তুমি জানো,কী বলছো তুমি?

আমার সেনাবাহিনীর অর্ধেকেরও বেশি সদস্য মারা গেছে এই ড্রাগনকে মারতে গিয়ে। অথচ ড্রাগনের একটা পশমও কেউ ছিঁড়তে পারে নি। আর তুমি বলছো ওই মামসিয়কে একা পাঠাবো ড্রাগনকে মারতে। হা..হা..হা….

মন্ত্রী বললো: বাদশাহ সালামত! যে মামসিয় প্রথম শিকারেই আজব জন্তু নিয়ে এসেছে এবং চল্লিশ ঘোড়ার দুধ আনতে পেরেছে তার জন্য এ কাজ মোটেই কঠিন নয়।

বাদশাহ এবার ভাবলো মন্ত্রী তো একেবারে অযৌক্তিক বলছে না। তাই মামসিয়কে ডেকে পাঠালো এবং বললো: হে মামসিয়! তোমাকে আমার মন্ত্রী বানাবো এক শর্তে,যদি তুমি ওই ড্রাগনের অত্যাচার থেকে আমাদের বাঁচাতে পারো! মৃত কিংবা জীবিত ড্রাগনকে যদি নিয়ে আসতে পারো।

মামসিয় মনে মনে বললো: ‘আমার মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত এরা ছাড়বে না’। এরপর চলে গেল মায়ের কাছে এবং সব কিছু খুলে বললো। মা বললো: এই ড্রাগনকে মারতে গিয়ে কতো শতো সেনা মারা গেল। ওই মন্ত্রী আসলে চাচ্ছে তোমাকে মেরে ফেলতে।

মামসিয় বললো: কিন্তু মা করার তো কিছু নেই,মরে গেলেও যেতেই হবে। তুমি বরং আমাকে দিক-নির্দেশনা দাও কীভাবে কী করবো!

বৃদ্ধা মা বললো: যাবিই যদি তাহলে শোন। ড্রাগনটা দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বিশাল। পর্বতের পাদদেশে একটা গর্তে সে ঘুমিয়ে থাকে। রাস্তার মাথায় গিয়ে দেখবে উঁচু একটা পাহাড়। ওই পাহাড়ের উপরে যাবে। উপরে গেলে দেখবে কোনো কিছুই শান্ত নেই। সবকিছুই অস্থির। গাছপালা পশুপাখি জীবজন্তু সবাই সচল অবস্থায় আছে।

এ সময় যদি পর্বতের পাদদেশে পা রাখো তবে তুমি ধীরে ধীরে ঢুকে যাবে ড্রাগনের পেটে আর কোনোদিন সেখান থেকে বের হতে পারবে না। তাই তুমি সেখানেই মানে পাহাড়ের চূড়াতেই অবস্থান করবে। যতক্ষণ না ড্রাগন ঘুমিয়ে পড়ছে এবং সবকিছু স্থির শান্ত হচ্ছে ততক্ষণ তুমি অপেক্ষা করো। যখন দেখবে পাখি ঠিকমতো উড়ছে, পাথর তার জায়গায় স্থির তখন তুমি যাত্রা শুরু করবে এবং দ্রুত যাবে ওই উপত্যকায়। উপত্যকায় গেলে দেখবে ড্রাগন ঘুমোচ্ছে এবং গোংরানির শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। ওই সময় তাকে মারতে পারবে। আবারও বলছি ড্রাগন যতক্ষণ জাগ্রত থাকবে ততক্ষণ ওই উপত্যকায় পা রাখা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। আর চারদিকে অস্থিরতা মানে হলো ড্রাগন জেগে আছে। সুনসান প্রশান্তি আর স্থিরতা মানে হলো ড্রাগন ঘুমাচ্ছে।

মায়ের দিক-নির্দেশনা পেয়ে মামসিয় রুমালে রুটি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো এবং যাত্রাপথে পা রাখলো। ঝড়ের গতিতে সে গিয়ে পৌঁছে গেল উঁচু ওই পাহাড়ের কাছে। খানিক দাঁড়িয়ে উঠে যায় পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে পৌঁছে দেখলো মা যেমনটি বলেছিল ঠিক তেমনি। অস্থির অবস্থা চারদিকে। এমন অস্থিরতা যে দাঁড়িয়ে থাকাটাই ভীষণ কষ্টের। এ অবস্থা দেখে সে বুঝলো ড্রাগন এখন জেগে আছে। অনেক কষ্টে একটা জায়গায় সে কোনোরকমে আশ্রয় নিলো এবং অপেক্ষা করতে লাগলো। আস্তে আস্তে যখন সবকিছু শান্ত হয়ে এলো মামসিয় বুঝলো যে ড্রাগন এবার ঘুমিয়েছে।

মায়ের নির্দেশ মতো মামসিয় এবার নেমে এলো পর্বতচূড়া থেকে। পর্বতের পাদদেশে যখন পৌঁছলো তার চোখ পড়লো ড্রাগনের ওপর। ড্রাগস দেখে তো থ হয়ে গেল সে। মামসিয়র মুখে কথা ফুটছিলো না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল সে। ড্রাগনটা কাত হয়ে শুয়ে ছিল। উপত্যকার দৈর্ঘ্য প্রস্থ পূর্ণ করে শুয়ে আছে সে। নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। তার নাক ডাকার শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে।#

‘মামসিয় ন্যাড়া’ (৪)

ড্রাগন যখন ঘুমচ্ছিল মামসিয় পা টিপে টিপে গেল ওই উপত্যকায় এবং একেবারে ড্রাগনের খুব কাছে চলে গেল সে। তীর বের করে সোজা ড্রাগনের কপাল টার্গেট করলো এবং মেরেই বসলো তীর। ড্রাগন এঁকেবেঁকে উঠলো এবং একসময় বিকট শব্দ করে উঠলো।

এমন জোরে শব্দ করলো যে পুরো উপত্যকাই একেবারে থরথর করে কেঁপে উঠলো। একসময় নিথর হয়ে গেল ড্রাগন। এরপর মামসিয় যে কীভাবে এতো বিশাল মৃত ড্রাগনকে শহরে নিয়ে এলো কেউ তা জানে না। মামসিয় ড্রাগনকে বাদশার প্রাসাদের সামনে নিয়ে ফেললো এবং বললো: “হে বাদশাহ! এই নাও তোমার ড্রাগন। তোমার শত্রুর পরিণতি যেন এরকমই হয়”। বাদশা ড্রাগনের দিকে তাকিয়ে তারপর তার মন্ত্রীর দিকে তাকালো এবং বললো: হে উজির! এবার তো আর কোনো বাহানার সুযোগ নেই তোমার। এবার কিছুতেই মামসিয় ন্যাড়াকে খালি হাতে ফেরাতে পারবো না। তাড়াতাড়ি তোমার মন্ত্রিত্ব ন্যাড়াকে সোপর্দ করে দাও।

উজির দেখলো এবারও তার ফাঁদ কোনো কাজে আসে নি। মারাত্মক উৎকণ্ঠায় পড়ে গেল সে। অবশেষে বাদশার উদ্দেশ্যে বললো: বাদশাহ সালামাত! কাল আসুক মামসিয়, কোনোরকম ঝুটঝামেলা হবে না। সুন্দরভাবে তাকে তার মন্ত্রিত্ব বুঝিয়ে দেবো।

কিন্তু রাত হতে না হতেই মন্ত্রী আবারও গেল সেই যাদুর বাবাটুপির কাছে। বাবাটুপিকে সামনে ফেলে বললো: হে মহান বাবাটুপি! তোমার জন্য আমার প্রাণ উৎসর্গ করলাম। এই ন্যাড়া মামসিয় আবারও আমাকে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে। সবার কাছে আমার মাথা হেঁট করে দিয়েছে। কোনোভাবেই তো তাকে আটকানো গেল না। এবার কিন্তু কোনোভাবেই আমার মন্ত্রিত্ব তাকে হস্তান্তর না করে উপায় নেই। কিন্তু কোথায় ন্যাড়া আর কোথায় বাদশার মন্ত্রিত্ব। এখন বলো কী করবো।

কিন্তু বাবাটুপি কী বললো সে কথা শুনবো খানিক বিরতির পর। আমাদের সঙ্গেই থাকুন।

মিউজিক শুনলেন আশা করি ভালো লেগেছে। বাবাটুপি আবার কোন ঝামেলায় ফেলে মামসিয়কে সে নিয়ে নিশ্চয়ই উদ্বেগের মধ্যে আছেন আপনারা। কিন্তু না এবারের বিপদটা আগের মতো নয়। মধুর বিপদ,মানে প্রেমের বিপদ। বাবাটুপি মন্ত্রীকে পরামর্শ দিলো সে যেন বাদশাকে গিয়ে বলে মামসিয়কে পাশের দেশে পাঠাতে এবং রাজকন্যাকে তার জন্য নিয়ে আসতে। বাবাটুপি জানতো এ কাজ সবাইকে দিয়ে হবে না। ন্যাড়া কেন এরকম হাজারো ন্যাড়াও যদি যায় একজনও জীবিত ফিরবে না।

উজির বেশ খুশি হয়ে গেল। বাবাটুপিকে চুমু খেয়ে প্রশান্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ভোরে ভোরে মোরগের ডাকের আগেই সে চলে গেল বাদশার দরবারে। বাদশাহকে বললো: বাদশাহ সালামত! গতরাতে একটা স্বপ্ন দেখলাম।

বাদশাহ বললো: আবার কী স্বপ্ন দেখেছো তুমি।

উজির বললো: “দেখলাম মামসিয় ন্যাড়া পাশের দেশে গেছে এবং সেদেশের রাজকন্যাকে তোমার জন্য নিয়ে এসেছে। আমার স্বপ্ন যেন সত্যি হয়,আপনি মামসিয়কে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেন। এই সুযোগ আর নাও আসতে পারে”।

বাদশা উজিরের কথা শুনে হাসলো এবং বললো: হে উজির! এটা কোনো কথা হলো। তোমার বুদ্ধি শুদ্ধি কি লোপ পেল নাকি। তুমি জানো না আমাদের শক্তিশালী সেনারা পর্যন্ত হার মেনেছে একাজে? এখন তুমি বলছো মামসিয় ন্যাড়াকে একা পাঠাবো প্রতিবেশী দেশের বাদশার সঙ্গে যুদ্ধ করতে!

উজির বললো: বাদশা! আপনি মামসিয়কে তুচ্ছ মনে করছেন। যে কিনা প্রথম শিকারেই অদ্ভুত প্রাণী শিকার করেছে, যে কিনা চল্লিশ ঘোড়ার দুধের জায়গায় আস্ত ঘোড়াগুলোকেই নিয়ে এসেছে, যে কিনা বিশাল ড্রাগনকে মেরে আপনার সামনে হাজির করেছে,তাকে হালকা চোখে দেখছেন আপনি! বাদশা বললো: তুমি কি সত্যি সত্যি বলছো?

উজির বললো: আমি এর আগে কোনো কাজেই এতো সিরিয়াস ছিলাম না।

যাই হোক, মামসিয় ন্যাড়া ঘুমচ্ছিল। কেউ দরোজার কড়া নাড়লো। তার মা বললো: বাবা! ওঠো! দেখো এবার আবার কোন ঝামেলার কাজে তোমাকে জড়াতে যাচ্ছে।

মামসিয় বললো: “বোঝাই যাচ্ছে বাদশা আবারও আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে”। এই বলে সে তার জামা পরলো এবং পা বাড়ালো প্রাসাদের উদ্দেশ্যে এবং ফিরেও এলো কিছুক্ষণ পর। এসেই মাকে বললো: খাবার দাবার কিছু ব্যবস্থা কর, এক্ষুণি রওনা দিতে হবে। এবার যেতে হবে পাশের দেশে। রাজকন্যাকে নিয়ে আসতে হবে বাদশার জন্য।

মামসিয়র মা বললো: বাবা! একাজে যেও না। উজির চাচ্ছে তোমাকে মেরে ফেলতে। কত বীর পালোয়ান রাজকন্যাকে আনতে গিয়ে মারা গেছে। কেউই রাজকন্যাকে আনতে পারে নি। তুমি একা কী করে একাজ করবে।

মামসিয় বললো: কিচ্ছু করার নেই মা! হয় যেতে হবে, না হয় মরতে হবে।#

‘মামসিয় ন্যাড়া’ (৫)

মামসিয়র কথা শুনে মা বললো: ঠিক আছে বাবা যেতেই যদি হবে তাহলে একটু শোনো। আমি প্রতিবেশি রাষ্ট্র কিংবা সেদেশের বাদশা সম্পর্কে কিছুই জানি না। তুমি নিজেই খোঁজখবর নিয়ে পথ বের করে নাও।

মায়ের কথা শুনে ন্যাড়া খাবারের পুটলি কোমরে বেঁধে পা রাখলো ঘরের বাইরে। হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, টিলাগুলো থেকে বন্যার মতো পানির ধারা নেমে এলো নীচে। এরকম ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়ে সে গিয়ে পৌঁছলো সমুদ্রের তীরে। তার চোখে পড়লো কেউ যেন পানি খাবার জন্য তার মাথাটা নামিয়ে দিলো সমুদ্রের পানিতে। সে কি পানি খাওয়া রে বাবা! এক ঢোক পানি গিলতেই সমুদ্রের পানিস্তর এক হাত পরিমাণ নীচে নেমে যায়। মামসিয় ন্যাড়া এই কাণ্ড দেখে তো হতবাক। বলেই ফেললো: এটা কীরকম পানি খাওয়া!

ওই লোকটার নাম ছিল অবে দারিঅ খোশ্ক্‌কুন মানে ‘সমুদ্রের পানি শুষ্ককারী’। সে বললো: চোখ নেই, দেখছো না কীভাবে পানি খাচ্ছি। কিন্তু চোখ তো দেখছি আছে। ওই চোখ দিয়ে কি মামসিয় ন্যাড়াকে দেখেছো?

মামসিয় ন্যাড়া বললো: কোন মামসিয়র কথা বললো?

লোকটা বললো: যে মামসিয় প্রথম শিকারে গিয়েই এমন এক প্রাণী শিকার করেছে যার একপাশে আলো জ্বলে অপরপাশে বাজে মিউজিক।

ন্যাড়া বললো : কেন,কী দরকার তাকে দিয়ে?

প্রাণীটা বললো: আমি তার কাছে যেতে চাই এবং সারাজীবন তার গোলাম হয়ে থাকতে চাই।

মামসিয় এবার হেসে দিয়ে বললো: ওঠো! আমিই সেই মামসিয় ন্যাড়া।

প্রাণীটা বললো: সত্যি বলছো?

ন্যাড়া বললো: মিথ্যা বলার কী প্রয়োজন?

এরপর থেকেই ওই প্রাণীটা মামসিয়র গোলামে পরিণত হলো এবং মামসিয়র সঙ্গে পথ চলতে শুরু করলো। যেতে যেতে এক জায়গায় গিয়ে দেখলো এক লোকের ঘাড়ের চারপাশে বেশ কটি যাঁতার পাথর। সেগুলোকে সে বৃত্তাকারে ঘুরাচ্ছিল এবং তার সামনে যাই পড়ছিল সবই পাউডারে পরিণত হচ্ছিল। ন্যাড়া বললো: এই আহাম্মককে দেখো!

যাঁতামানব বললো: তুই নিজে আহাম্মক। তোর চোখ নেই, আমার গলায় পাথর দেখছিস না। কিন্তু মামসিয় ন্যাড়াকে দেখার চোখ তো তোর আছে। তাকে যদি দেখতে পেতাম তাহলে তার গোলাম হতাম।

দারিঅ খোশ্ক্‌কুন বললো: এ-ই মামসিয় ন্যাড়া!

যাঁতামানব বললো: সত্যি বলছো?

দারিঅ খোশ্ক্‌কুন বললো: মিথ্যে বলবো কেন?

যাঁতামানবও মামসিয়র গোলাম হয়ে যায়।

দারিঅ খোশ্ক্‌কুন আর যাঁতামানবকে নিয়ে মামসিয় আবার যাত্রা শুরু করলো। যেতে যেতে পথে দেখলো একটি গুলতি শিকারী তার গুলতি দিয়ে পাথরের তক্তা বা স্ল্যাব একদিক থেকে অন্যদিকে ছুঁড়ে মারছে। মামসিয় চীৎকার করে উঠলো: এই পাগল! থামো! দেখি কী করছো তুমি। এটা কীরকম গুলতিবাজি। গুলতিবাজ থামলো এবং বললো: পাগল আমি নই, তুই। তোমার কি চোখ নেই? দেখছো না কী করছি? কিন্তু মামসিয়কে দেখার মতো চোখ তো তোমার আছে। যদি তার খোঁজ পেতাম, তাহলে তার গোলাম হয়ে থাকতাম সারাজীবন।

দারিঅ খোশ্ক্‌কুন আর যাঁতামানব সমস্বরে বলে উঠলো: “তুমি যার সাথে কথা বলছো সে-ই মামসিয়”। গুলতি শিকারীও এভাবে মামসিয়র গোলাম হয়ে গেল।

সবাই মিলে রওনা হলো সামনের দিকে। পথে পড়লো আরেক অদ্ভুত লোক যে কিনা এক কান দস্তরখানের নীচে দিয়ে আরেক কান দস্তরখানের ওপরে রেখে ঘুমচ্ছিল। সে ওই কান দিয়ে অনেক দূরের শব্দও শুনতে পেত। লম্বা কানের অধিকারীও শেষ পর্যন্ত মামসিয়র গোলামে পরিণত হলো। সেও মামসিয়র সফরসঙ্গী হলো। সবাই একত্রে যাত্র করলো প্রতিবেশী দেশের উদ্দেশে এবং একসময় পৌঁছে গেল মূল ফটকে। সেখানে বহু সেনা পায়চারি করছে,টহল দিচ্ছে। তাদের অনুমতি ছাড়া ওই গেইট খোলা অসম্ভব। গুলতিবাজ বললো: কারা এরা? মামসিয় বললো: প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাদশার প্রহরী সেনাদল। অপরিচিত কেউ তাদের ডিঙিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা অসম্ভব।

গুলতিবাজ বললো: “আমাদেরকে যেতে না দিয়ে পারবে”? এই বলেই সে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে প্রহরীদের ধরে ধরে গুলতিতে পুরলো এবং মাথার চারদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে মারলো। বাদশাহ এ সময় প্রাসাদে বসে দরবারের অভিজাতদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়লো সৈন্যরা উড়ন্ত কিংবা ঝুলন্ত অবস্থায় তার দিকে এগিয়ে আসছে। বিশ্বাস হচ্ছিল না বাদশার।এরিমাঝে কেউ এসে বললো: হে বাদশাহ! আপনি বসে আছেন? এদিকে পাঁচজন লোক-দেখতে অন্যরকম-গেইটে দাঁড়িয়ে আছে, তারা নাকি আপনার মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছে।

বাদশাহ বললো: যাও,তাদেরকে নিয়ে আসো। দেখি এতো বড় সাহস

তাদের হলো কী করে!

যাঁতামানব সামনে এগিয়ে গেল এবং চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব ভেঙে ফেলছিল। অন্যরাও তাকে অনুসরণ করলো। এভাবে ভেঙেচুরে যেতে যেতে গিয়ে পৌঁছলো প্রাসাদে। বাদশা তাদেরকে দেখতেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবার উপক্রম হলো। তাড়াতাড়ি বললো: আজ যাও বিশ্রাম নাও। কাল মেয়েকে তোমাদের হাতে তুলে দেব।

বাদশার কথায় তারা চলে গেল। এই ফাঁকে বাদশা তার উজিরকে ডেকে পাঠালো। বললো: এই অদ্ভুত প্রাণীদের সঙ্গে পেরে ওঠা মুশকিল হবে। তাড়াতাড়ি ভাবো কীভাবে মেয়েকে এদের হাতে তুলে না দিয়ে পারা যায়।

উজির বললো: এদের সাথে কিছুতেই সংঘর্ষে যাওয়া যাবে না।

তারচে বরং একটা ফন্দি আঁটতে হবে।

বাদশাহ বললো: কী ফন্দি!

উজির বললো: তাড়াতাড়ি ঘোষকদের খবর দিন। তারা বাজারের অলিগলিতে ছোটো বড় তরুণ-যুবক নারী-বৃদ্ধ যাকেই পাবে তাকেই আপনার পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানাবে, তারা যেন অবশ্যই দাওয়াতে আসে। এদিকে বাবুর্চিকে খবর দিয়ে বলবো তারা যেন চল্লিশটি বিশাল বিশাল ডেকচিতে রান্না করে। চল্লিশতম ডেকচির খাবারে বিষ মিশিয়ে রাখবে। ওই পাঁচজনকেও দাওয়াত করা হবে। তাদেরকে বিষযুক্ত খাবার দিয়ে মেরে ফেলা হবে।#

‘মামসিয় ন্যাড়া’ (৬)

উজির ফন্দি আঁটলো শহরের সবাইকে দাওয়াত করবে। খাবারের চল্লিশতম ডেকচিতে বিষ মিশিয়ে রাখবে। ওই পাঁচজনকেও দাওয়াত করা হবে এবং তাদেরকে বিষযুক্ত খাবার দিয়ে মেরে ফেলা হবে। মামসিয় তার সঙ্গীদের নিয়ে বসে বসে গল্প করছিল। লম্বা কানের অধিকারী হঠাৎ হেসে দিলো।

আরেকজন বললো: পাগল নাকি! নিজে নিজে হাসছো যে!

লম্বাকর্ণধারী বললো: না। বাদশা আর উজির আমাদের মারবার ষড়যন্ত্র করছে,তাই হাসলাম।

মামসিয় বললো: কীরকম ষড়যন্ত্র?

লম্বাকর্ণধারী বললো: ওরা চায় বিষাক্ত খাবার দিয়ে আমাদের মেরে ফেলতে।

দারিঅ খোশ্ক্‌কুন বললো: তাদেরকে তাদের মতো ভাবতে দাও।

পরদিন ঠিকমতোই শহরের লোকজন এলো। বাদশার প্রাসাদে ভিড় জমে গেল। ছোটোবড়ো সব শ্রেণীর মানুষের সমাবেশ। মামসিয়ও তার সঙ্গীদের নিয়ে এসে এক কোণে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ পর মামসিয় বাদশাহকে বললো: আমার কুক’কে একটু তোমার রান্নাঘরে যেতে দেবে?

বাদশাহ বললো: কোনো অসুবিধা নেই।

মামসিয় তার দারিয় খোশ্‌ককুনকে বললো: যাও! খাবার দাবারের খোজ খবর নিয়ে আসো! দেখো খাবার তৈরি আছে কিনা!

দারিয় খোশ্‌ককুন রান্নাঘরে গিয়ে দেখলো বাদশার বাবুর্চি চল্লিশ পাতিল রান্না তৈরি করে রেখেছে। এখন শুধু পরিবেশন করার অপেক্ষা।

দারিয় খোশ্‌ককুন বললো: হে বাবুর্চি! আমি মামসিয়র বাবুর্চি। কী রান্না করেছো দেখতে পারি!

এই বলেই কোনোরকম অনুমতির তোয়াক্কা না করে দারিয় খোশ্‌ককুন প্রথম পাতিলের কাছে গেল। বিশাল পাতিল তুলার মতো তুলে ধরে বাদশার বাবুর্চিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে সব খেয়ে ফেললো। এরপর গেল দ্বিতীয় পাতিলের কাছে। সেই পাতিলও খেলো। তারপর তৃতীয় পাতিল চতুর্থ পাতিল খেতে খেতে পুরো চল্লিশ পাতিলই শূন্য করে ফেললো। বাদশার বাবুর্চি টেরই পেল না। পাবে কী করে। এতো দ্রুত এতো বড় পাতিলের সব খাবার একটানে খেয়ে ফেলা কি বিশ্বাসযোগ্য!

বাদশার বাবুর্চি বললো: পুরো চল্লিশ পাতিলই প্রস্তুত আছে। সমস্যা নেই।

দারিয় খোশ্‌ককুন বললো: অনেক কষ্ট করেছো। খুব সুস্বাদু হবে বলে মনে হচ্ছে,ঘ্রাণই বলে দিচ্ছে।

এই বলে দারিয় খোশ্‌ককুন ফিরে এসে বসলো আগের জায়গায়।

বাদশাহ এবার আদেশ দিলো মেহমানদের খাবার দিতে। তারপর কী হলো তা শুনবো খানিক বিরতির পর।

বাদশাহর আদেশের কথা বলছিলাম। আদেশ শুনে বাবুর্চি তাড়াতাড়ি গেল রান্নাঘরে। প্রথম পাতিলের ঢাকনা খুলে দেখলো কিচ্ছু নেই,পুরো খালি। দ্বিতীয় পাতিলও তাই, তৃতীয় পাতিলও শূন্য। এভাবে একে একে সব পাতিলের ঢাকনা খুলে বাবুর্চি তো হতবাক। সব পাতিল খালি। কী করবে সে! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল বাবুর্চি। কিন্তু বাদশাহকে জানাতেই হবে। কীভাবে জানাবে এখন,কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না বাবুর্চি। অগত্যা জানাতেই হলো। বাদশা বুঝতে পারলো এটা নিশ্চয়ই মামসিয়র কাজ। রাগে কাঁপতে শুরু করলো বাদশা। পরক্ষণেই ভাবলো এতে তো কোনো ফায়দা হবে না। মাথা ঠাণ্ডা করে মেহমানদের জানাতে বললো: খাবারের অনুষ্ঠান কাল হবে,আজ নয়।

প্রচণ্ড রাগ মাথায় রেখে উজিরকে বললো: এখন কী করবো?

উজির বললো: ধাতব গোসলখানা গরম করতে বলুন। মামসিয় আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের সেখানে আমন্ত্রণ জানান। ওরা ভেতরে ঢুকলেই দরোজা বন্ধ করে দিয়ে উপর থেকে হাউজের পুরো পানি ঢেলে দিয়ে মেরে ফেলবো।

বাদশা বললো: আইডিয়াটা মন্দ না।বিশাল কর্ণধারী শুনতে পেলো সব। সে হেসে দিলো।

মামসিয় জিজ্ঞেস করলো: কী হলো! হাসছো কেন?

কর্ণধারী মামসিয়কে বাদশা-উজিরের সব ষড়যন্ত্রের কথা খুলে বললো। যাঁতামানব আর দারিয় খোশ্‌ককুন বললো: ঠিক আছে,তাদেরকে তাদের মতো যা খুশি করতে দাও।

প্ল্যান মোতাবেক পরদিন বাদশার লোকজন মামসিয়দেরকে আমন্ত্রণ জানালো। হাম্মামের ভেতর ঢুকতেই বাদশার লোকজন দরোজা বন্ধ করে দিলো আর উপর থেকে হাউজের পানির মুখ খুলে দিলো। দারিয় খোশ্‌ককুন ভেতরে ঢুকেই ওই পানির মুখে মুখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। হাউজের সব পানি সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে লাগলো,এক ফোঁটাও নীচে পড়তে দিলো না।

দারিয় খোশ্‌ককুন এক পর্যায়ে যাঁতামানবকে বললো: দেখছো না টায়ার্ড হয়ে গেছি। যাঁতামানব এ কথা শুনে তার কাঁধের যাঁতাগুলো পাখার মতো ঘুরাতে লাগলো। এমন জোরে ঘুরালো যে হাম্মামের স্টিলের দেয়াল ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেল। এদিকে দারিয় খোশ্‌ককুন বাইরে গিয়ে মুখ থেকে পানি উগরে দিলো। তার মুখের পানিতে অর্ধেক শহরে বন্যা দেখা দিলো। বন্যার খবর দ্রুত পৌঁছে গেল বাদশার কানে। জনগণ বাদশার উপর ক্ষেপে গেল। সবাই বলাবলি করতে শুরু করলো বাদশার মেয়ের জন্য আমরা কেন এতো কষ্ট সহ্য করবো! তোমার মেয়েকে দিয়ে দাও। আমরা একটু শান্তিতে থাকি। বাদশা এসব শুনে শেষ পর্যন্ত মামসিয়র হাতে তার কন্যাকে সোপর্দ করে দিলো। মামসিয়কে রাজকন্যাকে নিয়ে রওনা দিলো নিজের দেশে। কাছাকাছি পৌঁছতেই বাদশার কানে সংবাদ পৌঁছে গেল যে মামসিয় জীবিত আছে এবং সে প্রতিবেশী রাজকন্যাকে নিয়ে এসেছে।

বাদশাহ এ সংবাদ শুনে তার সভাসদ আর অভ্যর্থনাকারী বাহিনীকে পাঠিয়ে দিলো মামসিয়কে অভ্যর্থনা জানাতে। মামসিয় প্রাসাদে না গিয়ে গেলো নিজ বাড়িতে। বাদশা যতই বার্তা পাঠালো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রাজকন্যাকে প্রাসাদে নিয়ে যাবার জন্য মামসিয় কানেই তুললো না। উল্টোকে বাদশাকে বার্তা পাঠিয়ে বললো: এ পর্যন্ত যতরকমের আদেশ তুমি আমাকে দিয়েছো সব শুনেছি। আর না। এবার সে শর্ত দিলো: প্রথম শিকারের অদ্ভুত প্রাণীটা আর চল্লিশ ঘোড়া ফেরত দিয়ে এই শহর ছেড়ে চলে যেতে। না হয় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে। আরও স্মরণ করিয়ে দিলো প্রতিবেশী দেশের বাদশার সৈন্য সামন্ত তোমার সেনাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা আমার হাতে পরাজিত হয়েছে।

মামসিয়র বার্তা পেয়ে বাদশাহ তার উজিরের সাথে বসলো পরামর্শ করতে। অনেক শলা পরামর্শ করে বাদশা তার জান নিয়ে ভাগলো। মামসিয় তার বন্ধুদের নিয়ে প্রাসাদে গেল এবং বাদশাহী শুরু করলো। তার মাকেও বানালো মন্ত্রী। এরপর সারা শহর আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে সাত দিন সাত রাত ধরে উৎসব করে রাজকন্যাকে বিয়ে করলো।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত