নক্ষত্রকন্যা

নক্ষত্রকন্যা

সুমন ভাই কফিতে চুমুক দিয়েই বিকৃত গলায় বললেন‚ “এই হাসপাতালের চা-কফি দিন দিন এমন বিস্বাদ হচ্ছে কেন লো তো?”আমি মৃদু হেসে বললাম‚ “কফি ঠিকই আছে‚ সম্ভবত আপনার মেজাজ আজ খারাপ সুমন ভাই! আমি লক্ষ্য করেছি‚ মেজাজ খারাপ থাকলে আপনিখাদ্যবস্তুকে গালাগালি করেন।”গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন সুমন ভাই‚ “একদম ঠিক। বুঝলে অপু‚ তুমি যতটা আমায় বোঝো‚ আমার স্ত্রীও বোধহয় এতটা বোঝে না। ধরো আমার মেজাজ খারাপ‚ বউকে বললাম‚ ‘এটা কি বানিয়েছ?একদম বিচ্ছিরি স্বাদ।’ তবেই সেরেছে‚ সেদিনআর খাবার জুটবে না কপালে। হা হা হা..! “এখানে ভাবীর দোষ নেই। আপনার মেজাজ যেমনই থাক‚ সে কারণে আপনি অন্যের রান্নার নিন্দাকরতে পারেন না। রান্না যেমনই হোক‚ সংসার টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত- রান্না খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা!””বাহ! অসাধারণ বলেছ‚ গ্রেট বলেছ! লাইক!

” লাইক দেয়ার ভঙ্গীতে আঙুল তুলে দেখালেন তিনি। ঠিক তখনই মার্থা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসল।আমি আর সুমন ভাই আমেরিকার একটা হাসপাতালে কাজ করি‚ মার্থা আমাদের সহকর্মী। আমার ডিউটি আওয়ার শেষ‚ সুমন ভাইয়ের শুরু‚ ঘরে ফেরার আগে একটু আড্ডা দিয়ে নিচ্ছিলাম। প্রতিদিনই কাজটা করি আমরা অবশ্য।মার্থার চেহারা দেখে বুঝলাম যে কোন সিরিয়াস পেশেন্ট এসেছে‚ সুমন ভাইকে যেতে হবে। আজ আমাদের আড্ডার এখানেই সমাপ্তি।মার্থা বলল-“ড. আহমেড‚ সড়ক দুর্ঘটনার একজন ভিক্টিম এসেছে‚ ব্রেইন হেমোরেজ হয়েছে বোধহয়। অবস্থা গুরুতর। জলদি আসুন।”সুমন ভাই কালক্ষেপন না করে উঠে দাড়ালেন এবং মার্থার মতোই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেরোলেন কেবিন থেকে। সুমন ভাইয়ের পুরো নাম সুমন আহমেদ‚ এখানকার লোকেরা ডাকে ড. আহমেড। আমার নাম অপু তানভীর‚ এরা ডাকে ড. টানভীর।আমারও ঘরে ফেরার সময় হয়েছে‚ অফিস ব্যাগটা হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালাম আমি। বড় বড় কয়েকটা চুমুক দিয়ে শেষ করলাম কফিটুকু। তারপর বেরিয়ে এলাম বাইরে।বেরিয়ে যাবার সময় রিসেপশনিস্ট মেয়েটা অন্যান্য দিনের মতোই আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি হাসল। তার হাতে আইডি কার্ড জাতীয় একটা কিছু দেখতে পেয়ে আগ্রহী হয়ে কাছে গেলাম।”এটা কার পরিচয় পত্র লিন্ডা? টিভিতে দেখা এস্ট্রোনাটদের আইডি কার্ডের মতো দেখাচ্ছে!””ঠিকই ধরেছেন ড. টানভীর‚ গাড়ি দুর্ঘটনায় যে পেশেন্ট এসেছে‚ সে ফাইবার সিক্সটি এইটের এক কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার ছিল।

“কি বললে? ফাইবার সিক্সটি এইট? সেই বিখ্যাত স্পেসশিপ? সেটা তো তিন বছর পর আজইপৃথিবীতে ফিরেছে বোধহয়। তাই না? “হ্যা। এই লোকটাও তাতে ছিল সম্ভবত।” লিন্ডা পেশেন্টের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল।”এটা কি? লগবুক মনে হচ্ছে? স্পেসশীপেরও কি লগবুক থাকে নাকি! একটু দেখতে পারি লিন্ডা?”সাধারণত পেশেন্টের জিনিসপত্র এভাবে কাউকে দেখতে দেয়ার নিয়ম নেই‚ নিয়ম না থাকলেও লিন্ডা কি ভেবে লগবুকটা দিল আমাকে।বাসায় যাবার পরিবর্তে নিজের কেবিনে ফিরে এলাম আমি‚ লগবুকের মতো দেখতে খাতাটা নিয়ে বসলাম। এস্ট্রোনাটদের জীবন নিয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ।লগবুকটা খুলতেই বুঝলাম‚ এটা মোটেই লগবুক নয়‚ ব্যক্তিগত ডায়েরি। অন্যের ডায়েরি পড়া গর্হিত কাজ। কিন্তু বাঙালী কৌতূহলের কারণেই কি না জানে‚ আমি ডায়েরির ভিতরটায় উঁকি দিলাম।প্রথম পেইজে নীল কালি দিয়ে প্যাঁচানো হাতে কয়েকটা লাইন লেখা-“আমার নাম জেমস ফার্নান্দেজ । ২১৩২ সালে প্যারিসের অত্যন্ত শস্তা একটা হাসপাতালে আমার জন্ম। এটা আমার ব্যক্তিগত ডায়েরি। কোন শালা যদি এই ডায়েরি হাতে নিয়ে থাকো তাহলে এখনই রেখে দাও‚ নইলে কষে একটা লাথথি মারব তোমার পশ্চাৎদেশে!”পড়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই ধরনের কথা একদমইআশা করিনি। তবে জেমস ফার্নান্দেজের লাথি খাবার ভয়ে দমে গেলাম না আমি। পাতা উল্টে পড়ে যেতে লাগলাম ডায়েরিটা।বুঝলাম‚ জেমস অনিয়মিত লেখক ছিল। কখনো ঘন ঘন লিখত‚ কখনো অনেকদিন পর পর। তারিখগুলো তার প্রমাণ। তবে‚ বেশ ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটনা ছিল সেখানে। আমি পড়ায় ডুবে গেলাম।

(জেমস ফার্নান্দেজ এর ডায়েরি থেকে)২১-৩-২১৬৩পত্রিকায় অনেক নাম শুনেছিলাম ফাইবার সিক্সটি এইট নামক স্পেসশীপের। বিভিন্ন গ্রহে প্রাণী অনুসন্ধানের জন্য নির্মিত বিজ্ঞান কাউন্সিলের তৈরি এটা দ্বিতীয় স্পেসশিপ‚ অনেক আধুনিক এবং উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন।প্রাথমিকভাবে আমি অনেক গর্বিত হয়েছিলাম এই স্পেসশীপের সদস্য হবার সুযোগ পেয়ে। আমার গর্ব পরদিনই উবে গেল‚ যখন জানলাম যে স্পেসশীপটিতে সবচেয়ে নিচু শ্রেণীর কর্মকর্তা হলাম আমি। নিম্নশ্রেণীর কিছু রোবট আছে বটে ফাইবার সিক্সটি এইটে‚ কিন্তুআমি ছাড়া দ্বিতীয় কোন নিম্নশ্রেণীর কর্মীনেই।২৪ ঘন্টার মধ্যে ১৪ ঘন্টাই আমাকে কাজ করতেহয়। দিনরাত বসে থাকতে হয় কমিউনিকেশন রুমে। স্ক্রীনের আঁকাবাঁকা রেখার গাণিতিক বিশ্লেষণ করতে করতে আমার সময় পার হয়।মাত্র এক সপ্তাহ হলো আমি এখানে এসেছি‚ এরই মধ্যে দম বন্ধ হবার যোগার হয়েছে আমার। দিনরাত কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যেস এবং প্রশিক্ষণ আমার আছে‚ কিন্তু ফাইবার সিক্সটি এইটে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়‚ তাতে একটি প্রথম শ্রেণীর রোবটও বোধহয় বিদ্রোহ করে বসবে। সবচেয়ে ভয়ংকর যে বিষয় আমার জন্য‚ সেটা হলো পুরো কাজের ভেতর কোন বৈচিত্র্য নেই। একই রকম ডাটা প্রসেসিং করতে হয় সারাক্ষণ‚ একঘেয়েমি কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে। কোন কুক্ষণে এই স্পেসশিপে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কে জানে!

৩-৩-২১৬৩আমি মোটামুটি রোবট হয়ে গেছি। একটি তৃতীয় শ্রেণীর রোবট এবং আমার মধ্যে ফিজিওলজিক্যাল পার্থক্য ছাড়া আর কোন ধরনের পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। দিনগুলো কাটছে অমানুষিক ব্রেইন ওয়র্ক এবংএকঘেয়েমির মধ্য দিয়ে।

৪-৭-২১৬৩মা কে মনে পড়ছে। মা কে হারিয়েছি খুব ছোটবেলায়। দু’বার হারিয়েছি মা কে। প্রথমবার‚ যখন সে বিয়ে করল আমার সৎ বাবাকে। দ্বিতীয়বার যখন পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপারে পারি জমাল সে।প্রায়ই আকাশের তারা দেখি আজকাল। স্বর্গ কিংবা নরক‚ যেখানেই থাক জিনিসগুলো‚ নক্ষত্র কিংবা গ্রহের ফাঁক-ফোঁকরে‚ অথবা গ্যালাক্সির চূড়োয়‚ কৃষ্ণ গহবরের অভ্যন্তরে‚ যেখানেই থাক‚ খুঁজে পেতে ইচ্ছেহয় ভীষণ।১৩-৮-২১৬৩এখানে কাজের চাপ বেশ কমেছে। আমরা কেপলার ১১৯ সি নামক একটা গ্রহে অবতরণ করেছি। এক সপ্তাহ এখানেই থাকব। টিকটিকির মতো দেখতে কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী পাওয়া গেছে এখানে। সে সব নিয়ে প্রাথমিক গবেষণা এবং উচ্চতর অনুসন্ধান চলছে।স্পেসশিপ নিশ্চল থাকলে আমাকে তেমন কোন কাজ করতে হয় না। প্রায় শুয়ে বসেই দিন কাটাই। এতদিন কাজের চাপে থেকে থেকে অভ্যাস হয়ে যাওয়ায় এখন অবসরও সহ্য হচ্ছে না‚ কেমন যেন বিদ্ঘূটে অনুভূতি হচ্ছে।রোবটদের সাথে আজকাল আমি বেশ গল্প করি। এখানকার মানুষগুলো সবাই এত ব্যস্ত যে‚ কাজের বাইরে তেমন কথা বলার সুযোগ নেই। কেউবিরক্ত করতে ভালোবাসে না‚ বিরক্ত হতেও না।রোবটগুলোই যা ভরসা।এখানে ইরি নামের একটা রোবট আছে। আমি প্রথমপ্রথম রোবটটির সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করতাম‚ কারণ এটাই একমাত্র মেয়েলি নামের রোবট স্পেসশিপে। তবে সেই সঙ্গে মাথামোটাও‚ তাই বন্ধুত্ব তেমন এগোয়নি।

১৬-৭-২১৬৩আজ উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা ঘটেছে আমার জীবনে। আমি যে এতটা বুদ্ধিমান আমার নিজেরও ধারণা ছিল না।এই গ্রহে টিকটিকিসদৃশ প্রাণীগুলোকে সেদিন স্পেসশিপে মুক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেয়াহয়েছিল‚ এদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানার জন্য। এরা কোন ভাষায় কথা বলে‚ আদৌ ভাব আদানপ্রদান করে কি না‚ এসব জানার চেষ্টা চলছিল।একদিন আমার কমিউনিকেশন রুমের ফ্রিকোয়েন্সি রেগুলেটর যন্ত্রের উপর বসে পড়ল একটা জন্তু। বসেই টিকটিকির মতো‚ তবে অন্যরকম ফ্যাসফ্যাসে গলায়‚ নির্দিষ্টবিরাম নিয়ে আওয়াজ করয়ে লাগল-“ক্যাক কোক কোক কোক কোক!””ক্যাক কোক কোক ক্যাক কোক কোক।”প্রাণীগুলো এ ধরনের আওয়াজ করে সেটা আমরা জানতাম‚ কিন্তু কথাগুলোর অর্থ বের করতে পারেনি এখানকার জীববিজ্ঞানীরা।আমি পারলাম।যেসব প্রাণী একই রকম শব্দ উচ্চারণ করে‚ তারা সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এই প্রাণীগুলোরক্ষেত্রে সেটা একদমই ভুল প্রমাণিত হলো। এরা সব শব্দ সমান কম্পাঙ্কে উচ্চারণ করে থাকে।কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম যে‚ প্রাণীগুলো দু’ভাবে শব্দ উচ্চারণ করে; ক্যাক এবং কোক। একটিকে এক এবং অপরটিতে শূন্য ধরলে কিছু বাইনারি রাশি পাওয়া যায়।

যেমন-১০০১১১১১১০০১১০১১০০০১১১১১১১০০০১১১০১১কয়েক বছর আগে প্রাণীবিজ্ঞানী উইলিয়াম রবার্ট বলেছিলেন উন্নত শ্রেণীর প্রাণীরা বাইনারি সংখ্যায় নিজেদের মধ্যকার ভাব আদান প্রদান করে থাকে। তার এই মতবাদ বেশ শক্তপোক্ত হলেও ছিল প্রমাণহীন। কিন্তু এইটিকটিকি সদৃশ প্রাণিগুলোর ক্ষেত্রে এই মতবাদ প্রযোজ্য হতে পারে বলে ধারণা হলো আমার।বিষয়টা জীববিজ্ঞানীদের কানে তুললাম। তারা বেশ গুরুত্বের সাথেই নিল বিষয়টা এবং নতুন করে গবেষণা শুরু করল। গবেষণার ফলাফল হলো বিস্ময়কর‚ প্রাণীগুলো সত্যিই বাইনারিনিয়মে ভাবের আদান প্রদান করে। এমনকি সে সবকথার দুয়েকটা বুঝতেও শুরু করল গবেষকরা।এ কারণে‚ আজ শুধু আমাকে সংবর্ধনা দেয়ার উদ্দেশ্যে ফাইবার সিক্সটি এইটে একটা ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমার ক্ষুদ্র জীবনে এটা বোধহয় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

জীবনে প্রথম আমার মতো ব্যক্তিত্বহীন একজন মানুষ আসরের মধ্যমণি হতে পারল।(এ পর্যন্ত পড়ার পর আমাকে ক্ষ্যান্ত দিতে হলো। কারণ জেমস ফার্নান্দেজের ডায়েরির বাকী পৃষ্ঠাগুলো জুড়ে আছে অনেকগুলো টেকনিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ।এমনিতেও ডায়েরিটা খুব বেশি বড় নয়। ফাঁকা ফাঁকা করে লেখা। পুরোটা শেষও হয়নি।এরপরও ইংরেজি কিছু লেখা আছে যেগুলোতে কোন দিন তারিখ দেয়া নেই। লেখাগুলোর বাংলা অনুবাদ করলে অনেকটা এমন দাড়ায়-)লেখা-১আমি প্রেমে পড়েছি। আমার প্রেমে পড়ার বিষয়টা মোটেও সরল সহজ নয়। খুব একটা জটিলও নয়‚ তবে অদ্ভুত।আমরা চলতে শুরু করার দু বছর পরের কথা‚ একটাএশিয়ান স্পেসশিপ আমাদের সঙ্গে একই পথে যাচ্ছিল‚ সেখানকার কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার একটা মেয়ে‚ যার নাম টিনা। সেই স্পেসশিপ হতে আমাদের স্পেসশিপে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলো। টিনা নামের মেয়েটাই কথা বলল-“পাথভিউয়ার থেকে কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার টিনা বলছি‚ ফাইবার সিক্সটি এইটের সহযোগিতা প্রয়োজন আমাদের।”এই নির্জন নক্ষত্রদেশে এমন সুললিত‚ সুমিষ্ট কন্ঠের একটা মেয়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে আমি মুহুর্তেই তার প্রেমে পড়ে গেলাম।

গল্পের বিষয়:
সাইন্স-ফিকশন

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত