কেপলার টুটুবি

কেপলার টুটুবি

ছেলেটির চুল সোনালি রঙের, চোখ দুটো আকাশের মতো নীল। চেহারায় কোথায় জানি এক ধরনের বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে। মেয়েটির মাথা ভরা লালচে চুল, চোখ দুটি মেঘের মতো কালো। চেহারার মাঝে এক ধরনের উচ্ছল সজীবতা। ছেলেটি মেয়েটির একটি হাত স্পর্শ করে নরম গলায় বলল, আমি তোমাকে আজ একটি কথা বলতে চাই।

মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, জানি। তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, আমিও তোমাকে আজ একটা কথা বলতে চাই।

ছেলেটার চোখে মুখে বিস্ময়ের একটা সূক্ষ্ম ছাপ পড়ল, বলল, তুমিও আমাকে একটা কথা বলবে?

হ্যাঁ।

তাহলে বল। মেয়েটি রহস্যের মতো ভান করে বলল, তুমি আগে বল।

ছেলেটি কয়েক মুহূর্ত মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তুমি তো সবই জান। আমি খুব নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। খুবই একাকী একজন মানুষ। আমি যন্ত্রের মতো কাজ করে যেতাম–কেন করতাম নিজেই জানতাম না। তোমার সাথে পরিচয় হবার আগে আমার জীবনটা ছিল একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন, সাদামাটা। মাঝে মাঝে আমার মনে হতো জীবনটা বুঝি পুরোপুরি অর্থহীন। তোমার সাথে পরিচয় হবার পর হঠাৎ করে সবকিছু অন্যরকম হয়ে। উঠল। মনে হতে লাগল আমি যেন জীবনটার একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছি।

মেয়েটি মাথা নাড়ল, হাসি হাসি মুখে বলল, আমি জানি।

তুমি এতো চমৎকার একটি মেয়ে, তোমার মাঝে এতো বিশাল প্রাণশক্তি, তুমি এতো চঞ্চল হাসিখুশি, শুধু তাই নয়, তুমি বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান, সফল, তোমার সাথে আমার মতো একজন মানুষের সম্পর্ক হবার কথা ছিল না। কিন্তু তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দাও নি তুমি আমার জীবনটাকে পরিপূর্ণ করেছ। আমি সেজন্যে তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।

মেয়েটি কোনো কথা বলল না, হাসি হাসি মুখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটি এবারে মেয়েটার হাতটা নিজের কাছে টেনে এনে বলল, তুমি জান আমাদের চারপাশের জগণ্টা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে। তুমি জান এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠছে। প্রতিদিন শুনছি আমাদের চারপাশে আছে ভয়ংকর রবোমানব, তারা নাকি খুব ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেবার চেষ্টা করছে। তারা নাকি আমাদের মাঝে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। যখন তারা আমাদের মূল নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে তখন আমরা নাকি হয়ে যাব দ্বিতীয় প্রজাতি। ছেলেটার মুখটা হঠাৎ একটু কঠিন হয়ে ওঠে, সে চাপা গলায় বলে, আমি কিন্তু সেটা বিশ্বাস করি না।

মেয়েটা এবারেও কোনো কথা বলল না, স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল! ছেলেটা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মানব সভ্যতা ছেলেখেলা না। মানুষের জন্যে মানুষের ভালোবাসা দিয়ে হাজার হাজার বছরে এটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আর কিছু রোবট মানুষের চেহারা নিয়ে মানুষের মাঝে ঢুকে মানুষকে পরাজিত করে তাদের সভ্যতা দখল করে নেবে? অসম্ভব!

মেয়েটি নিষ্পলক চোখে ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তাকে দেখে মনে হয় ছেলেটার কথাগুলো যেন সে বুঝতে পারছে না, কিংবা বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি অত্যন্ত গোপন একটা প্রজেক্টে কাজ করি। কী নিয়ে কাজ করি আমি সেটা তোমাকে বলতে পারব না, বলার অনুমতি নেই। যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে বলতে পারতাম, তুমি তাহলে বুঝতে পারতে আমরা কতোদূর এগিয়ে আছি। রবোমানবদের খুঁজে বের করার জন্যে আমাদের আর জটিল লোবোগ্রাফি করতে হবে না, আমি যে পদ্ধতিটা নিয়ে কাজ করছি সেটা ব্যবহার করে আমরা খুব সহজে রবোমানবদের বের করে ফেলতে পারব। এর মাঝে সেটা ব্যবহার শুরু হয়েছে, খুব চমৎকার ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমার মতো আরো অনেকে কাজ করছে, দেখবে আমাদের মানুষদের হারানো খুব কঠিন।

মেয়েটির মুখে এবারে মৃদু একটু হাসি ফুটে উঠল। ছেলেটি একটু অধৈর্য হয়ে বলল, তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না। তাই না?

মেয়েটি মাথা নাড়ল, বলল, করছি।

আমার যদি অনুমতি থাকত তাহলে আমি তোমাকে আমার প্রজেক্টের কথা খুলে বলতাম।

তোমাকে বলতে হবে না, আমি জানি।

ছেলেটা অবাক হয়ে বলল, তুমি জান?

হ্যাঁ।

কীভাবে জান?

মেয়েটি নরম গলায় বলল, আমি আসলে একজন রবোমানব। আমার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তোমার কাছ থেকে এই প্রজেক্টের তথ্যগুলো বের করার।

ছেলেটা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হয় সে কিছু বুঝতে পারছে না। মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি তোমাকে আজকে এই কথাটা বলব ঠিক করে রেখেছিলাম।

ছেলেটি নিস্পলক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব ধীরে ধীরে তার চেহারা থেকে অবিশ্বাসের ছাপটুকু সরে যায়, সেখানে এক ধরনের অবর্ণনীয় আতংকের ছাপ পড়ে। তারপর আতংকের ছাপটুকু সরে সেখানে একটি গভীর বিষাদের ছাপ পড়তে শুরু করে। ছেলেটি খুব ধীরে ধীরে, শোনা যায় না এরকম গলায় বলল, তুমি একজন রবোমানব?

হ্যাঁ।

সত্যিকারের রবোমানব?

হ্যাঁ সত্যিকারের রবোমানব।

আমাদের এতোদিনের যে সম্পর্ক সেগুলো সব মিথ্যা?

মেয়েটি খিল খিল করে হাসল, বলল, মিথ্যা কেন হবে? সব সত্যি। আগে যা কিছু ঘটেছে সেগুলোও সত্যি। এখন যেটা ঘটবে সেটাও সত্যি।

এখন কী ঘটবে? প্রশ্নটা করতে গিয়ে ছেলেটার গলার স্বর একটু কেঁপে উঠল।

মেয়েটি একটু হাসল, বলল, আমি তোমার মাথার খুলিটা কেটে তোমার মস্তিষ্কটা বের করে নেব। আমার ব্যাগে একটা ক্রায়োজেনিক প্যাকেট আছে, সেটাতে করে নিয়ে যাব। তোমার মস্তিষ্কটা নষ্ট হবে না, তার সাথে আমরা একটা ইন্টারফেস তৈরি করব, তারপর আমরা সেখান থেকে তোমার সব তথ্য বের করে নেব।

ছেলেটি হতবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, কাঁপা গলায় বলল, তুমি এরকম একটা কাজ করতে পারবে?

কেন পারব না? এটা আমার জন্যে খুব সহজ একটা কাজ। তুমি জান আমরা মানুষ না আমরা হচ্ছি রবোমানব। মানুষের যে দুর্বলতাগুলো আছে সেগুলো সরানোর জন্যে আমাদের জন্ম হয়েছে। আমাদের মাঝে অপ্রয়োজনীয় কোনো অনুভূতি নেই। আমাদের মাঝে ভালোবাসা নেই, মমতা নেই, অপরাধবোধ নেই, দুঃখবোধ নেই। তুমি যেভাবে একটা গণিতের সমস্যার সমাধান কর আমি ঠিক সেভাবে তোমার খুলি কেটে তোমার মস্তিষ্ক বের করে নিই।

কথা শেষ করে মেয়েটি ছেলেটির চোখের দিকে তাকিয়ে হাসল। ছেলেটি অবাক হয়ে আবিষ্কার করল সেই হাসিটি একজন মমতাময়ী মানবীর মতো নরম এবং কোমল।

কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তাবাহিনীর দুইজন মানুষ ছেলেটির মৃতদেহটি সমুদ্রের বালুবেলায় একটি ঝাউগাছের নিচে আবিষ্কার করে। একজন নিচু হয়ে মৃতদেহটি পরীক্ষা করে বলল, মাথার খুলি কেটে মস্তিষ্কটি নিয়ে গেছে।

অন্যজন বলল, নিখুঁত কাজ। এক ফোটা রক্তও পড়ে নি।

প্রথমজন বলল, মৃতদেহটি কীরকম বিবর্ণ দেখেছ? শরীরের সব রক্ত বের করে নিয়েছে।

অন্যজন কোনো কথা বলল না। তারা জানে রবোমানবের দেহটি জৈবিক। সেটাকে রক্ষা করতে তাদেরকে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হয়। রবোমানবেরা জানে মানুষের রক্ত খুব ভালো প্রোটিন।

বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল তার জন্যে আলাদা করে রাখা উঁচু চেয়ারটিতে বসার পর আকাদেমীর অন্য দশজন সদস্য তাদের চেয়ারে বসল। কালো গ্রানাইটের গোল টেবিলটা ঘিরে চেয়ারগুলো রাখা, টেবিলটা খুব বড় নয়; যেন সবাই সবাইকে কাছে থেকে দেখতে পায় আর কোনোরকম মাইক্রোফোন ছাড়াই তারা যেন খালি গলায় কথা বলতে পারে। ঘরটির দেয়াল ধবধবে সাদা, ছাদটা অনেক উঁচু, সেখান থেকে হালকা নরম একটা আলো ছড়িয়ে পড়ছে। বশাল একটা হলঘরের মাঝখানে গ্রানাইটের কালো টেবিল আর কয়টি চেয়ার, এ ছাড়া আর কোনো আসবাবপত্র নেই।

ঘরের একমাত্র দরজাটি নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত মহামান্য থুল অপেক্ষা করলেন, তারপর আকাদেমীর সকল সদস্যদের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, আমি প্রথমেই তোমাদের সবার কাছে ক্ষমা চাইছি।

কম বয়সী গণিতবিদ শ্রুম বলল, তার কোনো প্রয়োজন নেই মহামান্য থুল।

তাকে বাধা দিয়ে মহামান্য থুল বললেন, আছে। এই ঘরের আমরা এগারোজন হচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এগারোজন মানুষ। পৃথিবীর মানুষ এই টেবিলকে ঘিরে বসে থাকা এই এগারোজনকে পৃথিবী পরিচালনার দায়িত্ব দয়েছে। আমাদের পরস্পরকে বিশ্বাস করতে হবে। আমরা যদি একজন আরেকজনকে বিশ্বাস না করি তাহলে এই আকাদেমী একটা অর্থহীন জটলায় পরিণত হবে। আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি যে আমি তোমাদের অবিশ্বাস করেছি। আমি তোমাদের সবার লোবোগ্রাফ করিয়ে এই ঘরে ঢুকতে দিয়েছি।

পদার্থবিদ ক্রন বলল, আমরা বুঝতে পারছি মহামান্য থুল। আপনার জায়গায় আমাদের কেউ থাকলেও সেও এই সময়ে ঠিক এই কাজটি করত। পৃথিবীর এখন অনেক বড় দুঃসময়।

মহামান্য থুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি জানি তোমরা আমার শংকাটুকু বুঝতে পারবে। তারপরেও আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে আমি তোমাদের জানাতে চাই আমি নিজেও নিজের লোবোগ্রাফি করে এই ঘরে ঢুকেছি। মহামান্য থুল হাতের স্বচ্ছ কাগজটি টেবিলে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটি আমার রিপোর্ট। আমি দেখেছি, তোমরাও দেখতে পার। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এই ঘরে যারা আছে তারা সবাই মানুষ। আমিও মানুষ। এখানে কোনো রবোমানব নেই।

জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করছি মহামান্য থুল।

না। মহামান্য থুল মাথা নেড়ে বললেন, আমি তোমাদের সবার রিপোর্ট দেখেছি। তোমাদেরও আমার রিপোর্টটি দেখতে হবে। আমরা সভা শুরু করার আগে সবাই নিশ্চিত হতে চাই যে এই চার দেওয়ালের ভেতর কোনো রবোমানব নেই। সবাই নিশ্চিত হতে চাই যে আমরা সবাই মানুষ।

বিজ্ঞান আকাদেমীর দশজন সদস্যের কেউ হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটি নিতে রাজি হল না। সমাজবিজ্ঞানী লিহা বলল, মহামান্য থুল, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমাদের কারো পক্ষে সেটি করা সম্ভব নয়। আপনার লোবোগ্রাফি রিপোর্ট দেখে আপনার মনুষত্ব যাচাই করার মতো ধৃষ্ঠতা দেখানোর দুঃসাহস এই

পৃথিবীতে কারো নেই।

মহামান্য থুলের মুখে এক ধরনের কাঠিন্য ফুটে উঠল, সেটি তার চরিত্রের সাথে পুরোপুরি বেমানান। তিনি কঠিন গলায় বললেন, তাহলে আমার উপর আরোপিত ক্ষমতাবলে আমি আদেশ করছি, লিহা, তুমি লোবোগ্রাফি রিপোর্টটি দেখে আমাদের সকল সদস্যদের সেটি জানাও।

লিহা অত্যন্ত কুণ্ঠার সাথে রিপোর্টটি হাতে নিয়ে সেটি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে মাথা তুলে বলল, এই রিপোর্টে মহামান্য থুলের জিনেটিক কোডিং নির্দিষ্ট করা আছে, এখানে লেখা আছে রবোমানবের বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনোটিই তার শরীরে পাওয়া যায় নি। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে একজন মানুষ।

মহামান্য থুলের মুখ থেকে কাঠিন্যটুকু সরে গিয়ে সেখানে তার পরিচিত হাসিটুকু ফুটে উঠল। তিনি সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, চমৎকার! এখন আমরা সবাই নিশ্চিতভাবে জানি এখানে আমরা সবাই মানুষ। আমরা এখন মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারব।

মহামান্য থুল গ্রানাইটের মসৃণ টেবিলটার উপর অন্যমনস্কভাবে টোকা দিতে দিতে বললেন, তোমরা সবাই জান আমি কেন তোমাদের ডেকে এনেছি। এখানে আমরা যে কথা বলব পৃথিবীর কেউ সে কথাগুলো জানবে না। এগুলো রেকর্ড করা হবে না তাই ভবিষ্যতেও কেউ কখনো জানতে পারবে না। আমি এই সিদ্ধান্তগুলো কেন নিয়েছি সেটা তোমরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছ?

কেউ কোনো কথা বলল না, কয়েকজন শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মহামান্য থুল বললেন, তোমরা সবাই জান রবোমানব প্রজেক্টটি আমাদের অনুমতি ছাড়া শুরু করা হয়েছিল। মানুষের মনুষত্ববোধ থাকবে না কিন্তু মানুষের বুদ্ধিমত্তা থাকবে এরকম রবোট তৈরি করার অনুমতি পৃথিবীর নির্বোধতম মানুষটিও দেবে না। আর সেগুলোকে মানুষের রূপ দিয়ে এন্ড্রয়েড তৈরি করতে দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সেটাই ঘটেছে। যখন আমাদের শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটা ধরতে পেরেছে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছু শহরের কিছু কাউন্সিলার তার জন্যে দায়ী। তারা তাদের শহরে গোপন এন্ড্রয়েড শিল্প গড়ে উঠতে দিয়েছে। কারা দায়ী, কীভাবে সেটা গড়ে উঠতে পেরেছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা এখন একটি একাডেমিক ব্যাপার। আমি সেটা নিয়ে আলোচনা করার জন্যে তোমাদের ডাকি নি। আমি ডেকেছি অন্য কারণে। আমি সেটি বলার আগে আমাদের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহুকে বর্তমান পরিস্থিতিটি ব্যাখ্যা করতে বলব।

তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহু মাথা নিচু করে বলল, আমি এই আকাদেমীর কাছে ক্ষমা চাইছি, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি নি।

মহামান্য থুল বললেন, আমি তোমাকে আত্মবিশ্লেষণ করতে বলি নি। তোমাকে আমি শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতির উপর একটা রিপোর্ট দিতে বলেছি।

তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বিজ্ঞানী জুহু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, যখন আমরা ভেবেছিলাম আমরা অবস্থাটি আয়ত্তের মাঝে আনতে যাচ্ছি ঠিক তখন আমরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যাচ্ছি। রবোমানবেরা এখন সংঘবদ্ধ শক্তি, তারা নিজেরা নিজেদের তৈরি করছে। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন একসময় কিছু মানুষ ওদের তৈরি করেছিল। জৈবিক মানুষ ব্যবহার করে তাদের তৈরি করা হয় মস্তিষ্ক থেকে মানবিক অনুভূতিগুলো সরিয়ে নিয়ে সেখানে নিউরনগুলোকে নতুন করে পুনর্বিন্যাস করা হয়–সেজন্যে আমাদের স্বীকার করতেই হবে তাদের বুদ্ধিমত্তা মানুষ থেকে বেশি। যেহেতু তাদের কোনো মানবিক অনুভূতি নেই তাই তারা হচ্ছে ভয়ংকর একরোখা-তারা যে কোনো কিছু করে ফেলতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ করতেও তাদের এতোটুকু দ্বিধা হয় না।

জুহু একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, পৃথিবী থেকে অপরাধ ধীরে ধীরে ওঠে যাচ্ছে। একসময় মানুষ যে কারণে অপরাধ করত এখন সেই কারণগুলোর বেশিরভাগই নেই, তাই অপরাধ করার প্রয়োজনও হয় না। তারপরেও ছোটখাট কিংবা বড়সড়ো অপরাধ যখন কেউ করে আমাদের নিরাপত্তাবাহিনী তাদের ধরতে পারে। আমাদের নেটওয়ার্ক পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক, সবার সুনির্দিষ্ট তথ্য সেখানে আছে, কেউ এর বাইরে কখনো যেতে পারে না।

জুহু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, হঠাৎ করে তাকে কেমন জানি হতাশাগ্রস্থ এবং ক্লান্ত মনে হয়। অনেকটা অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, এই পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কটিই হয়েছে আমাদের সর্বনাশ। আমরা এই নেটওয়ার্কের ওপর খুব বেশি নির্ভর করি। রোমানবেরা এই নেটওয়ার্কের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, নেটওয়ার্কের তথ্য পরিবর্তন করে তাদের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারা সর্বশেষ কী করার চেষ্টা করছে শুনলে আপনারা হতবাক হয়ে যাবেন।

পদার্থবিদ ক্রন একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, কী করার চেষ্টা করছে?

তারা ডাটাবেসের তথ্য এমনভাবে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে যে লোবোগ্রাফি করে আমরা যখন একজন রবোমানবকে আলাদা করি, নেটওয়ার্ক তখন যেন তার আসল তথ্য লুকিয়ে তার সম্পর্কে বানানো তথ্য দেয়। তারা যদি সেটা করতে পারে আমরা তখন কোনোভাবে তাদের খুঁজে পাব না। তারা আমাদের মাঝে লুকিয়ে থেকে একদিন আমাদের পরাজিত করে পুরো পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে। এই পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না, থাকবে শুধু রবোমানব।

জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, সমস্যাটা কী তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। প্রাচীনকালে রবোট তৈরি হতো যন্ত্রপাতি দিয়ে! লোহালক্কর, ফটোটিউব, ভালব, ইলেকট্রনিক, ফটোট্রনিক সার্কিট দিয়ে। তাদের খুঁজে বের করতে হত নাএমনিতেই তারা মানুষ থেকে আলাদা হয়ে থাকত! এই রবোমানবেরা সেরকম নয়। তারা পুরোপুরি মানুষ, শুধুমাত্র তাদের মস্তিষ্কটা নতুনভাবে ম্যাপিং করেছে। নিউরনগুলোকে ওভারড্রাইভ করার জন্যে মস্তিষ্কের একেবারে ভেতরে, যেটাকে থ্যালামাস বলে সেখানে একটা অত্যন্ত ছোট, চোখে দেখা যায় না এতো ছোট মাইক্রোস্কোপিক ইমপ্লান্ট বসানো হয়। সেটা কিছুক্ষণ পরপর নিউরনগুলোকে বাড়তি স্টিমুলেশান দেয়। শুধু যে স্টিমুলেশান দেয় তা নয় সেটা দিয়ে ম্যাপিং পরিবর্তন করে ফেলতে পারে, একটি রবোমানবকে ভিন্ন রবোমানবে পাল্টে দিতে পারে, নতুন তথ্য ঢুকিয়ে দিতে পারে। এদের প্রোগ্রাম করা যায় কিন্তু এরা পুরোপুরি জৈব মানুষ। সেজন্যে এদের কোনোভাবে ধরা যায় না।

মহামান্য থুল বললেন, আমি তোমাদের আরো মন খারাপ করা খবর দিই। রবোমানব খুঁজে বের করার অসাধারণ একটা পদ্ধতি একটা কমবয়সী ছেলে বের করেছিল, রবোমানবেরা তার মস্তিষ্ক কেটে নিয়ে গেছে। শুধু যে মস্তিষ্ক কেটে গিয়েছে তা নয়, রবোমানবেরা তার মস্তিষ্ক থেকে সব তথ্য বের করে এখন আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। আর কয়েকদিনের ভেতর সব জায়গায় রবোমানবেরা ঢুকে যাবে।

বিজ্ঞান আকাদেমীর সদস্যরা চুপ করে বসে রইল। একটু পর গণিতবিদ শ্রুম বলল, আমাদের কী কিছুই করার নেই?

আছে। অনেক কিছু করার আছে। আমরা তার চেষ্টা করছি।

জুহু বলল, কিন্তু নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমরা কয়েকদিনের মাঝে নেটওয়ার্কটি হারাব। আমি খুব দুঃখিত আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারিনি, মানুষের এতো বড় বিপর্যয়ের জন্যে আমি দায়ী-

মহামান্য থুল হাত তুলে তাকে থামালেন, তুমি কেন মিছিমিছি নিজের উপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছ। এখানে তোমার কিছু করার ছিল না।

কিন্তু এই দায়িত্বটি ছিল আমার।

তোমার একার নয়, আমাদের সবার। মহামান্য থুল সবার দিকে একবার তাকালেন তারপর বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এবারে আমি তোমাদের বলি আমি কেন তোমাদের ডেকে এনেছি।

সবাই তাদের চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। মহামান্য থুল তার হাতের নখগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতে করতে বললেন, আমরা সত্যের মুখোমুখি হই। পৃথিবীর মানুষ প্রথমবার সত্যিকারের একটা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। রবোমানবেরা আমাদের সভ্যতা ধ্বংস করার পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। প্রাচীনকালে এক দেশের মানুষেরা অন্য দেশ দখল করে সেই দেশের মানুষদের হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করে দিত। এই রবোমানবদের কাছ থেকে আমরা ঠিক সেরকম একটা বিপদ আশংকা করছি। যদি কোনোভাবে তারা নেটওয়ার্ক দখল করতে পারে তাহলে তারা পৃথিবীর মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। আমরা কোনোভাবে সেটা হতে দিতে পারি না। যে কোনো মূল্যে কিছু মানুষ হলেও আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

জীববিজ্ঞানী ত্রানা বলল, আপনি ঠিক কী বলছেন আমরা বুঝতে পারছিনা মহামান্য থুল।

আমি একটি মহাকাশযান প্রস্তুত করেছি। সেই মহাকাশযানে করে আমরা পৃথিবীর কিছু মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়ে দিতে চাই। দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের কোনো গ্রহে তারা নতুন করে মানুষের বসতি স্থাপন করবে। ছয়শত মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে কেপলার টুটুবি গ্রহটি আছে। অন্য কিছু খুঁজে না পেলেও অন্তত এই গ্রহটিতে থাকতে পারবে। পৃথিবী থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তারা বেঁচে থাকবে। এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না কোথাও মানুষের বংশধরেরা বেঁচে থাকবে। মানুষের সভ্যতা বেঁচে থাকবে।

বিজ্ঞান আকাদেমীর দশজন সদস্য চুপ করে বসে রইল, কেউ একটি কথাও বলল না। মহামান্য থুল বলল, তোমরা চুপ করে বসে আছ কেন? কিছু একটা বল।

পদার্থবিজ্ঞানী ক্রন বলল, আমাদের কিছু বলার নেই মহামান্য থুল। মানব সভ্যতা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আর কিছু করার নেই।

মহামান্য থুল একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, কিছু করার নেই সেটি সত্যি নয় ক্রন। আমাদের অনেক কিছু করার আছে এবং আমরা একেবারে শেষ পর্যন্ত তার চেষ্টা করব, কিন্তু আমি কোনো ঝুঁকি নেব না। মানুষ হয়ে আমি রবোমানবের পদানত হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। যদি বেঁচে থাকতেও হয় আমি জানব অল্প কিছু মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। রবোমানবের হাতে যদি আমার মৃত্যু হয় আমি শান্তি নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারব।

সমাজবিজ্ঞানী লিহা বলল, মহামান্য থুল, মহাকাশযানে কারা যাবে, সাথে কী থাকবে, কোথায় যাবে, নিরাপত্তার জন্যে কী করা হবে এই সব খুঁটিনাটি কী ঠিক করা হয়েছে?

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, না করা হয় নি। গোপনীয়তার জন্যে আমি কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছি, কিন্তু খুঁটিনাটি কিছুই করা হয় নি। আমি তোমাদের ডেকেছি এই পরিকল্পনাটা পূর্ণাঙ্গ করার জন্যে।

বিজ্ঞান আকাদেমীর সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য পরিবেশবিজ্ঞানী কিহি বলল, সময় নষ্ট না করে আমরা তাহলে কাজ শুরু করে দিই।

হ্যাঁ। মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, কাজ শুরু করে দাও।

তোমার নাম কী?

টুরান।

টুরান, তুমি মাত্র বাইশ বছরের একজন যুবক। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবনে ঝাঁপ দিতে চাও? তুমি কোথায় বসতি স্থাপন করবে কিংবা আদৌ কোথাও বসতি স্থাপন করতে পারবে কী না সেটি কেউ জানে না।

তুমি কেন এই প্রশ্ন করছ?

টুরান, এখানে প্রশ্ন করব আমি, তুমি উত্তর দেবে। তুমি প্রশ্ন করতে পারবে। বল, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ?

তুমি যে উত্তর শুনলে খুশি হবে সেটি দেব নাকি সত্যি উত্তর দেব? (হাসি) প্রথমে আমাকে খুশি করার জন্যে উত্তরটি দাও।

খুব শৈশব থেকে আমার মহাকাশ নিয়ে কৌতূহল। জন্মের পর থেকে আমার স্বপ্ন ছিল মহাকাশচারী হওয়ার। আমি সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আমি নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি অজানাকে জানতে চাই।

চমৎকার টুরান। এবারে সত্যি কারণটি বল।

এই পৃথিবী নিয়ে আমার ঘেন্না ধরে গেছে। আমি এই দূষিত গ্রহ থেকে পালাতে চাই।

কেন?

আমার সম্পর্কে সব তথ্য তোমার কাছে আছে। তুমি জান।

টুরান। তোমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। বল, কেন?

তোমরা নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে সব তথ্য জান। কেন আমার কাছে আবার জানতে চাইছ?

আমি তোমাকে বলেছি তুমি প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। বল। কেন?

আমার ভালোবাসার মেয়েটি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।

একটা মেয়ের জন্যে তুমি আস্ত পৃথিবীটাকে পরিত্যাগ করতে চাইছ।

হ্যাঁ।

তোমার নাম কী মেয়ে?

ইহিতা।

সুন্দর, একটি নাম। ইহিতা।

তুমিও খুব ভালো করে জান আমিও খুব ভালো করে জানি এটি মোটেও সুন্দর একটি নাম নয়। কাজেই কাজের কথায় চলে আসি।

ঠিক আছে ইহিতা। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের একটা অনিশ্চিত যাত্রায় যেতে চাইছ?

এটি মোটেও অনিশ্চিত যাত্রা নয়। পৃথিবী থেকে যখন একটা মহাকাশযান মহাকাশে পাড়ি দেয় সেটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যাত্রা। এর প্রতিটি মুহূর্ত অসংখ্যবার সঠিকভাবে যাচাই করে দেখা হয়।

সেটি সত্যি ইহিতা। কিন্তু তুমি জান এর গন্তব্য অনিশ্চিত। এটি যেখানে যাবে সেখানে পৃথিবীর মানুষ আগে কখনো যায় নি।

বলতে পার সেটি আমার মূল আকর্ষণ।

কেন?

গত কিছুদিনে আমার জীবনের খুব কষ্টের সময় গিয়েছে। আমি সেগুলো ভুলে থাকতে চাই কিন্তু ভুলে থাকতে পারি না। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশে গেলে হয়তো ভুলে থাকতে পারব।

স্মৃতি ভুলে থাকা কোনো কঠিন কিছু নয়। নিউরন থেকে স্মৃতি মুছে দিলেই হয়।

আমি মানুষ। আমি রবোমানব নই যে নিউরনের স্মৃতি পুনর্বিন্যাস করব। তুমি কষ্ট করবে?

মানুষ হলেই কষ্ট পেতে হয়। কষ্ট করতে হয়। চেষ্টা করতে হয় কষ্টকে ভুলে থাকতে।

তোমার কষ্টের কথাটা কী বলবে?

আমার ভালোবাসার মানুষটি একটি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমরা বিয়ে করার দিন ঠিক করেছিলাম।

আমি দুঃখিত ইহিতা। শুনে আমি খুব দুঃখ পেলাম।

শুনে তুমি আসলে খুব দুঃখ পাও নি। এটি ভদ্রতার কথা।

তুমি কেন বলছ শুনে আমি দুঃখ পাই নি?

কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি আমার সম্পর্কে সবকিছু জান। তুমি কেন আমার সাথে কথা বলছ আমি সেটাও বুঝতে পারছি না।

এটি নিয়ম। আমাদের প্রত্যেকের সাথে কথা বলতে হয়।

তোমার নাম কী? টর।

টর, তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?

আমার বয়স চল্লিশ। আমি পৃথিবীর জীবন মোটামুটি দেখেছি। জীবনটা আমার কাছে একঘেয়ে মনে হচ্ছে। আমি নতুন কিছু চাই, নতুন উত্তেজনা চাই।

তোমার পরিরার?

আমার পরিরার নেই। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেকদিন আগে।

টর, মহাকাশযান যদি তোমার একঘেয়ে মনে হয়?

সে আশংকাটুকু আছে। কিন্তু আমি সেখানেও উত্তেজনা খুঁজে নিতে পারব।

তাহলে পৃথিবীতে উত্তেজনা কেন খুঁজে নিচ্ছ না টর?

চেষ্টা করেছি। আমাকে দেবার মতো উত্তেজনা পৃথিবীতে নেই।

তুমি কি মনে কর পৃথিবী থেকে মহাকাশে অভিযান করার জন্যে যে বিশাল মহাকাশযানটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটি শুধুমাত্র তোমাকে উত্তেজনা দেবার জন্যে?

না। কিন্তু আমি যদি উত্তেজনা পাই ক্ষতি কী?

উত্তেজনার খোঁজে তুমি যদি দায়িত্বহীন হয়ে যাও?

উল্টোটাও তো হতে পারে।

উল্টো কি হতে পারে টর?

মহাকাশযানের ভয়ংকর কোনো বিপর্যয়ে অন্য সবাই যখন পিছিয়ে যাবে তখন ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে আমি এগিয়ে যাব। সবাইকে রক্ষা করব।

তুমি এটা বিশ্বাস কর, টর?

হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। আমার ধারণা তুমিও বিশ্বাস কর।

তুমি কেন এ কথা বলছ?

কারণ নেটওয়ার্কে আমার সব তথ্য আছে। তুমি নিশ্চয়ই আমার সবকিছু জান। আমি যেগুলো জানি না তুমি সেগুলোও জান। আমি কী ঠিক বলেছি?

হ্যাঁ তুমি ঠিক বলেছ।

তোমার নাম কী?

নুট।

তোমার বয়স কত?

আঠারো।

তোমার বয়স মাত্র আঠারো। তুমি কেন পৃথিবীর নিরাপদ জীবন ছেড়ে মহাকাশের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?

মহাকাশ নিয়ে আমার একটি আকর্ষণ আছে।

সেটাই কী একমাত্র কারণ?

হ্যাঁ। সেটাই একমাত্র কারণ।

নুট।

বল।

আমি যদি বলি সেটা একমাত্র কারণ না।

(নিরুত্তর)

নুট।

বল।

আমার কথার উত্তর দাও। তুমি নিশ্চয়ই জান আমাদের নেটওয়ার্কে তোমার সব তথ্য আছে? তুমি মাত্র আঠারো বছরের একজন তরুণ। কিন্তু এর মাঝে তুমি তোমার ঘরে ভয়ংকর ভিরবিয়াস ড্রাগ তৈরি করে বিক্রি করার চেষ্টা করেছ। পৃথিবীতে থাকলে তোমাকে দীর্ঘ সময় শুদ্ধকরণ প্রতিষ্ঠানে কাটাতে হবে। সেজন্যে তুমি মহাকাশে পালিয়ে যেতে চাইছ।

(নিরুত্তর)

আমার কথার উত্তর দাও নুট।

(নিরুত্তর)

নুট।

বল। আমার কথার উত্তর দাও।

(নিরুত্তর)

তোমার নাম কী?

আমার নাম নীহা।

নীহা, তোমার বয়স কত?

ষোল।

নীহা।

বল।

নীহা, তুমি মাত্র ষোল বছরের একটি মেয়ে। তুমি কেন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছ?

আমি তোমার প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি পৃথিবীতে থাকি আর মহাকাশযানে থাকি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোনো গ্রহতেই থাকি, এর মাঝে পার্থক্য কী?

কোনো পার্থক্য নেই?

না।

কেন নেই, নীহা?

আমি গণিত ছাড়া আর কোনো কিছু বুঝি না। আমি প্রতিমুহূর্তে আমার মস্তিষ্কে গণিতের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করি। আমি যখন তোমার সাথে কথা বলছি তখন গণিত নিয়ে চিন্তা করতে করতে কথা বলছি। সত্যি কথা বলতে কী আমি রূপাকভ সমীকরণ নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই মাত্র তার একটি সমাধান পেয়ে গেছি।

তোমাকে অভিনন্দন নীহা।

এটি মোটেও অভিনন্দন পাওয়ার মতো কাজ নয়। খুবই সহজ কাজ।

নীহা। তুমি কিন্তু এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাও নি। কেন পৃথিবী আর মহাকাশযানে কিংবা অন্য কোনো গ্রহে থাকা একই ব্যাপার?

তার কারণ আমার চারপাশে কী আছে তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমার প্রয়োজন ছোট একটা ডেস্ক, ভাবনা করার জন্য নিরিবিলি একটু জায়গা।

পৃথিবীর কী নিরবিলি জায়গা নেই নীহা?

আছে।

তাহলে কেন মহাকাশযানের অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে চাইছ?

তার কারণ পৃথিবীতে থাকলে আমার চারপাশের সমাজ আমাকে সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতে বলবে। আমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দিবে না।

মহাকাশযানে তোমাকে নিরিবিলি বসে থাকতে দেবে?

দেবে। সেখানে মানুষের কোনো দায়িত্ব নেই। মহাকাশযান চালানোর জন্যে শক্তিশালী কম্পিউটার থাকে। তাছাড়া–

তাছাড়া কী, নীহা?

মহাকাশযানে ওঠার পর আমাদের শীতল ঘরে দীর্ঘদিনের জন্যে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে আগ্রহ আছে।

কী ধরনের আগ্রহ?

তাপমাত্রা কমিয়ে শরীরের সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে রাখলেও মস্তিষ্কের কোনো একটি ধাপ সচল থাকে বলে আমার ধারণা। আমি দীর্ঘ যাত্রায় মস্তিষ্কের সেই সচল অংশটুকু ব্যবহার করে দেখতে চাই।

নীহা।

বল।

তুমি কী জান তুমি খুব অদ্ভুত একটি মেয়ে।

(নিরুত্তর)

নীহা।

বল।

তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।

এটি আরেকটি কারণ।

কোনটি আরেকটি কারণ নীহা?

জন্মের পর থেকে আমি শুনে আসছি যে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে। তাই আমি এমন একটা জায়গায় যেতে চাই সেখানে পৃথিবীর কেউ নেই। কেউ যেন আমাকে না বলে আমি অদ্ভুত একটি মেয়ে।

নীহা।

বল।

আমার ধারণা বহুদূর কোনো গ্রহেও তোমাকে বলা হবে তুমি অদ্ভুত একটি মেয়ে।

(নিরুত্তর)

তুমি কী তবুও মহাকাশযান করে যেতে চাও?

হ্যাঁ।

যেতে চাই।

তোমার নাম কী?

আমার নাম সুহা।

তোমার সাথে যে শিশুটি আছে তার নাম কী?

ক্লদ।

সে তোমার কী হয়?

ক্লদ আমার ছেলে।

আমি তার মা।

সুহা, তোমার বয়স কতো?

আমার বয়স ছাব্বিশ।

ক্লদের বয়স কত? চার।

তুমি তোমার চার বছরের সন্তানকে নিয়ে মহাকাশযানে করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতে রওনা দিতে চাও?

আমি ব্যাপারটি সেভাবে দেখছি না।

তুমি ব্যাপারটি কীভাবে দেখছ?

আমি মনে করি আমার চার বছরের ছেলেকে নিয়ে এই মহাকাশযানে করে দূর মহাকাশে রওনা দিতে পারলে আমি আমার সন্তানের জীবন নিশ্চিত করতে পারব।।

তুমি কেন এই কথা বলছ?

কারণ আমি জানি রবোমানবেরা পৃথিবী দখল করে নেবে। তখন তারা কোনো মানুষকে রাখবে না। যদিবা রাখে তাদেরকে রবোমানবের আজ্ঞাবহ নিচু শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে থাকতে হবে। আমি আমার সন্তানের জন্যে সেই ধরনের জীবন চাই না। আমি তাকে মানুষের সম্মানিত জীবন দিতে চাই।

তুমি কেন বলছ এই পৃথিবী রবোমানবেরা দখল করে নেবে।

তার কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি তারা প্রায় দখল করে ফেলছে।

তুমি কীভাবে সেটা জান সুহা?

সংবাদ মাধ্যমে আগে রবোমানব খুঁজে পাওয়ার খবর দেয়া হতো। এখন দেয়া হয় না। যার অর্থ রবোমানবদের আর খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে না। কিংবা–

কিংবা কী?

কিংবা শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীতে রবোমানবেরা ঢুকে গেছে যেটি আরো বিপজ্জনক।

তুমি কী মানুষের কর্মদক্ষতাকে বিশ্বাস কর না?

করি। কিন্তু—

কিন্তু কী সুহা?

রবোমানবেরাও এক ধরনের মানুষ। আমাদের যা আছে তাদেরও তার সবকিছু আছে। তাদের একটা বাড়তি জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে থ্যালামাসে ইমপ্ল্যান্ট করে দেয়া নিউরন স্টিমুলেটর। সেটা তাদের মস্তিষ্ককে অনেক বেশি দক্ষ করে তুলেছে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি এই রবোমানবেরা খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবী দখল করে নেবে। আমি তার আগে পৃথিবী ত্যাগ করতে চাই।

তোমার চার বছরের ছেলে ক্লদ? সেও কী যেতে চায়?

ক্লদকে এখনো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া হয় না।

ক্লদের বাবা?

আমি তার সম্পর্কে কথা বলতে চাই না।

কেন?

কারণ আমি তার সম্পর্কে একটি ভালো কথাও বলতে পারব না। আমি ক্লদের সামনে কিছু বলতে চাই না।

ঠিক আছে। আমি কী ক্লদের সাথে একটু কথা বলতে পারি?

পার।

ক্লদ।

উঁ। তুমি কী জান তুমি কোথায় যাচ্ছ।

জানি।

কোথায়?

আকাশে।

আকাশে কোথায়?

রাত্রিবেলা যে তারাগুলো মিটমিট করে সেখানে।

সেখানে গিয়ে তুমি কী করবে?

আমি তারাগুলো ধরে একটা কাচের বোতলে রাখব। রাত্রিবেলা সেগুলো বোতলের ভেতর মিটমিট করবে।

চমৎকার ক্লদ। তোমাকে আরেকটা জিনিস জিজ্ঞেস করতে পারি?

পার। তুমি তোমার মাকে কতটুকু ভালোবাস?

অনেকটুকু। এই ঘরের সমান। আরো বেশি।

চমৎকার ক্লদ। চমৎকার।

ঘরটি ছোট, ঘরের ছাদ বেশ নিচু, ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায়। ঘরটির মাঝে একটি ধাতব টেবিল, টেবিল ঘিরে তেরোজন নারী-পুরুষ বসে আছে। ঘরটির ভেতর নিরানন্দ পরিবেশ কিন্তু ঠিক কেন সেটি নিরানন্দ হঠাৎ করে বোঝা যায় না। ধাতব টেবিলের একপাশে যে বসে আছে তার চেহারায় এক ধরনের কাঠিন্য লুকিয়ে আছে। সে টেবিলে থাবা দিতেই টেবিলের চারপাশে বসে থাকা নারী ও পুরুষগুলো ঘুরে তার দিকে তাকাল। মানুষটি সুনির্দিষ্ট কারো দিকে না তাকিয়ে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে তাদের গোপন সভা করেছে সেটা কি জানা গেছে?

কমবয়সী একটা মেয়ে খিলখিল করে হেসে বলল, আমাদের নিয়ে!

অবশ্যি আমাদের নিয়ে? কিন্তু আমাদের কোন বিষয়টা নিয়ে সেটা জানা গেছে?

মাঝবয়সী একজন মানুষ বলল, মোটামুটি অনুমান করতে পারি।

ঠিক আছে অনুমান কর।

মানুষটি বলল, আমরা রবোমানবেরা নেটওয়ার্ক দখলের দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেছি। সমাজের সব জায়গায় আমাদের রবোমানবেরা আছে—তারা গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। আগে যেরকম প্রতিদিন মানুষেরা কিছু রবোমানব ধরে ফেলতো-আজকাল সেটা পারছে না। তার প্রধান কারণ–

কঠিন চেহারার মানুষটি বিরক্তির সুরে বলল, আমরা সবাই এগুলো জানি। আমি তোমাকে যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল। বিজ্ঞান আকাদেমী কী নিয়ে সভা করেছে?

তারা একটা মহাকাশযান পাঠাবে।

মহাকাশযান?

হ্যাঁ।

তুমি কেমন করে সেটা জান? বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা ছিল গোপন। বিজ্ঞান আকাদেমীর কোনো সদস্যের মাঝে আমরা কোনো রবোমানব ঢুকাতে

পারি নি।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি তার গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, বিজ্ঞান আকাদেমীর সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীর অনেক জায়গায় অনেক রকম কাজ শুরু হয়ে গেছে। সব কাজগুলো হচ্ছে একটা মহাকাশযানকে নিয়ে। আমরা তাই অনুমান করছি একটি মহাকাশযান পাঠানো হবে।

মহাকাশযানে কী পাঠানো হবে?

কমবয়সী মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, মানুষ। মানুষের ফিটাস। মানুষের জিনোম।

কঠিন চেহারার মানুষটি কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল, জিজ্ঞেস করল, সত্যি?

হ্যাঁ। নেটওয়ার্কের তথ্য আমরা আজকাল যখন খুশি পরীক্ষা করতে পারি। আমি নিশ্চিতভাবে জানি অসংখ্য মানুষ, মানুষের ফিটাস আর জিনোম প্রস্তুত করা হচ্ছে!

কঠিন চেহারার মানুষটির মুখে বিচিত্র একধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সে দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, মানুষ তাহলে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে! নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে মহাকাশযানে করে কিছু মানুষ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পৃথিবীতে না থাকলেও অন্য কোথাও যেন মানুষেরা বেঁচে থাকে?

হ্যাঁ। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, সবকিছু দেখে আমাদের তাই মনে হচ্ছে।

কঠিন চেহারার মানুষটি তরল গলায় বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের অভিনন্দন। সেই দিনটি আর খুব বেশি দূরে নয় যখন আমরা পৃথিবীর দায়িত্ব নেব।

সবাই মাথা নাড়ল, শুধু মধ্যবয়স্ক মানুষটি গম্ভীর গলায় বলল, এখন আমাদের অনেক কাজ। পৃথিবীর দায়িত্ব নেবার আগে আমাদের নিজেদের কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে।

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমরা কি প্রস্তুতি নেইনি?

নিয়েছি। বেশ কিছু প্রস্তুতি নিয়েছি। নেটওয়ার্কটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার সাথে সাথে আমাদের কাজে লেগে যেতে হবে।

তুমি ঠিকই বলেছ। কঠিন চেহারার মানুষটি হঠাৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়, নিজের হাতের আঙুলগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার ঘনিষ্ঠ রবোমানবেরা, তোমাদের মাঝে যারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছ আমি তাদের পুরস্কার দিতে চাই!

ধাতব টেবিল ঘিরে বসে থাকা সবাই একটু নড়েচড়ে বসে তার দিকে তাকাল। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, তোমরা সবাই জান মানুষ রোমানব খুঁজে বের করার একটা পদ্ধতি বের করেছিল। যে ছেলেটি সেটা বের করেছিল তার অসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা থাকলেও মানুষ হিসেবে সে ছিল অতি নির্বোধ। আমাদের একজন এজেন্ট তার করোটি কেটে মস্তিষ্কটা বের করে নিয়ে এসেছে! সেই মস্তিষ্ক থেকে আমরা সব তথ্য বের করে এনেছি, বলতে পার এই ঘটনাটি রবোমানবের জীবনের বিশাল বড় একটি সাফল্য। যে এজেন্ট সেই কাজটি করেছে সেও আমাদের মাঝে আছে–আমি এখন তাকে পুরস্কৃত করতে চাই।

কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলের অন্য মাথায় বসে থাকা লাল চুলের কমবয়সী হাসিখুশি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, বল, তুমি কী পুরস্কার চাও?

লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমি এখন কোনো পুরস্কার চাই না। আমরা রবোমানবেরা যখন নেটওয়ার্ক দখল করে পৃথিবীর দায়িত্ব নিয়ে নেব তখন আমাকে পুরস্কার দিও! আমি তখন তোমার কাছে একটা পুরস্কার চাইব।

তখনো তুমি পুরস্কার পাবে। এখন তুমি কী পুরস্কার চাও বল।

লাল চুলের মেয়েটা রহস্যের ভঙ্গি করে বলল, সত্যি বলব?

বল।

আমি যে মস্তিষ্কটা কেটে এনেছি সেটাকে একটা ইন্টারফেস দিয়ে কমিউনিকেশন মডিউলের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যার অর্থ সেই মানুষটার সাথে আমি এখন কথা বলতে পারি। আমি কমিউনিকেশন মডিউল ব্যবহার করে আমার পরিচিত এই ছেলেটার সাথে মাঝে মাঝে কথা বলতে চাই। তাই তুমি পুরস্কার হিসেবে আমাকে এই মস্তিষ্কটা দিতে পার।

কঠিন চেহারার মানুষটি দুলে দুলে হাসতে হাসতে বলল, আমি ভেবেছিলাম রবোমানবের ভেতর থেকে মায়া-মমতা ভালোবাসা সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

লাল চুলের মেয়েটি হাসল, বলল, এটি মায়া মমতা ভালোবাসা না–এটা হচ্ছে একটা বিনোদন। যে মানুষের কোনো দেহ নেই, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই তার সাথে কথা বলার বিষয়টা প্রায় রূপকল্পের মতো। মানুষটি একটা শব্দহীন আলোহীন অস্তিত্বহীন জগতে অনন্ত জীবনের জন্য আটকা পড়ে আছে তার ভেতরে যে অমানুষিক আতংক আর হতাশা সেটি বিনোদনের জন্যে অসাধারণ।

কঠিন চেহারার মানুষটি লাল চুলের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, তথাস্তু। তোমার প্রিয় মানুষটির মস্তিষ্ক নিয়ে খেলা করার জন্যে সেটা তোমাকে দিয়ে দেয়া হল।

লাল চুলের মেয়েটি বলল, ধন্যবাদ। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, আমার মনে হচ্ছে আমরা আমাদের কাজে ঠিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। যেটি করা দরকার সেটি না করে অন্যান্য ছেলেমানুষী কাজে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলছি।

কঠিন চেহারার মানুষটির মুখের মাংসপেশি একটু শিথিল হয়ে সেখানে একটা হাসির আভাস পাওয়া গেল। সে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। আমরা সত্যিকারের কাজ না করে আনুষঙ্গিক কাজ বেশি করছি। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না। কেন জান?

কেন?

তার কারণ তুমি গোপনে সত্যিকারের কাজ করে যাচ্ছ?

মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, আমাদের ভেতর থেকে মায়া মমতা ভালোবাসা এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় অনুভূতিগুলো সরিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভয়ের অনুভূতিটি সরানো হয় নি। নিরাপত্তার জন্যে ভয়ের অনুভূতি দরকার। আমরা এখনো ভয় পাই। তুমি যেরকম ভয় পাচ্ছ। কঠিন চেহারার মানুষের মুখের হাসিটি আস্তে আস্তে সরে গিয়ে সেখানে আবার কাঠিন্যটি ফিরে আসে, সে শীতল গলায় বলল, তুমি কেন ভয় পাচ্ছ বলবে?

মধ্যবয়স্ক মানুষটি আমতা আমতা করে বলল, না–আমি ভয় পাচ্ছি না। আমি-

না পেলে ক্ষতি নেই। যখন প্রয়োজন হবে তখন ভয় পেলেই হবে। কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আমি বলেছি যে তোমাদের সবার কাজের জন্যে একটা পুরস্কার দেব। একজনকে দিয়েছি। তোমাকেও দেব।

আমাকে? আ-আমাকে?

হ্যাঁ। ছোট একা সীসার টুকরো। তোমার কপালে, শব্দের চেয়ে তিনগুণ গতিতে সেটা ঢুকে যাবে। সীসা নরম ধাতু, সেটা টুকরো টুকরো হয়ে তোমার মস্তিষ্ককে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। তুমি কিছু বোঝার আগেই তোমার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

কঠিন চেহারার মানুষটি তার ড্রয়ার থেকে একটা পুরানো ধাঁচের রিভলবার বের করে আনে। সেটির দিকে তাকিয়ে মধ্যবয়স্ক মানুষটির মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়, অবর্ণনীয় আতংকে সেটি কদর্য হয়ে ওঠে। মানুষটি কাঁপা গলায় বলল, তু–তুমি কী বলছ?

আমি কী বলেছি তুমি শুনেছ। রবোমানবদের এই বিস্ময়কর সাফল্যের কারণ হচ্ছে শৃঙ্খলা। কারণ হচ্ছে নেতৃত্ব। এই নেতৃত্বকে তুমি গোপনে চ্যালেঞ্জ করতে চাইছ? তোমার এতো বড় দুঃসাহস?

কঠিন চেহারার মানুষটি তার চেপে রাখা রিভলবারটি মধ্যবয়স্ক মানুষের কপালের দিকে তাক করে। মধ্যবয়স্ক মানুষটি ভাঙা গলায় বলল, আমি দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত–

মিথ্যা কথা বলো না। রবোমানবেরা কখনো দুঃখিত হয় না।

লাল চুলের মেয়েটি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, দাঁড়াও! দাঁড়াও।

কঠিন চেহারার মানুষটা মাথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

আমি কী একটু অন্যপাশে সরে বসতে পারি? কেন?

দৃশ্যটা যেন একটু ভালো করে দেখতে পারি। গুলি খাবার পর যখন একজন ছটফট করতে থাকে সেই দৃশ্যটি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।

কঠিন চেহারার মানুষটি লালচুলের মেয়েটিকে অন্যপাশে বসার সময় দিয়ে ট্রিগার টেনে ধরে।

কোনো আদি নেই কোনো অন্ত নেই। কোনো শুরু নেই কোনো শেষ নেই। এক ফোটা আলো নেই, এক বিন্দু শব্দ নেই। তাপ নেই, স্পর্শ নেই, অনুভূতি নেই। আলাে বর্ণ শব্দ গন্ধ স্পর্শ উত্তাপহীন এই জগতে সে কতদিন থেকে আটকে আছে কে জানে। কত লক্ষ বছর সে এভাবে আটকে থাকবে? এই বিশাল শূন্যতা থেকে তার কোনো মুক্তি নেই?

কতকাল পার হয়ে গেছে কে জানে তখন হঠাৎ মনে হল বহুদূর থেকে কে যেন তাকে ডাকছে। সত্যি ডাকছে নাকি এটি কনা? কেউ কি তাকে ডাকতে পারে? সে কি কারো কথা শুনতে পারে?

সে আবার তার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করল। এবারে সে স্পষ্ট শুনতে পায় কেউ একজন তাকে ডাকছে। বলছে, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

হ্যাঁ, সে শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু সে কেমন করে বলবে যে সে শুনতে পাচ্ছে? তার কথা বলার ক্ষমতা নেই। তার কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। তার মুখ নেই, কণ্ঠ নেই। তার সমস্ত চেতনা গভীর প্রত্যাশায় আকুলি-বিকুলি করে ওঠে কিন্তু সে কিছু করতে পারে না।

তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?

কণ্ঠস্বরটি পরিচিত, বহু পরিচিত। নারী কণ্ঠ, সে কতবার এই কণ্ঠ শুনেছে। তার ভালবাসার মেয়ের কণ্ঠ কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরটি শুনে সে অমানুষিক আতঙ্কে শিউরে ওঠে। চিৎকার করে উঠতে চায়, তুমি? তুমি? তুমি?

হ্যাঁ। আমি।

তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। রিসার্চ ল্যাব তোমার মস্তিষ্ক থেকে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একটা ইন্টারফেসের সাথে একটা কমিউনিকেশন্স মডিউল লাগিয়ে দিয়েছে।

আমি কোথায়?

আমার ঘরে। আমার বসার ঘরে। টেবিলের উপর একটা কাচের জারে তরলের মাঝে ড়ুবে আছ। থলথলে কুৎসিত একটা মস্তিষ্ক দেখলে গা ঘিন ঘিন করে, কিন্তু তবু আমি রেখে দিয়েছি। এখান থেকে বৈদ্যুতিক তার বের হয়ে এসেছে ইলেকট্রনিক প্রসেসর হয়ে মাইক্রোফোনে এসেছে, স্পিকারে এসেছে। আমি তোমার সাথে কথা বলতে পারি, তোমার কথা শুনতে পারি।

কেন? তুমি কেন আমার কথা শুনতে চাও?

এমনি! একজন মানুষের যখন দেহ থাকে না শুধু মস্তিষ্ক থাকে তখন সে কেমন করে চিন্তা করে আমার জানার ইচ্ছে করে।

তুমি–তুমি এমন নিষ্ঠুর কেমন করে হতে পার?

ওগুলো পুরানো কথা। আপেক্ষিক কথা। দুর্বল মানুষের কথা। নিষ্ঠুরতা বলে আসলে কিছু নেই।

আছে।

ঠিক আছে তাহলে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। একজন মানুষ যখন অন্য একজন মানুষকে হত্যা করে সেটা কী নিষ্ঠুরতা?

হ্যাঁ। সেটি নিষ্ঠুরতা?

মানুষকে হত্যা করা বড় নিষ্ঠুরতা নাকি তার মস্তিষ্ককে একটা গ্লাসের জারে পুষ্টিকর তরলের মাঝে ড়ুবিয়ে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা বড় নিষ্ঠুরতা?

মানুষকে হত্যা করে তার মস্তিষ্ককে বাঁচিয়ে রাখা অনেক বড় নিষ্ঠুরতা অনেক অনেক বড় নিষ্ঠুরতা-অনেক অনেক অনেক-

নারী কণ্ঠের উচ্ছল হাসির শব্দে সব কথা চাপা পড়ে গেল। মেয়েটি শুনতে পেল না অসহায় একটি মস্তিষ্ক থেকে হাহাকারের মতো করে ভেসে এলো, আর নিষ্ঠুরতার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাওয়া হচ্ছে আরো বড় নিষ্ঠুরতা।

মহামান্য থুল হলঘরে প্রবেশ করা মাত্রই তাকে সম্মান দেখানোর জন্যে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। ছোট শিশুটি মেঝেতে বসে একটা চতুষ্কোণ খেলনা দিয়ে খেলছিল, সবাইকে দাঁড়াতে দেখে সেও তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে যায়।

বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল একটু এগিয়ে গিয়ে ছোট শিশুটির থুতনি ধরে আদর করে বললেন, বস। তোমরা সবাই বস।

তিনি নিজে এসে একটি চেয়ারে বসার পর সবাই তাদের জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখা চেয়ারে বসে পড়ল। মহামান্য থুল সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, আমি তোমাদের শুধু বিদায় দিতে আসি নি তোমাদের এক নজর দেখতে এসেছি। পৃথিবীর বাইরে যারা নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবে আমি নিজের চোখে তাদের একটিবার দেখতে চাই।

।টুরান বলল, আমাদের এতো বড় দায়িত্ব দিয়েছেন সেজন্যে আপনাদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আমাদের কৃতজ্ঞতা।

আমরা তোমাদের দায়িত্ব দিই নি, তোমরা দায়িত্বটুকু নিয়েছ। সেজন্যে তোমাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আমি তোমাদের ফাইলগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছি। আমার ধারণা তোমরা চমৎকার একটি দল হবে। তোমাদের মতো একটি দলের হাতে আমরা নিঃসন্দেহে আরো অনেকের দায়িত্ব দিতে পারি। মহামান্য থুল সবার দিকে তাকালেন তারপর নরম গলায় বললেন, তোমরা নিশ্চয়ই জান তোমাদের মহাকাশযানে তোমাদের সাথে আরো বেশ কিছু মানুষ, মানুষের ভ্রণ এবং জিনোম পাঠানো হচ্ছে। যখন তোমরা নিশ্চিতভাবে একটি বাসস্থান খুঁজে নেবে শুধুমাত্র তখন পর্যায়ক্রমে তাদের জাগিয়ে তোলা হবে কিংবা বড় হতে দেয়া হবে।

ইহিতা জিজ্ঞেস করল, সেই ধরনের মানুষের সংখ্যা কত?

থুল একটু হাসলেন, হেসে বললেন, সংখ্যাটি আমি জানি, কারণ অনেক ভেবে-চিন্তে সংখ্যাটি ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু আমরা ঠিক করেছি সংখ্যাটির কথা তোমাদের বলব না। এটি থাকুক তোমাদের জন্যে একটা বিস্ময়।

টর ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, মহামান্য থুল, যাত্রার শুরুতেই আমাদেরকে শীতল ঘরে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। আমরা কেউ যদি চাই তাহলে কী আমরা জেগে থাকতে পারি?

না। তোমাদের জেগে থাকার কোনো সুযোগ নেই। ইচ্ছে করে সেই সুযোগ রাখা হয় নি। তেমাদের ভ্রমণটি তো আর এক দুই দিন বা এক দুই মাসের নয়। এটি কয়েকশ বছরের হতে পারে। আমরা চাই না তোমরা মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে থেকে থুথুড়ে বুড়ো হয়ে যাও!

মহামান্য থুলের কথা বলার ভঙ্গি শুনে সবাই হালকা গলায় হেসে ওঠে। টর কিছু একটা বলতে চাইছিল গুল তাকে থামালেন, বললেন, টর! তোমার হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। আমি জানি সারাজীবন তুমি শুধু উত্তেজনা খুঁজে বেড়িয়েছ! তোমাকে আমরা মোটেই নিরাশ করব না। এই মহাকাশযানে যদি কিছুমাত্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয় সেটা মোকাবেলা করার জন্যে অবশ্যই তোমাদের ঘুম থেকে ডেকে ওঠানো হবে।

ধন্যবাদ মহামান্য থুল।

তোমাদের আর কারো কোনো প্রশ্ন আছে?

কেউ কিছু বলার আগেই ক্লদ বলল, আমি কি ক্লাটুনকে সাথে নিতে পারি?

ক্লাটুন? ক্লাটুন কে?

ক্লদের মা সুহা বলল, ওর পোষা কুকুর।

থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি দুঃখিত ক্লদ। মহাকাশযানে তুমি ক্লাটুনকে নিতে পারবে না। কিন্তু তোমার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই কারণ তোমাদের মহাকাশযানে কুকুর বেড়াল পশুপাখি সবকিছু আছে। তুমি নিশ্চয়ই অন্য একটি ক্লাটুন পেয়ে যাবে!

ক্লদ মাথা নাড়ল, বলল, উঁহু। পাব না।

কেন পাবে না?

আমার ক্লাটুনের বুদ্ধি অন্য সব কুকুর থেকে বেশি।

সুহা তার ছেলেকে থামিয়ে বলল, ঠিক আছে ক্লদ, এখন আমি একটু কথা বলি?

ক্লদ মাথা নেড়ে চুপ করে গেল। সুহা এবারে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, মহামান্য থুল, আমার একটা প্রশ্ন ছিল আমি কী আপনাকে সেটা জিজ্ঞেস করতে পারি?

কর।

আমি কখনো ভাবি নি চার বছরের একটা শিশুকে নিয়ে আমার মতো একজন মাকে এই মহাকাশযানে যেতে দেয়া হবে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম সবাই হবে পূর্ণবয়স্ক অভিজ্ঞ মহাকাশচারী। এরকম একটি অভিযানে কেন আমাদের দুজনকে নেয়া হল?

থুল একটু হাসলেন, বললেন, তার কারণ এটি অন্যরকম একটি অভিযান। এই মহাকাশযানে আরো অনেক মানুষ, অনেক প্রাণী, গাছপালা, পশুপাখি অনেক কিছু থাকবে, কিন্তু তারা জেগে উঠবে যখন তোমরা তোমাদের অভিযান শেষ করে বেঁচে থাকার মতো একটা আবাসস্থল খুঁজে পাবে তখন। মূল অভিযানে তারা কেউ নেই, তাদের ভূমিকা মহাকাশযানের যন্ত্রপাতির মততা, জ্বালানির মতো, রসদের মতো! শুধু তোমাদের ভূমিকা হচ্ছে মানুষের।

থুল একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, মানুষের শক্তি হচ্ছে বৈচিত্র্যে, তাই তোমাদের দলটি তৈরি করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মানুষ দিয়ে। তোমরা সবাই একে অন্যের থেকে ভিন্ন। আমরা চাই তোমাদের মানবিক অনুভূতিগুলি প্রবলভাবে থাকুক। সেটা করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে একটি শিশুর উপস্থিতি। তাই এখানে একটা শিশুকে আনা হয়েছে। শিশু থাকতে হলে তার মাকে থাকতে হয়। তাই তুমি এসেছ।

কিন্তু যদি কখনো কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি হয়?

ছোট শিশুকে নিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি পাড়ি দেয়ার অনেক উদাহরণ এই পৃথিবীতে আছে। কাজেই সেটা নিয়ে আমরা মোটেও চিন্তিত নই।

থুল একবার সবার দিকে তাকালেন, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের আর কোনো প্রশ্ন আছে?

ক্লদ হাত তুলে আবার কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল সুহা তাকে থামাল। নীহা তখন দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, মহামান্য থুল শীতল ঘরে থাকার সময় আমাদের মস্তিষ্ক কি পুরোপুরি অচল হয়ে থাকবে?

থাকার কথা। তাপমাত্রা কমিয়ে তোমাদের জড় পদার্থ তৈরি করে ফেলা হবে।

আমরা কী তখন মস্তিষ্ক একটুও ব্যবহার করতে পারব না?

থুল হাসলেন, বললেন, তুমি চেষ্টা করে দেখ পার কিনা। না পারলেও ক্ষতি নেই, কারণ তুমি যে চিন্তাটি করতে করতে শীতল ঘরে ঘুমিয়ে পড়বে, ঘুম ভাঙবে ঠিক সেই চিন্তাটি নিয়ে। তুমি জানতেও পারবে না তার মাঝে হয়তো কয়েকশ বছর কেটে গেছে।

নীহা বলল, আমি এই অভিজ্ঞতাটুকু পাওয়ার জন্যে আর অপেক্ষা করতে পারছি না।

তোমাকে আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। মহামান্য থুল আবার সবার দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, আর কোনো প্রশ্ন আছে?

সবাই মাথা নাড়ল, জানাল তাদের আর কোনো প্রশ্ন নেই। থুল এবারে মুটের দিকে তাকিয়ে বললেন, নুট, সবাই কিছু না কিছু বলেছে। তুমি এখনো কিছু বল নি। তুমি কি কিছু জিজ্ঞেস করবে?।

নুট নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানাল সে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। মহামান্য থুল তখন উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, তোমাদের সাথে আমার কিংবা পৃথিবীর কোনো মানুষের সাথে সম্ভবত আর কখনো দেখা হবে না। আমি তোমাদের জন্যে শুভ কামনা করছি।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে একবার আলিঙ্গন করে ধীর পায়ে হেঁটে হলঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

স্কাউটশিপটা এক ধরনের ভোতা যান্ত্রিক শব্দ করতে করতে মহাকাশযানের পাশে এসে থামল। স্বয়ংক্রিয় কিছু যন্ত্রপাতি স্কাউটশিপটাকে আঁকড়ে ধরে। মহাকাশযানের গোলাকার দরজার সাথে বায়ুনিরোধক সংযোগটা নিশ্চিত করার পর ঘরঘর শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। বাতাসের চাপটি সমান হবার সময় একটা মৃদু কম্পন অনুভব করা গেল তারপর হঠাৎ করে সবকিছু পুরোপুরি নীরব হয়ে যায়।

সাতজন মহাকাশচারীকে মহাকাশযানে তুলে দেবার জন্যে যে চারজন ক্রু এসেছে তারা স্কাউটশিপের সিট থেকে নিজেদের মুক্ত করে ভাসতে ভাসতে কাজ শুরু করে দেয়। সবাইকে সিট থেকে মুক্ত করে ক্রুরা তাদেরকে খোলা দরজাটি দিয়ে মহাকাশযানের ভেতর নিয়ে আসে। যন্ত্রপাতিগুলো ইতস্তত ভেসে বেড়াচ্ছিল সেগুলোকে মহাকাশযানের গায়ে আটকে দিতে দিতে একজন ক্রু বলল, তোমরা ভারশূন্য পরিবেশটাতে একটু অভ্যস্ত হয়ে নাও, ভবিষ্যতে কাজে দেবে। টুরান একটু সামনে এগুতে যাওয়ার চেষ্টা করে শূন্যে পুরোপুরিভাবে একটা ডিগবাজি খেয়ে বিব্রতভাবে বলল, ট্রেনিংয়ের সময় ভেবেছিলাম বিষয়টা খুব সোজা!

হাসিখুশি চেহারার ত্রুটি মহাকাশযানের এক অংশ থেকে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে অন্য অংশে ভেসে যেতে যেতে বলল, যে কোনো বিষয় অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর সোজা। তোমরাও দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে!

ইহিতা মহাকাশযানের দেয়াল ধরে সাবধানে একটু এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে বলল, কিন্তু আমরা তো অভ্যস্ত হবার সুযোগ পাব না। মহাকাশযানটির ভেতরে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি করার জন্যে তোমরা তো একটু পরেই এটাকে তার অক্ষের উপর ঘোরাতে শুরু করবে।

টুরান মহাকাশযানের মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঝুলে ছিল, সেখান থেকে সরে যাবার চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদেরকে একটু পরে শীতলঘরে আটকে দেবে, মাধ্যাকর্ষণ দিয়েছ কী দাও নি সেটা তো আমরা জানতেও পারব না!

মধ্যবয়স্ক একজন ক্রু একটা প্যানেলের সামনে নিজেকে আটকে ফেলে বলল, মহাকাশযানের কক্ষপথে ঠিকভাবে চালিয়ে নিতে মহাকাশযানে একটা কৌণিক ভরবেগ দিতে হয়–মাধ্যাকর্ষণটি আসল উদ্দেশ্য না।

টর ভাসতে ভাসতে খানিকদূর এগিয়ে গিয়ে বলল, আমি এখনো মনে করি আমাদের শীতলঘরে বন্ধ করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। মহাকাশযানের যাত্রাটা আমাদের উপভোগ করতে দেয়া দরকার।

ইহিতা হেসে বলল, বারো জি ত্বরণে যাওয়ার সময় তুমি সেটা উপভোগ করবে বলে মনে হয় না! স্কাউটশিপেই আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল মনে আছে?

টর মহাকাশযানের একটা ভাসমান মডিউলকে ধরার চেষ্টা করে বলল, যেহেতু সত্যিকারের মহাকাশযানে এসেছি একটু বাড়তি উত্তেজনা তো পেতেই পারি।

মহাকাশচারীদের ছোট দলটি যখন ভারশূন্য পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল তখন দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ক্লদকে সবার আগে বিষয়টিতে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে দেখা গেল। সে মহাকাশযানের এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে রবারের বলের মতো ছুটে যেতে লাগল, এবং তার মুখের আনন্দধ্বনি মহাকাশযানের পরিবেশটুকুকে বেশ অনেকখানি সহজ করে তুলে।

কিছুক্ষণের মাঝে মহাকাশযানের শক্তিশালী কুরু ইঞ্জিন গর্জন করে ওঠে এবং পুরো মহাকাশযানটি কেঁপে ওঠে। মহাকাশযানের ভেতর বাতাসের প্রবাহ শুরু হয়ে যায়। বিশাল মহাকাশযানের নানা অংশে আলো জ্বলে ওঠে এবং অসংখ্য যন্ত্রপাতি গুঞ্জন করে ওঠে।

কয়েকজন ক্রু মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলে কাজ করছিল। তারা এবারে সবাইকে ডাকল, বলল, মহাকাশযানের কোয়ান্টাম কম্পিউটার চালু হয়েছে। তোমরা এসে নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নাও।

সুহা বৃথাই তার ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদের সবাইকে আসতে হবে? ক্লদকেও?।

মধ্যবয়স্ক ক্রু বলল, ঠিক আছে, ক্লদকে একটু পরে আনলেও হবে। অন্যরা এসো।

দলের বাকি ছয়জন সদস্য ভাসতে ভাসতে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। টর জানতে চাইল, কোথায় কোয়ান্টাম কম্পিউটার?

এই যে আমি এখানে। মহাকাশযানের ভেতর একটা কণ্ঠস্বর গম গম করে ওঠে।

টুরান বলল, এখানে মানে কোথায়?

এখানে মানে এই মুহূর্তে এখানে। যদি তুমি অন্য কোথাও থাকো আমি সেখানেও থাকব। আমি এই মহাকাশযানের সবজায়গায় আছি। সবসময়ে আছি।

নীহা জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?

কণ্ঠস্বরটি তরল গলায় বলল, আমি তো আর তোমাদের মতো মানুষ নই যে আমার একটা নাম কিংবা পরিচয় থাকতে হবে। কিন্তু তোমরা যদি চাও আমাকে ট্রিনিটি নামে ডাকতে পার। ট্রিনিটি নামটি আমার খুব পছন্দের।

নীহা বলল, ট্রিনিটি, তোমার সাথে পরিচয় হয়ে খুব খুশি হলাম।

ধন্যবাদ নীহা।

তুমি আমার নাম জান?

শুধু নাম? আমি তোমার সবকিছু জানি। সত্যিকথা বলতে কী আমি তোমার সম্পর্কে এমন অনেক কিছু জানি যেটা তুমি নিজেই জান না!

সেটা কীভাবে সম্ভব?

খুবই সম্ভব। তুমি ইরিত্রা রাশিমালার যে সমস্যাটা নিয়ে চিন্তা করছ, তুমি যে তার সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছ, তুমি কী সেটা জান? জান না। আমি জানি।

কী আশ্চর্য!

এটা মোটেও আশ্চর্য কিছু নয়। আমার জন্যে এটা খুবই সোজা। তোমাদের সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার ওপর, আমি তোমাদের সবসময় চোখে চোখে রাখি। তোমাদের শরীরের ভেতরে এমনকি মস্তিষ্কের ভেতরেও আমি উঁকি দিতে পারি!

কী আশ্চর্য! নীহা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার বলল, কী আশ্চর্য!

সুহা চোখের কোনা দিয়ে ক্লদকে দেখার চেষ্টা করছিল, সে তখন মহাকাশযানের এক অংশে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বিপজ্জনকভাবে অন্যদিকে ছুটে যাচ্ছে। সুহার চোখে মুখে আতংকের একটা ছায়া পড়ল, মনে হয় সেটা দেখেই কোয়ান্টাম কম্পিউটার ট্রিনিটি তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল, সুহা! তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমার ছেলে ক্লদকে চোখে চোখে রাখছি! তার কিছু হবে না।

সত্যি?।

সত্যি। সে চেষ্টা করলেও নিজেকে ব্যথা দিতে পারবে না। আমাদের এই মহাকাশযানের নিরাপত্তার ব্যবস্থার খুঁটিনাটি জানলে তুমি হতবাক হয়ে যাবে।

তোমার সাথে কথা বলেই আমি হতবাক হয়ে যাচ্ছি।

স্কাউটশিপে করে আসা ক্রুদের একজন বলল, ট্রিনিটি। আমরা কী আনুষ্ঠানিকভাবে তোমার কাছে এই মহাকাশচারীদের দায়িত্ব দিয়ে ফিরে যেতে পারি?

অবশ্যই পার। তোমার তথ্য ক্রিস্টালটি আমার ভিডি রিডারে প্রবেশ করিয়ে দাও। আমি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সাতজন মহাকাশচারীর দায়িত্ব নিয়ে নেব।

মধ্যবয়স্ক ক্রুটি তার পিঠে ঝোলানো ব্যাগ থেকে চতুষ্কোণ একটি ক্রিস্টাল বের করে কন্ট্রোল প্যানেলের নির্দিষ্ট জায়গায় ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ একধরনের যান্ত্রিক শব্দ হল, প্যানেলে কিছু আলোর ঝলকানি হল তারপর ক্রিস্টালটি আবার বের হয়ে এলো। সবাই আবার তখন ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, চমৎকার! ছয়জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং একজন শিশুর দায়িত্ব আমি নিয়ে নিচ্ছি। এই সাতজন মানুষ ছাড়াও শীতলঘরে আরো অসংখ্য মানুষ, প্রাণী, বৃক্ষলতা, তাদের দ্রুণ এবং তথ্য রয়েছে আমি সেগুলোর দায়িত্বও নিয়ে নিচ্ছি।

মধ্যবয়স্ক ক্রুটি কন্ট্রোল প্যানেল থেকে চতুষ্কোণ ক্রিস্টালটি বের করে সাবধানে নিজের ব্যাগে রেখে বলল, তাহলে আমরা বিদায় নিই?

ট্রিনিটি বলল, হ্যাঁ তোমাদের বিদায় নেয়ার সময় হয়ে গেছে। আমি যখন আমার সবগুলো কুরু ইঞ্জিন চালু করব তখন তোমাদের স্কাউটশিপ নিয়ে এই মহাকাশযান থেকে দূরে থাকা ভালো, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর ঢুকে যাওয়া উচিত।

চারজন ক্রু তাদের যন্ত্রপাতি বাক্সে ঢুকিয়ে নিয়ে বিদায় নেবার জন্যে প্রস্তুত হল। মধ্যবয়স্ক ক্রু, একটু এগিয়ে এসে একজন একজন করে সাতজন মহাকাশচারীর সবার হাত স্পর্শ করল, তারপর বলল, তোমরা কারা, কেন তোমরা এই মহাকাশযানে এসেছ, তোমরা কোথায় যাবে, কতদিনের জন্য যাবে, কেন যাবে আমরা কেউ সেগুলো কিছু জানি না। আমাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তোমাদের এই মহাকাশযানে এনে ট্রিনিটির হাতে তুলে দেওয়ার জন্যে। আমরা সেই দায়িত্ব শেষ করে তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।

টুরান বলল, আমরা কারা কেন কোথায় যাচ্ছি তার সবকিছু আমরা জানি, কিন্তু আমাদের সেই কথাগুলো কাউকে বলার কথা নয়, তাই তোমাদেরকেও বলছি না–

মধ্যবয়স্ক ক্রু বলল, আমরা সেটি নিয়ে কোনোরকম কৌতূহল দেখাচ্ছি না! কিন্তু আমরা জানি তোমাদের এই মিশন মানবজাতির জন্যে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ, আমরা তোমাদের সাফল্য কামনা করি।

তোমাদের ধন্যবাদ।

অন্য তিনজন ক্রু এগিয়ে এসে সবার হাত স্পর্শ করে বিদায় নিয়ে মহাকাশযানের গোল দরজা দিয়ে ভেসে ভেসে বের হয়ে গেল। গোল দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবার পর তারা একটা মৃদু গর্জন এবং কম্পন অনুভব করে। একটু পরেই স্বচ্ছ জানালা দিয়ে তারা স্কাউটশিপটাকে নীল আলো ছড়িয়ে ছুটে যেতে দেখে।

টুরান তখন অন্য সবার দিকে তাকিয়ে বলল, এখন থেকে আমরা একা। একেবারে একা।

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। আমাদের জন্যে ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করে আছে আমরা জানি না। যদি কখনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।

নীহা বলল, ট্রিনিটি আমাদের সাহায্য করবে।

টুরান মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। অবশ্যই। ট্রিনিটি অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবে।

ইহিতা বলল, আমাদের কিছুক্ষণের মাঝে শীতলঘরে ঢুকে যেতে হবে, কতোদিন সেখানে আমরা থাকব জানি না। আবার কখন সবার সাথে দেখা হবে বলতে পারি না। আমার তাই মনে হয় শীতলঘরে যাবার আগে নিজেদের মাঝে একটু কথা বলে নিই। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা।

টুরান কন্ট্রোল প্যানেলের একটা মনিটর ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, আমাদের ভরশূন্য পরিবেশে থাকার অভ্যাস নেই। এভাবে ভেসে ভেসে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা সোজা নয়।

ইহিতা ভুরু কুঁচকে বলল, গুরুত্বপূর্ণ কথা তাহলে কেমন করে বলতে হয়।

টুরান কাঁধ ঝাকুনি দিয়ে বলল, আমার গুরুত্বপূর্ণ কিংবা হালকা কোনো ধরনের কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না।

ইহিতা কিছুক্ষণ স্থির চোখে টুরানের দিকে তাকিয়ে রইল, কথা বলার প্রস্তাবটি আমি না দিয়ে যদি একজন পুরুষমানুষ দিত তাহলে কী তুমি আরেকটু আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে?

সম্ভবত।

ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, টুরান। তোমার ব্যক্তিগত জীবনের একটা ঘটনাকে তুমি এই মহাকাশযানের এতো বড় একটা অভিযানে টেনে আনবে আমি সেটা বিশ্বাস করি নি।

টুরান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি দুঃখিত। কিন্তু আমার কিছু করার নেই।

টর একটু এগিয়ে এসে বলল, ঠিক আছে, টুরানের যদি আগ্রহ না থাকে থাকুক। আমরা অন্যেরা তোমার গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো শুনি।

ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমরা তো যন্ত্র নই। আমরা মানুষ। মানুষের কাছে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ কথা মাত্র একটিই হতে পারে।

টুরানের মুখে এক ধরনের হাসি ফুটে ওঠে, সেটি কী? একজনের জন্যে অন্যজনের সহমর্মিতা।

টুরান এবার হাসির মতো শব্দ করল, বলল, সহমর্মিতা অনেক কঠিন শব্দ। আমরা না হয় সেটি ব্যবহার না করলাম। তাছাড়া এই ধরনের শব্দ আমি বিশ্বাস করি না।

টর বলল, টুরান, তুমি কেন ইহিতাকে কথা বলতে দিচ্ছ না?

ইহিতা বলল, সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে হয় আমার আর কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমরা এখন আমাদের শীতলঘরে যাই। যাবার আগে সবার জন্যে শুভেচ্ছা। আমরা আবার যখন জেগে উঠব, সেটি হবে আমাদের জন্যে নতুন জীবন।

নীহা বলল, আমি সেই নতুন জীবনের জন্যে অপেক্ষা করে আছি।

সুহা বলল, তোমরা আমার সন্তানটির জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করো যেন তাকে আমি একটি সুন্দর জীবন দিতে পারি।

নীহা বলল, নিশ্চয়ই পারবে সুহা। নিশ্চয়ই পারবে।

ইহিতা নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, নুট, তুমি কখনো কোনো কথা বল না। আজকে কী বলবে?

নুট জোর করে হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়ল, সে বলবে না। ৪২

ঠিক আছে, নুট। আশা করছি ভবিষ্যতে কখনো আমরা তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাব!

টুরান বলল, চল আমরা শীতলঘরে যাই। আমি এই অতীতকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পিছনে ফেলে যেতে চাই।

টর বলল, আমি কী ঠিক করেছি জান? কী?

আমি শীতলঘরে ঢুকব না। আমি বাইরে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে থাকব। আমি মহাকাশযানটির গতিবিধি দেখতে চাই।

হঠাৎ করে ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর গমগম করে ওঠে, না টর। সেটি সম্ভব নয় তোমাকে শীতলঘরে ঢুকতে হবে।

আমি ঢুকব না। আমি মানুষ, আমি একটা কম্পিউটারের নির্দেশ মানতে রাজি নই।

টর। আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাই না। একটা মহাকাশযানের মূল কম্পিউটার হিসেবে আমার অনেক ক্ষমতা। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমি তোমাকে শীতলঘরে যেতে বাধ্য করতে পারি।

কীভাবে?

আমি তোমাকে সেটি বলব না। তুমি যদি আমার কথা না শোনো আমি তোমাকে বাধ্য করতে পারব। আমার সেই ক্ষমতা আছে।

টর কঠোর মুখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ট্রিনিটি, আমি তোমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। আমাকে বাধ্য কর।

ট্রিনিটি বলল, সেটি না করলেই ভালো করতে। বিশ্বাস কর আমি অনেক কিছু করতে পারি।

টর মুখ শক্ত করে বলল, আমি বিশ্বাস করি না!

ঠিক আছে, আমি তাহলে অন্যদের বলছি। তোমরা শীতল ঘরে যাও, প্রস্তুতি নাও।

টুরান ইতস্তত করে বলল, আর টর?

ট্রিনিটি বলল, সেও আসবে। তোমরা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না।

টুরান বলল, আমার মনে হয় আমরা নিজেদের মাঝে একটা বোঝাঁপড়া করে নিতে পারতাম। আমাদের মাঝে কাউকেই নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়া হয় নি। আমরা সেটা করে নিতে পারতাম, তাহলে এই ঝামেলাটুকু হত না।

ইহিতা বলল, একটু আগে আমি সেই প্রস্তাবটি করেছিলাম তখন তুমি রাজি হও নি। এখন তুমি নিজে এই প্রস্তাবটি করছ।

টুরান মুখ শক্ত করে বলল, দুটি আসলে এক বিষয় নয়।

ইহিতা ভেসে ভেসে সামনে অগ্রসর হতে হতে বলল, দুটি আসলে একই বিষয়। তুমি সেটা খুব ভালো করে জান।

টুরান কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল, সে স্বীকার করতে চাইছে না কিন্তু এই মেয়েটি আসলে সত্যি কথাই বলেছে।

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, উপরে যে ঘরটিতে সবুজ বাতি জ্বলছে তোমরা সবাই সেখানে যাও। সবার জন্যে আলাদা করে একটা ক্যাপসুল রাখা আছে। তোমরা সেখানে ঢুকে যাও। টরকে নিয়ে তোমরা চিন্তা করো না। আমি নিশ্চিতভাবে বলছি, সেও চলে আসবে। সম্ভবত তোমাদের আগেই সে ক্যাপসুলে ঢুকে যাবে।

প্রথমে ক্লদ, তার পিছু পিছু তার মা সুহা, তাদের পিছনে পিছনে ইহিতা নুট আর নীহা, সবশেষে টুরান উপরের ঘরটিতে এসে ঢুকল। দেয়ালের সাথে সাতটি ক্যাপসুল লাগানো, ক্যাপসুলের ওপর ছোট স্ক্রিনে তাদের ছবি। সবাই নিজের ক্যাপসুল খুঁজে বের করে নেয়। ক্লদ আনন্দের শব্দ করে বলল, আমার ক্যাপসুলটি কতো সুন্দর দেখেছ, মা?

সুহা বলল, হ্যাঁ বাবা খুব সুন্দর।

ভেতরে ভিডি রিডার আছে।

হ্যাঁ। তুমি খেলতে পারবে। আমাদের সাথে কথা বলতে পারবে।

আমি ভিতরে ঢুকি?

ঢুকে যাও। ঢুকে যাবার আগে শুধু আমাকে একটু আদর দিয়ে যাও।

ক্লদ তার মাকে একবার জড়িয়ে ধরল। সুহা গভীর মমতায় শিশুটিকে ক্যাপসুলের ভেতর শুইয়ে দেয়। আবার তার সাথে কবে দেখা হবে সে জানে। কত বছর পার হয়ে যাবে? একশ বছর? দুইশ বছর? নাকি লক্ষ বছর?

ক্লদের ক্যাপসুলের ঢাকনাটি নেমে এসে ক্যাপসুলটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে অন্য সবাই একট আর্ত চিৎকার শুনতে পায়। ইহিতা চমকে ওঠে বলল, কী হয়েছে?

ট্রিনিটি বলল, টরকে শীতলঘরে আনছি। ছোট একটা ইলেকট্রিক শক দিয়েছি।

ইহিতা কঠিন গলায় বলল, তুমি আমাদের একজন অভিযাত্রীকে ইলেকট্রিক শক দিতে পার না।

পারি। শুধু ইলেকট্রিক শক নয়, আরো অনেক কিছু করতে পারি। এই মহাকাশযানটি আমার দায়িত্বে। এটি ঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্যে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়।

আমি ভেবেছিলাম একটি কম্পিউটার কখনো একজন মানুষকে অত্যাচার করতে পারে না। তাদেরকে সেই অধিকার দেয়া হয় নি।

ঠিক তখন আবার একটা ভয়ংকর আর্ত চিৎকার শুনতে পেল, আগের থেকে জোরে এবং আগের থেকে দীর্ঘ সময়ব্যাপী। প্রায় সাথে সাথেই সবাই দেখতে পেল টর বাতাসে ভেসে ভেসে দ্রুত এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ঘরের দরজায় সে আঘাত খেয়ে পিছনে ছিটকে গেল এবং দেয়াল আঁকড়ে ধরে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সে ঘরের ভেতরে ঢুকে পাগলের মতো নিজের ক্যাপসুলটি খুঁজতে থাকে। তার চোখ-মুখ রক্তশূন্য, প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বিকৃত এবং কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে সে তার ক্যাপসুলে হুঁড়মুড় করে ঢুকে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। ইহিতা ক্যাপসুলে মাথা ঢুকিয়ে টরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী হয়েছে টর?।

টর বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, কানের ভেতর ভয়ংকর শব্দ, মনে হয় মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কী ভয়ানক যন্ত্রণা তুমি চিন্তা করতে পারবে না!

এখন বন্ধ হয়েছে?

হ্যাঁ বন্ধ হয়েছে। টর হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, আমি এই ট্রিনিটিকে খুন করে ফেলব। সৃষ্টিকর্তার দোহাই, খুন করে ফেলব।

ট্রিনিটি একটা কম্পিউটার! কম্পিউটারকে খুন করবে কেমন করে?

সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও!

টর কথা শেষ করার আগেই ক্যাপসুলের দরজাটি নেমে আসে। ইহিতা মৃদু স্বরে বলল, কাজটা ঠিক হল না।

নীহা জানতে চাইল, কোন কাজটা?

আমরা এখনো আমাদের যাত্রা শুরু করিনি এর মাঝে ট্রিনিটির সাথে টরের বিরোধ!

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমরা সেটা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আমার সাথে কারো বিরোধ নেই।

ইহিতা বলল, না থাকলেই ভালো। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, চল আমরা আমাদের ক্যাপসুলে ঢুকে যাই।

নীহা বলল, চল।

সবাই যখন নিজের ক্যাপসুলে ঢুকছে তখন ইহিতা দেখল নুট তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ইহিতা অবাক হয়ে বলল, নুট! কিছু বলবে?

নুট মাথা নাড়ল। ইতিহা জিজ্ঞেস করল, কী বলবে?

নুট মৃদু গলায় ফিসফিস করে বলল, আমার খুব ভয় করছে।

কিসের ভয়?

শীতলঘরে ঘুমানোর পর যদি আর কখনো জেগে না উঠি!

ইহিতা নুটের হাত ধরে বলল, জেগে উঠবে। নিশ্চয়ই জেগে উঠবে।

তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ?

ইহিতা একমুহূর্ত ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। যাও ক্যাপসুলে শুয়ে পড়।

নুট তার ক্যাপসুলে যেতে যেতে আবার ফিরে এসে ইহিতার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার যদি কিছু করার জন্যে কখনো সাহায্যের দরকার হয় তুমি আমাকে বল। তুমি যেটা বলবে আমি সেটা করব।

ইহিতা হেসে বলল, অবশ্যই বলব নুট। অবশ্যই বলব।

ক্যাপসুলের ঢাকনাটা নেমে আসার সাথে সাথে ইহিতা একটা মিষ্টি গন্ধ অনুভব করতে পারল। তাদেরকে ঘুম পাড়ানোর জন্যে সম্ভবত কোনো একটি গ্যাস ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ইহিতা সামনে রাখা মনিটরটা স্পর্শ করে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমি পৃথিবীটাকে শেষবার দেখতে চাই।

মনিটরে ধীরে ধীরে নীল পৃথিবীটার ছবি ভেসে উঠল। এই অপূর্ব সুন্দর নীল গ্রহটি ছেড়ে সে চলে যাবে? আর কখনো এই গ্রহটি সে দেখতে পাবে না? তাদের নতুন গ্রহ কেপলার টুটুবি দেখতে কেমন হবে? পৃথিবীর মতো সুন্দর?

গভীর একটা বেদনায় তার বুক টনটন করতে থাকে। ইহিতা অনুভব করে খুব ধীরে ধীরে অপূর্ব নীল গ্রহটি আবছা হয়ে আসছে। তার চোখে ঘুম নেমে আসছে। ঘুম। গভীর ঘুম।

কতো বছর পর তার এই ঘুম ভাঙবে?

ছোট ঘরটির ধাতব টেবিল ঘিরে বারোজন নারী পুরুষ বসে আছে, দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে এরা সবাই রবোমানব। কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলে থাবা দিতেই সবাই তার দিকে তাকাল। সে একটু হাসার ভঙ্গি করে বলল, আগে যতবার এই ঘরটিতে তেমাদের নিয়ে বসেছি, প্রত্যেকবার আমার ভেতরে এক ধরনের চাপা ভয় কাজ করেছে। যদি মানুষেরা খবর পেয়ে যায়–যদি তারা আমাদের ধরতে চলে আসে! মানুষটি তার আঙুল দিয়ে টেবিলে একটু শব্দ করে বলল, এই প্রথমবার আমার ভেতরে কোনো ভয় নেই। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নেটওয়ার্কটি এখনো দখল করি নি, কিন্তু নেটওয়ার্কটির গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে এসেছে। এখন হঠাৎ করে নিরাপত্তাবাহিনীর কেউ আর আমাদের ধরতে চলে আসবে না!

লালচে চুলের মেয়েটি বলল, তোমাকে অভিনন্দন!

আমাকে অভিনন্দন দেবার কিছু নেই। আমরা সবাই মিলে করেছি।

কিন্তু তোমার নেতৃত্বে করেছি। তুমি অসাধারণ একটি পরিকল্পনা করেছ। নেটওয়ার্কে যখন প্রথমবার তোমার ছবি আর নামটি চলে আসবে, যখন সবাই জানবে নতুন পৃথিবীর নতুন নেতা তুমি-তখন পৃথিবীর গোবেচারা মানুষগুলোর কী অবস্থা হবে কল্পনা করেই আমার শরীরে শিহরণ হতে থাকে!

কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, তোমার শিহরণকে আর দুটি দিন আটকে রাখ। এখন থেকে ঠিক দুইদিন পর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে নেটওয়ার্ক দখল করব।

কমবয়সী একজন মানুষ ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, নেটওয়ার্ক দখল করার পর, সবচেয়ে প্রথম আমরা কী করব?

সবকিছু ঠিক করা আছে। সময় হলেই দেখতে পাবে?

আমাদের আগে থেকে বলবে না?

বলব। তোমাদের নিয়ে কাজ করেছি, তোমাদের না বললে কাকে বলব? কঠিন চেহারার মানুষটার মুখ হঠাৎ করে আরো কঠিন হয়ে যায়, সবার প্রথম আমরা বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজনকে ধরে আনব। সত্যি কথা বলতে কী ধরে আনা হবে না, যেখানে যাকে পাওয়া যাবে সেখানেই তাকে শেষ করে দেয়া হবে। তবে পৃথিবীর গোবেচারা মানুষদের আমরা সেটা জানাব না। তাদেরকে জানাব ওদের ধরে আনা হয়েছে বিচার করার জন্যে। তারপর আমরা ওদের বিচার করে শাস্তি দেব।

হাসিখুশি একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন অপরাধের জন্যে আমরা তাদের শাক্তি দেব?

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, অপরাধের কী আর শেষ আছে? মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করার অপরাধ। রবোমানবদের প্রতি অবিচার করার অপরাধ? পৃথিবীর সম্পদ ধ্বংস করার অপরাধ! এমন কী তাদের বিরুদ্ধে শিশু হত্যার অপরাধ পর্যন্ত আনতে পারি?

লাল চুলের মেয়েটি বলল, সেটা কী কেউ বিশ্বাস করবে? এই দুর্বল কাপুরুষ অথব কিছু মানুষ-তারা শিশু হত্যা করতে পারে সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না।

কঠিন চেহারার মানুষটি টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, একশবার বিশ্বাস করবে। পুরো নেটওয়ার্ক আমাদের দখলে, সেই নেটওয়ার্কে হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য সংরক্ষিত করে রাখা হবে। আমরা দিনকে রাত রাতকে দিন করতে পারব। সূর্যকে চাদ, চাঁদকে সূর্য করে ফেলতে পারব। বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি থুলকে সবচেয়ে বড় ভণ্ড হিসেবে দেখানো হবে। মানুষটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আর এই বুড়োটিকে আমি নিজের হাতে খুন করতে চাই।

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, আমাকে সেই দৃশ্যটি নিজের চোখে দেখতে দেবে?

কেন?

দুটি কারণে, প্রথমত, এসব দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। দ্বিতীয়ত, তোমর মনে আছে আমার ঘরে একটা ছেলের মস্তিষ্ক আমি বাঁচিয়ে রেখেছি?

মনে আছে।

আমি তাকে এই ঘটনাটি নিজের মুখে বর্ণনা করতে চাই। যখন একজন মানুষের একটা মস্তিষ্ক ছাড়া আর কিছু থাকে না তখন তার থেকে অসহায় আর কিছু নেই। সেই অসহায় মানুষটির মস্তিষ্ক যখন আকুলি বিকুলি করতে থাকে সেটি দেখার চাইতে বড় বিনোদন আর কিছু হতে পারে না!

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, ঠিক আছে, আমি তোমাকে সেই দৃশ্যটি দেখতে দেব।

ধন্যবাদ! তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। অনেক অনেক ধন্যবাদ!

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, আজকে আমরা একত্র হয়েছি তোমাদের কিছু তথ্য জানতে। এখন পৃথিবীর সবকিছু পরিচালনা করে বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন মানুষ। নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবার পর বিজ্ঞান আকাদেমীর জায়গায় চলে যাব আমরা এগারোজন মানুষ।

ধাতব টেবিল ঘিরে বসে থাকা মানুষগুলো হঠাৎ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। কঠিন চেহারার মানুষটি হাসি হাসি মুখে বলল, কী হল, তোমরা হঠাৎ করে এতো শান্ত হয়ে গেলে কেন?

কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটি তার মুখের হাসিটিকে আরো বিস্তৃত হতে দিয়ে বলল, কী হল, তোমরা কেউ কথা বলছ না কেন?

সুদর্শন একজন মানুষ তার কপাল থেকে ঘাম মুছে বলল, আমরা এখানে বারোজন আছি, কিন্তু তুমি বলেছ আমরা এগারোজন!

তার মানে কী?

তার মানে এই বারোজনের একজন–

বারোজনের একজন?

থেকেও নেই।

চমৎকার বিশ্লেষণ! চমৎকার! তুমি যখন এতো চমৎকার বিশ্লেষণ করতে পার তোমাকে তাহলে আরো একটু বিশ্লেষণ করতে দিই। তুমি বল কোন মানুষটি এখানে থেকেও নেই?

সুদর্শন মানুষটি সবার মুখের দিকে তাকাল তারপর ঘুরে কঠিন চেহারার মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, এখানে যারা আছে তাদের কেউই কখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নি। শুধু আমি তোমার সাথে পাশাপাশি কাজ করেছি। তুমি আর আমি মিলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি।

তার অর্থ কী?

তার অর্থ আমাদের এই বারোজনের মাঝে কাউকে যদি মারা যেতে হয়, তাহলে সেটি হবে তুমি না হয় আমি।

চমৎকার, তাহলে তুমিই বল। মানুষটি কী তুমি না আমি?

সুদর্শন চেহারার মানুষটি একদৃষ্টে কঠিন চেহারার মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে একটা বিষণ্ণ হাসি ফুটে ওঠে–সে ফিস ফিস করে বলল, দোহাই লাগে, আমাকে তুমি মেরে ফেলো না। আমি কী করেছি শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে!

কী করেছ?

কথা দাও তুমি আমাকে মেরে ফেলবে না।

রবোমানবেরা মানুষ নয়, তাদের কথার কোনো মূল্য নেই।

তবু কথা দাও!

না, আমি নাটকীয়তা পছন্দ করি না। তুমি বল।

সুদর্শন মানুষটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পৃথিবীর সাতজন মহাচারীকে নিয়ে একটি মহাকাশযান মহাকাশে যাত্রা করেছে। সেই সাতজন মহাকাশচারীর মাঝে দুইজন রবোমানব ঢুকিয়ে দিয়েছি।

কঠিন চেহারার মানুষটি বলল, কেমন করে সেটা করেছ?

নেটওয়ার্কের গভীরে আমার নিজস্ব যোগাযোগ আছে–

সুদর্শন মানুষটির কথা শেষ হবার আগেই কঠিন চেহারার মানুষটি তার পকেট থেকে একটা রিভলবার বের করে সুদর্শন মানুষটিকে পরপর অনেকগুলো গুলি করল। সুদর্শন মানুষটি কাত হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল, তার চোখে এক ধরনের অবিশ্বাসের দৃষ্টি।

কঠিন চেহারার মানুষটি ফিসফিস করে বলল, যে বিজ্ঞান আকাদেমীর সবচেয়ে গোপন প্রজেক্টে নিজের নাক গলাতে পারে তাকে বিশ্বাস করা ঠিক না।

সবাই মাথা নাড়ল, বলল, না। ঠিক না।

তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

কোনো উত্তর নেই। লাল চুলের মেয়েটি মাথা ঝাঁকিয়ে গলার স্বর আরেকটু উঁচু করে বলল, শুনতে পাচ্ছ আমার কথা?

এবারেও কোনো উত্তর নেই। লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, আমি জানি তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, তুমি ইচ্ছে করে আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না। কেন আমার কথার উত্তর দিচ্ছ না? তুমি কী আমার উপরে রাগ করেছ?

না আমি রাগ করিনি। যে মানুষটির দেহ নেই, হাত পা মুখ চোখ কিছু নেই, যার অস্তিত্ব হচ্ছে শুধু একটা মস্তিষ্ক সে রাগ করতে পারে না।

চমৎকার। তোমার আর আমার সম্পর্কটি তাহলে ভালোবাসার সম্পর্ক! মধুর একটি ভালোবাসার সম্পর্ক!

আমি তোমার নিষ্ঠুরতা দেখে হতবাক হয়ে যাই। কী বলতে চাও বল। আলোহীন বর্ণহীন শব্দহীন গন্ধহীন অনুভূতিহীন আমার শূন্য জগৎটি ভয়ংকর। এর চাইতে ভয়ংকর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তুমি প্রতিদিন আমার সাথে দুইএক মিনিট যে কথাগুলো বল সেটি সেই শূন্যতার জগৎ থেকেও ভয়ংকর। বল তুমি কী বলতে চাও। বলে আমাকে মুক্তি দাও।

আমি তোমাকে একটা সুসংবাদ দিতে চাই।

সুসংবাদ?

হ্যাঁ। সুসংবাদ।

কী সুসংবাদ? শুনতে আমার আতংক হচ্ছে। কিন্তু তুমি বল।

আর আটচল্লিশ ঘণ্টার মাঝে আমরা নেটওয়ার্ক দখল করে নেব। তখন পুরো পৃথিবীটা হবে আমাদের।

তোমরা পুরো পৃথিবীটা নিয়ে কী করবে?

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হেসে বলল, এটি আবার কীরকম প্রশ্ন? মানুষ পৃথিবীটা দখল করে কী করেছে?

মানুষ তো পৃথিবী দখল করে নি! মানুষ সবাইকে নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থেকেছে। একেবারে ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে বিশাল নীল তিমিসবাইকে নিয়ে বেঁচে থেকেছে। তার কারণ মানুষের বেঁচে থাকার একেবারে গোড়ার কথা হচ্ছে ভালোবাসা! তোমাদের তো ভালোবাসা নেই–তোমরা কী নিয়ে বেঁচে থাকবে? তোমরা কেন বেঁচে থাকবে?

লাল চুলের মেয়েটি খিল খিল করে হাসতে হাসতে বলল, আমরা কেমন করে বেঁচে থাকি সেটা দেখানোর জন্যেই আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব! বুঝেছ?

মস্তিষ্কটি উত্তরে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল লালচুলের মেয়েটি খুট করে সুইচটি বন্ধ করে দিল। কাচের জারে ভেসে থাকা থলথলে মস্তিষ্কটির দিকে তাকিয়ে তার এক ধরনের ঘৃণাবোধ হয়। সে হেঁটে হেঁটে জানালার কাছে দাঁড়ায়। দূর পাহাড়ের পিছনে সূর্যটা আড়াল হয়ে যাচ্ছে, চারদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। লালচুলের মেয়েটি বাইরে তাকিয়ে থাকে, তার ভুরু দুটি কুঞ্চিত, কিছু একটা তাকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। মস্তিষ্কটি সত্যিই জিজ্ঞেস করেছে, পৃথিবী দখল করে তারা কী করবে?

সত্যিই তো। তারা কী করবে?

বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুল দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিলেন, তার পাশে তথ্যবিজ্ঞানী জুহু দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যটা পাহাড়ের আড়ালে চলে যাবার সাথে সাথে চারদিকে আবছা অন্ধকার নেমে আসে।

মহামান্য থুল নিচু গলায় বললেন, যতক্ষণ সূর্য আকাশে থাকে ততক্ষণ একটিবারও মনে হয় না সেটি আড়াল হয়ে গেলে অন্ধকার নেমে আসবে।

তথ্যবিজ্ঞানী জুহু কী বলবে বুঝতে না পেরে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। মহামান্য থুল মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের হাতে আর কতোক্ষণ সময় আছে?

সময় নেই। রবোমানবেরা ইচ্ছে করলে এখন যে কোনো মুহূর্তে নেটওয়ার্ক দখল করে নিতে পারে। তারা করছে না, অনুমান করছি তারা আরো একটু গুছিয়ে নিতে চাইছে।

তার মানে আমাদের হাতে খুব বেশি হলে আটচল্লিশ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টা সময়।

জুহু বলল, কিংবা আরো কম!

নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবার পর কী হবে বলতে পারবে?

সবার আগে আমাদের এগারোজনকে খুন করবে।

তারপর?

তারা পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের সকল তথ্য পেয়ে যাবে। যত প্রতিষ্ঠান আছে তা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। পানি, বিদ্যুৎ, খাবার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। চিকিৎসার নিয়ন্ত্রণ নেবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করবে। এক সময় পৃথিবীতে বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডার ছিল, এখন নেই। যদি থাকত তাহলে সবার আগে তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতো।

তারপর কী করবে বলে তোমার ধারণা?

পৃথিবীর সবচেয়ে কর্মক্ষম মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে যাবে।

হত্যা করার জন্যে?

ভয় দেখানোর জন্যে প্রথমে নিশ্চয়ই অনেক মানুষকে হত্যা করবে। তারপর তারা কর্মক্ষম মানুষগুলোকে রবোমানবে পাল্টে দিতে শুরু করবে।

তারপর?

তারপর ধীরে ধীরে পৃথিবীর সব মানুষকে রবোমানবে পাল্টে দেবে। কেউ কেউ হয়তো পালিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নেবে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ রবোমানব হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক দিয়ে নিখুঁতভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে।

তারপর?

জুহুকে একটু বিভ্রান্ত দেখা গেল। ইতস্তত করে বলল, পৃথিবীর সব মানুষকে রবোমানবে পাল্টে দেয়ার পর কী আর কিছু বাকি থাকল?

নিশ্চয়ই বাকি আছে। তারপর কী হবে বলে তোমার ধারণা?

জুহু কোনো উত্তর দিল না।

রবোমানব বাবা-মায়ের রবোমানব সন্তান হবে পরের প্রজন্ম?

নিশ্চয়ই তাই হবে।

মহামান্য থুল খুব ধীরে ধীরে ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, বললেন, তোমার ধারণা মানুষের মায়েরা যেভাবে তাদের সন্তানদের ভালোবেসে বুক আগলে রক্ষা করে রোমানবের মায়েরাও তাই করবে? যে ভালোবাসাকে তাদের মস্তিষ্ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সন্তানের জন্যে সেই ভালোবাসা আবার ফিরে আসবে?

জুহু ইতস্তত করে বলল, আমি জানি না মহামান্য থুল। আমি সত্যিই জানি। আপনি কী জানেন?।

না। জানি না।

আপনি কি অনুমান করতে পারেন?

যে বিষয়টি সত্যি সত্যি জানা সম্ভব আমি সেটা অনুমান করতে চাই না।

এটা সত্যি সত্যি জানা সম্ভব?

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, আজকে শুধু আমি প্রশ্ন করব। তুমি উত্তর দেবে। ঠিক আছে?

আপনি যেটি বলবেন সেটিই হবে মহামান্য থুল।

এবার আমি তোমাকে সম্পূর্ণ অন্য একটি প্রশ্ন করি।

জুহু মাথা নেড়ে বলল, করেন মহামান্য থুল।

আমাদের নেটওয়ার্কটি যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কী হবে?

জুহু চোখ বড় বড় করে মহামান্য থুলের দিকে তাকাল, আমতা আমতা করে বলল, নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেলে?

হ্যাঁ। আমাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেলে-

আমাকে ক্ষমা করবেন মহামান্য থুল, কিন্তু আপনার প্রশ্নটি তো একটি অবাস্তব প্রশ্ন। এই নেটওয়ার্কটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যেন কোনোভাবে এটি ধ্বংস না হয়। ঝড়, ভূমিকম্প, সুনামি, বন্যা, নিউক্লিয়ার বোমা কোনো কিছু যেন ধ্বংস করতে না পারে ঠিক সেভাবে এই নেটওয়ার্কটি তৈরি করা হয়েছে। মহামান্য থুল আপনি সবচেয়ে ভালো করে জানেন কোনোভাবে এই নেটওয়ার্ক

ধ্বংস করা সম্ভব নয়, আপনার যৌবনে আপনি এর ডিজাইন টিমে ছিলেন।

হ্যাঁ। আমি ছিলাম। আমি জানি যদি একটি নেটওয়ার্ক কোনোভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে তাহলে সেই নেটওয়ার্ককে পৃথিবীর সব মানুষের দায়িত্ব দেয়া যায় না। কাজেই এই নেটওয়ার্ককে ধ্বংস করা যাবে না। তারপরেও আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, যদি এই নেটওয়ার্কটি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কী হবে?

জুহু মাথা চুলকে বলল, মহামান্য থুল, আমার কথাকে আপনি ধৃষ্টতা হিসেবে নেবেন না। আপনার প্রশ্নটি অনেকটা এরকম, আমরা জানি পৃথিবীর আহ্নিক গতি কখনো বন্ধ হবে না, এটি সবসময়েই নিজের অক্ষের উপর চব্বিশ ঘণ্টায় একবার ঘুরবে। কিন্তু যদি বন্ধ হয় তাহলে কী হবে?

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, হ্যাঁ। অনেকটা সেরকম।

জুহু বলল, মুহর্তে পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। পানি, খাবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাটে গাড়ি চলবে না। প্লেন উড়বে না। মানুষ মানুষকে চিনবে না। কাজে বের হয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসতে পারবে না। চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে। স্কুল কলেজ গবেষণা বন্ধ হয়ে যাবে। এক কথায় সমস্ত পৃথিবী অচল হয়ে যাবে।

তারপর কী হবে?

সারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে যাবে।

তারপর কী হবে?

মানুষে মানুষে হানাহানি শুরু হয়ে যাবে।

মহামান্য থুল খুব ধীরে ধীরে ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, নিচু গলায় বললেন, তোমার তাই ধারণা? যখন খুব বড় বিপদ নেমে আসে তখন মানুষ একে অন্যকে সাহায্য না করে একে অন্যের সাথে হানাহানি শুরু করে? মানুষ তখন স্বার্থপরের মতো নিজের বিষয়টা দেখবে?

জুহু অপ্রস্তুত মুখে বলল, এর উত্তর আমি জানি না মহামান্য থুল। একটু থেমে সে যোগ করল, আপনি কী জানেন?

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, না। জানি না।

অনুমান করতে পারেন?

যে বিষয়টা সত্যি সত্যি জানা সম্ভব আমি সেটা অনুমান করতে চাই না।

জুহু অবাক হয়ে মহামান্য থুলের দিকে তাকাল, একটু আগে তিনি ঠিক এই বাক্যটিই বলেছিলেন! জুহু দ্বিতীয়বার তাকে প্রশ্ন করার সাহস পেল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, মহামান্য থুল।

বল।

আমি আসলে আপনাকে একটা খারাপ খবর দিতে এসেছিলাম।

কী খারাপ খবর?।

মানুষের সভ্যতা বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আমরা একটি মহাকাশযানে করে সাতজন মহাকাশচারী পাঠিয়েছিলাম।

হ্যাঁ। সাতজনের একটি পূর্ণাঙ্গ টিম। একজন শিশুসহ।

সেই টিমটিতে যেন কোনো রবোমানব যেতে না পারে তার জন্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু–

কিন্তু কী?

সাতজনের ভেতর দুইজন রবোমানব ঢুকে গেছে।

মহামান্য থুল ঘুরে জুহুর দিকে তাকালেন, কোন দুইজন?

জানি না। কেউ জানে না।

এখন কী করবে?

বুঝতে পারছি না মহামান্য থুল। সেজন্যে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।

আমার মনে হয় কিছুই করার প্রয়োজন নেই। যেভাবে চলছে চলুক।

আমরা পৃথিবী থেকে সিগন্যাল পাঠিয়ে মহাকাশযানটা ধ্বংস করে দিতে পারি।

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, আমরা যদি রবোমানব হয়ে যেতাম তাহলে নিশ্চয়ই তাই করতাম। কিন্তু আমরা তো রবোমানব নই। আমরা খুব সাধারণ মানুষ। একটি তুচ্ছ কীটপতঙ্গের উপর হাত তুলতেও আমাদের হাত কাঁপে। আমরা কেমন করে কিছু অসহায় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করব?
টুরান চোখ খুলে তাকাল। তার ঘুম ভেঙে গেছে–ঠিক করে বলতে হলে বলতে হবে তার ঘুম ভাঙিয়ে তাকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। যার অর্থ তারা হয়তো কেপলার টুটুবি গ্রহে পৌঁছে গেছে। মাঝখানে কতোটুকু সময় পার হয়েছে কে জানে? এক বছর? একশ বছর? এক লক্ষ বছর? কী আশ্চর্য!

টুরান নিজের হাত নাড়ানোর চেষ্টা করল, পারল না। সেটি এখনো শিথিল হয়ে আছে। সে জানে ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ তার শরীর শিথিল হয়ে থাকবে, সেখানে জোর পাবে না। ধীরে ধীরে তার শরীরে শক্তি ফিরে পাবে। টুরান ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে থাকে। ক্যাপসুলের ভেতর মিষ্টি গন্ধের একটি শীতল বাতাস ছড়িয়ে পড়ছে–এটি নিশ্চয়ই তার শরীরকে সতেজ করে তুলবে। খুব হালকা একটি সঙ্গীতের শব্দ ভেসে আসছে। মিষ্টি একটা সঙ্গীত, মনে হয় বহুদূরে কোনো একটা নদীর তীরে সে দাঁড়িয়ে আছে আর দূরে কোথাও কোনো একজন নিঃসঙ্গ শিল্পী নদীতীরে একটা গাছে হেলান দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে। টুরান তার চোখ বন্ধ করল। বুক ভরে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিল, ভেতরে ভেতরে সে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করছে।

ক্যাপসুলের ভেতর টুক করে একটা শব্দ হল, সঙ্গীতটি বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে একটা সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে। টুরান তার হাতটি চোখের সামনে নিয়ে এল, তার শরীরে শক্তি ফিরে এসেছে। সে হাত দিয়ে ক্যাপসুলের ঢাকনাটি স্পর্শ করতেই সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল। টুরান সাবধানে ক্যাপসুল থেকে বের হয়ে এসে ক্যাপসুলের পাশে দাঁড়াল। সে দাঁড়াতে পারছে, ভেসে যাচ্ছে না যার অর্থ মহাকাশযানটি তার অক্ষের উপর ঘুরছে, মহাকাশযানের মাঝে কৃত্রিম একটা মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করে রাখা আছে।

টুরান মাথা ঘুরিয়ে ডানদিকে তাকাতেই সে চমকে ওঠে। মহাকাশযানের দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে ইহিতা বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

বসার ভঙ্গিটি দুঃখি মানুষের মতো, দেখে মনে হয় কিছু একটা নিয়ে ইহিতা গভীর বিষাদে ড়ুবে আছে। টুরান জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

কিছু হয় নি।

তুমি এমন করে বসে আছ কেন?

আমি তো এমন করেই বসি।

টুরান বলল, আমরা কেপলার টুটুবিতে পৌঁছে গেছি, মানুষের নতুন সভ্যতা শুরু করব, তোমার মাঝে তার উত্তেজনা দেখছি না।

আমরা কেপলার টুটুবিতে পৌঁছাই নি। আমাদের যাত্রা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

টুরান চমকে ওঠে বলল, কী বলছ তুমি?

আমরা সৌরজগতের ভেতরেই আছি।

টুরান উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, কেন? আমাদের যাত্রা কেন বন্ধ করে দেয়া

হল?

ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি না। ট্রিনিটি কিছু বলতে রাজি হচ্ছে না। যখন সবাই জেগে উঠবে তখন বলবে তার আগে বলবে না।

অন্যদের কখন জাগাবে? তোমাকে কেন আগে জাগিয়েছে?

আমাকে আগে জাগায় নি, সবাইকে একই সাথে জাগানো শুরু করেছে। একেকজনের শরীর একেকভাবে কাজ করে তাই একেকজন একেক সময়ে জেগে উঠছে।

টুরান হেঁটে হেঁটে অন্য ক্যাপসুলগুলোর কাছে যায়, ভেতরে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করে আবার ইহিতার কাছে ফিরে এসে বলল, আমার কাছে পুরো ব্যাপারটি খুব দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে।

ইহিতা কথাটার কোনো উত্তর দিল না। টুরান তখন বলল, আমার কাছে মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু ঘটেছে। খুব খারাপ এবং ভয়ংকর।

সেটি কী হতে পারে?

আমি জানি না।

সবাই ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ট্রিনিটি সবাইকে একটা ছোট হলঘরে নিয়ে এলো। ঘরটিতে বসার জন্যে কার্যকর চেয়ার, চেয়ারের সামনে ডেস্ক এবং ডেস্কে ধূমায়িত খাবার। ক্লদ ছাড়া আর কেউ সেই খাবারে উৎসাহ দেখাল না।

টুরান বলল, ট্রিনিটি, তুমি ভূমিকা ছেড়ে দিয়ে সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এসো।

ট্রিনিটি বলল, আমি আসলে ভূমিকা করছি না। সোজাসুজি কাজের কথায় চলে এসেছি। আমি তোমাদেরকে একটি দুঃসংবাদ দেবার জন্যে ডেকে তুলেছি।

কেউ কোনো কথা না বলে দুঃসংবাদটি শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। ট্রিনিটি ভাবলেশহীন গলায় বলল, পৃথিবীটি রবোমানবেরা দখল করে নেবে সেই আশংকায় এই মহাকাশযানে করে তোমাদের সাতজনের নেতৃত্বে বিশালসংখ্যক মানুষ, মানুষের দ্রুণ, জিনোম, পশুপাখি, গাছপালা পাঠানো হচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য মানুষ দূর মহাকাশের কোনো একটি উপযুক্ত গ্রহে বসতি স্থাপন করবে। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের কথা কিছুক্ষণ আগে পৃথিবী থেকে আমাকে জানানো হয়েছে তোমাদের সাতজনের মাঝে দুইজন রবোমানব।

ক্লদ ছাড়া অন্য সবাই ভয়ানক চমকে উঠল। ক্লদ ঠিক সেই মুহূর্তে তার খাবারের মাঝে একটা লাল চেরি আবিষ্কার করেছে। সে এটা খাবে না কি এটা দিয়ে খেলবে সেটি নিয়ে মনস্থির করতে পারছিল না।

টুরান কাঁপা গলায় বলল, কোন দুইজন?

আমি জানি না। পৃথিবীর মানুষও জানে না। এটি জানলে পুরো ব্যাপারটা খুব সহজ হয়ে যেতো।

সবাই সবার দিকে তাকাল, চোখে চোখ পড়তেই আবার তারা নিজেদের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ইহিতা জিজ্ঞেস করল, আমাদের ভেতর যারা রবোমানব তারা নিজেরা কী জানে যে তারা রবোমানব?

রবোমানবের মস্তিষ্কের থ্যালামাসে একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ইমপ্ল্যান্ট বসানো হয় যেটা মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করে, ওভার ড্রাইভ করে। তোমাদের দুজনের সেই ইমপ্লান্ট কার্যকর করা হয়ে থাকলে তোমরা ইতোমধ্যে জান যে তোমরা রবোমানব।

ইহিতা জানতে চাইল, সেটা কী কার্যকর করা হয়েছে?

আমি জানি না। এই মহাকাশযানে সেটা পরীক্ষা করার উপায় নেই।

নীহা জিজ্ঞেস করল, এখন কী করা হবে? আমরা কী আবার পৃথিবীতে ফিরে যাব?

না। ট্রিনিটি কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, তোমাদের সাতজনকে এই মহাকাশযান ছেড়ে চলে যেতে হবে।

সবাই চমকে উঠল, সুহা আর্তচিৎকার করে বলল, কী বলছো!

আমি কী বলেছি তোমরা সেটি শুনতে পেয়েছ, তারপরেও আমি আবার বলি। তোমাদের এই সাতজনকে মহাকাশযান ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমার এই মহাকাশযানের নিরাপত্তার জন্যে এখানে কোনো রবোমানবকে স্থান দেয়া যাবে না।

সুহা হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, আমরা কোথায় যাব? আমি আমার এই শিশু বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় যাব?

ক্লদ এই ছোট হলঘরের ভেতরের উত্তেজনাটুকু টের পেতে শুরু করেছে। সে তার খাওয়ার প্যাকেটটি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল।

ট্রিনিটি বলল, আমরা পৃথিবী থেকে খুব বেশিদূর যাই নি। গ্রহাণু বেল্ট পার হয়েছি মাত্র। গতিপথ পরিবর্তন করে আমি মহাকাশযানটিকে মঙ্গলগ্রহ ঘিরে একটি কক্ষপথে নিয়ে এসেছি। তোমাদের একটা স্কাউটশিপে করে আমি মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

টুকন চিৎকার করে বলল, মঙ্গলগ্রহে?

হ্যাঁ মঙ্গলগ্রহে।

তুমি কী জান মঙ্গলগ্রহ হচ্ছে পৃথিবীর ভাগাড়। মানুষ যখন পুরোপুরি সভ্য হয় নি তখন ভয়ংকর পরীক্ষাগুলো করেছে মঙ্গলগ্রহে? এখানে রয়েছে তেজস্ক্রিয়তা, রয়েছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। শুধু তাই না এখানে জৈবিক পরীক্ষা হয়েছে। নতুন প্রাণ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এরকম ভয়ংকর একটা জায়গায় আমাদের পাঠাবে?

হ্যাঁ। ট্রিনিটি শান্ত গলায় বলল, আমার কোনো উপায় নেই। আমি যখন জেনেছি তোমাদের দুজন রবোমানব এবং কোন দুজন রবোমানব আমার জানা নেই তখন এছাড়া আমার কিছু করার নেই। একটি কম্পিউটার হিসেবে আমাকে কোনো মানুষকে হত্যার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। যদি দেয়া হতো তাহলে শীতলঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় সাতজনকেই হত্যা করে আমি নিশ্চিত হয়ে যেতাম।

টর বিড়বিড় করে বলল, ভাগ্যিস ক্ষমতা দেয়া হয় নি। ক্ষমতা ছাড়াই তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পার।

ইহিতা বলল, ট্রিনিটি, তুমি কী বলছ সেটা চিন্তা করেছ?

চিন্তা প্রক্রিয়াটি মানুষের। আমি মানুষ নই, তাই চিন্তা করতে পারি না। তবে যে কোনো বিষয় আমি আমার মতো বিশ্লেষণ করতে পারি। কাজেই আমি যেটা বলেছি সেটা অনেক ভাবে বিশ্লেষণ করে বলেছি।

না। ইহিতা মাথা নাড়ল, তুমি পুরোপুরি বিশ্লেষণ কর নি। তুমি বলেছ মানুষকে হত্যা করার ক্ষমতা তোমাকে দেয়া হয় নি। কিন্তু যদি আমাদের ভয়ংকর বাস-অযোগ্য মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দাও আমরা কিন্তু সবাই মারা যাব। রবোমানব আর সাধারণ মানুষ সবাই মারা যাব। কাজেই তুমি আসলে আমাদের হত্যাই করছ।

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমার বক্তব্য সঠিক নয়। মঙ্গলগ্রহে অনেকবার মানুষ এসেছে গেছে। এখানে তারা অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছে। এখানে অনেক জায়গায় মানুষের পরিত্যক্ত আবাসস্থল আছে, সেখানে খাবার আছে, রসদ আছে। তোমরা ইচ্ছে করলেই একরম একটি দুটি আবাসস্থল খুঁজে বের করে সেখানে আশ্রয় নিতে পার। সেখানে তোমরা মানুষেরা এবং রবোমানবেরা নিজেদের মাঝে বোঝাপাড়া করে নিতে পারবে।

টুরান বলল, আমরা সেই বোঝাঁপড়া এখানে বসে করতে পারি।

ট্রিনিটি বলল, না।

ইহিতা বলল, এটি সরাসরি আমাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া।

ট্রিনিটি বলল, আমার কিছু করার নেই।

সুহা হাহাকার করে বলল, আমার সাথে একটি ছোট শিশু। একটা নিরাপদ জীবনের জন্যে আমি ছোট শিশুকে নিয়ে বের হয়েছি। আমাদের এই বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়ো না।

ট্রিনিটি বলল, স্কাউটশিপটা প্রস্তুত করে রাখা আছে। তোমরা সেখানে ওঠো।

নীহা অবাক হয়ে বলল, এখনই?

হ্যাঁ। এখনই।

আমরা যদি রাজি না হই।

ট্রিনিটি বলল, অবশ্যই রাজি হবে। টরকে জিজ্ঞেস করে দেখো আমার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে থাকা সম্ভব কী না!

ইহিতা বলল, আমাদের পুরো ব্যাপারটি ভেবে দেখার সময় দিতে হবে। আমরা মানুষ, এই মহাকাশযানটির নেতৃত্ব আমাদের দেয়া হয়েছে। তুমি একটা কম্পিউটার, তোমায় আমাদের সাহায্য করার কথা। আমাদের আদেশ নির্দেশ মেনে চলার কথা। আমাদের পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে দাও, ভাবনা-চিন্তা করতে দাও।

তোমরা মানুষ—এবং রবোমানব, শুধুমাত্র এই কারণে আমি তোমাদের ভাবনা-চিন্তা করতে দেব না। তার কারণ তোমরা এমন কোনো একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারবে যার কারণে আমি তোমাদের রেখে দিতে বাধ্য হব। আমি সেরকম পরিস্থিতিতে যেতে রাজি নই। তোমরা স্কাউটশিপে উঠে যাও।

ঘরের ভেতরে যারা আছে তারা সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। সুহা কাতর গলায় বলল, তোমাদের ভেতর যে রবোমানব সে নিজের পরিচয় দিয়ে দাও। দোহাই তোমাদের। আমাদের সবাইকে মেরে ফেলো না?

নীহা বলল, রবোমানবদের বুকের ভেতর কোনো ভালোবাসা থাকে না। তারা তোমার কথাকে কোনো গুরুত্ব দেবে না। তারা একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছে। সেই উদ্দেশ্য সফল না হওয়া পর্যন্ত তারা এখান থেকে যাবে না।

ট্রিনিটি গমগমে গলায় বলল, তোমরা স্কাউটশিপে উঠে যাও। এক মিনিটের মাঝে স্কাউটশিপে উঠে না গেলে আমি জোর করতে বাধ্য হব।

ক্লদ জিজ্ঞেস করল, মা, আমরা স্কাউটশিপে করে কোথায় যাব? মঙ্গলগ্রহে। ক্লদের মুখে হাসি ফুটে উঠল, বলল, কী মজা হবে। তাই না মা?

সুহা অসহায়ভাবে একবার ক্লদের মুখে আরেকবার সবার মুখের দিকে তাকাল। ট্রিনিটি আবার বলল, দশ সেকেন্ড পার হয়ে গেছে। আর পঞ্চাশ সেকেন্ড বাকি আছে।

সবাই পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। ট্রিনিটি বলল, আর চল্লিশ সেকেন্ড।

সবার আগে ইহিতা ওঠে দাঁড়াল। তার দেখাদেখি অন্য সবাই। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, ট্রিনিটি, তুমি মানুষ হলে আমি তোমাকে অভিশাপ দিতাম। কিন্তু তুমি একটি নির্বোধ কম্পিউটার, তোমাকে অভিশাপ দেয়া অর্থহীন। তবু আমি অভিশাপ দিচ্ছি। তুমি যেন মানুষের হাতে ধ্বংস হও।

ট্রিনিটি বলল, পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড।

স্কাউটশিপটি গর্জন করতে করতে নিচে নামতে থাকে। যতদূর দেখা যায় বিস্তৃত লালাভ একটি গ্রহ, লালচে মেঘ, নিচে প্রবলবেগে ধূলিঝড় বয়ে যাচ্ছে।

স্কাউটশিপটির তীব্র ঝাকুনি সহ্য করতে করতে নীহা বলল, মঙ্গল গ্রহ সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ এর ভর পৃথিবীর দশভাগের এক ভাগ, ব্যাসার্ধ পৃথিবীর অর্ধেক। তাই এখানে আমাদের ওজন হবে সত্যিকার ওজনের মাত্র তিনভাগের এক ভাগ।

টুরান বলল, যতক্ষণ মঙ্গলগ্রহে থাকব সারাক্ষণ আমাদের বায়ুনিরোধক পোশাক পরে থাকতে হবে। সেটি অত্যন্ত বিশেষ ধরনের পোশাক, তার ওজন দিয়ে আমাদের ওজন একটু বাড়ানো হবে, তারপরেও আমাদের সবসময়ই নিজেদের হালকা মনে হবে।

নীহা মনিটরে কিছু তথ্য দেখে বলল, মঙ্গলগ্রহের বায়ুমণ্ডল খুবই হালকা, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাত্র একশ ভাগের এক ভাগ। বাতাসের পঁচানব্বই ভাগই কার্বনডাই অক্সাইড! তিন ভাগ নাইট্রোজেন।

সুহা জানতে চাইল, অক্সিজেন? অক্সিজেন নেই?

খুবই কম। এক হাজার ভাগের এক ভাগের মতো।

টুরান বলল, আমাদের পোশাকে সেই অক্সিজেন আর নাইট্রোজেন আলাদা করে নিঃশ্বাস নেবার জন্যে দেয়া হবে।

টর জিজ্ঞেস করল, পানি আছে?

প্রচুর পানি, কিন্তু সেগুলো দুই মেরুতে জমা আছে। বরফ হিসেবে।

ইহিতা বলল, কিছু মাথা খারাপ বিজ্ঞানী মেরু অঞ্চলের বরফ গলিয়ে পানির প্রবাহ তৈরি করে এখানে প্রাণের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিল।

সুহা জানতে চাইল, প্রাণের বিকাশ হয়েছিল?

ইহিতা মাথা নেড়ে বলল, পরিষ্কার করে কেউ বলতে পারে না। এটা হচ্ছে পৃথিবীর অন্ধকার জগতের সময়ের ঘটনা। সারা পৃথিবী তখন নানারকম দেশে ভাগ হয়েছিল। কেউ গরিব কেউ বড়লোক। শক্তি বলতে তেল গ্যাস-এক দেশ তেল গ্যাসের জন্যে আরেক দেশ দখল করে ফেলত। সেই সময় পৃথিবীতে কোনো নিয়ম নীতি ছিল না, যার জোর সে পৃথিবী শাসন করত। সেই সময়ে উন্নত দেশের কিছু মাথাখারাপ বিজ্ঞানী মঙ্গলগ্রহের উপযোগী প্রাণ তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। কেউ বলে পেরেছিল, কেউ বলে পারে নি।

নীহা জানতে চাইল, তুমি এতো কিছু কেমন করে জান?

কৌতূহল।

স্কাউটশিপটা একটা ঝড়ো হাওয়ার মাঝে আটকা পড়ে যায়, ভয়ানক ঝাকুনি হতে থাকে। ভেতরের সবাই সিটের সামনে ব্র্যাকেটগুলো ধরে তাল সামলানোর চেষ্টা করে। টর একটা কুৎসিত গালি দিয়ে বলল, মঙ্গলগ্রহ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে হয়।

শুধু ক্লদ আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, তার কাছে মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে একটা খেলা।

স্কাউটশিপটা পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত থেমে গেল। টুরান বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিয়ে বলল, সবাই ঠিক আছ?

সেটা নির্ভর করে ঠিক থাকা বলতে কী বোঝায় তার ওপর। নীহা বলল, বেঁচে আছি।

আপাতত বেঁচে থাকা মানেই হচ্ছে ঠিক থাকা।

ইহিতা বলল, কেউ একজন স্কাউটশিপের লগটা পড়ে বলবে আমরা এখন কোথায়। কী করব?

পঁচিশ ডিগ্রি অক্ষাংশ যেটা এখন গ্রীষ্মকাল। তাপমাত্রা শূন্যের নিচে পাঁচ ডিগ্রি, যেটা এখানকার হিসেবে বেশ গরম।

টুরান বলল, খুব কাছাকাছি মানুষের একটা আশ্রয়স্থল থাকার কথা, যে জন্যে স্কাউটশিপটা এখানে থেমেছে।

হ্যাঁ। মনিটরে সেটা দেখতে পাচ্ছি। এখানে কেউ নেই, আমরা মনে হয় আশ্রয় নিতে পারব।

নীহা বাইরে তাকিয়ে বলল, আমাদের স্কাউটশিপটা রীতিমতো একটা ধুলার ঝড় তৈরি করেছে। ধুলাটুকু সরে গেলে মনে হয় সূর্যটাকে দেখতে পাব। আকারে ছোট দেখাবে।

ইহিতা বলল, আকার নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না, সূর্যটাকে দেখলে অন্তত মনে হবে পরিচিত কিছু একটা দেখছি!

স্কাউটশিপের জানালা দিয়ে সবাই বাইরে তাকিয়েছিল, ধুলো সরে গেলে তারা বিস্তীর্ণ প্রান্তর দেখতে পেল। যতদূর চোখ যায় লাল পাথরে ঢাকা, ঘোলাটে লাল আকাশে একটি লালচে সূর্য। রুক্ষ পাথুরে প্রান্তর দেখে মন খারাপ হয়ে যায়।

রুহান বলল, আমরা এই ছোট স্কাউটশিপে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না। মানুষের ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে হবে।

নীহা বলল, তাহলে দেরি না করে চল রওনা দিই।

রওনা দেয়ার আগে অনেক প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের সবার দীর্ঘ সময়ের জন্যে স্পেসস্যুট পরে নিতে হবে।

ইহিতা বলল, অন্তত স্কাউটশিপে স্পেসস্যুটগুলো দেয়ার জন্যে ট্রিনিটিকে একটা ধন্যবাদ দিতে হয়।

টর বলল, ট্রিনিটির নাম কেউ মুখে আনবে না। আমি নিজের হাতে একদিন ট্রিনিটিকে খুন করব।

ট্রিনিটি নিয়ে আরো আলাপ শুরু হয়ে যাবার উপক্রম হতে চলছিল কিন্তু তখন ক্লদ চিৎকার করে বলল, আমি স্কাউটশিপে থাকতে চাই না। আমি বের হতে চাই।

রুহান বলল, শুধু তুমি নও। ক্লদ আমরা সবাই বের হতে চাই।

তাহলে আমরা কেন বের হচ্ছি না?

টুরান নরম গলায় বলল, স্পেসস্যুটটা পরেই আমরা বের হব। একটু সময় দাও।

দেখা গেল একটু সময় দিয়ে হল না। সাতজন মানুষের স্পেসস্যুট পরতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল। সবচেয়ে ঝামেলা হলো ক্লদকে স্পেসস্যুট পরাতে। নুট এমনিতে কোনো কথা বলে না কিন্তু ক্লদকে স্পেসস্যুটে পরানোর সময় সে তাকে সাহায্য করল। স্পেসস্যুট পরার পর স্বচ্ছ নিওপলিমারের একটা আবরণ তাদের শরীরটাকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলল। মাথায় একটা হেলমেট, সেই হেলমেটের সাথে যোগাযোগ মডিউলে একে অন্যের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা। পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার। বায়ুমণ্ডল থেকে যেটুকু অক্সিজেন পাওয়া সম্ভব সেটাকেই সংগ্রহ করে ক্রমাগত সিলিন্ডারে ভরে দেয়ার একটা পাম্প কাজ করে যাচ্ছে।

স্কাউটশিপ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তটি ছিল সবচেয়ে অনিশ্চিত মুহূর্ত। নিরাপত্তার জন্যে সবাইকে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বের হতে হবে। কেউ মুখ ফুটে বলছে না কিন্তু সবাই জানে তাদের ভেতর যে দুজন রবোমানব তারা হাতে আগ্নেয়াস্ত্রটি নিয়েই সেটা ঘুরিয়ে অন্য সবাইকে শেষ করে দিতে পারে। যারা মানুষ তারা জানে না এখানে কোন দুজন রবোমানব, কিন্তু যারা রবোমানব তারা খুব ভালো করে জানে এখানে কারা মানুষ।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে হাতে নিয়ে নামছে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। তীব্র উত্তেজনাটুকু কমিয়ে দিল ক্লদ, সে বলল, আমাকে? আমাকে অস্ত্র দেবে না?

সুহা বলল, বাবা, এটা খেলনা না। এটা সত্যিকারের অস্ত্র।

আমি জানি এটা খেলনা না। আমি খুব সাবধানে ধরে রাখব।

উঁহু। বড় না হওয়া পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নেয়া নিষেধ।

টুরান তার দিকে একটা ডিটেক্টর এগিয়ে দিয়ে বলল, তুমি বরং এটা নিতে পার।

এটা কী?

এটা তেজস্ক্রিয়তা মাপার একটা ডিটেক্টর। মঙ্গল গ্রহে পৃথিবী থেকে অনেক তেজস্ক্রিয়তা ফেলা হয়েছে। আমরা যেন ভুল করে কোনো তেজস্ক্রিয় জায়গায় চলে না যাই সেজন্যে এটা আমাদের সাথে রাখতে হবে। আশপাশে তেজস্ক্রিয় কিছু থাকলেই এটা কট কট শব্দ করবে।

হাতে সত্যিকারের একটা অস্ত্র নিতে না পারার দুঃখটা ক্লদের খানিকটা হলেও ঘুচে গেল। সে ডিটেক্টরটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে দেখতে থাকে কোথাও কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায় কি না।

স্কাউটশিপের গোল দরজা বন্ধ করে সাতজনের দলটা হাঁটতে শুরু করে। স্পেসস্যুটের ভেতর বাতাসের তাপ, চাপ, জলীয় বাষ্পের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রাখার পরও তারা বাইরের হিমশীতল পরিবেশটুকু অনুভব করে। একধরনের ঝড়ো বাতাস বইছে, মাঝে মাঝেই চারদিকে ধূলায় ধূসর হয়ে যাচ্ছিল তার মাঝে তারা সারি বেঁধে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। স্পেসস্যুটের পোশাকে নানা ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি তারপরেও তাদের নিজেদের অনেক হালকা মনে হয়, প্রতিটি পদক্ষেপ দেবার সময় তারা খানিকটা উপরে ওঠে যায়। যদিও তারা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে কিন্তু দেখে মনে হয় লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে।

কতোক্ষণ গিয়েছে জানে না তখন হঠাৎ করে ক্লদের আনন্দধ্বনি শোনা গেল, পেয়েছি! পেয়েছি!

ইহিতা জানতে চাইল, কী পেয়েছ?

তেজস্ক্রিয়তা।

টুরান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় তেজস্ক্রিয়তা পেয়েছ?

এই তো আমার ডিটেক্টরে। এই দেখ কট কট শব্দ করছে।

সবাই অবাক হয়ে শুনল সত্যিই ডিটেক্টরটা কট কট শব্দ করছে। নীহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, আমরা কি ভুল করে কোনো তেজস্ক্রিয় এলাকায় চলে এসেছি?

টুরান মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি নিশ্চিতভাবে পরীক্ষা করে দেখেছি। আশপাশে কোনো তেজস্ক্রিয়তা নেই।

তাহলে এখন কোথা থেকে আসছে?

ইহিতা উপরের দিকে তাকাল, বলল, হয়তো বাতাসে ভেসে আসছে?

টুরান ডিটেক্টরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, না এটা উপর থেকে আসছে। এটা নিচে থেকে আসছে।

হঠাৎ করে ডিটেক্টরের শব্দ বেড়ে যেতে শুরু করে। সাথে সাথে তারা পায়ের নিচে একটা কম্পন অনুভব করে।

মাটির নিচে দিয়ে কিছু একটা তাদের দিকে আসছে। সবাই তাদের অস্ত্র হাতে তুলে নিল।

কম্পনের সাথে সাথে এবার তারা সামনে পাথরের মাঝে কিছু একটা নড়ে যেতে দেখল। মাটির নিচে দিয়ে কিছু একটা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের মনে হতে থাকে যে কোনো মুহূর্তে পাথর ভেদ করে কিছু একটা ভয়ংকর চিৎকার করে বের হয়ে আসবে, কিন্তু কিছু বের হলো না। তাদের পায়ের নিচে দিয়ে সেটা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। ডিটেক্টরে তেজস্ক্রিয়তার শব্দটা কমতে কমতে এক সময় মিলিয়ে গেল।

সুহা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, এটা কী?

ইহিতা বলল, কোনো একটা প্রাণী।

মঙ্গলগ্রহে প্রাণী আছে?

আগে ছিল না। মনে হচ্ছে এখন আছে।

কাছে এলে তেজস্ক্রিয়তা বেড়ে যায় কেন?

নিশ্চয়ই শক্তি পায় তেজস্ক্রিয়তা থেকে। এটা যেহেতু তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাগাড়, শক্তিটাও এখান থেকে পাবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? তেজস্ক্রিয়তার শক্তি অনুপরমাণুকে ছিন্নভিন্ন। করে দিতে পারে। এই প্রাণীর দেহ তাহলে কী দিয়ে তৈরি?

এটা নিশ্চয়ই আমাদের পরিচিত প্রাণীর মতো না। অন্যরকম।

কীভাবে অন্যরকম?

জানি না। হয়তো প্রাণী আর যন্ত্রের একটা হাইব্রিড।

টুরান বলল, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চল অগ্রসর হই। চার দেওয়াল আর ছাদের নিচে থাকলে মনে হয় একটু ভরসা পাব।

হ্যাঁ চল।

সবাই আবার অগ্রসর হতে থাকে। ক্লদ জিজ্ঞেস করল, মঙ্গল গ্রহের প্রাণীটা দেখতে কেমন হবে?

সুহা বলল, আমি জানি না। জানতেও চাই না। সেটা যেন আমরা কোনোদিন জানতে না পারি।

ক্লদ বলল, আমি কিন্তু জানতে চাই।

কেউ তার কথার উত্তর দিল না। সবার জীবনই যদি একটা শিশুর জীবনের মতো সহজ সরল হত তাহলে মন্দ হত না!

কুগুরাভ সমীকরণের দ্বিতীয় সমাধানটা নীহার মাথায় আসি আসি করেও আসছিল না। কমপ্লেক্স প্লেনের কোথায় সমাধানটি হবে বোঝা যাচ্ছে, সমাধানটির ক্ষেত্রটিও পেয়ে গেছে শুধু সমাধানটি পাচ্ছে না। নীহা গভীরভাবে চিন্তা করে নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল হঠাৎ করে সে বাস্তব জগতে ফিরে এল। কেউ একজন তাকে ডাকছে, নীহা। কোথায় যাচ্ছ তুমি? দাঁড়াও।

নীহা দাঁড়াল, কুগুরাভ সমীকরণের কথা চিন্তা করতে করতে সে কখন সবাইকে ছেড়ে একা একা খানিকটা দূরে চলে এসেছে লক্ষ করে নি। নীহা শুনল, টর বলছে, আমরা পৌঁছে গেছি।

কোথায় পৌঁছে গেছি?

যেখানে পৌঁছানোর কথা। মানুষের আবাসস্থল।

মানুষ কী আছে?

না। মানুষের থাকার কথা নয়। মঙ্গলগ্রহে এখন আমরা কয়জন ছাড়া আর কোনো মানুষ নেই।

নীহা হেঁটে হেঁটে অন্যদের কাছে ফিরে এল। জিজ্ঞেস করল, মানুষের আবাসস্থলটা কোথায়?

টর হাত দিয়ে সামনের একটা পাথরের স্তৃপকে দেখিয়ে বলল, এইতো, এটা।

নীহা বলল, দেখে মোটেই মানুষের আবাসস্থল মনে হচ্ছে না।

টর হাতে ধরা মডিউলটা দেখে বলল, মনে না হলেও কিছু করার নেই। এটাই সেই জায়গা। মনে হয় মাটির নিচে তৈরি করেছে।

ইহিতা জিজ্ঞেস করল, এখন আমরা কী করব?

সুহা বলল, ভেতরে ঢুকব। অন্ততপক্ষে চারদিকে দেয়াল আর মাথার উপরে একটা ছাদ তো থাকবে।

কেমন করে ঢুকব? নীহা জানতে চাইল, দরজা কোথায়? চাবি কোথায়?

টুরান বলল, একটা ব্যবস্থা থাকবে। জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে আশ্রয় দেয়ার একটা কোড আছে, সেই কোডটি দিলেই দরজা খুলে যাবে। আগে দরজাটি খুঁজে বের করা যাক।

দরজাটা সহজেই খুঁজে পাওয়া গেল। কী প্যাডে যখন কোড সংখ্যাটি প্রবেশ করানো হচ্ছে তখন ক্লদ দরজাটাকে পা দিয়ে একটা লাথি দেয়, সাথে সাথে কঁাচ ক্যাচ শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। টুরান অবাক হয়ে বলল, দরজাটা খোলা।

ইহিতা দরজাটা পরীক্ষা করে বলল, কেউ একজন এটা ভেঙে আগে ভেতরে ঢুকেছে।

নীহা বলল, তার মানে এটা আশ্রয় হতে পারে, কিন্তু নিরাপদ আশ্রয় নয়। টুরান বলল, এখন কী করব?

টর বলল, অবশ্যই ভেতরে ঢুকব। ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে!

সে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, বলল, আমি সবার আগে যাই। তোমরা পিছনে পিছনে এসো।

ভেতরে একটা ঝাঁপসা খোলা আলো। একটা সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে, সাবধানে পা ফেলে টর এগিয়ে যায়। অন্যেরা তার পিছু পিছু নামতে থাকে। নিচে একটুখানি খোলা জায়গা সেখানে দাঁড়িয়ে তারা চারদিকে তাকায়। সামনে একটা ভারী দরজা, দরজার ওপরে একটা বাতি জ্বলছে নিভছে। টর এগিয়ে এসে দরজা লাথি দিতেই দরজাটা খুলে গেল, দরজায় অন্যপাশে একজন দীর্ঘদেহী মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। মানুষটির হাতে একটা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, অস্ত্রটি তাদের দিকে তাক করে মানুষটি ভারী গলায় বলল, তোমরা কারা? এখানে কেন এসেছ? তোমরা জান না এখানে ভয়ংকর বিপদ?

টর বলল, আমরা ঘটনাক্রমে এখানে এসেছি, আমাদের একটু আশ্রয় দরকার। এখানে বিপদটি কী?

মানুষটি তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, টরের কথাটি শুনেছে কিংবা শুনে থাকলেও বুঝেছে বলে মনে হল না। মানুষটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, তোমরা কারা? এখানে কেন এসেছ? তোমরা জান না এখানে ভয়ংকর বিপদ?

ইহিতা বলল, এটা সত্যিকারের মানুষ না। হলোগ্রাফিক ছবি।

টর মানুষটির হলোগ্রাফিক শরীরের ভিতর দিয়ে হেঁটে চলে যেতে যেতে বলল, কিছু একটা বিপদের কথা বলছে। মানুষকে সাবধান করার জন্যে এটাকে বসানো হয়েছে।

ইহিতা বলল, টর খুব সাবধান।

আমি সাবধান আছি।

ক্লদ বলল, আমার যন্ত্র আবার কটকট শব্দ করছে।

সবাই চমকে উঠল। শুনতে পেল সত্যিই তেজস্ক্রিয়তা মাপার ডিটেক্টরটি খুব মৃদুভাবে শব্দ করছে। টুরান ডিটেক্টরটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল। এখানে খুব অল্প তেজস্ক্রিয়তা আছে। আমাদের জন্যে বিপজ্জনক পরিমাণে নয়কিন্তু আছে।

টর হাতের অস্ত্রটা ধরে সাবধানে অগ্রসর হয়। চারপাশে কয়েকটা ঘর, ঘরের ভেতর নানা ধরনের যন্ত্রপাতি। সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরের মেঝেতে মানুষের ব্যবহারী কিছু জিনিসপত্র, জামাকাপড়, পানীয় এর বোতল–শুকনো রক্তের ছোপ, সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় এখানে কোনো একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে।

শেষ ঘরটির ছাদ ভেঙে পড়েছে। দেওয়ালে বিস্ফোরণের চিহ্ন–একদিকে একটা বিশাল গর্ত। সেই গর্ত দিয়ে একটা সুড়ঙ্গে মতো বের হয়ে গেছে। তারা কিছুক্ষণ এই সুড়ঙ্গটার দিকে তাকিয়ে থাকে, ইহিতা নিচু গলায় বলল, এই সুড়ঙ্গটা কী যাবার জন্যে নাকি আসার জন্যে?

টর বলল, আমরা ভিতরে ঢুকে দেখতে পারি।

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, না। আমরা এমনিতেই অনেক বড় বিপদের মাঝে আছি। নতুন করে বিপদ ডেকে আনার কোনো প্রয়োজন নেই।

ঠিক তখন ক্লদের কথা শোনা গেল, সে চিৎকার করছে, সবাই এসো দেখে যাও।

সবাই গিয়ে দেখল, সে একটা ছোট দরজা খুলে ভিতরে তাকিয়ে আছে। টুরান নিচু হয়ে দেখল, একটি মৃতদেহ। মানুষটি কতদিন আগে মারা গেছে বোঝার উপায় নেই, সমস্ত শরীর শুকিয়ে চামড়া হাড়ের উপর লেগে আছে। মানুষটির হাতে একটি ভিডি রেকর্ডার শক্ত করে ধরে রেখেছে।

সবাই এক ধরনের আতংক নিয়ে মৃতদেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। নীহা ভয়ার্ত গলায় বলল, মানুষটির চোখে মুখে কী আতংক লক্ষ করেছ?

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ কী দেখে এতো ভয় পেয়েছ কে জানে?

হাতের ভিডি রেকর্ডারে হয়তো রেকর্ড করা আছে।

টর তখন নিচু হয়ে মৃত মানুষটির হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ভিডি রেকর্ডারটি ছুটিয়ে আনে। উপরের লাল বোতামটি স্পর্শ করার সাথে সাথে ঘরের মাঝামাঝি একটি মানুষের ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক ছবি ভেসে আসে। অস্পষ্ট ছবি, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে ছবিটা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তারপর আবার ফিরে আসছে। তারা শুনতে পেল, মানুষটি কাঁপা গলায় বলছে, বিপদ। এখনে খুব বড় বিপদ। তোমরা কারা আমার কথা শুনছ আমি জানি না, কিন্তু আমি তোমাদের বলছি তোমরা এক্ষুণি এই আবাসস্থল ছেড়ে চলে যাও। তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো এই আবাসস্থলের দেয়াল ভেঙে ফেলেছে তারা এখন এখানে ঢুকতে পারে… কিমি আর লুসাকে ধরে নিয়ে গেছে… আমাদেরকেও নেবে… কী ভয়ংকর একটি প্রাণী… এদের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, ধ্বংস নেই… কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো…

ইহিতা এগিয়ে এসে ভিডি রেকর্ডারের বোতাম টিপে সেটাকে বন্ধ করে বলল, ক্লদের মতো ছোট একটা শিশুর সামনে এটা দেখা ঠিক হচ্ছে না।

টর বলল, কিন্তু আমাদের জানা দরকার মানুষটি কী বলছে।

সুহা বলল, ঠিক আছে আমি ক্লদকে সরিয়ে নিই। তোমরা দেখ।

ক্লদ বলল, না আমি যাব না। আমি শুনব মানুষটি কী বলছে।

না তুমি শুনবে না।

আমি শুনব।

না। তুমি শুনবে না–বলে সুহা ক্লদকে ধরে সরিয়ে নিল।

সবাই তখন মানুষটির কথা শুনল। কথাগুলো অনেকটা তার দিনলিপির মতো, সে ছাড়াছাড়া ভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে বলছে। অনেক কথা বলছে, বেশিরভাগই আতংকের কথা, অসহায়তার কথা। ক্রোধ এবং ক্ষোভের কথা। তারপরও তার কথা থেকে তারা অনেকগুলো জরুরি বিষয় জানতে পারল। এই মানুষগুলো বুদ্ধিমান প্রাণী সৃষ্টির একটা গোপন মিশনে এসেছিল। পৃথিবীর মতো এখানে যেহেতু কোনো জৈব জগৎ নেই তাই প্রাণীটার শক্তির জন্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার করেছে। যে প্রাণীটি তৈরি হয়েছে সেটি সত্যিকার অর্থে বুদ্ধিমান প্রাণী হয় নি। যেহেতু নতুন করে তাদের জন্মানোর কোনো উপায় নেই তাই অন্যভাবে নিজেদের তৈরি করার পদ্ধতি বের করে নিয়েছে। মানুষদের ধরে তাদের শরীর টুকরো টুকরো করে ব্যবহার করছে। পুরো প্রক্রিয়াটা বীভৎস–যারা এই গোপন মিশনে এসেছিল তারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে। যারা পালাতে পারে নি তারা প্রাণীগুলোর হাতে মারা পড়েছে।

যে বিষয়টা সবচেয়ে ভয়ংকর সেটি হচ্ছে তাদের ধ্বংস করা যায় না–গুলি করে বা বিস্ফোরণে শরীরটাকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেও তারা ছিন্ন ভিন্ন অংশগুলো জুড়ে দিয়ে নতুন করে তাদের তৈরি করে নেয়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে শক্তি পায় বলে তাদের কোনো রসদের অভাব নেই। মাটির নিচে দিয়ে এরা সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে, প্রয়োজন না হলে উপরে ওঠে না, সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত চলে যেতে পারে।

মানুষটির কাছ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পেয়েছে। মানুষের এই আবাসস্থলটি তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো দখল করে নিলেও এখন থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটা খুব সুরক্ষিত আবাসস্থল রয়েছে যেখানে তেজস্ক্রিয় প্রাণী ঢুকতে পারে না। সেখানে কোনোভাবে আশ্রয় নিতে পারলে তারা বেঁচে যাবে।

ভিডি রেকর্ডে মানুষের কথাগুলো শেষ হবার পর সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, টর জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব?

টুরান বলল, করার তো খুব বেশি কিছু নেই। এই আবাসস্থলটা মোটেও নিরাপদ নয়, তাই আমাদের যেতে হবে সুরক্ষিত আবাসস্থলটিতে।

কেমন করে যাব? প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ।

হেঁটে যাওয়া ছাড়া কি অন্য কোনো পথ আছে?

টর মাথা নাড়ল, বলল, নেই।

তাহলে দেরি করে লাভ নেই। চল রওনা দিই।

ইহিতা বলল, আমাদের সাথে চার বছরের একটা শিশু আছে ভুলে যেও।

টুরান বলল, না। আমরা ভুলি নি।

নীহা খানিকটা অনিশ্চিত ভাবে বলল, আমি একটা বিষয় জিজ্ঞেস করতে পারি?

অবশ্যই। ইহিতা বলল, জিজ্ঞেস তো করতেই পার, কিন্তু আমরা কেউ তার উত্তর জানি কী না সেটা অন্য ব্যাপার।

নীহা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমরা লক্ষ করেছ আমরা কিন্তু ছোট একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনার মাঝে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা পুরো ব্যাপারটা কখনো দেখছি না।

টর ভুরু কুঁচকে বলল, পুরো ব্যাপারটা কী?

আমরা এই গ্রহে আটকা পড়েছি, আমরা কোনোভাবে মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারব না। আগে হোক পরে হোক তেজস্ক্রিয় প্রাণী আমাদের খেয়ে ফেলবে।

টর বলল, তুমি কী বলতে চাইছ?।

নীহা বলল, আমি বলছি কেউ একজন আমাকে ভবিষ্যতের একটা পরিকল্পনা দেখাও। মিনিট মিনিট করে বেঁচে থাকতে আমার ঘেন্না ধরে গেছে।

ইহিতা নরম গলায় বলল, নীহা! আমরা যে বিষয়টা ভুলে থাকার ভান করছি, তুমি ঠিক সেই ব্যাপারটা টেনে এনেছ। সত্যি কথা বলতে কী আমরা মিনিট মিনিট করে বেঁচে আছি কারণ সেটা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। আমরা শুধু সময়টা কাটিয়ে যাচ্ছি, এ ছাড়া আর কিছু করার নেই, সেজন্যে।

নীহা বলল, আমি এই পৃথিবীতে কারো কাছে কিছু চাই নি। শুধু নিজের জন্যে একটু সময় চেয়েছিলাম। নিরিবিলি নিজের সাথে একটু সময়। আমি সেটাও পেলাম না। সেজন্যে দুঃখ দুঃখ লাগছে।

তারা যখন কথা বলছে তখন সুহা আর ক্লদও সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, ক্লদ কৌতূহলী চোখে নীহার দিকে তাকিয়ে রইল, সুহা বলল, মানুষকে কখনো আশা ছেড়ে দিতে হয় না।

নীহা বলল, আমি আশা ছেড়ে দিতে চাই না। আমাকে বল, আমি কী নিয়ে আশা করে থাকব? আমি এই অনিশ্চিত অবস্থাটা আর সহ্য করতে পারছি না, মনে হচ্ছে আমাদের ভেতরে যে দুইজন রবোমানব আছে তারা যদি আমাকে গুলি করে মেরে ফেলত তাহলেই বুঝি বেশি ভালো হত! কে রবোমানব? আমাকে মেরে ফেলবে অনুগ্রহ করে?

সবাই নীহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল, কী বলবে কেউ বুঝতে পারছে না। নীহা ভাঙা গলায় বলল, আমাকে এখানে রেখে তোমরা যাও। আমি বসে কুগুরাভ সমীকরণের সমাধানের কথা চিন্তা করতে থাকি। এক সময় তেজস্ক্রিয় প্রাণী এসে আমাকে খেয়ে সব ঝামেলা চুকিয়ে দেবে! অন্তত আমি যেটা করতে ভালোবাসি সেটা করতে করতে মারা যাব।

এই দীর্ঘ সময়ে নুট নিজে থেকে কখনো একটি কথাও বলে নি। এবার সে এগিয়ে এসে বলল, আমি কী একটা কথা বলতে পারি?

সবাই চমকে ওঠে নুটের দিকে তাকাল।

ইহিতা বলল, নুট! তুমি যে আমাদের সাথে আছ সেই কথাটি আমাদের কারো মাথাতেই আসে না! অবশ্যই তুমি কথা বলতে পারবে। আমরা শুনতে চাই তুমি কী বলবে। কেমন করে বলবে!

নুট ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, কথা না বলতে বলতে আমি কেমন করে কথা বলতে হয় সেটাই ভুলে গেছি!

নীহা বলল, তোমার গলার স্বর সুন্দর। আমাদের মাঝে তোমার সবচেয়ে বেশি কথা বলা উচিত ছিল।

নুট দুর্বলভাবে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, ধন্যবাদ নীহা। কিন্তু আমি অবশ্যি গলার স্বর নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলাম না। তুমি যে বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন করেছ আমি সারাক্ষণ শুধু সেটাই ভেবেছি। ভেবে ভেবে একটা উত্তর পেয়েছি।

কী উত্তর পেয়েছ?

তুমি ভবিষ্যতের একটা পরিকল্পনা জানতে চেয়েছ, আমি তোমাকে সেই পরিকল্পনা দিতে পারি। একেবারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

সত্যি?

হ্যাঁ।

পরিকল্পনাটা খুবই সহজ, তার জন্যে আমাদের এক-দুইজনকে হয়তো মারা যেতে হবে, কিন্তু যারা বেঁচে থাকবে তাদের একটা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকবে।

ইহিতা বলল, সেটি কী বলে ফেল নুট।

আমাদের এখনই পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে মানুষের আবাসস্থলটাতে যেতে হবে। সেখানকার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে নয়। অন্য কারণে।

কী কারণে?

এই লম্বা পথ পায়ে হেঁটে যেতে আমাদের কয়েকদিন লাগবে। এই সময়টাতে তেজস্ক্রিয় প্রাণী নিশ্চিতভাবে আমাদের আক্রমণ করবে। তখন আমরা একটা ভয়ংকর বিপদে পড়ব। আমার ধারণা তখন আমাদের মাঝে কারা মানুষ কারা রবোমানব সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

কেউ কোনো কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে নুটের দিকে তাকিয়ে রইল। নুট বলল, আমরা যদি রবোমানবদের আলাদা করতে পারি তখন হয় তারা না হয় আমরা বেঁচে থাকব। আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি, দুই কারণে। প্রথম কারণ, আমরা সংখ্যায় বেশি।

ইহিতা জানতে চাইল, দ্বিতীয় কারণ?

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে আমি জানি আমাদের কোন দুইজন রবোমানব। কাজেই তারা হঠাৎ করে কিছু করতে পারবে না। অন্ততপক্ষে আমি সতর্ক থাকব!

সবাই ভয়ানকভাবে চমকে উঠল, টর তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করল, কোন দুইজন?

নুট মাথা নাড়ল, বলল, আমি বলব না। আমি সেটা জানি কিন্তু আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণ ছাড়া আমার কথার কোনো গুরুত্ব নেই, বরং সেটা একটা জটিলতা তৈরি করবে। আমি তাই প্রমাণের জন্যে অপেক্ষা করছি।

টর মাথা নেড়ে বলল, আসলে তুমি জান না।

জানি।

তুমি কথা বলতে না সেটাই ভালো ছিল।

নুট হাসার চেষ্টা করল, আমি বলতে চাই নি কিন্তু নীহা ভেঙে পড়ছে দেখে বলছি। নুট নীহার দিকে তাকিয়ে বলল, যখন আমরা একশভাগ খাঁটি প্রমাণসহ রবোমানবদের আলাদা করব–তখন ট্রিনিটি আমাদের যে কয়জন বেঁচে থাকবে সেই বাকি মানুষদের মহাকাশযানে নিয়ে নেবে। তুমি সেটাকে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা হিসেবে নিতে পার।

নীহা কিছুক্ষণ নুটের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, ধন্যবাদ নুট। তুমি আমার ভেতরে যথেষ্ট কৌতূহল তৈরি করেছ! আমি আরো এক দুই দিন বেঁচে থাকার জন্যে চেষ্টা করতে রাজি আছি!

চমৎকার।

ক্লদ নুটের পোশাক স্পর্শ করে বলল, নুট!

বল।

কোন দুইজন রবোমানব আমিও সেটা জানি।

নুট হাসল, বলল, চমৎকার! কিন্তু কাউকে সেটা বল না। আমাদের কথা কেউ বিশ্বাস করবে না।

ক্লদ মাথা নাড়ল, না বলব না।

মহামান্য থুল বাগানে তার চেয়ারটিতে বসেছিলেন। সূর্য ড়ুবে যাবার পর একটা শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছে। তার একটা গরম কাপড় গায়ে দিয়ে বসা উচিত ছিল। দুই হাত বুকের কাছে এনে অনেকটা শিশুর মতো গুটিসুটি মেরে তিনি চেয়ারে বসে রইলেন।

পাশে তথ্যবিজ্ঞানী জুহু দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, মহামান্য থুল, এখন আপনার ঘরের ভেতরে চলে যাওয়া উচিত।

মহামান্য থুল বললেন, ঠিকই বলেছ, কিন্তু উঠতে আলস্য লাগছে। বয়স হয়ে গেলে এটি হচ্ছে সমস্যা! সহজ কাজটিও তখন কঠিন।

তাহলে কি আপনার জন্যে একটা গরম কাপড় নিয়ে আসব?

না, না, না, কোনো প্রয়োজন নেই! মহামান্য থুল ব্যস্ত হয়ে বললেন, তুমি বরং চেয়ারটা টেনে বস। তোমার সাথে একটু কথা বলি।

জুহু একটা চেয়ার টেনে মহামান্য থুলের কাছে বসল। মহামান্য থুল দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, পৃথিবীতে খাবারের পরিবহনের কাজটা কী শেষ করা হয়েছে?

করা হয়েছে মহামান্য থুল। আপনি যেভাবে বলেছেন সেভাবে পৃথিবীর একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও খাদ্যশস্যকে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

শুকনো প্রোটিন?

সেটিও।

মৌলিক ওষুধপত্র।

যথেষ্ট পরিমাণে।

চমৎকার।

কেন সেটি করা হল সেটি আমরা কেউ বুঝতে পারছি না। মূল ভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনের সময় খাবার পাঠানো অনেক বেশি কার্যকর পদ্ধতি। এখন অনেক জায়গায় নতুন করে শস্য সংরক্ষণের জন্যে ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এতো অল্প সময়ে সেটা করা খুব সহজ হয় নি। তারপরেও করেছি–আপনার নির্দেশ সবাই খুব গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছে।

ধন্যবাদ জুহু।

মহামান্য থুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, জুহু।

বলুন মহামান্য থুল।

আমরা যে মহাকাশযানটা পাঠিয়েছিলাম তার খবর কী জান?

জানি মহামান্য থুল। জুহু মাথা নেড়ে বলল, তাদের নিয়ে দুঃসংবাদ আছে।

কী দুঃসংবাদ।

সাতজন মহাকাশচারীর মাঝে দুইজন রবোমানব জানার পর মহাকাশযানের মূল কম্পিউটার সাতজন অভিযাত্রীকেই মহাকাশযান থেকে বের করে দিয়েছে।

বের করে দিয়েছে? কোথায়? মঙ্গল গ্রহে।

মহামান্য থুল শিস দেয়ার মতো শব্দ করলেন। মঙ্গল গ্রহ তো থাকার উপযোগী গ্রহ নয়। সেখানে গত শতাব্দীতে তেজস্ক্রিয় এক ধরনের প্রাণী তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রাণীগুলো তো এখনো শেষ হয় নি।

জুহু মাথা নাড়ল, বলল, খুবই ভয়ংকর পরিবেশ। মহাকাশচারীদের বেঁচে থাকার কথা না। সম্ভবত সবাই এর মাঝে মারা গেছে।

মহামান্য থুল মাথা নেড়ে বললেন, যদি সম্ভব হয় তুমি তাদের সাথে একটু যোগাযোগ করতে পারবে?

পারব মহামান্য থুল। যদি তারা বেঁচে থাকে তাহলে পারব।

চমৎকার।

মহামান্য থুল হঠাৎ করে একটা গভীর চিন্তায় ড়ুবে গেলেন। জুহু কী করবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। তারপর অত্যন্ত দ্বিধান্বিত ভাবে বলল, মহামান্য থুল, আমি কী এখন চলে যাব?

হ্যাঁ, হ্যাঁ নিশ্চয়ই। যাবার আগে শুধু তোমার কাছে একটা জিনিস জানতে চাই।

বলুন মহামান্য থুল।

প্রিসা নগরীর উত্তরে একটা বন আছে না?

আছে মহামান্য থুল।

সেই বনে কী একটা আগুন লাগানো সম্ভব?

জুহু অবাক হয়ে বলল, আগুন লাগনো?

হ্যাঁ।

আপনি আদেশ দিলে অবশ্যই সম্ভব!

কিন্তু কাজটি করতে হবে গোপনে। মহামান্য থুল দুর্বল ভঙ্গিতে হেসে বললেন, কেন এটা করতে চাইছি তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো না!

আমার খুবই কৌতূহল হচ্ছে, কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করব না।

ধন্যবাদ জুহু। তুমি আগামীকাল দুপুরে বনটিতে আগুন লাগিয়ে দিও। আর তার একটু আগে লিন্টাস শহরের নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্রের পানি সরবরাহ কেন্দ্রে পাঁচ লিটার তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ফেলে আসতে হবে।

পাঁচ লিটার তেজস্ক্রিয় আয়োডিন?

হ্যাঁ।

কাজটি খুবই বিপজ্জনক, কিন্তু আপনি চাইলে অবশ্যই করা সম্ভব। জুহু। খুব কষ্ট করে তার বিস্ময়টুকু গোপন করে বলল, আর কিছু মহামান্য থুল?

হ্যাঁ। আরো কয়েকটা ছোট বড় কাজ। যদি আমার জন্য করে দাও তাহলে খুব ভালো হয়।

আপনি বলুন।

মহামান্য থুল তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে জুহুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এই যে এখানে আমি লিখে দিয়েছি! তুমি পড়ে হাসাহাসি করো না!

জুহু বলল, আপনার নির্দেশ শুনে আমি হাসাহাসি করব? কী বলছেন আপনি মহামান্য থুল!

নির্দেশগুলো হাস্যকর সেজন্যে বলছি!

জুহু কাগজের লেখাগুলো পড়ল। সেখানে বিচিত্র বিচিত্র অনেকগুলো নির্দেশ দেয়া আছে। মাজুরা ইলেকট্রিক কোম্পানির ফোরম্যানকে অগ্রিম বোনাস দেয়া, সবুজ পৃথিবী শিশু স্কুলের বাচ্চাদের সকাল দশটায় আর্ট মিউজিয়ামে নেয়া, মাহীরাহদের সুইস গেট খুলে নিচের শুষ্ক অঞ্চলকে প্লাবিত করে দেয়া, বিনোদনের জন্যে আলাদা করে রাখা দুটি উপগ্রহকে অচল করে দেয়া, এরকম অনেকগুলো বিচিত্র নির্দেশ দেয়া আছে। মহামান্য থুলের ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জুহুর মনে কোনো সন্দেহ নেই বলে সে কাগজে লেখাগুলো পড়ে বিচলিত হল না। মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি নিশ্চিত থাকুন মহামান্য থুল। আপনি যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন ঠিক সেভাবে প্রত্যেকটা কাজ করা হবে।

ধন্যবাদ জুহু। অনেক ধন্যবাদ।

জুহু মহামান্য থুলকে অভিবাদন জানিয়ে লম্বা পা ফেলে বের হয়ে এল। থুল একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মাইক্রোফোনের সুইচটি অন করে লাল চুলের মেয়েটি বলল, তুমি কী আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?

মস্তিষ্কটি ভারী গলায় বলল, হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি।

লাল চুলের মেয়েটি বলল, আজকে খুব একটা বিশেষ দিন। আজকে তোমার সাথে অবশ্যই কথা বলতে হবে।

মস্তিষ্কটি কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটি বলল, কী হল তুমি কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন?

তুমি জান, আমি তোমার উচ্ছাসে অংশ নিতে পারি না। যেটি তোমার বিশেষ দিন পৃথিবীর মানুষের জন্যে সেটি নিশ্চয়ই খুব অশুভ একটি দিন।

লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, তুমি ঠিকই অনুমান করেছ! তুমি শুনতে চাও না কেন এটি মানুষের জন্যে অশুভ?

না। আমি শুনতে চাই না।

না চাইলেই হবে না। তোমাকে শুনতে হবে। এগুলো গোপন কথা। ভয়ংকর গোপন কথা। সারা পৃথিবীতে এখন আমরা মাত্র কয়েকজন রবোমানব এটি জানি। এটা কাউকেই বলার কথা না। কিন্তু আমি নিশ্চিন্তে তোমাকে সবকিছু বলতে পারি! তোমার মতো নিরাপদ শ্রোতা সারা পৃথিবীতে আর একটিও নেই।

আমি শুনতে চাই না।

তোমাকে শুনতে হবে। লাল চুলের মেয়েটি কঠিন মুখে বলল, তোমাকে অবশ্যই শুনতে হবে। আমার যা ইচ্ছে হয় আমি তোমাকে বলব তোমার তার সবকিছু শুনতে হবে!

লাল চুলের মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে খানিকটা উত্তেজক পানীয় ভরে এনে জানালায় পা ভাঁজ করে বসে বলল, তুমি শুনে নিশ্চয়ই আতংকিত হবে, আমরা আমাদের কাউন্ট ডাউন শুরু করেছি। আগামীকাল বিকেল তিনটা হচ্ছে আমাদের আক্রমণের সময়। পৃথিবীর সব বড়বড় আক্রমণ হয় ভোর রাতে। আমরা ঠিক করেছি আমাদের আক্রমণটি হবে দিনের আলোতে। সন্ধ্যেবেলা সব মানুষ যখন সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বিশ্রাম নেবে তখন আমরা আমাদের ঘোষণাটি প্রচার করব। ঘোষণায় কী বলা হবে শুনতে চাও?

মস্তিষ্কটি নিচু গলায় বলল, না শুনতে চাই না।

তুমি শুনতে চাও কি না চাও তাতে কিছু আসে যায় না। ঘোষণাটি হবে এরকম, বলা হবে, পৃথিবীর রবোমানবেরা। তোমরা যে ঘোষণাটির জন্য দীর্ঘদিন থেকে অপেক্ষা করছিলে, আমরা এখন সেই ঘোষণাটি করতে চাই। আজ থেকে পৃথিবীতে সকল বৈষম্য সকল অবিচারের অবসান হয়েছে। এই পৃথিবীতে যে সম্প্রদায়ের বুদ্ধিমত্তা বেশি, যে সম্প্রদায়ের মেধা বেশি, ক্ষমতা বেশি সেই সম্প্রদায়ের অধিকারও বেশি। মানুষের যে অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে সভ্যতা গড়ে উঠতে পারছে না, সেই নেতৃত্বকে অপসারণ করা হয়েছে। প্রিয় রবোমানব এবং মানুষেরা তোমরা শুনে খুশি হবে যে নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীতে আমাদের অত্যাচার নির্যাতন অবিচার আর বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে সেই নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে বিচারের সম্মুখীন করা হবে।

মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে উঠল, না! লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে ওঠে বলল, না? কেন না? এটা হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না।

মেয়েটি তার পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। এটি আসলেই হতে পারে না। এটি আসলে একটা মিথ্যা ঘোষণা। বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকে বিচার করা হবে সেই ঘোষণাটি আসলে সত্যি নয়। কেন সত্যি নয় জান?

না। জানি না।

তার কারণ, আগামীকাল বিকেল তিনটার সময় সবার আগে তাদের বাসায় গিয়ে তাদের হত্যা করা হবে। কে কাকে হত্যা করবে সেটাও ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের সর্বাধিনায়ক হত্যা করবে তোমাদের মহামান্য থুলকে! নিজের হাতে। সেই দৃশ্যটি দেখার জন্যে আমার সমস্ত শরীর আকুলি বিকুলি করছে! মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো একটা শব্দ করে বলল, আহ্! সেই দৃশ্যটি কী অভূতপূর্ব হবে তুমি চিন্তা করতে পার?

মস্তিষ্কটি কাতর গলায় বলল, আমি চিন্তা করতে চাই না। আমি শুনতে চাই। তোমার দোহাই লাগে–

মেয়েটির শরীরে উত্তেজক পানীয় কাজ করতে শুরু করেছে। সে মাটিতে পা দাপিয়ে বলল, তোমাকে শুনতে হবে হতভাগা মস্তিষ্ক! তোমাকে সব শুনতে হবে। নেটওয়ার্ক দখল করে আমরা কীভাবে সব রবোমানবকে নির্দেশ পাঠাব তোমাকে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দেয়া হবে সেটা শুনতে হবে। কীভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে শস্যভাণ্ডার দখল হবে শুনতে হবে, কীভাবে সুস্থ সবল মানুষের মাথায় ইমপ্লান্ট বসিয়ে রবোমান তৈরি করব শুনতে হবে।

মস্তিষ্কটি আর্ত চিৎকার করে বলল, শুনতে চাই না! আমি কিছুই শুনতে চাই–দোহাই তোমার–

লাল চুলের মেয়েটি অপ্রকৃতস্থের মতো হাসতে থাকে। কিছুতেই হাসি থামাতে পারে না।

সাতজনের ছোট দলটি নিঃশব্দে হেঁটে যেতে থাকে। তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। পৃথিবী হলে এখানে পাখির ডাক থাকত, ঝি ঝি পোকার ডাক থাকত { গাছের পাতার মাঝে বাতাসের শিরশির শব্দ থাকত। দূর থেকে কোনো একজন নিঃসঙ্গ ভবঘুরের গানের সুর ভেসে আসত। এখানে কিছু নেই। ইহিতার কাছে এই নৈঃশব্দটুকু অসহ্য মনে হয়।

ইহিতা দূরে তাকাল। সূর্যটি অস্ত যাচ্ছে, লাল এই গ্রহে দূরে নিপ্রাণ সূর্যটিকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হয়। ঠিক পৃথিবীর মতোই খুব ধীরে ধীরে সন্ধ্যে নেমে আসবে। একটু পর ঘুটঘুটে অন্ধকারে ড়ুবে যাবে। মঙ্গল গ্রহের কুৎসিত চাঁদ দুটি আকাশে থাকবে কী না কে জানে, থাকলেই সেটা কতোটুকু আলো দিতে পারবে সেটাই বা কে জানে। শৈশবে এই গ্রহটিকে নিয়ে সে কতো পড়াশোনা করেছে, তখন কী সে কল্পনা করেছিল একটি নির্বোধ কম্পিউটারের কারণে এই গ্রহটিতে নির্বাসিত হয়ে যাবে?

একটি ঢালু পাহাড়ের নিচে এসে সুহা বলল, আমরা এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ক্লদ মনে হয় একটু ক্লান্ত হয়ে গেছে।

ক্লদ বলল, উঁহু। আমি ক্লান্ত হই নি। আমি কখনো ক্লান্ত হই না।

ইহিতা বলল, চমৎকার! কিন্তু পরিশ্রম করলে ক্লান্ত হওয়াটা দোষের কিছু নয়। তুমি যদি ক্লান্ত হও, তাহলে আমাদের বল। আমরা তোমাকে ট্রান্সপোর্টারে বসিয়ে নিয়ে যাব। কোনো পরিশ্রম ছাড়াই তখন যেতে পারবে।

টুরান বলল, আমাদের একটা বাই ভার্বাল থাকলে চমৎকার হতো, অনেক তাড়াতাড়ি যেতে পারতাম।

টর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, হতভাগা ট্রিনিটি আমাদের ছোট একটা স্কাউটশিপে করে এখানে পাঠিয়েছে, খাবার আর পানি নিয়েই টানটানি, এখানে বাই ভার্বাল কেমন করে পাঠাবে? ৮৪

নীহা আপন মনে তার কুগুরাভ সমীকরণ সমাধান খুঁজে যাচ্ছিল, তার চারপাশে সবাই কে কী বলছে ভালো করে শুনছিল না। হঠাৎ করে সে বলল, আমার অনেকক্ষণ থেকে একধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। আমি কেন জানি আমার ভাবনায় মনোযোগ দিতে পারছি না।

কেন?

আমার–আমার—নীহা তার ব্যাকটিকে শেষ না করে থেমে গেল।

ইহিতা জানতে চাইল, তোমার কী?

আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, কেউ আমাদের চোখে চোখে রাখছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন আমাদের লক্ষ করছে। কেমন জানি অশুভ একটা অনুভূতি।

সুহা বলল, সেটি হতেই পারে। আমরা সবাই তেজস্ক্রিয় প্রাণীকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আছি।

নীহা মাথা নাড়ল, বলল, না সেরকম নয়। আমার অনুভূতিটি অনেক বাস্তব। মনে হচ্ছে কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চারদিকে অন্ধকারমনে হচ্ছে অন্ধকারের বাইরে অনেকগুলো চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

টুরান কষ্ট করে একটু হাসির মতো শব্দ করল, বলল, তেজস্ক্রিয় প্রাণী নিয়ে ভয় আমার ভেতরেও আছে। কিন্তু অশুভ অনুভূতি বা অন্ধকারে চোখ এগুলো তোমার কল্পনা। কারণ তেজস্ক্রিয় প্রাণী যদি কাছাকাছি আসে তাহলে আমাদের মিটারে আমরা রিডিং পাব। এই দেখো এখানে কোনো রিডিং নেই। বলে টুরান

তেজস্ক্রিয়তা মাপার ছোট যন্ত্রটি নীহাকে দেখাল।

ঠিক তখন তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্রটা থেকে হঠাৎ করে কট কট করে এক ধরনের শব্দ হতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে মিটারটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে কাটাটি নড়ছে, কিছু আলো জ্বলতে নিভতে থাকে আর শব্দটা দ্রুততর হতে থাকে।

ইহিতা নিচু গলায় বলল, নীহার ধারণা সঠিক। প্রাণীগুলো আমাদের দিকে আসছে।

নীহা আর্ত চিৎকার করে বলল, সর্বনাশ!

সুহা বলল, আমরা কী করব?

ইহিতা বলল, প্রাণীগুলোকে ঠেকানোর চেষ্টা করতে হবে।

কীভাবে?

অস্ত্র দিয়ে। ইহিতা ডানে বামে তাকাল, বলল, পিছনে বড় পাথরগুলো আছে, এখানে দাঁড়াই তাহলে শুধু সামনের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি নাও। শোনো খুব কাছে না আসা পর্যন্ত গুলি কর না। গুলি যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট

হয়।

সবাই ছুটে বিশাল পাথরটাকে পিছনে রেখে দাঁড়াল। ইহিতা হেলমেটের সুইচ টিপে সেটাকে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর জন্যে সংবেদনশীল করার চেষ্টা করে। অবলাল আলোতে কিছু দেখতে পেল না কিন্তু আলট্রাভায়োলেট তরঙ্গে যেতেই সে প্রাণীগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পায়। অনেকগুলো প্রাণী গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রাণীর শরীরের যে জায়গা থেকে অতিবেগুনি রশ্মি বের হচ্ছে শুধু সেই অংশটুকু দেখতে পাচ্ছে তাই প্রকৃত আকারটা বোঝা যাচ্ছে না। অনুমান করা যায় প্রাণীটি আকারে খুব উঁচু নয়–হাত-পা থাকতে পারে, দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, তোমাদের হেলমেট অতিবেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নাও।

নীহা জানতে চাইল, তাহলে কী হবে?

প্রাণীগুলো দেখতে পাবে।

নীহার সাথে সাথে অন্য সবাই তাদের হেলমেটের গগলস অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসা প্রাণীগুলো দেখতে পায়। টর চাপা স্বরে একটা কুৎসিৎ গালি দিয়ে বলল, আরেকটু কাছে আয় হতভাগারা–অনেকদিন কারো উপর গুলি চালাই নি।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, সাবধান, প্রয়োজন না হলে গুলি করো না।

কেমন করে বুঝব প্রয়োজন নেই!

যদি দেখ প্রাণীগুলো থেমে গেছে। যদি দেখ আমাদের দিকে এগিয়ে না এসে ইতস্তত অন্যদিকে যাচ্ছে।

কেন থেমে যাবে? কেন ইতস্তত অন্যদিকে যাবে?

ইহিতা ফিসফিস করে বলল জানি না। শুধু দেখ যায় কি না।

সবাই অস্ত্র তাক করে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে ঠিক তখন যেন ইহিতার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্যেই প্রাণীগুলোর গতি কমে আসে, প্রাণীগুলোর অনেকগুলো থেমে যায়, অনেকগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক হাঁটতে থাকে।

টুরান ফিসফিস করে বলল, কী হয়েছে? ইহিতা বলল, সবাই চুপ। কেউ একটা কথা বলবে না। একটা শব্দ করবে। কোনো কিছু না নড়লে প্রাণীগুলো দেখতে পায় না। কেউ নড়বে না। একেবারে কাছে এলেও নড়বে না।

সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকে। প্রাণীগুলো ইতস্তত এদিক-সেদিক ছড়িয়ে পড়ে। একটা প্রাণী তাদের কাছাকাছি এসে ডানদিকে সরে যায় সেখান থেকে হঠাৎ করে ঘুরে সোজাসুজি তাদের দিকে এগিয়ে আসে। সুহা ফিসফিস করে বলল, সর্বনাশ!

অন্য কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই দেখল কিছু একটা দুলতে দুলতে তাদের দিকে আসছে। কাছাকাছি আসার পর প্রথম প্রাণীটার অবয়ব স্পষ্ট দেখা যায়। রেডিয়েশন মিটারটি নিঃশব্দ করে রাখা আছে বলে সেটি শব্দ করছে না কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রচণ্ড রেডিয়েশনে তার কাটাটি থরথর করে কাঁপছে।

প্রাণীটি আরো কাছে এগিয়ে আসে, এটি পৃথিবীর কোনো প্রাণীর মতো নয়। মনে হয় মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে একটি অতিকায় কুৎসিত ক্লেদাক্ত কীট তৈরি করা হয়েছে। ধারালো দাঁতের পিছনে লকলকে জিব। চোখ আছে কী নেই বোঝা যায় না। প্রাণীটি খুব কাছে এসে তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখল তারপর একটু বাম দিকে সরে দুলতে দুলতে নড়তে নড়তে সরে গেল। হঠাৎ করে তারা মাটিতে একটা কম্পন অনুভব করে সাথে সাথে সবগুলো প্রাণী একসাথে ঘুরে গেল তারপর ছুটতে ছুটতে দূরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ইহিতা ফিসফিস করে বলল, এখনো কেউ কোনো শব্দ করো না। কেউ একটুও নড়ো না। প্রাণীগুলো আগে একেবারে সরে যাক।

যখন প্রাণীগুলো একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল তখন নীহা একটা দীর্ঘশ্বাসকে বুক থেকে বের করে দিয়ে বলল, খুব বাঁচা বেঁচে গেছি।

টর বলল, একটা গুলি পর্যন্ত করতে পারলাম না।

তুমি গুলি করতে চাইছিলে?

হ্যাঁ। অনেকদিন কোনো অস্ত্র ব্যবহার করি নি, হাত নিশপিশ করছিল।

সবাই এক ধরনের সন্দেহের চোখে টরের দিকে তাকিয়ে থাকে। টুরান একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি একটা কথা বলতে পারি?

সবাই এবার ঘুরে টুরানের দিকে তাকাল, সুহা বলল, বল।

টুরান বলল, তোমাদের মনে আছে আমরা যখন মহাকাশযানে করে আমাদের যাত্রা ঠিক শুরু করতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন ইহিতা আমাদের সবার সাথে একবার কথা বলতে চাইছিল?

সবাই মাথা নাড়ল। টুরান বলল, আমি এক ধরনের গোয়ার্তুমি করে ইহিতাকে কথা বলতে দিই নি। তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। অপমানসূচক কথা বলেছিলাম।

ইহিতা নিচু গলায় বলল, তুমি এমন কিছু অপমানসূচক কথা বল নি।

বলেছিলাম। আমার খুব কাছাকাছি থাকা একটি মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সেই থেকে আমি পুরোপুরি নারী জাতির বিদ্বেষী হয়ে গিয়েছিলাম কোনো মেয়েকে সহ্যই করতে পারতাম না। কোনো মেয়ের কথাও শুনতে চাইতাম না। বিষয়টা খুবই বড় নির্বুদ্ধিতা হয়েছিল।

কেউ কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে টুরানের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে কী বলতে চাইছে।

ইহিতা তখন যে কথাগুলো বলতে চাইছিল, আমি এখন তোমাদের সাথে সেই কথাগুলো বলতে চাই।

টর জিজ্ঞেস করল, সেই কথাগুলো কী?

আমরা সাতজন মানুষ অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা পথ পাড়ি দিচ্ছি, এইমাত্র একটা খুব বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছি। সামনে পাব কিনা জানি না। বিপদ আসবে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এই রকম অসম্ভব বিপজ্জনক অবস্থা হলে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সব সময় সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তটি নেয়া যায় না–তার সময় থাকে না। তখন খুব দ্রুত মোটামুটি সঠিক একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেটা খুবই জরুরি।

টর বলল, আমি এখনও বুঝতে পারছি না, তুমি কী বলতে চাইছ!

তুমি বুঝতে পারছ না কারণ আমি এখনো কথাটি বলি নি।

তাড়াতাড়ি বলে ফেল।

টুরান বলল, আমি যদি ঠিক করে অনুমান করে থাকি তাহলে ইহিতা আমাদের বলতে চেয়েছিল মানুষের একটা দল হিসেবে আমাদের একটা দলপতি থাকা দরকার। যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শুধু তাই না, দলপতিকে মেনে নিলে আমরা সবাই তার সিদ্ধান্তটি কোনোরকম প্রশ্ন না করে মেনে নিতে পারব।

টুরান একটু থামল এবং সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল। সে সবার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, এই মুহূর্তে আমাদের একজন দলপতি দরকার। আমি দলপতি হিসেবে ইহিতার নাম প্রস্তাব করছি। একটু আগে ইহিতা আমাদের যে কথাগুলো বলেছে তার প্রত্যেকটি কথা সত্যি বের হয়েছে। সে আমাদের ভয়ংকর বিপদে নিজে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।

টর বলল, আমাদের মাঝে দুইজন রবোমানব আছে, তুমি কেমন করে জান ইহিতা একজন রবোমানব না?

টুরান থতমত খেয়ে বলল, সেটা আমি জানি না। কেউই জানে না।

নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, আমি জানি, ইহিতা রবোমানব না।

টর মাথা ঘুরিয়ে নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি জান না। তুমি অনুমান করছ।

নুট বলল, না। আমি জানি। আমার টুরানের প্রস্তাবটা খুব পছন্দ হয়েছে। আমিও ইহিতাকে আমাদের দলপতি হিসেবে গ্রহণ করছি।

নীহা বলল, আমিও।

সুহা বলল, আমিও তাকে দলপতি হিসেবে চাই।

ক্লদ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আলাপটা বোঝার চেষ্টা করল। সে এমনিতে খুবই ছটফটে ছেলে, কিন্তু একটু আগে এতো কাছে থেকে তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো দেখার পর থেকে সে হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আমিও চাই।

টর বলল, তার মানে বাকি রয়েছি শুধু আমি?

কেউ কোনো কথা বলল না। টর বলল, আমার অবশ্যি কোনো পথ বাকি থাকল না। আমাকেও মেনে নিতে হচ্ছে।

টুরান বলল, চমকার।

ইহিতা বলল, আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না মঙ্গল গ্রহের এই পাহাড়ের নিচে এই ধূলিঝড়ের মাঝে, তেজস্ক্রিয় প্রাণীদের আনাগোনার মাঝে আমরা বসে বসে একটা নাটক করছি! কিন্তু আমি এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করব না। সময় খুব মূল্যবান। আমি সময়টা বাঁচাতে চাই। আমাকে যেহেতু দলপতির দায়িত্ব দিয়েছ আমি সেই দায়িত্ব নিচ্ছি-শুধুমাত্র এই বিপজ্জনক পথের অংশটুকুতে। যদি ঠিকভাবে মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে পারি তখন অন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে।

সেটি তখন দেখা যাবে। টুরান বলল, তাছাড়া আমরা একটি খেলার টিম তৈরি করছি না যে একেক খেলায় একেকজন দলপতি হবে।

ইহিতা বলল, সেই আলোচনা থাকুক। তোমরা সবাই এখনই রওনা দাও। দ্রুত আমি আসছি।

নীহা জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথা থেকে আসছ?

সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। সবাই হাঁটতে শুরু কর।

সবাই হাঁটতে হাঁটতে দেখল, ইহিতা পিঠ থেকে তার ব্যাকপেক নামিয়ে মাটিতে উবু হয়ে কিছু একটা করছে। কী করছে কেউ অনুমান করতে পারল না।

ইহিতা তার কাজ শেষ করে একটু জোরে হেঁটে ছোট দলটির সাথে যোগ দিল। টর জিজ্ঞেস করল, কাজ শেষ হয়েছে?

হ্যাঁ হয়েছে।

টর আশা করছিল ইহিতা বলবে সে কী করেছে, ইহিতা বলল না। তখন টর নিজেই জিজ্ঞেস করল, তুমি পিছনে কী করে এসেছ?

এমন কিছু নয়।

তার মানে তুমি আমাদের বলতে চাইছ না?

না।

কেন?

টর, তোমার একটা বিষয় বুঝতে হবে। তোমরা আমাকে তোমাদের দলপতি বানিয়েছ, এখন আমার উপর কিছু বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়েছে। শুধু আমাকে বেঁচে থাকলে হবে না। তোমাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সেজন্যে আমাকে কিছু বাড়তি কাজ করতে হয়ে। আমি সেটা করছি। যখন তোমাদের এটা জানার প্রয়োজন হবে আমি তোমাদের জানাব।

টর কিছু বলল না, ইহিতার কথাটা তার খুব পছন্দ হল বলে মনে হল না।

ছোট দলটি চারঘণ্টা হাঁটার পর ইহিতা বলল, আমরা এখন বিশ্রাম নেব।

নীহা বলল, তোমার এই অসাধারণ সিদ্ধান্তের জন্যে অনেক ধন্যবাদ ইহিতা। আমি ভেবেছিলাম তুমি আর কোনোদিন বুঝি একটু বিশ্রাম নেবার কথা বলবে না।

ইহিতা বলল, শক্তি থাকতে থাকতে আমি যতটুকু সম্ভব পথ অতিক্রম করে ফেলতে চাইছিলাম।

ক্লদ ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, টুরান এতোক্ষণ তাকে ট্রান্সপোর্টারে শুইয়ে এনেছে, এবারে তাকে নিচে শুইয়ে দিয়ে বলল, ভাগ্যিস মঙ্গল গ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল অনেক কম, তা নাহলে ক্লদকে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যেত।

সুহা টুরানের হাত স্পর্শ করে বলল, আমি যে তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না! কতোটুকু পথ ক্লদকে ট্রান্সপোর্টারে করে এনেছ!

টুরান পাথরে পা ছড়িয়ে বসে বলল, ধন্যবাদ দেবার তুমি আরো ভালো সুযোগ পাবে–এবারে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নেয়া যাক।

ইহিতা বলল, সবাইকে মনে করিয়ে দিই–এবার যখন রওনা দেব তখন কিন্তু আর থামাথামি নেই। রওনা দেবার আগে সবাই খানিকটা স্নায়ু-উত্তেজক পানীয় খেয়ে নিও। তাহলে খিদেও পাবে না, ক্লান্তও হবে না। ঘুমাতেও হবে না।

নীহা বলল, যখন রওনা দেব তখন সেটা দেখা যাবে। এই মুহূর্তে আমার ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমি একটু ঘুমাই যখন রওনা দেবে তখন ডেকে তুলো।

সুহা বলল, তুমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাও। তোমাকে দেখে আমার হিংসা হচ্ছে।

কেন? হিংসা হচ্ছে কেন?

এরকম একটা পরিবেশে যার ঘুম পায় তাকে দেখে হিংসা হতেই পারে!

নীহা চোখ বন্ধ করতে করতে বলল, তোমাকে কুগুরাভ সমস্যাটা শিখিয়ে দেব-তার সমাধানের কথা চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যাবার মতো আনন্দ আর কিছুতে নেই!

নীহা ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠল। টুরান ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করে বলল, নীহা! ওঠ।

নীহা ভয় পাওয়া গলায় বলল, কী হয়েছে?

প্রাণীগুলো আসছে। রেডিয়েশান মিটারে আমরা সিগন্যাল পাচ্ছি।

সর্বনাশ! এখন কী হবে?

ইহিতা বলল, যা হবার সেটাই হবে। ভয় পাবার কিছু নেই। অস্ত্রটা তৈরি রাখ।

নীহা অস্ত্রটা তাক করে গুড়ি মেরে বসে বলল, আমরা তো নড়ছি না, প্রাণীগুলো আমাদের দেখছে কেমন করে?

জানি না। মনে হয় বাইরের তাপমাত্রা কমে যাবার কারণে আমাদের স্পেসস্যুট থেকে অনেক বেশি তাপ বিকিরণ করছে।

নীহা কথা না বলে তার চোখের গগলসটি অতি বেগুনি রশ্মিতে সংবেদনশীল করে নিল, সাথে সাথে চারপাশের জগৎটা অন্য রকম দেখাতে থাকে, তার মাঝে সে দূরে প্রাণীগুলোকে দেখতে পেল। সেগুলো গুড়ি মেরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, খুব ধীরে ধীরে চারদিকে থেকে তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, আমি না বলা পর্যন্ত কেউ গুলি শুরু করবে না।

ঠিক আছে।

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল, দেখতে পেলো প্রাণীগুলো তাদের দিকে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে। রেডিয়েশন মিটারের কাটাটি নড়তে থাকে, প্রাণীগুলো থেকে চারপাশে তীব্র তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রাণীগুলো আরেকটু কাছে এগিয়ে এল, এখন তাদের চেহারাগুলো দেখা যেতে শুরু করেছে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল প্রাণীগুলো একরকম নয়, তাদের মাঝে গঠনগত একটা মিল আছে, সবগুলোরই সামনে বীভৎস ধারালো দাঁত, বড় মুখ। মুখটি কখনো শরীরের উপর, কখনো নিচে। অনেকগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। কখনো তাদের অতিকায় মাকড়শার মতো মনে হয়, কখনো ক্লেদাক্ত কীটের মতো মনে হয়।

প্রাণীগুলো আরেকটু এগিয়ে এল, তাদের হিংস্র গর্জন খুব ক্ষীণভাবে তারা শুনতে পায়। মাটিতে মৃদু কম্পন অনুভব করতে পারে।

যদিও কথা ছিল ইহিতা অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না, কিন্তু হঠাৎ করে টর প্রচণ্ড আক্রোশে গুলি করতে শুরু করল। সাথে সাথে যেন নরক নেমে আসে, প্রাণীগুলো ছুটে তাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সেগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে থাকে। কিন্তু তারপরেও সেগুলো থেমে যায় না–আরো ভয়ংকর আক্রোশে সেগুলো ছুটে আসতে থাকে। প্রাণীগুলোর ছিন্নভিন্ন দেহগুলোও গড়িয়ে গড়িয়ে পাথরে ঘষতে ঘষতে কাঁপতে কাঁপতে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে।

ইহিতা বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে একটা প্রাণীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার পরও তার প্রতিটি অংশ যদি আলাদাভাবে জীবিত থেকে যায় প্রতিটি অংশই যদি নিজের মতো করে তাদের আক্রমণ করতে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে তারা কেমন করে টিকে থাকবে?

ইহিতা তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে কয়েকবার গুলি করে প্রাণীগুলোকে খানিকটা দূরে সরিয়ে দিল। তারপর দ্রুত তার পকেট থেকে রিমোট কন্ট্রোলটা বের করে। পথের মাঝখানে সে একটা সনিক চার্জার বসিয়ে এসেছে, সেটা ব্যবহার করা যায় কীনা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।

রিমোট কন্ট্রোলের প্যানেলটি চোখের সামনে ধরে সে দ্রুত তার রেটিনা স্ক্যানিং করে নিয়ে বোতামগুলো স্পর্শ করে। প্রায় সাথে সাথেই সে একটা কম্পন এবং একটু পর বিস্ফোরণের চাপা শব্দ শুনতে পেল। ইহিতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ক্ষ্যাপা প্রাণীগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল এবং হঠাৎ করে তার মনে হল প্রাণীগুলোর মাঝে এক ধরনের নতুন চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।

ইহিতা চিৎকার করে বলল, থামাও। গুলি থামাও! সবাই গুলি থামাও।

সবাই গুলি থামাল এবং দেখতে পেল হঠাৎ প্রাণীগুলো পিছনে ছুটে যেতে শুরু করেছে। ছুটে যাবার সময় প্রাণীগুলো তাদের শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশগুলো মুখে করে নিয়ে যেতে থাকে। শরীরের নানা অংশে সেগুলো ছুঁড়ে দিতে থাকে এবং সেগুলো শরীরে লেগে কিলবিল করে নড়তে থাকে।

ইহিতা রদ্ধশ্বাসে এই বিচিত্র দৃশ্যটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল, এখন গুলি করো না–প্রাণীগুলোকে চলে যেতে দাও।

নীহা কাঁপা গলায় বলল, কোথায় যাচ্ছে? আমি যেখানে সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছি সেখানে। কেন?

প্রথমবার যখন প্রাণীগুলো আমাদের দিকে ছুটে এসেছিল তখন হঠাৎ করে ছুটে চলে গিয়েছিল, মনে আছে?

মনে আছে।

আমি পরীক্ষা করে দেখেছিলাম–দূরে একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর খুব ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ ভেসে এসেছিল, ভূমিকম্পের বেলায় যেরকম হয়। তাই ভাবলাম-

কী ভাবলে?

প্রাণীগুলো ছোট কম্পনের শব্দ তরঙ্গ শুনতে পেলে সেদিকে নিশ্চয়ই ছুটে যায়। তাই পথে একটা সনিক চার্জার লাগিয়ে এসেছিলাম। এখান থেকে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে সেটা বিস্ফোরণ করিয়েছি। আসলেই প্রাণীগুলো সেদিকে ছুটে গেছে।

কেন? কেন ছুটে যায়?

এখনো জানি না, কিন্তু সেটা নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে। আমাদের এক্ষুণি রওনা দিতে হবে। আমাদের কাছে আর সনিক চার্জার নেই, প্রাণীগুলো আবার আক্রমণ করলে আর ফেরাতে পারব না। এক্ষুণি রওনা দিতে হবে।

টুরান বলল, তাছাড়াও এই তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো থেকে অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ বের হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয়।

নীহা বলল, হ্যাঁ চল রওনা দিই। ট্রান্সপোর্টারে করে আমি ক্লদকে নিতে পারি।

ক্লদ মাথা নাড়ল, বলল, না। আমি ট্রান্সপোর্টারে যাব না। আমি হেঁটে যাব।

নীহা মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে।

ইহিতা টরের দিকে তাকিয়ে বলল, আর টর, শোনো।

বল।

আমি কিন্তু বলেছিলাম আমি নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ গুলি করবে না। তুমি আমার নির্দেশ শোনো নি। তুমি আগেই গুলি শুরু করেছ।

টর থতমত খেয়ে বলল, আমি দুঃখিত।

ইহিতা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার কেন জানি মনে হয় তুমি আসলে সেরকম দুঃখিত নও। কিন্তু শুনে রাখ–

কী?

মানুষের আবাসস্থলে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমি তোমাদের দলপতি। তোমাদের আমার কথা শুনতে হবে। এটা একটা আদেশ। মনে থাকবে?

মনে থাকবে।

যদি মনে থাকে তাহলে আমাকে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। ঠিক আছে?

টর পাথরের মতো মুখ করে বলল, ঠিক আছে।

সাতজনের ছোট দলটা তখন মঙ্গলগ্রহের রুক্ষ পাথরের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকে। তাদের হাঁটার গতি দ্রুত। যেভাবে হোক তারা মানুষের আবাসস্থলে পৌঁছাতে চায়।

সাতজনের ছোট দলটি যখন মানুষের আবাসস্থলের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন সূর্যটি বেশ উপরে ওঠে গেছে। সূর্যের ম্লান আলোতে মঙ্গলগ্রহের বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে কেমন যেন নিঃসঙ্গ দেখায়। টর বলল, আমার মনে হয় আমরা শেষ পর্যন্ত আবাসস্থলে পৌঁছে গেছি।

নীহা বলল, হ্যাঁ। আরো কয়েকদিনের জন্যে বেঁচে থাকার সুযোগ হল।

টর বলল, ব্যাপারটা ভালো হল কি না বুঝতে পারছি না!

নীহা বলল, জীবন কখনো খারাপ হতে পারে না। জীবন সবসময়ই ভালো।

কে বলেছে? সুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সবকিছু অন্যরকমও হতে পারে।

হলেও আর কতোটুকু হবে?

অনেকখানি হতে পারে।

নীহা ভুরু কুঁচকে বলল, কীভাবে?

সুহা বলল, কাছে এসো দেখাচ্ছি।

নীহা দুই পা এগিয়ে সুহার কাছে যেতেই সে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা নীহার মাথায় ধরল। মুহর্তে সুহার চেহারাটি একটি হিংস্র মানবীতে পাল্টে গেল। সে হিসহিস করে বলল, সবাই তোমাদের হাতের অস্ত্র নিচে ফেলে দুই হাত উপরে তুলে দাঁড়াও। এক সেকেন্ড দেরি করলে এই নির্বোধ মেয়েটার খুলি ফুটো হয়ে যাবে।

সবাই হতবাক হয়ে সুহার দিকে তাকিয়ে থাকে। সুহা প্রায় যান্ত্রিক গলায় বলল, এখনো যদি না বুঝে থাক তাহলে পরিষ্কার করে বলে দিই। আমি দুজন রবোমানবের একজন।

টুরান কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, আরেকজন কে?

ক্লদ বলল, আমি।

সবাই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল, তুমি!

হ্যাঁ আমি। বলে ক্লদ এগিয়ে নীহার হাত থেকে হ্যাচকা টান মেরে তার অস্ত্রটা নিয়ে নেয়।

সুহা সবার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল, আমি তোমাদের সাথে খোশগল্প করার জন্যে আসি নি। হাতের অস্ত্র নিচে ফেল।

টর ইহিতাকে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা, কী করব? তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে এই ডাইনিবুড়িকে শেষ করে দিই।

তাহলে অন্যদের কথা জানি না কিন্তু নিশ্চিতভাবে নীহাকে হারাব।

সুহা চিষ্কার করে বলল, বাজে কথা বল না। অস্ত্র ফেল, তা না হলে এই মুহূর্তে এর খুলি উড়িয়ে দেব।

ইহিতা এক পা এগিয়ে এসে বলল, আমার মনে হয় না তুমি এই মুহূর্তে সেটা করবে। তুমি রবোমানব হতে পার কিন্তু রবোট নওনীহার মাথায় গুলি করা মাত্রই আমাদের চারজনের অস্ত্র তোমাকে ঝাঁঝরা করে দেবে! কাজেই তুমি এতো সহজে গুলি করবে না।

তুমি রবোমানবকে চেনো না। রবোমানবের ভেতরে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা নেই

শব্দটা দুর্বলতা নয়। শব্দটা হচ্ছে মানবিক মায়া মমতা-

সুহা হিস হিস করে বলল, অর্থহীন কথা বলে সময় নষ্ট কর না। তোমাদের মানবিক মায়ামমতা দুর্বলতা কি না সেটা এই মুহূর্তে প্রমাণিত হবে! তোমাদের নিজেদের রক্ষা করার একটি মাত্র উপায়-সেটি হচ্ছে আমাকে গুলি করা। করো গুলি। চিৎকার করে বলল, করো।

নীহা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

সুহা হিংস্র ভঙ্গিতে বলল, করতে পারবে না। কাজেই সময় নষ্ট করো না। হাতের অস্ত্র ফেলে দাও।

ইহিতা অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, সে ঠিকই বলেছে। আমাদের আর কিছু করার নেই–হাতের অস্ত্র ফেলে দিতে হবে।

টর বলল, কিন্তু এই ডাইনি বুড়ি তাহলে সাথে সাথে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।

সম্ভবত। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই, অন্তত নীহা জানবে আমরা আমাদের নিজেদের বাঁচানোর জন্যে তাকে মারা যেতে দিই নি।

টর কাঁপা গলায় বলল, তুমি আমাদের দলপতি, তুমি যেটাই বলবে আমি সেটাই শুনব। আমরা কি শেষ চেষ্টা করব না?

ইহিতা বলল, ক্লদের দিকে তাকাও। দেখো সে কীভাবে অস্ত্রটা তোমার দিকে তাক করে ধরেছে। সম্ভবত সে তোমাকে গুলি করবে, কিন্তু তুমি কি পারবে এই চার বছরের শিশুটাকে গুলি করে মারতে?

টর মাথা নাড়ল, বলল, না।

আমি জানি তুমি আমি কেউ পারব না। আমরা মানুষ সেই জন্যে এখানে এই মুহূর্তে হয়তো সবাই মারা যাব। কিন্তু জেনে রাখো যে কারণে আমরা সবাই এখানে মারা যাব ঠিক সেই কারণে পৃথিবীর অসংখ্য জায়গায় অসংখ্য মানুষ একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখবে।

সুহা চিৎকার করে বলল, অস্ত্র ফেল।

টর ইহিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ইহিতা। তুমি আমাদের দলপতি। তুমি বল, অস্ত্র ফেলব?

আমি খুবই দুঃখিত টর, কিন্তু আমাদের অস্ত্র ফেলতে হবে।

টর হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। ইহিতা আর টুরান তাদের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলল। নুট তার হাতের অস্ত্র তুলে বলল। আমি আমার হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলার আগে একটি কথা বলতে পারি?

কী কথা?

নুট একটু এগিয়ে এসে বলল, মনে আছে আমি বলেছিলাম আমি জানি আমাদের ভেতরে কোন দুজন রবোমানব? তোমরা কী বিশ্বাস কর আমি সেটা জানতাম?

সুহা মাথা নাড়ল, বলল, অসম্ভব। আমরা পুরো সময় নির্বোধ মানুষের মতো অভিনয় করে গেছি।

নুট এক হাতে তার অস্ত্রটি ধরে রেখেছিল, অন্য হাতটি উপরে তুলে দেখিয়ে বলল, এটা কী দেখেছ?

একটা লিভার।

হ্যাঁ। এই লিভারটি ছেড়ে দিলে কী হবে জান?

কী হবে?

এটা খুব ছোট একটা বিস্ফোরক ডেটোনেট করবে। বিস্ফোরকটা কোথায় আছে জানতে চাও?

সুহা হিংস্র মুখে জিজ্ঞেস করল, কোথায়?

তোমার ছেলে ক্লদের শরীরে!

মিথ্যা কথা!

তোমার মনে আছে, ক্লদকে স্পেসস্যুট পরাতে কে সাহায্য করেছিল? আমি। কেন আমি এতো ব্যস্ত হয়ে তাকে সাহায্য করেছিলাম? ছোট্ট এই বিস্ফোরকটি রাখার জন্যে!

তুমি মিথ্যা কথা বলছ!

ঠিক আছে! নুট হাতের অস্ত্রটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, পরীক্ষা হয়ে যাক! আমাকে গুলি কর। আমার হাত থেকে লিভারটি মুক্ত করিয়ে দাও।

ক্লদ চিৎকার করে বলল, না! না! সুহা, গুলি করো না।

নুট হা হা করে হেসে বলল, আমি কম কথা বলি, তাই অনেক বেশি চিন্তা করি। চিন্তা করে করে সব কিছু বের করে ফেলা যায়। আরো একটা জিনিস জান?

কী?

আমাকে মানুষের এই দলটাতে কেন রেখেছে জান?

কেন?

আমার একটা অপরাধী মন আছে-যেটা এখানে আর কারো নেই। আমি অপরাধীর মতো চিন্তা করতে পারি-যেটা তোমাদের মতো রবোমানবদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। নুট আবার হাসার চেষ্টা করে বলল, সুহা! নির্বোধ রবোমানব, তুমি কী লক্ষ করেছ, আমি সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। অন্যদের আড়াল করে ফেলেছি। তুমি আমাকে গুলি না করে অন্যদের গুলি করতে পারবে না।

সুহা কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নুটের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরে ক্লদের দিকে তাকাল, বলল, ক্লদ তুমি নিচ থেকে সবগুলো অস্ত্র তুলে নিয়ে এস।

ক্লদ বলল, কেন?

আমার সাথে তর্ক করবে না, নিয়ে এস?

ক্লদ নিচে পড়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে নিয়ে আসে। সুহা তখন ধাক্কা দিয়ে নীহাকে সরিয়ে দিল, তারপর ক্লদকে বলল, অস্ত্রগুলো দাও।

ক্লদ জিজ্ঞেস করল, কেন?

তুমি এতোগুলো রাখতে পারবে না সেজন্যে।

ক্লদ বলল, অস্ত্রগুলো ভারী না, তাছাড়া মঙ্গলগ্রহে মাধ্যাকর্ষণ বল খুব কম। আমি এগুলো রাখতে পারব।

বাজে তর্ক করো না। অস্ত্রগুলো দাও আমার হাতে।

ক্লদ তার শিশুসুলভ কণ্ঠে কিন্তু একজন বড় মানুষের ভাষায় বলল, সব অস্ত্র তোমার হাতে থাকলে তোমার কাছ থেকে আমাকে নিরাপত্তা কে দেবে! তা ছাড়া-

তা ছাড়া কী?

কথা ছিল আমি এখন প্রথম মানুষ হত্যা করব। তুমি আমাকে এখনো হত্যা করতে দিচ্ছ না।

ক্লদ! নির্বোধের মতো আচরণ করো না! দেখতে পাচ্ছ না এই অপরাধীটা দাবি করছে তোমার জীবন তার হাতে? যতক্ষণ পরীক্ষা করে সেটা নিশ্চিত না হতে পারছি ততক্ষণ তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

ক্লদ চিৎকার করে বলল, তুমি বলেছিলে তুমি নিখুঁত পরিকল্পনা করেছ, এখানে দেখা যাচ্ছে তোমার পরিকল্পনায় শুধু ভুল আর ভুল! তুমি বলেছিলে মানুষ হচ্ছে নির্বোধ! এখন দেখা যাচ্ছে তুমি মানুষ থেকেও নির্বোধ?।

সুহা ধমক দিয়ে বলল, বাজে কথা বলো না। আমার পরিকল্পনা নিখুঁত।

তাহলে কেন এখনো আমি একটা মানুষকে হত্যা করতে পারছি না!

পারবে। সময় হলেই পারবে।

কখন সময় হবে?

সুহা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রেডিয়েশান মনিটরের দিকে তাকাল। সেখানে আবার তেজস্ক্রিয়তার চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। সে ভুরু কুঁচকে বলল। প্রাণীগুলো আবার আসছে।

ক্লদ জিজ্ঞেস করল, আমরা এখন কী করব?

তুমি ছুটে যাও আবাসস্থলের দিকে। অস্ত্রগুলো রেখে যাও।

না। আমি অস্ত্র নিয়ে যাব। বলে সে দুই হাতে কোনোভাবে অস্ত্রগুলো ধরে আবাসস্থলের দিকে ছুটতে থাকে।

নুট শব্দ করে হাসল, বলল, আমি তোমাকে যতই দেখছি—ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি! তুমি কী সত্যিই ক্লদকে জন্ম দিয়েছিলে?

হ্যাঁ দিয়েছিলাম। তাতে কী হয়েছে?

মা হয়ে তুমি যেভাবে তোমার নিজের সন্তানকে হত্যা করার ব্যবস্থা করলে। আমি সেটা দেখে মুগ্ধ হয়েছি সুহা। এখন তুমি আমাদের হত্যা করবে তখন আমার হাতের লিভারটি ছুটে যাবে সাথে সাথে ক্লদের শরীরের ভেতর বিস্ফোরক বিস্ফোরিত হবে–তুমি নিশ্চিত করলে তখন যেন সে তোমার কাছ থেকে দূরে থাকে! তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

এর ভেতরে কোন বিষয়টি অযৌক্তিক? একটা অবাধ্য শিশুর হাতে যখন অস্ত্র ওঠে যায় সে কতো বিপজ্জনক তুমি জান?

জানি। নুট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ক্লদ ছুটে অনেকদূর চলে গিয়েছে তাই তোমার মনে ধারণা হয়েছে সে তোমার কথা শুনতে পারছে না। তুমি ভুলে গেছো আমাদের হেলমেটের মাঝে কমিউনিকেশান মডিউল লাগানোএকশ কিলোমিটার দূর থেকেও কথা শোনা যায়। ক্লদ তোমার কথাগুলো শুনেছে। তার হাতে একটি নয় দুটি নয় চার-চারটি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সে ফিরে আসছে–তোমার কী মনে হয় চার বছরের একটা শিশুর সাথে তুমি বোঝাপাড়া করতে পারবে?।

সুহা চমকে পিছনে তাকাল, তার গলা থেকে একটা হিংস্র শ্বাপদের মতো শব্দ বের হয়ে এলো। সে তার অস্ত্রটি শক্ত হাতে ধরে পায়ে পায়ে ক্লদের দিকে এগুতে থাকে। সবাই বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে, চার বছরের একটা শিশুও হাতে একটা অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে, দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি একটা খেলনা ধরে রেখেছে। কিন্তু এটা মোটেও খেলনা নয়-এটা ভয়ংকর একটা অস্ত্র!

সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। একটা মা আর তার শিশু সন্তান একজন আরেকজনের দিকে উদ্যত অস্ত্র হাতে এগিয়ে যাচ্ছে-একজন আরেকজন হত্যা করতে চায়। কী ভয়ংকর একটি দৃশ্য–এর চাইতে ভয়াবহ, এর চাইতে নিষ্ঠুর কোনো কিছু কি হওয়া সম্ভব?

নুট নীহা টর টুরান আর ইহিতা নিঃশ্বাস বন্ধ করে সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।

মঙ্গল গ্রহের লাল পাথরে পাশাপাশি পড়ে থাকা সুহা আর ক্লদের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থেকে ইহিতা বলল, আমি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না এটি সম্ভব।

নীহা বলল, আমি নিজের চোখে দেখেও এটা বিশ্বাস করতে পারছি না।

টর নুটের দিকে তাকালে, জিজ্ঞেস করল, তোমার হাতের লিভারটি কী আসলেই বিস্ফোরকের সাথে জুড়ে দেয়া, নাকি পুরোটি একটি ধোঁকা?

নুট মাথা নাড়ল, বলল, না। এটা ধোকা না। এটা সত্যি। আমি জানতাম এরা দুজন রবোমানব।

ক্লদের শরীরে সত্যি বিস্ফোরক লাগানো আছে?

হ্যাঁ। ছোট বিস্ফোরক। এই দেখ–সে নিচু হয়ে ক্লদের ছিন্নভিন্ন স্পেসস্যুটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোট একটা বিস্ফোরকের গোলক বের করে আনে। সেটি দূরে ছুঁড়ে দিয়ে নুট তার লিভারটি ছেড়ে দিতেই দূরের বিস্ফোরকটি বিস্ফোরিত হল।

টর নুটের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে স্বীকার করতেই হবে তুমি অসাধারণ। আমি কখনোই এই দুজনকে রবোমানব হিসেবে সন্দেহ করতে পারতাম না।

নুট কোনো কথা বলল না, অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। ইহিতা বলল, রেডিয়েশান মনিটরে রিডিং দিতে শুরু করেছে। প্রাণীগুলো আবার আসছে। আমাদের আবাসস্থলের ভেতর ঢুকে যাওয়া দরকার। চল যাই।

টুরান জিজ্ঞেস করল, মৃতদেহ দুটি?

এই মুহূর্তে কিছু করার নেই। পরে যদি সুযোগ পাই সমাহিত করে দেব।

লাল পাথরের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্রগুলো তুলে পাঁচজন দ্রুত আবাসস্থলের দিকে যেতে থাকে প্রাণীগুলো আসার আগে তারা ভেতরে ঢুকে যেতে চায়।

আবাসস্থলের ভেতরটা খুব সাজানো গোছানো। মানুষজন থাকার জন্যে পরিপাটি ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাতাসের তাপ চাপ রক্ষা করা আছে বলে তারা স্পেসস্যুট খুলে বসেছে। শুধু তাই নয় তারা সত্যিকারের খাবারের প্যাকেট বের করে সেগুলো গরম করে ধূমায়িত কফির সাথে বসে বসে খেয়েছে। গত ছত্রিশ ঘণ্টার উত্তেজনা শেষে হঠাৎ করে একটা নিশ্চিন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকতে পেরে তাদের মাঝে এক ধরনের আলস্য ভর করেছে।

কফির মগে চুমুক দিয়ে টুরান বলল, আমরা কী তাহলে এখন আমাদের মহাকাশযানে ফিরে যেতে পারি?

ইহিতা বলল, নিশ্চয়ই পারি। এখন আমাদের মাঝে কোনো রোমানব নেই। আমরা নিশ্চয়ই মহাকাশযানে ফিরে যাব।

টর বলল, তোমরা যা ইচ্ছে তাই বলতে পার–আমি কিন্তু তোমাদের পরিষ্কার করে একটা কথা বলতে চাই

কী কথা? মহাকাশযানে গিয়ে আমি ট্রিনিটিকে নিজ হাতে খুন করব!

ইহিতা শব্দ করে হাসল, বলল, তুমি কীভাবে সেটা কর, আমি সেটা দেখতে চাই।

নীহা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু আমরা এখন মহাকাশযানে ফেরত যাব কেমন করে?

টুরান বলল, আমরা ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করব, ট্রিনিটি কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। একটা স্কাউটশিপ পাঠাবে এখানে বা সেরকম কিছু একটা করবে।

তাহলে ট্রিনিটির সাথে যোগাযোগ করতে হবে?

হ্যাঁ।

কেমন করে করব?

এই আবাসস্থলাটাতে অনেক ভালো কমিউনিকেশন্স মডিউল থাকার কথাএসো খুঁজে বের করি।

নীহা আর টুরান মিলে আবাসস্থলে কমিউনিকেশন্স মডিউল খুঁজতে থাকে, আবাসস্থলের দোতলাতে সেটা পেয়ে গেল। টুরান কয়েকটা সুইচ স্পর্শ করে বলল, কী আশ্চর্য! দেখেছ, আমাদের জন্যে এখানে ম্যাসেজ রাখা আছে?

কী ম্যাসেজ?

এখনো জানি না। টুরান আরেকটা বোতাম চাপ দিতেই সামনে একটা আলোর ঝলকানি দেখা গেল, তারপর ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি বলছি। স্কাউটশিপে করে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া মহাকাশচারীদের সাথে যোগাযোগ করতে চাই। জরুরি। আবার বলছি, স্কাউটশিপে করে…।

নীহা বলল, আমি সবাইকে ডেকে আনি। সবাই মিলে শুনি ট্রিনিটি কী বলে।

যাও ডেকে আনো।

কিছুক্ষণের মাঝেই সবাই ওপরে কমিউনিকেশন মউিডলের কাছে চলে এলো। টুরান তখন যোগাযোগের চ্যানেলটি চালু করে। সাথে সাথে ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, আমি ট্রিনিটি, মহাকাশযান থেকে তোমাদের সবার জন্যে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

টর বলল, বাজে কথা বলল না। মানুষকে শুভেচ্ছা জানানোর মতো বুদ্ধিমত্তা তোমার নেই।

আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত—

টর মাঝপথে থামিয়ে বলল, আমি তোমাকে বলেছি, তুমি বাজে কথা বলবে। আমাদেরকে ভয়ংকর বিপদের মাঝে ঠেলে দিয়ে বলছ তুমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত? তুমি জান অন্তর মানে কী? বেজন্ম কোথাকার!

ট্রিনিটি হাসির মতো শব্দ করে বলল, টর, আমি তোমার ক্ষোভটুকু পরিষ্কার বুঝতে পারছি। তবে তোমাকে দুটি ব্যাপার বুঝতে হবে। প্রথমত আমি যেটা করেছি সেটা না করে আমার উপায় ছিল না। খুব সোজা ভাষায় যদি বলতে হয় তাহলে বলা যায়, আমি একটা কম্পিউটার, আমাকে যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছে আমাকে ঠিক সেভাবে কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, তুমি যখন আমার ওপর রেগে যাও কিংবা রেগে গালাগাল কর আমি কিন্তু সেগুলো বুঝি না! তুমি যথার্থই বলেছ, আমার সেগুলো বোঝার ক্ষমতা নেই।

টুরান বলল, ঠিক আছে। ঠিক আছে! তুমি কী বলার জন্যে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছ সেটা বলে ফেল।

ট্রিনিটি বলল, পৃথিবী থেকে তোমাদের সাথে খুব জরুরিভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইহিতা অবাক হয়ে বলল, পৃথিবী থেকে? আমাদের সাথে?

হ্যাঁ।

কে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে?

আমার জানা নেই। গোপনীয় চ্যানেল। তোমরা যদি প্রস্তুত থাকো তাহলে আমি চ্যানেলটি তোমাদের জন্যে উন্মুক্ত করে দিই।

অবশ্যই। ইহিতা বলল, অবশ্যই উন্মুক্ত করে দাও।

সাথে সাথে ঘরের ভেতর কিছু আলোর বিচ্ছুরণ দেখা গেল কিছু যান্ত্রিক শব্দ ভেসে এলো এবং বেশ কয়েক মিনিট পর হঠাৎ করে ঘরের ঠিক মাঝখানে তারা বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি মহামান্য থুলকে দেখতে পেল। মহামান্য থুল একটা সবুজ ঘাসের লনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তারা শুনতে পেল মহামান্য থুল একটু ঘুরে তাদের দিকে বললেন, তোমাদের জন্যে শুভেচ্ছা। আমি খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে তোমাদের সাথে যোগাযোগ করছি।

নীহা চিৎকার করে বলল, মহামান্য গুল? আপনি?

নীহার কথাটি মহামান্য থুল সেই মুহূর্তে শুনতে পেলেন না। মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে তার কথাটি পৌঁছাতে কমপক্ষে পাঁচ মিনিট সময় নেবে, মহামান্য থুলের উত্তরটি ফিরে আসতে আরো পাঁচ মিনিট। নীহা এবং অন্যেরা শুনতে পেলো মহামান্য থুল ঠিক সেই কথাটিই বললেন, মুখোমুখি কথা বলার যে সুবিধেটুকু আছে সেটি এখন আমাদের মাঝে নেই, তোমাদের কথা আমার কাছে এবং আমার কথা তোমাদের কাছে পৌঁছানোর মাঝে বেশ অনেকখানি সময় নেবে। তোমরা কেমন আছ আমি জানি না। আমার জানা প্রয়োজন। আমি এখন চুপ করছি, তোমরা বল। কেমন আছ বল।

টুরান বলল, এর মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেছে। কোনো মানুষের জীবনে এতো অল্প সময়ে এতো কিছু ঘটতে পারে সেটা বিশ্বাসই হতে চায় না। মহামান্য থুল আপনি শুনে খুশি হবেন যে আমরা ভয়ংকর ভয়ংকর বিপদের মাঝে থেকেও রক্ষা পেয়েছি। কীভাবে সেটা ঘটেছে সেটা আপনাকে বলবে ইহিতা। আমরা ইহিতাকে আমাদের দলপতি তৈরি করেছি। ইহিতা একজন অসাধারণ-দলপতি, সে কীভাবে আমাদের রক্ষা করে এনেছে সেটি শুনলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন! টুরান ইহিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ইহিতা! তুমি বল।

ইহিতা একটু বিব্রত হয়ে বলল, আমি এমন কিছুই করি নি! তারপর সে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে মহাকাশযানে কী ঘটেছে এবং কীভাবে তারা শেষ পর্যন্ত এই নিরাপদ আবাসস্থলে আশ্রয় নিয়েছে সেটি বলল। তাদের ভেতরে যে দুজন রবোমানব আছে এবং সেই দুজন শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজেরাই নিজেদের হত্যা করেছে সেটি বলার সময় ইহিতার মুখে গভীর একটা বেদনায় ছাপ পড়ে।

ইহিতার কথা শেষ হবার পর প্রায় দশ মিনিট সময় পরে তারা মহামান্য থুলের কথা শুনতে পেল, মহামান্য থুল বললেন, পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মাইল দূরে একটা নির্জন গ্রহের ছোট একটা আবাসস্থলে তোমরা কোনো ভাবে নিজেদের রক্ষা করে বেঁচে আছ। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। সত্যি কথা বলতে কী শুধু আমি নই, পৃথিবীর মানুষ তোমাদের কাছে ঋণী থাকবে। তোমরা সবাই জান রবোমানবেরা কিছুক্ষণের মাঝেই পৃথিবীর নেটওয়ার্কটি দখল করে নেবে। দখল করার পর নিশ্চিতভাবেই তারা আমাকে এবং বিজ্ঞান আকাদেমীর সবাইকে হত্যা করতে আসবে। আমি সেটা নিয়ে খুব বেশি দুর্ভাবনা করছি না। তোমরা জান আমি দীর্ঘ একটি আনন্দময় জীবন কাটিয়েছি, আমি এখন খুব আনন্দের সাথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি। কিন্তু আমাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে রক্ষা করতে আমরা কি সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি? রবোমানব যখন নেটওয়ার্ক দখল করে এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি কমিউনিটি, প্রতিটি অস্ত্রাগার প্রতিটি যোগাযোগ ব্যবস্থা এক কথায় পুরো পৃথিবীর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে তখন পৃথিবীর মানুষ রবোমানবের হাতে ধ্বংস হয়ে যাবে?

মহামান্য থুল একটু থামলেন, অন্যমনস্কভাবে নিজের হাতের দিকে তাকালেন তারপর আবার মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালেন, তাকিয়ে বললেন, এর সঠিক উত্তর কেউ জানতো না। এখন আমি জানি। ভবিষ্যতে যে ভয়ংকর বিপদটি আসবে সেই বিপদের মাঝে মানুষ ভেঙে পড়বে না। তোমরা যেমন ভেঙে পড়নি। তারা নিজেদের মাঝে নেতৃত্ব তৈরি করে নেবে। সেই নেতৃত্বকে মেনে নিয়ে তারা একে অন্যকে সাহায্য করবে। ঠিক যেরকম তোমরা করেছ। আর ঠিক তখন যদি আমরা রবোমানবকেও একই ধরনের বিপদের মাঝে ফেলতে পারি তখন তারা হবে ভয়ংকর রকম স্বার্থপর, তারা হবে হিংস্র, তারা হবে নিষ্ঠুর, তারা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একে অন্যকে হত্যা করবে। ঠিক এখানে যেরকম করেছে।

মহামান্য থুল একটু হাসির মতো ভঙ্গি করলেন, তোমাদের প্রতি পৃথিবীর মানুষের কৃতজ্ঞতা! তোমাদের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পেয়েছি। আমাদের কী করতে হবে সেটা নিয়ে আমি একটু ভাবনার মাঝে ছিলাম, আমার ভাবনা দূর হয়েছে।

মহামান্য থুলের কথা শেষ হবার আগেই সবাই প্রায় এক সাথে চিৎকার করে উঠল, কিন্তু আপনার কী হবে? আপনার কী হবে?

তারা সেই প্রশ্নের উত্তর পেল না, প্রশ্নটি মঙ্গলগ্রহ থেকে পৃথিবীতে গিয়ে সেখান থেকে আর ফিরে এলো না, তার কারণ ততক্ষণে সেখানে একটি মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেছে।
লাল চুলের মেয়েটি টেবিলে কাচের জারে তরলের মাঝে ড়ুবিয়ে রাখা থলথলে মস্তিষ্কটির দিকে একধরনের বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে রইল তারপর খুট করে সুইচটাতে চাপ দিয়ে মাইক্রোফোন অন করে বলল, এই, তুমি কী জেগে আছ?

স্পিকারে একটা ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল, জেগে আছি।

আমার হয়েছে মুশকিল, কাচের জারে তোমাকে-তার মানে এই থলথলে মস্তিষ্কটা দেখতেই কেমন জানি গা ঘিনঘিন করে, আবার একটু কথা না বললে ভালোও লাগে না।

তোমার কাছে আমার অনুরোধ তুমি আমাকে ধ্বংস করে দাও! আমার এই অস্তিত্ব যে কী ভয়ংকর তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।

লাল চুলের মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, কে বলেছে কল্পনা করতে পারি না। অবশ্যই পারি! কল্পনা করতে পারি বলেই তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখছি। তুমি হচ্ছ আমার সবচেয়ে বড় বিনোদন।

স্পিকার থেকে কাতর একটি কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, দোহাই তোমার! দোহাই আমাকে আর কষ্ট দিও না। আমাকে শেষ করে দাও।

বাজে কথা বলো না, তার চাইতে আমি তোমাকে কী বলতে এসেছি সেটা শোনো! আর কিছুক্ষণের মাঝেই পুরো নেটওয়ার্কটি আমরা দখল করে নেব। সাথে সাথে আমরা বের হব–সারাজীবন যেটা করতে পারিনি তখন সেটা করতে পারব–প্রকাশ্যে আমরা অস্ত্র নিয়ে বের হব। সবচেয়ে প্রথম কী করব তোমাকে তো বলেছি, বলেছি না?

লাল চুলের মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল, বলে থাকলেও আবার বলি। আনন্দের কথা অনেকবার শোনা যায়! মেয়েটি হাসি থামিয়ে বলল, সবার আগে হত্যা করব তোমাদের থুথুড়ে বুড়ো হতভাগা থুলকে! তার বাসভবন এরই মাঝে ঘিরে ফেলা হয়েছে। গ্রিন সিগনেল পেলেই আমরা অস্ত্র হাতে ঢুকে যাব!

স্পিকার থেকে হাহাকারের মতো শব্দ ভেসে আসে, না! না!

হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমাদের সবার হাতে থাকবে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। তোমার খুলি কেটে আমি তোমাকে বের করে এনেছিলাম বলে আমাকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। থুলকে প্রথম গুলিটি করার সুযোগ দেয়া হবে আমাকে! বুঝেছ? আমাকে!

একটা অসহায় যন্ত্রণার শব্দ শোনা গেল। লাল চুলের মেয়েটি সেই যন্ত্রণার শব্দটি উপভোগ করতে করতে বলল, পুরো ব্যাপারটা খুব গোপনীয়। কেউ কারো কাছে সেটা বলতে পারছে না। শুধু আমি তোমাকে বলতে পারছি! মেয়েটি আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে।

হাসির শব্দটি যে একটি অসহায় মস্তিষ্কের নিউরনে দীর্ঘসময় বিচ্ছুরিত হতে থাকল সেই কথাটি কেউ জানতে পারল না।
দরজা ভেঙে বারোজন রোমানব মহামান্য থুলের বাসভবনে ঢুকে পড়ল। তারা সবাই জানে এই সময়টিতে তিনি বাসার পিছনে নরম ঘাসের ওপর একটি হেলান দেয়া চেয়ারে বসে দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। রবোমানবগুলো তার বাসভবনের ভেতর দিয়ে ছুটে পিছনে চলে আসে, তাদের ধারণা সত্যি। মহামান্য থুল সত্যি সত্যিই একটা হেলান চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। রবোমানবের পায়ের শব্দ শুনে তিনি ঘুরে তাকালেন। তার মুখে কোনো ভয় বা আতংকের ছাপ। পড়ল না। শুধুমাত্র একটু বিস্ময়ের ছাপ উঁকি দিয়ে গেল।

রবোমানবের এই ছোট দলটির দলপতি, নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে মহামান্য থুলের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, থুল! তোমার খেলা শেষ।

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, আমি আমার দায়িত্বটিকে কখনো খেলা হিসেবে নিই নি।

মানুষটি ধমকের সুরে বলল, আমি তোমার সাথে কথার মারপ্যাচ পরীক্ষা করতে আসি নি। আমি কেন এসেছি সেটা তুমি খুব ভালো করে জান। আমি কী বলছি সেটা আরো ভালো করে জান!

থুল মাথা নাড়লেন। বললেন, হ্যাঁ। জানি। বেশ ভালো ভাবেই জানি। তারপরও তোমার মুখ থেকে শোনার একটু আগ্রহ হচ্ছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, অন্য কোনো সময় হলে আমি তোমার সাথে এই আলোচনার যেতাম না। কিন্তু আজকে-শুধু আজকে বলে আমি তোমার সাথে কথা বলছি। আজকে আমার মনটা আনন্দে ভরপুর।

মহামান্য থুল বললেন, আমি শুনি তোমার কথা।

আমরা রবোমানবেরা পৃথিবীটা দখল করে নিয়েছি।

পৃথিবী? মহামান্য থুল ভুরু কুঁচকালেন। পৃথিবী তো অনেক বড় ব্যাপার। এক সময় সাত বিলিয়ন মানুষ ছিল। এখন সেটাকে কমিয়ে আমরা দুই বিলিয়নে নামিয়ে এনেছি। দুই বিলিয়ন মানুষের পৃথিবী কেমন করে কেউ দখল করে?

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, নির্বোধের মতো কথা বলো না! তুমি খুব ভালো করে জান এখন পৃথিবী দখল করার জন্যে পৃথিবীর মাঠে ঘাটে দৌড়াতে হয় না। পুরো পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে নেটওয়ার্ক, কাজেই শুধু নেটওয়ার্ককে দখল করতে হয়!

সেটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হা হা করে হাসল। বলল, আমরা সেই অসম্ভব। কাজটি করেছি। আমরা নেটওয়ার্কটি দখল করেছি। কাজটি খুব সহজ ছিল না, একদিনেও আমরা এটা করি নি, ধীরে ধীরে করেছি। নির্বোধ মানুষের ভেতর একজন একজন করে রবোমানব ঢুকিয়েছি, তারা খানিকটা করে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্য রবোমানব ঢুকিয়েছে। একটু একটু করে আমরা তোমাদের নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি। এখন এটা আমাদের নেটওয়ার্ক! এই পৃথিবীর দুই বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে আমরা নিয়ন্ত্রণ করব। তাদের জীবন-মরণ এখন আমাদের হাতে!

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, কাজটা খুব বুদ্ধিমানের হয় নি। কোন কাজটা?

এই যে একটা নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে সেবা দেয়া। তুমি কিছু মনে করো না, নেটওয়ার্কটা কিন্তু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তৈরি হয় নি। সাহায্য করার জন্য তৈরি হয়েছে। তবে তুমি ঠিকই অনুমান করেছ। মানুষের দৈনন্দিন সব কাজই নেটওয়ার্ক দিয়ে করতে হয়, তাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তাদের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

হ্যাঁ। তুমি ব্যাপারটা বুঝেছ! আমরা যদি কোনো বাবা-মাকে বলি আমাদের কথা না শুনলে তোমার চার বছরের বাচ্চাটার রক্তের তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যাবে তাহলে কোন বাবা-মা আমাদের অবাধ্য হবে? আর নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে থাকলে রক্তে তেজস্ক্রিয় দেয়া পানির মতো সহজ। স্কুলের লাঞ্চের প্যাকেট পর্যন্ত নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণে।

মহামান্য থুলকে কেমন যেন বিষণ্ণ দেখাল। তিনি একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার সাথে কথা বলে আমার মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি একটু এগিয়ে এসে বলল, বুড়ো তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই। তোমার মন খারাপের অনুভূতি দূর করার জন্যে আমরা এসেছি!

আমাকে হত্যা করার কথা বলছ?

হ্যাঁ। শুধু তোমাকে না, এই মুহূর্তে বিজ্ঞান আকাদেমীর এগারোজন সদস্যকেই হত্যা করা হচ্ছে। তোমাকে দিয়ে শুরু করব। তোমাকে নিজের হাতে হত্যা করার জন্যে সবাই আগ্রহী, আমি অনেক বেছে এই মেয়েটিকে সুযোগ দিয়েছি।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেই লাল চুলের মেয়েটি হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এল। থুল কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, আমার ঠিক তোমার বয়সী একটা মেয়ে আছে।

আমার তোমার বয়সী বাবা নেই।

তুমি আমাকে হত্যা করবে?

হ্যাঁ।

আমার গুলি করতে খুব ভালো লাগে।

ঠিক আছে গুলি কর।

মেয়েটি তার অস্ত্রটি উপরে তুলতেই মহামান্য থুল হাত তুলে তাকে থামালেন বললেন, এক সেকেন্ড।।

কী হয়েছে?

আমাকে হত্যা করার আগে আমি কি তোমাদের একটা কথা বলতে পারি?

কী কথা?

একটি নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো মানবজাতিকে একটা শৃঙ্খলার মাঝে আনার মাঝে একটা ঝুঁকি আছে সেটা যে আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কি তোমরা জান?

তুমি কী বলতে চাইছ?

তোমরা যে নেটওয়ার্কটি দখল করতে চাইবে সেটা আমরা অনুমান করেছিলাম সেটা কী তোমরা জান?

এটা একটা ছোট শিশুও অনুমান করতে পারবে।

কাজেই আমরা কী করেছি তোমরা জান?

কী করেছ?

নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দিয়েছি। এই মুহূর্তে সেটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির এক মুহূর্ত সময় লাগল কথাটি বুঝতে। যখন বুঝতে পারল তখন সে হা হা করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, বুড়ো ভাম কোথাকার! তুমি আমাকে বুদ্ধিহীন প্রতিবন্ধী ভেবেছ? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা সম্ভব না? সরাসরি নিউক্লিয়ার বোমা ফেলেও এটা ধ্বংস করা যায় না? ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ কক্ষ নেই, এটা বন্ধ করার কোনো সুইচ নেই! এর বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ করার কোনো উপায় নেই, মূল কেন্দ্রে মানুষ ঢোকার ব্যবস্থা নেই। ভূমিকম্প, সুনামি এর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! তুমি ভেবেছ আমি এসব জানি না? তুমি ভেবেছ আমি জানি না যে এটি অনেক জায়গায় এটি কপি করে রাখা আছে? তুমি ভেবেছ আমি তোমার এই অর্থহান প্রলাপ বিশ্বাস করব?

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, আমি একবারও সেটি ভাবি নি। আমি ভেবেছি তুমি আমার কথা শুনে খোঁজ নেবে আমি কী সত্যি কথা বলেছি নাকি মিথ্যে কথা বলে তোমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছি।

রবোমানবেরা তাদের হেডফোনে কিছু শোনার চেষ্টা করে, তাদেরকে হঠাৎ করে বিভ্রান্ত দেখা যায়, নিজেদের ভেতরে ফিসফিস করে কথা বলে তারপর নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির কাছে ছুটে আসে, চাপা গলায় বলে, আসলেই নেটওয়ার্ক থেকে কোনো তথ্য আসছে না।

মহামান্য থুল হাসলেন, বললেন, এটা কোনো কূট চাল নয়! তোমাদের বিভ্রান্ত করার কোনো কৌশল নয়। আসলেই নেটওয়ার্কটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি চিৎকার করে বলল, অসম্ভব!

নেটওয়ার্ক দখল করার মতো অসম্ভব একটা কাজ যদি তোমরা করতে পার, তাহলে সেটা ধ্বংস করার মতো আরেকটা অসম্ভব কাজ কেন আমরা করতে পারব না?

এটা কেউ করতে পারবে না–নিশ্চয়ই এখানে অন্য কিছু আছে।

অন্য কিছু নেই।

আছে। নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হিংস্র গলায় বলল, নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা অসম্ভব। স্বয়ং শয়তান এলেও পারবে না। আমি এক্ষুণি বের করছি আসলে কী হয়েছে। মানুষটি তার পকেট থেকে ছোট কমিউনিকেশন মডিউল বের করে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। সে হতবাক হয়ে আবিষ্কার করে সেটি নীরব হয়ে আছে। সে বোতামগুলো স্পর্শ করল, কোনো লাভ হল না। তারপর সেটা ধরে সে ঝাঁকুনি দিল, দুই হাতে সেটাকে পাগলের মতো আঘাত করতে লাগল।

মহামান্য থুল বললেন, কোনো লাভ নেই। তুমি আমার কথা বিশ্বাস কর, পৃথিবীতে এখন কোনো নেটওয়ার্ক নেই। নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তোমরা যেন পৃথিবীর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পার সেজন্যে আমরা নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি!

অসম্ভব!

হ্যাঁ। প্রায় অসম্ভব। তারপরও করেছি। খুব বেশি জানাজানি হতে দেই নি, ধ্বংস করার দায়িত্বটি নিয়েছিলাম আমি! মহামান্য থুল একটু হাসলেন, এই প্রথম আমি কিছু একটা ধ্বংস করলাম!

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে, সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে, অসম্ভব! অসম্ভব! তুমি আমাকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছ। তোমাদের অন্য কোনো মতলব আছে! তোমরা খুব ভালো করে জান নেটওয়ার্ক। ধ্বংস হলে পুরো পৃথিবীর সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাবে! পুরো পৃথিবী অচল হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হচ্ছে মাথায় গুলি করার মতো।

মহামান্য থুল মাথা নাড়লেন, বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ! পুরো পৃথিবী এখন ওলট-পালট হয়ে যাবে! কোথাও কোনো তথ্য নেই, কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সমস্ত পৃথিবীতে এখন বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হবে! চরম বিশৃঙ্খলা!

তুমি বলতে চাইছ তুমি নিজের হাতে পৃথিবী ধ্বংস করছ?

মহামান্য থুল বাধা দিয়ে বললেন, আমি মোটেও পৃথিবী ধ্বংস করছি না। আমি শুধু নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করেছি। নেটওয়ার্ক! নেটওয়ার্ক ধ্বংসের কারণে পৃথিবী ধ্বংস হবে না—পৃথিবী অনেক বড় ব্যাপার। এতে অল্পে পৃথিবী ধ্বংস হয় না। বড়জোর বিশৃঙ্খলা হবে, হই চই হবে, ওলট-পালট হবে কিন্তু ধ্বংস মোটেও হবে না। তোমরা যেহেতু সব খবর রাখো, তোমরা নিশ্চয়ই জান খাদ্যশস্যের যেন কোনো অভাব না হয় সেজন্যে আমরা অনেকদিন থেকে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত খাবার মজুদ করেছি। ওষুধপত্র মজুদ করেছি, প্রয়োজনীয় রসদ মজুদ করেছি! কাজেই পৃথিবীর মানুষ প্রথম কয়েকদিন হই চই করবে, একটু বিশৃঙ্খল হবে তারপর নিজেরা নিজেদের নেতৃত্ব তৈরি করে নিজেদের দায়িত্ব নেবে! তোমরা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবে না।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি বিস্ফারিত চোখে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে রইল, সে এখনো তার কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষের চেহারায় নিষ্ঠুরতা সরে গিয়ে সেখানে এখন এক ধরনের আতংকের ছাপ পড়তে শুরু করেছে। সে তার শুকনো ঠোঁটকে জিভ দিয়ে ভিজিয়ে মাথা নেড়ে বলল, আমি তোমার একটি কথাও বিশ্বাস করি না।

মহামান্য থুল তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, না করলে নেই। তারপরও তোমাদের জানিয়ে রাখছি। আমার মনে হয় তোমাদের আরো একটা তথ্য জানিয়ে রাখা দরকার। মানুষের উপর যখন বড় বিপদ নেমে আসে তখন তারা একে অন্যের বিভেদ ভুলে যায়, তারা তখন এক সাথে কাজ করে। তার কারণ হচ্ছে মানুষের সভ্যতার জন্মই হয়েছে একজনের জন্যে অন্যের মমতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে। রবোমানবেরা তাদের ভেতর থেকে মমতা আর ভালোবাসা তুলে দিয়েছে। তাই রবোমানবেরা যখন বড় বিপদে পড়ে তখন তারা কী করে জান?

কী করে?

তারা স্বার্থপর হয়ে যায়। হিংস্র হয়ে যায়। একে অন্যকে সরিয়ে নেতৃত্ব নিতে চায়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তখন কী হয় জান?

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কোনো কথা না বলে থুলের দিকে তাকিয়ে রইল। মহামান্য থুল তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তখন রবোমানবেরা একে অন্যকে হত্যা করে! কাজেই আমি কাগজে লিখে দিতে পারি আজ থেকে তিন মাস পরে পৃথিবীতে কোনো রোমানব থাকবে না। যেহেতু নেটওয়ার্ক থেকে কোনো সাহায্য পাবে না তাই একজন আরেক জনকে হত্যা করতে থাকবে!

লালচুলের মেয়েটি বলল, তুমি এটা কী ভাবে জান?

মঙ্গল গ্রহে আমরা ছোট একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। সেই এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে বড় বিপদের মাঝে রবোমানবের মা তার সন্তানকে হত্যা করে ফেলে!

লাল চুলের মেয়েটি নিষ্ঠুর চেহারার দলপতির দিকে তাকাল। দলপতির চেহারায় নিষ্ঠুরতাটুকু সরে গিয়ে এখন সেখানে একধরনের উদ্ভ্রান্ত ভাব চলে এসেছে। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আমি কি এখন গুলি করতে পারি।

দলপতি বলল, দাঁড়াও। এক সেকেন্ড। তারপর ঘুরে মহামান্য থুলের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এখনো বিশ্বাস করি না তুমি নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছ। কিন্তু আমি তারপরও জানতে চাই সত্যিই যদি ধ্বংস করে থাক তাহলে সেটি কেমন করে করেছ?

মহামান্য থুল হেসে চেয়ারে হেলান দিয়ে বললেন, তোমার পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব না। তোমার মস্তিষ্ক সেটা বোঝার ক্ষমতা রাখে না।

আমি তবু শুনতে চাই। রবোমানবদের দলপতি ক্ষিপ্ত স্বরে বলল, আমাকে বল।

আমি তোমাকে পুরো ব্যাপারটি বোঝাতে পারব না, বড় জোর তোমাকে একটু ধারণা দিতে পারি। মহামান্য থুল তার আঙুলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আমি জানি না, তোমরা লক্ষ করেছ কি না প্রিসা নগরীর উত্তরের বনাঞ্চলে একটা আগুন জ্বলছে। শীতের মওসুমে প্রায়ই জ্বলে—এটি এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। তবে আগুনের কারণে যে ধোয়া হয় সেটা সূর্যের আলোকে আটকে দেয় তাই নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সৌর বিদ্যুতের প্যানেলগুলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে না। সেটি এমন কোনো গুরুতর ব্যাপার না, কিন্তু ঠিক একই সময় মাহীরা হদের সুইস গেট খুলে নিচের শুষ্ক অঞ্চল পাবিত করা হয়েছে। খুবই স্বাভাবিক একটা কাজ কিন্তু হদের পানির উচ্চতা কমে গিয়েছে, পানি দিয়ে বিদ্যুৎ প্লান্ট শীতল করা হলে এক সময় সেটি সম্ভব হবে না! তোমরা লক্ষ করেছ কিনা জানি না দুটো বিনোদন উপগ্রহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, মানুষের বিনোদনের উপায় নেই, নগরীতে বিক্ষোভ হয়েছে তার জন্যে নিরাপত্তা কর্মীরা ব্যস্ত, ঠিক তখন শক্তি কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন পাওয়া গেছে, নিরাপত্তা কেন্দ্র, শক্তি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে! মাজুরা ইলেকট্রিক কোম্পানির ফোরম্যানকে অগ্রিম বোনাস দেয়া হয়েছে-এই মানুষটি বোনাস পেলেই শহরে গিয়ে উত্তেজক পানীয় খায়, ভোরে ঠিক করে কাজ করতে পারে না। সেজন্যে সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এবং একটা দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারেনি। অগ্নিকাণ্ডের জন্যে যে ফায়ারব্রিগেড যাবার কথা তাদেরও সমস্যা হয়েছে সবুজ পৃথিবীর স্কুলের বাচ্চাদের জন্যে! তারা আর্ট মিউজিয়ামে গিয়েছে সকাল দশটায় সেজন্যে রাস্তাটা সাময়িকভাবে বন্ধ! এরকম অসংখ্য ছছাট ছোট ঘটনা আলাদা আলাদা ভাবে পুরোপুরি গুরুত্বহীন। কিন্তু যখন একটার সাথে আরেকটা জুড়ে দেখ দেখবে সেটি ভয়াবহ বিপজ্জনক! নেটওয়ার্কের কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়ে যাবে। গিয়েছে!

রবোমানবের দলপতি হিংস্র গলায় বলল, তার মানে তুমি দাবি করছ কী করলে কী হবে তার সবগুলো তুমি আগে থেকে জান?

হ্যাঁ জানি। আমাকে কেউ দাবা খেলায় কখনো হারাতে পারে না—কী হলে কী হতে পারে তার সম্ভাব্য সবকিছু আমি বলতে পারি। এখানেও আমি বলতে পারি, তাই কিছু ছোটখাট ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর সবগুলোর সম্মিলিত ফল হচ্ছে নেটওয়ার্ক ধ্বংস হওয়া। মহামান্য থুল বললেন, ক্যাওস থিওরি বলে একটা থিওরি আছে। সেখানে বলা হয় এখানে হয়তো একটা প্রজাপতি তার ডানা ঝাঁপটেছে–তার ফলস্বরূপ অন্য গোলার্ধে একটা ঘূর্ণিঝড় হয়ে যাবে! এখানেও তাই, পার্থক্য হল আমি নিজের হাতে একটি একটি করে সেটা সাজিয়েছি।

রবোমানবের দলপতি বলল, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না!

ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছা। মহামান্য থুল কাঁধ ঝাঁকিয়ে চুপ করলেন।

লাল চুলের মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, আমি কী এখন এই বুড়োটিকে গুলি করব!

দলপতি হিংস্র গলায় বলল, হ্যাঁ। করো। এর এই অভিশপ্ত মস্তকটাকে ছিন্নভিন্ন করে দাও।

লাল চুলের মেয়েটি তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তুলে গুলি করল। ঝলক ঝলক রক্ত বের হয়ে দেহটি ঘুরে পড়ে যাবার কথা ছিল কিন্তু দেহটি পড়ে গেল না। বরং মহামান্য থুল ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি তোমাদের আরো একটু বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম। তোমরা কেউ অনুমান করতে পার নি আমি যে আমি নই? আমি আমার হলোগ্রাফিক ছবি। নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে, জরুরি বিদ্যুৎ দিয়ে এই হলোগ্রাফিক ছবি তোমাদের দেখানো হয়েছে, মনে হয় আর দেখানো সম্ভব নয়। সত্যিই যদি আমাকে চাও বাইরে খুঁজতে হবে। আমি এখন বাইরে। লক্ষ লক্ষ বিভ্রান্ত আতংকিত মানুষের সাথে মিশে গেছি।

প্রচণ্ড আক্রোশে সবগুলো রবোমানব মহামান্য থুলের হলোগ্রাফিক ছবিটিকেই গুলি করতে থাকে। মহামান্য থুল হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে বইলেন। খুব ধীরে ধীরে তার ছবিটি মিলিয়ে গেল।

রাস্তার ফুটপাথ দিয়ে অসংখ্য মানুষ ছুটছে। একটা ছোট শিশু কাঁদছে আর তার মা শিশুটির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শিশুটি জিজ্ঞেস করল, এখন কী হবে মা? নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে–

আমি জানি না। মা ভয় পাওয়া গলায় বললেন, আমি জানি না বাবা।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বৃদ্ধ বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।

মা জিজ্ঞেস করল, আপনি কেমন করে জানেন?

বৃদ্ধ হাসলেন, বললেন, আমি জানি! মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।

আপনাকে চেনা চেনা লাগছে। আপনাকে কী আমি আগে কখনো দেখেছি?

আমি জানি না। অনেকের চেহারা হয় এরকম, দেখলেই মনে হয় আগে কোথায় জানি দেখেছি। মনে হয় আমার চেহারা সেরকম।

আপনি সত্যিই বলছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে?

হ্যাঁ। বিশ্বাস কর। আমি বলছি সব ঠিক হয়ে যাবে।

মা শিশুটিকে নিয়ে ছুটতে থাকে। শিশুটি এখন নতুন উৎসাহে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল, মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাসছিস কেন?

এমনি।

তোর ভয় করছে না?

না। আমার ভয় করছে না।

কেন ভয় করছে না?

ঐ যে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কোন বুড়ো কী না কী বলেছে—

কী বলছ তুমি মা? তুমি মহামান্য থুলকে চিনতে পার নি?

মা থমকে দাঁড়ালেন, পিছনে তাকালেন কিন্তু থুলকে আর খুঁজে পেলেন না।
নীহা কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। খানিকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে সে মাথা ঘুরিয়ে ভিতরে অন্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ?

কী?

এই যে সামনে সুহা আর ক্লদের মৃতদেহ পড়েছিল—

হ্যাঁ। মৃতদেহ দুটি আর নেই।

তাই নাকি? টর জানালার পাশে এসে দাঁড়াল, বাইরে তাকিয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। মৃতদেহগুলো কোথায়?

টুরান বলল, নিশ্চয়ই তেজস্ক্রিয় প্রাণীগুলো নিয়ে গেছে।

নিয়ে কী করবে?

জানি না। টর মাথা নাড়ল, এই প্রাণীগুলো সম্পর্কে কেউ খুব বেশি জানে না। এগুলো সত্যিকার প্রাণী না। হাইব্রিড।

নীহা বলল, আমি আর প্রাণীদের কথা ভাবতে চাই না। ট্রিনিটি বলেছে স্কাউটশিপ পাঠিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে, আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছি।

আমরা সবাই সেজন্যে অপেক্ষা করছি।

নীহা আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। সে কী কুগুরাভ সমীকরণের সমাধানের কথা চিন্তা করছে নাকি মঙ্গল গ্রহের নিঃসঙ্গ লাল প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে আসছে বোঝা যায় না।

ট্রিনিটি স্কাউটশিপটাকে যখন তাদের আবাসস্থলের কাছে নামিয়ে আনে তখন সূর্য ঢলে পড়ছে। ছড়ানো ছিটানো পাথরের লম্বা ছায়া চারদিকে একটি আধিভৌতিক দৃশ্য তৈরি করেছে। আবাসস্থলের ভেতরে সবাই তাদের স্পেসস্যুট পরে নেয় তারপর হাতে অস্ত্রগুলো নিয়ে বের হয়। স্কাউটশিপটি কাছেই, তারপরেও তারা দ্রুত হাঁটতে থাকে। তারা যখন স্কাউটশিপের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন ইহিতার কণ্ঠকর শুনতে পেল, তাড়াতাড়ি হাঁট। প্রাণীগুলো আসছে।

টর বলল, আসতে দাও। আমি এখন আর ভয় পাই না, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে একেবারে শেষ করে দেব।

ইহিতা বলল, কোনো প্রয়োজন নেই। গোলাগুলি না করে আমরা ছুটে উঠে যাই। চল।

সবাই তখন ছুটতে থাকে। স্কাউটশিপের কাছে এসে প্রথমে টুরান, তারপর ইহিতা, আর টর লাফিয়ে স্কাউটশিপে উঠে গেল। নুট যখন নীহাকে ধাক্কা দিয়ে স্কাউটশিপের ভেতরে উঠিয়ে দিচ্ছে ঠিক তখন চারপাশ থেকে প্রাণীগুলো তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করায় জন্যে ওপর থেকে টরকে এক পশলা গুলি করতে হল, প্রাণীগুলো যখন একটু সরে যায় তখন সবাই নীহাকে টেনে ভেতরে তুলে নেয়। প্রাণীগুলো তখন আবার ছুটে তাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করে কিন্তু ততক্ষণে স্কাউটশিপের ভারী দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরও বাইরে প্রাণীগুলো ছুটোছুটি করতে থাকে।

স্কাউটশিপের ভেতর ইহিতা একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সবাই ঠিকমতোন এসেছ?

নীহা মাথা নাড়ল, বলল, এসেছি। সবাই তাহলে নিজেদের জায়গায় বসে যাও। আমরা এখন রওনা দেব।

সবাই নিজেদের জায়গায় বসতেই সিট থেকে যন্ত্রপতি বের হয়ে এসে তাদেরকে নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে আটকে নেয়। নীহা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল, নুট নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী দেখার চেষ্টা করছ নীহা?

নীহা বলল, না। কিছু না।

তুমি কী প্রাণীগুলোকে দেখতে চাইছ?

হ্যাঁ। আমার মনে হল, স্পষ্ট মনে হল–কথা শেষ না করে নীহা থেমে যায়।

নুট মাথা নাড়ল, বলল, তুমি ঠিকই দেখেছ নীহা।

নীহা চমকে উঠে বলল, কী বলছ তুমি?

আমি ঠিকই বলেছি। নুট ফিসফিস করে বলল, আমি নিচে ছিলাম, স্পষ্ট দেখেছি একটা প্রাণীর মাথা সুহার মতো। আরেকটা ক্লদের।

কেমন করে সম্ভব?

এই প্রাণীগুলো মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে পারে। সুহা আর ক্লদের শরীরকে এগুলো ভাগাভাগি করে নিয়েছে।

কী ভয়ংকর!

হ্যাঁ ভয়ংকর।

স্কাউটশিপটা গর্জন করে ওপরে উঠতে শুরু করতেই প্রাণীগুলো চিৎকার করতে করতে সরে গেল, নীহা প্রাণীগুলোকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে। সেও এবারে স্পস্ট সুহা আর ক্লদকে দেখতে পায়। তাদের সত্যিকার চেহারার সাথে খুব বেশি মিল নেই, কিন্তু বুঝতে কোনো সমস্যা হয় না।

ইহিতা জানতে চাইল, নীহা! তোমাকে কি কিছু উৎকণ্ঠার মাঝ ফেলে দিল?

হ্যাঁ।

কী?

আমরা আগে এই গ্রহটা ছেড়ে চলে যাই, তখন তোমার সাথে কথা বলব। এখন বলতে চাই না।

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে নীহা।

স্কাউটশিপটা তখন গর্জন করে লাল ধূলি উড়িয়ে আকাশে উঠতে থাকে। বহুঁ দূরে তখন মঙ্গলগ্রহের কুৎসিত চাঁদ ডিমোস আকাশে উঠতে শুরু করেছে।

মহাকাশযানের গোল জানালা দিয়ে মহাকাশযানে ঢোকার সাথে সাথে তারা ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, আমাদের মহাকাশযানে তোমাদের সাদর আমন্ত্রণ।

টর দাঁত কিড়মিড় করে বলল, খবরদার, বাজে কথা বলবে না ট্রিনিটি। তোমার মানুষকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষমতা নেই, অধিকারও নেই।

ইহিতা শব্দ করে হাসল, বলল, টর! আমার মনে হয় ট্রিনিটির সাথে তোমার এই সংঘাতটুকু মিটিয়ে ফেল। বিষয়টা অর্থহীন। অনেকটা জুতো মোজা বা একটা স্ক্রু ড্রাইভারের সাথে ঝগড়া করার মতো। ট্রিনিটি একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছু না একটু গুছিয়ে মানুষের মতো কথা বলতে পারে—এই হচ্ছে পার্থক্য!

ট্রিনিটি বলল, ইহিতা, আমাকে তুমি যতোটুকু তাচ্ছিল্য সহকারে দেখছ আমি ঠিক ততোটুকু তাচ্ছিল্যের পাত্র নই। আমার হিসেব করার ক্ষমতা প্রায় মানুষের সমান। কয়েকটি বিশেষ বিষয়ে মানুষ থেকে বেশি।

ঐটুকুই। হিসাব করার ক্ষমতা! ইহিতা বলল, মানুষকে কখনো তার হিসাব করার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা হয় না।

ট্রিনিটি বলল, এই তর্ক সহজে শেষ হবে না। তোমরা নিশ্চয়ই ক্লান্ত। উষ্ণ পানিতে স্নান করে নতুন পোশাক পরে এসো, আমি তোমাদের খাবারের ব্যবস্থা করছি।

টর জিজ্ঞেস করল, খাবারের জন্য কী আছে?

তোমাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনটুকু উদ্যাপন করার জন্যে আজকের মেনুতে থাকবে, বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক যবের রুটি, তিতির পাখির মাংস, সামুদ্রিক মাছ এবং আঙুরের রস।

টর কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ট্রিনিটি, তুমি যদি সত্যি সত্যিকারের তিতির পাখির মাংস জোগাড় করতে পার তাহলে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব।

ট্রিনিটি বলল, আমি সত্যিই তিতির পাখির মাংস জোগাড় করব।

পাশাপাশি পাঁচটি ক্যাপুসলের ওপর একটা সবুজ বাতি জ্বলছে এবং নিভছে। পাঁচজন নিজেদের ক্যাপসুলটি বের করে তার পাশে এসে দাঁড়াল। টুরান বলল, তাহলে আবার তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিই।

টর বলল, কততদিন পর আবার আমাদের দেখা হবে?

ইহিতা বলল, সেই প্রশ্নটির কোনো অর্থ নেই। আমাদের কাছে মনে হবে আমরা চোখ বন্ধ করেছি এবং চোখ খুলেছি। কাজেই তোমাদের সাথে দেখা হবে এক পলক পরে!

নীহা বলল, তাহলে আমাদের খুব আনুষ্ঠানিক বিদায় নেবারও প্রয়োজন নেই? আমরা ঝটপট ক্যাপসুলে শুয়ে পড়তে পারি?

ইহিতা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। ঝটপট শুয়ে পড়তে পারি।

টুরান বলল, শুধু পৃথিবীতে কী হচ্ছে সেই খবরটা জানতে পারলাম না।

ট্রিনিটি বলল, পৃথিবীর নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে আছে। তার খবর পাবার কোনো উপায় নেই।

ইহিতা বলল, এক দিক দিয়ে সেটি হয়তো আমাদের জন্যে ভালো। পৃথিবীকে পিছনে ফেলে আমরা সামনে নতুন আরেকটা পৃথিবী খুঁজে বের করতে যাব।

নীহা বলল, ঠিক আছে তাহলে চল আমরা ক্যাপসুলে ঢুকি।

সবাই বলল, চল।

নুট বলল, এবারে আমি অনেক প্রশান্তি নিয়ে ঘুমুতে যাচ্ছি। তোমাদের সবার সাথে নতুন পৃথিবীতে দেখা হবে!

সবাই মাথা নাড়ল, তারপর ক্যাপসুলে ঢুকে গেল। ক্যাপসুলের ঢাকনাটা খুব ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। ক্যাপসুলের ভেতর শীতল সুগন্ধি একটা বাতাস ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বাতাসে নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে, তারা কেউ চোখ খোলা রাখতে পারে না। একজন একজন করে তারা গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। তখন মৃদু কম্পন তুলে ক্রায়োজেনিক মডিউলটি চালু হয়ে যায়, সাথে সাথে পাঁচজন মহাকাশচারীর দেহ শীতল হতে থাকে। খুব ধীরে ধীরে জীবনের স্পন্দন থেমে যায়, পাঁচজন মানুষ পুরোপুরি পাঁচটি জড় পদার্থের মতো ক্যাপসুলের ভেতর শুয়ে থাকে।

মহাকাশযানটির ইঞ্জিনগুলো একটা একটা করে চালু হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মাঝেই পুরো মহাকাশযানটি থর থর করে কাঁপতে থাকে। সেটি খুব ধীরে ধীরে তার কক্ষপথ থেকে মুক্ত হয়ে মহাকাশের দিকে ছুটে যেতে থাকে। সৌরজগৎ পার হয়ে সেটি ছায়াপথের কেন্দ্রের দিকে ছুটে যেতে থাকবে। চারশ বিলিয়ন নক্ষত্রের কোথাও না কোথাও একটি চমৎকার গ্রহ খুঁজে পাওয়া যাবে যেখানে পৃথিবীর মানুষ নতুন করে তাদের সভ্যতা শুরু করতে পারবে।
পুলিশ কমিশনার অসহায়ভাবে হাত নেড়ে বললেন, আমি কী করব?

তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো বলল, তাহলে কে করবে? তোমাকেই তো করতে হবে। তুমি আমাদের পুলিশ কমিশনার। তুমি না করলে কে করবে?

পুলিশ কমিশনারকে আরো অসহায় দেখায়, কিন্তু আমি তো শুধু পুলিশ কমিশনার। আইন শৃঙ্খলার বিষয়টা দেখি।

এটা তো আইন শৃঙ্খলারই ব্যাপার। নেটওয়ার্ক কাজ করছে না, পুরো শহরের সবকিছু থেমে গেছে। আমরা কোথায় বিদ্যুৎ পাব, কোথায় খাবার পানি পাব, কোথায় খাবার পাব, আমাদের ছেলে মেয়েরা কেমন করে স্কুলে যাবে, কেমন করে লেখাপড়া করবে কিছু জানি না। আমাদের অসুখ হলে কে চিকিৎসা করবে তাও জানি না!

পুলিশ কমিশনার মাথা নাড়ল, বলল, এগুলো তো আমারও প্রশ্ন।

তাহলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও।

তেজি চেহারার একজন মহিলা বলল, মানুষজন কিন্তু ক্ষেপে উঠছে।

কমবয়সী একজন তরুণ বলল, সবাই খুব ভয় পেয়েছে। সারা শহরে আতংক।

বুড়ো মতোন একজন বলল, তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত দিতে হবে। বলতে হবে আমরা এখন কী করব।

পুলিশ কমিশনার বলল, আমরা চেষ্টা করছি কেন্দ্রে যোগাযোগ করার জন্যে। কোনো উত্তর পাচ্ছি না।

তেজি চেহারার মহিলাটি বলল, আমরা এসব শুনতে চাই না। তুমি কিছু একটা কর।

পুলিশ অফিসার খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, তাহলে আমরা সবাই এক সাথে বসি। বসে চিন্তা-ভাবনা করে কিছু একটা ঠিক করি।

তুমি যেটা ভালো মনে কর সেটা কর। কিন্তু কিছু একটা কর।

ঠিক আছে। ঠিক আছে। তাহলে আমরা সবাই আমাদের শহরের হলঘরটাতে বসি?

পুলিশ কমিশনারকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো মাথা নাড়ল, বলল, ঠিক আছে।

তেজি চেহারার মহিলাটি বলল, কিন্তু আমরা সবাইকে খবর দিব কেমন করে? নেটওয়ার্ক নেই।

সবার বাসায় বাসায় যেতে হবে। বাসায় বাসায় গিয়ে বলতে হবে।

বুড়ো মতন মানুষটা বলল, একজন কয়েকজনকে খবর দেবে, তারা প্রত্যেকে আরো কয়েজনকে খবর দেবে এভাবে সবার কাছে খবর পৌঁছানো যাবে।

পুলিশ কমিশনার বলল, হ্যাঁ। সেটাই ভালো। আমি আমার পুলিশ বাহিনীকেও পাঠিয়ে দিই।

হলঘরে শহরের সব মানুষ চলে এসেছে। বসার জায়গায় সবাইকে জায়গা দেয়া যায় নি তাই অনেক দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর রীতিমতো গরম, মানুষেরা হাত দিয়ে নিজেদের বাতাস করার চেষ্টা করছে। হলঘরের সামনে উঁচু মঞ্চে পুলিশ কমিশনার দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে মুখে এক ধরনের আতংক। সে হাত তুলতেই সবাই চুপ করে গেল।

পুলিশ অফিসার একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে বলল, প্রিয় নগরবাসী এখানে আসার জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ। তোমরা সবাই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কেন তোমাদেরকে এখানে ডাকা হয়েছে।

সবাই নিঃশব্দে বসে থাকে, সবার মাঝে এক ধরনের চাপা ভয়।

পুলিশ কমিশনার বলল, তোমরা সবাই দেখেছ আমাদের নেটওয়ার্কটি কাজ করছে না। এটি অসম্ভব একটি ব্যাপার—এরকম ভয়ংকর একটি ব্যাপার যে ঘটতে পারে আমরা সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। এখনো আমি সেটা বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশ কমিশনার একবার ঢোক গিলে বলল, আমি ভেবেছিলাম এটি একটি ছোট দুর্ঘটনা এবং অত্যন্ত দ্রুত এই সমস্যাটি মিটিয়ে ফেলা হবে। তোমরাও নিশ্চয়ই তাই ভেবেছিলে–আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম যে নেটওয়ার্কটি চালু হয়ে যাবে। নেটওয়ার্ক না থাকায় আমরা অন্যান্য শহরে খোঁজ নিতে পারছিলাম না, সব যোগাযোগ বন্ধ। তারপরও লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি এবং যেটুকু সম্ভব জানা গেছে শুধু এখানে নয়, সব জায়গায় নেটওয়ার্ক বন্ধ।

কমবয়সী একটি মেয়ে প্রায় হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, তাহলে আমাদের কী হবে?

পুলিশ কমিশনার বলল, সেটা নিয়ে কথা বলার জন্যেই তোমাদের সবাইকে ডেকেছি। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রেখে আলোচনা করা যাক।

বয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি একটা বইয়ে পড়েছিলাম প্রাচীন কালে সব শহরে শহর পরিচালনার জন্যে একটি কমিটি থাকত। সেই কমিটির সদস্যরা শহরের ভালো-মন্দ দায়িত্ব নিত। আমরাও কাজ চালানোর জন্যে এরকম একটা কমিটি করতে পারি।

একজন জিজ্ঞেস করল, সেই কমিটির সদস্য কে হবে?

আরেকজন বলল, নেটওয়ার্ক যদি না থাকে তাহলে সেই সদস্যরা কেমন করে কাজ করবে?

কমবয়সী মেয়েটি ভয় পাওয়া গলায় বলল, কিন্তু তোমরা কেউ কেন সত্যিকারের বিষয়টা নিয়ে কথা বলছ না? নেটওয়ার্কটি কেমন করে বন্ধ হয়ে গেল? আমরা সবসময় জানতাম নিউক্লিয়ার বোমা দিয়েও এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা যায় না।

সামনের দিকে বসে থাকা মধ্যবয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি ব্যাপারটা তোমাদের জন্যে ব্যাখ্যা করতে পারি।

সবাই ঘুরে মানুষটির দিকে তাকাল। এই শহরের মানুষ আগে কখনো এই মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে দেখেনি। মানুষটির উঁচু চোয়াল এবং মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখগুলো কোটরের ভেতর এবং দেখে মনে হয় সেটা ধিকিধিকি করে জ্বলছে। মানুষটি ওঠে দাঁড়াল এবং লম্বা পা ফেলে মঞ্চে ওঠে পুলিশ কমিশনাররের পাশে দাঁড়াল। তারপর পোশাকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে লম্বা বেঢপ একটা রিভলবার বের করে আনে। সেটা উপরে তুলে একটা গুলি করতই ঝনঝন শব্দ করে একটা আলো ভেঙ্গে পড়ে হলঘরের খানিকটা অন্ধকার হয়ে যায়। হলঘরে বসে থাকা মানুষগুলো এক সাথে সবাই চিৎকার করে আবার হঠাৎ করে থেমে যায়।

মধ্যবয়স্ক কোটরাগত চোখের মানুষটা রিভলবারটাকে একনজর দেখে বলল, আমার আসলে পুলিশ কমিশনারের কপালে এই গুলিটা করার কথা ছিল কিন্তু রক্তের ছিটে লেগে আমার শার্টটা নোংরা হবে তাই তাঁকে গুলি করি নি।

নেটওয়ার্ক বন্ধ, কাপড় ধুতেও পারব না।

হলঘর বোঝাই মানুষগুলো বিস্ফারিত চোখে মধ্যবয়স্ক মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মধ্যবয়স্ক মানুষটি বলল, তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমি রবোমানব। এই হলঘরের পিছনে আরো দুজন রবোমানব আছে, তাদের হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র রয়েছে, একটু যদি নাড়াচাড়া করো, আমার কথার অবাধ্য হও তাহলে সবাইকে গুলি করে শেষ করে দেয়া হবে। আমাদের কাছে মানুষ আর ব্যাক্টরিয়ার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

কেউ কোনো কথা বলল না, নিঃশব্দে রবোমানবটির দিকে তাকিয়ে রইল। রবোমানবটি হলঘরের মানুষগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, আজ আমার খুব আনন্দের দিন। এতোদিন আমরা মানুষের ভয়ে লুকিয়ে থাকতাম। এখন আমাদের আর লুকিয়ে থাকতে হবে না। আমরা প্রকাশ্যে এসেছি। এই মুহূর্তে পৃথিবীর প্রত্যেকটা শহরে নগরে রবোমানবেরা বের হয়ে তার দায়িত্ব নিচ্ছে। পুরো পৃথিবী এখন রবোমানবদের হাতের মুঠোয়।

বয়স্ক একজন মানুষ বলল, আমি বিষয়টা ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি বলছ পুরো পৃথিবীটা তোমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু কেমন করে সেটা তোমাদের হাতের মুঠোয় গিয়েছে?

তার কারণ আমরা পৃথিবীর নেটওয়ার্ক দখল করেছি। যে পৃথিবীর নেটওয়ার্ক দখল করতে পারে সে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করে।

কিন্তু নেটওয়ার্ক তত বন্ধ। বন্ধ নেটওয়ার্ক দখল করে কী লাভ?

আমরা বন্ধ নেটওয়ার্ক দখল করি নি।

তাহলে নেটওয়ার্ক বন্ধ কেন?

নিশ্চয়ই কোনো একটা কারণে নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে।

সেই কারণটা কী?

মধ্যবয়স্ক মানুষটার কোটরাগত চোখ দুটো হঠাৎ যেন জ্বলে ওঠে, সে হিংস্র গলায় বলল, তুমি সীমা অতিক্রম করেছ? আমি তোমার কথায় উত্তর দিতে বাধ্য নই।

কিন্তু আমাদের জানতে হবে।

বেশ। জেনে নাও। বলে রবোমানবটি তার রিভলবার তুলে বুড়ো মানুষটির মাথা লক্ষ্য করে গুলি করল। পুরো হলঘরটিতে গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

বুড়োমানুষের দেহটি ঢলে নিচে পড়ে গেল। রবোমানবটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোমাদের জন্যে এটি একটি উদাহরণ হয়ে রইল। কেউ যদি সীমা অতিক্রম করে তার বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।

কেউ কোনো কথা বলল না।

আমরা পৃথিবী দখল করেছি এই বিষয়টি নিয়ে কারো প্রশ্ন আছে?

এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না।

চমৎকার। রবোমানবটি মুখে সন্তুষ্টির একটা ভাব ফুটিয়ে বলল, এবার তাহলে সকলে ঘরে ফিরে যাও। কাল সকালে আমাদের পঞ্চাশজন মানুষ দরকার। সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশ জন মানুষ। কমবয়সী পঞ্চাশজন মানুষ। নাবী এবং পুরুষ। আজ রাতের মাঝে নেটওয়ার্ক চালু হয়ে যাবে। সেই নেটওয়ার্কে আমরা নির্দেশ পাঠাব।

এবারেও কেউ কোনো কথা বলল না। রবোমানবটির মুখে ক্রুর একটা হাসি ফুটিয়ে বলল, এই পঞ্চাশজনের জীবনকে আমরা মহিমান্বিত করে দেবো। তারা তুচ্ছ মানুষের জীবন পরিত্যাগ করে সত্যিকার রবোমানবের জীবনে পা দেবে।

উপস্থিত সবাই হঠাৎ করে আতংকে শিউরে ওঠে।
আবছা অন্ধকার একটি ঘরে কয়েকজন তরুণ গা ঘেষাঘেষি করে বসে আছে। তাদের সামনে একটি মনিটর। সেখানে আলোর কোনো বিচ্ছুরণ নেই। একজন নিচু গলায় বলল, নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে?

না, চালু হয়নি।

আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি মনে মনে প্রার্থনা করছি যেন নেটওয়ার্ক চালু না হয়।

শুধু তুমি নয় এই প্রথমবার আমরা সবাই প্রার্থনা করছি যেন নেটওয়ার্ক চালু না হয়।

রবোমানবেরা নেটওয়ার্কটা দখল করে নিয়েছে, তুমি চিন্তা করতে পার সেটি কী ভয়ানক ব্যাপার?

না আমি চিন্তাও করতে পারি না।

একটা জিনিস লক্ষ করেছ?

কী জিনিস?

নেটওয়ার্কটা যদি চালু না হয় তাহলে রবোমানবেরা কিছু করতে পারবে।

আমরাও কিছু করতে পারব না।

কিন্তু আমরা অনেক, তারা মাত্র তিনজন। আমরা ইচ্ছে করলে তাদের আংগুল দিয়ে টিপে মেরে ফেলতে পারব।

তাদের হাতে অস্ত্র আছে।

আমরাও অস্ত্র জোগাড় করতে পারি।

কেমন করে? নেটওয়ার্ক বন্ধ-তুমি কিছুই জোগাড় করতে পারবেনা।

আমরা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে ফেলতে পারি।

কী বলছ তুমি? এটা কতো বড় অপরাধ তুমি জান?

নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকলে এটা কোনো অপরাধ না।

যদি নেটওয়ার্ক চালু হয়ে যায়?

এখনো হয় নি।

হে ঈশ্বর তুমি নেটওয়ার্কটি বন্ধ রাখ।

কে জানে পৃথিবীর অন্য জায়গায় কী হচ্ছে!

ঠিক এখানে যা ঘটছে নিশ্চয়ই হুবহু তাই ঘটছে।

হে বিধাতা, তুমি নেটওয়ার্কটি বন্ধ রাখ। রবোমানবেরা যেন কোনোভাবে নেটওয়ার্ক চালু করতে না পারে।
রবোমানব তিনজনের একজন জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী চাও?

পেশীবহুল তরুণটি তার অস্ত্রটি হাত বদল করে বলল, তোমরা কাল বলেছিলে তোমরা সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশজন মানুষ চাও। আমরা সুস্থ সবল নিরোগ পঞ্চাশজন এসেছি।

একজন রবোমানব তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি তুলে বলল, আমাদের সাথে তামাশা করার চেষ্টা করো না। এই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি দিয়ে তোমাদের সবাইকে শেষ করে দেব।

আমরা সেটা অনুমান করেছিলাম। তাই দেখতেই পাচ্ছ আমরা সুস্থ সবল নীরোগ পঞ্চাশজন খালি হাতে আসিনি। সবার হাতে অস্ত্র। অস্ত্রাগার ভেঙে নিয়ে এসেছি।

।সোনালি চুলের একটি মেয়ে বলল, পৃথিবীর নেটওয়ার্ক কেন বন্ধ সেটা আমরা এখন বুঝতে পারছি। তোমরা এটি দখল করেছ জানতে পেরে নেটওয়ার্কটি অচল করে দেয়া হয়েছে। তোমরা সোনার হরিণ ধরার চেষ্টা করেছ। ধরে আবিষ্কার করেছ এটা মরা ইঁদুর। মানুষের বুদ্ধি রবোমানবের থেকে অনেক বেশি।

রবোমানবটি হিংস্র গলায় বলল, আমার কাছে বুদ্ধি নিয়ে বড়াই করো না। তোমরা সরে যাও, না হলে গুলি করে শেষ করে দেব।

পেশীবহুল তরুণটি বলল, এই কথাটা বরং আমরাই বলি। অস্ত্র ফেলে দিয়ে দুই হাত উঁচু করে দাঁড়াও না হলে আমরা গুলি করে শেষ করে দেব।

তরুণটির কথা শেষ হবার আগে রবোমানব তিনটি তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি করতে শুরু করে। পঞ্চাশজন তরুণ তরুণীও তাদের অস্ত্র তুলে নেয়। হলঘরটির মাঝে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।

যেভাবে হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবে গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেল। হলঘরের একপাশে গুলিবিদ্ধ তিনজন রবোমানব পড়েছিল। অন্য পাশে তরুণ-তরুণীরা। খুব ধীরে ধীরে তরুণ-তরুণীরা ওঠে দাঁড়াতে থাকে। শরীর থেকে ধূলা ঝাড়তে ঝাড়তে একজন বলল, রবোমানবদের বলা হয় নি আমরা অস্ত্রাগার ভেঙ্গে শুধু অস্ত্র নিই নি, গুলি নিরোধক পোশাকও নিয়েছি।

পঞ্চাশজন তরুণ-তরুণী তিনটি রবোমানবকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। একজন বলল, আমি কখনো চিন্তা করিনি আমি আমার হাতে অস্ত্র তুলে নেব, আমি সেই অস্ত্র দিয়ে কাউকে গুলি করব। আমি কখনোই কোনো প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হতে চাই নি।

সোনালি চুলের মেয়েটি বলল, তুমি সেটি নিয়ে মাথা ঘামিও না। রবোমানব তিনটি গুলিবিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এখনো মারা যায় নি। হাসপাতালে নিলে বাঁচিয়ে ফেলবে।

একজন শুধু মুখ শক্ত করে বলল, আমরা এই প্রাণীগুলোকে বাঁচানোর চেষ্টা করব?

সোনালি চুলের মেয়েটি বলল, হ্যাঁ বাঁচানোর চেষ্টা করব।

কেন?

কারণ আমরা মানুষ। কারণ আমরা রবোমানব নই।

তিনজন গুলিবিদ্ধ রবোমানকে হাসপাতালে নিতে নিতে একজন তরুণ জিজ্ঞেস করল, সারা পৃথিবীতে এখন কী হচ্ছে কে জানে?

অন্য একজন বলল, ঠিক এখানে যা হচ্ছে নিশ্চয়ই সব জায়গাতেই তাই হচ্ছে।

তুমি তাই ভাবছ?

হ্যাঁ। নেটওয়ার্কটি ইচ্ছে করে বিকল করা হয়েছে।

তার মানে আমাদের নেটওয়ার্ক ছাড়া বেঁচে থাকতে হবে?

হ্যাঁ। আর মজার কথা কী জান?

কী?

আমরা নেটওয়ার্ক ছাড়াই কিন্তু বেঁচে থাকা শুরু করে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, অভিজ্ঞতাটা কিন্তু খুব খারাপ না।

তরুণ কয়েকজন শব্দ করে হেসে উঠল। একজন তরুণী বলল, তুমি ঠিকই বলেছ! নেটওয়ার্কবিহীন জীবনটা আমার কাছেও মন্দ লাগছে না। এর মাঝে একটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব আছে, কেমন যেন বনভোজনের আনন্দ আছে!

কয়েকজন মাথা নাড়ল, বলল, ঠিকই বলেছ!

বেশ কিছু মানুষের জটলার ভেতর থেকে উত্তেজিত কথাবার্তা শোনা যেতে থাকে। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে এখানে?

রোমানবগুলো ধরা পড়েছে।

ধরা পড়েছে? মহিলার চোখ দুটো উত্তেজনায় চক চক করে ওঠে। কতো বড় বদমাইস দেখেছ? কী পরিমণ হিংস্র এই রবোমানবেরা–এদেরকে পিটিয়ে শেষ করে দেয়া দরকার।

কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো মানুষটি নরম গলায় বরল, আমরা তো মানুষ-আমরা তো কখনোই অন্য মানুষকে খুন করে ফেলার কথা বলতে পারি না।

কিন্তু রোমানবেরা তো মানুষ না?

তারা মানুষের একটা রূপান্তরিত রূপ। মস্তিষ্কে একটা পরিবর্তন এনে তাদেরকে দান করে ফেলা হয়।

মহিলাটি উত্তেজিত গলায় বলল, আমিও তো তাই বলছি। এই দানবগুলোকে শেষ করে দিতে হবে।

বুড়ো মানুষটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দানবগুলোকে তো মানুষের সাথে তুলনা করলে হবে না। একটা বনের পশু যদি কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাহলে কী আমরা পশুটাকে দোষ দিই? পশুর তো দোষ নেই, তাদের তো সেই বুদ্ধিমত্তা নেই। এখানেও তাই–

তাহলে রবোমানবদের কী করব?

আপাতত আটকে রাখতে হবে, তারপর বিজ্ঞানীদের গবেষণা করতে দিতে হবে-তারা কোনোভাবে রবোমানবদের ভেতরে মানুষের প্রবৃত্তি ফিরিয়ে আনতে পারে কী-না।

পারবে না। কিছুতেই পারবে না।

বুড়ো মানুষটি হাসল, বলল, কিন্তু চেষ্টা করতে হবে তো?

ঠিক তখন জটলটা ভেঙ্গে গেল, দেখা গেল বেশ কিছু উত্তেজিত মানুষ কয়েকজন রবোমানবকে পিছমোড়া করে বেঁধে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। মহিলটি জিজ্ঞেস করল, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

পুলিশ কমিশনারের কাছে।

কী করবে?

জেলখানায় আটকে রাখবে।

রাগী চেহারার একজন মানুষ বলল, এদেরকে খুন করে ফেলা উচিত। মনে আছে প্রথম কয়েকদিন আমাদের ওপর কী অত্যাচার করেছে? কতজনকে মেরেছে।

পিছমোড়া করে বেঁধে নেয়া মানুষগুলোর একজন বলল, আমাদের খুন করতে হবে না। একটা ঘরে বন্ধ করে রাখলে নিজেরাই নিজেদের খুন করে ফেলব। খবর পেয়েছি সব জায়গায় তাই হচ্ছে!

কী আশ্চর্য! কেন?

এদের ভেতরে কোনো ভালোবাসা নেই। আমাদের জন্যেও নেই, নিজেদের জন্যেও নেই।

মানুষগুলো রবোমানবদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল-পিছন পিছন অনেক মানুষ হৈ-হুল্লোড় করতে করতে যেতে থাকে। মহিলাটি সেদিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দুই সপ্তাহ আগেও যদি কেউ আমাকে বলত সারা পৃথিবীটা এভাবে ওলট-পালট হয়ে যাবে, আমি বিশ্বাস করতাম না।

বুড়ো মানুষটি বলল, তোমাদের এই শহরের কী অবস্থা?

প্রথম প্রথম খুব খারাপ অবস্থা ছিল। মানুষজন যখন বুঝেছে নেটওয়ার্ক ছাড়াই দিন কাটাতে হবে তখন আস্তে আস্তে সব ব্যবস্থা করতে শুরু করেছে।

বুড়ো মানুষটি মাথা নেড়ে বলল, ও আচ্ছা!

হ্যাঁ। প্রথম প্রথম সবাই অসম্ভব ক্ষেপেছিল, পরে বুঝতে পেরেছে। রবোমানবদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তখন সবাই মেনে নিয়েছে।

বুড়ো মানুষটি মাথা নাড়ল। মহিলাটি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন মোটামুটি সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মাঝে আছে। আশে পাশের শহরের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, দিন কেটে যাচ্ছে। তবে–

তবে কী?

শুধু একটা সমস্যা।

কী সমস্যা।

বাচ্চাদের স্কুলের সমস্যা। আগে নেটওয়ার্ক থেকে পাঠগুলো আসত—এখন সেরকম কিছু আসছে না। মানুষজনকে শিক্ষক হতে হচ্ছে। শিক্ষকের খুব অভাব। বিশেষ করে বিজ্ঞান আর গণিতের শিক্ষকের।

বুড়ো মানুষটা বলল, আমি মোটামুটিভাবে বিজ্ঞান আর গণিত জানি। তোমরা যদি চাও তাহলে আমি বাচ্চাদের বিজ্ঞান আর গণিত পড়াতে পারি।

মহিলাটির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কিছু একটা বলতে গিয়ে সে থেমে যায়। ইতস্তত করে বলল, কিন্তু–

কিন্তু কী?

নেটওয়ার্ক নেই বলে আমাদের কোনো অর্থ সম্পদ নেই। তোমাকে তো বেতন দিতে পারব না।

বুড়ো মানুষটি বলল, আমাকে বেতন দিতে হবে না। স্কুলের কোনো কোনায় একটু ঘুমানোর জায়গা আর একটুখানি খাবার দিলেই হবে।

সেটা দিতে পারব। আমি বাসা থেকে তোমায় জন্যে দুটো কম্বল নিয়ে আসব।

বুড়ো মানুষটা হাসি হাসি মুখে বলল, হ্যাঁ। দুটো কম্বল হলেই হয়ে যাবে।

তুমি তাহলে চল আমার সাথে, আমাদের স্কুলটাতে নিয়ে যাই।

বুড়ো মানুষটি সারাদিন স্কুলের বাচ্চাদের নানাভাবে ব্যস্ত রাখল। তাদের মজার মজার গল্প করল, গণিত শেখাল, বিজ্ঞান শেখাল, বেসুরো গলায় গান গাইল, বিজ্ঞানের ছোট ছোট পরীক্ষা করল। তারপর বিকেল বেলা স্কুলের বারান্দায় বসে বসে সব বাচ্চাদের বিদায় দিল।

একটি ছোট মেয়ে হাত নেড়ে বুড়ো মানুষটিকে বিদায় দিয়ে তার মায়ের হাত ধরে চলে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মা জিজ্ঞেস করল, কী হলো।

আমি ঐ বুড়ো দাদুকে একটা কথা বলে আসি?

কথা বলবে? যাও।

ছোট মেয়েটি বুড়ো মানুষটার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে পারি?

বল।

কানে কানে বলতে হবে। কেউ যেন শুনতে না পারে।

বুড়ো মানুষটি তার মাথা নিচু করল, মেয়েটি তখন তার কানে ফিস ফিস করে বলল, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি মহামান্য থুল। কিন্তু তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি কাউকে বলে দেব না!

বুড়ো মানুষটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তার বাম চোখটা মটকে বলল, আমি জানি তুমি কাউকে বলে দেবে না!

অন্ধকার নেমে এলে দুজন গুড়ি মেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কে?

আমরা।

গোপন সংকেত?

কোমাডো ড্রাগন।

সাথে সাথে খুট করে দরজা খুলে গেল। ভেতরে আবছা অন্ধকার, যে দরজাটা খুলেছিল, একজন দীর্ঘদেহী মানুষ, একটু সরে দাঁড়িয়ে সে দুজনকে ঢুকতে দিল। একজন নারী এবং একজন পুরুষ ঘরের ভেতরে ঢুকে। নারীটি কমবয়সী একটি মেয়ে, লাল চুল একটি রুমাল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। পুরুষ মানুষটির চেহারায় একটি অস্বাভাবিক কাঠিন্য।

ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা একজন জিজ্ঞেস করল, কী খবর?

নিষ্ঠুর কঠিন চেহারার মানুষ কিংবা লাল চুলের মেয়ে কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিল না। তারা হেঁটে ঘরের মাঝামাঝি ধাতব টেবিলটার পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসে। পুরুষ মানুষটি নিজের হাতে কিছুক্ষণ মাথাটা চেপে ধরে রেখে সোজা হয়ে বসে বলল, খিদে পেয়েছে। কোনো খাবার আছে?

শুকনো প্রেটিন আর কিছু কৃত্রিম খাবার। খানিকটা রক্তের জেলো।

তাই দাও। উত্তেজক পানীয় নেই?

খুঁজলে একটা বোতল পাওয়া যেতে পারে।

খুঁজে দেখ।

খাবার এবং পানীয় টেবিলে দেবার পর দীর্ঘদেহী মানুষটি এসে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, কী খবর?

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কিছু শুকনো প্রোটিন চিবুতে চিবুতে এক ঢোক উত্তেজক পানীয় খেয়ে বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? তোমরা সবাই খুব ভালো করে জান খবর ভালো না।

সেটা তো জানি। কিন্তু কতো খারাপ?

আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা ছিল নেটওয়ার্ক দিয়ে। নেটওয়ার্ক দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। কিন্তু নেটওয়ার্কটিই নেই আমরা কী করব?

এখন আমরা কী করব?

মানুষের সাথে মিশে যেতে হবে।

মধ্যবয়স্ক একজন মহিলা জিজ্ঞেস করল, তার মানে আমরা কী ধরে নেব রবোমানবের বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে? আমরা মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছি?

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি মাথা ঘুরিয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল, মানুষ নিজেও পরাজিত হয়েছে। আমাদের হাত থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে তারা নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছে, এখন তারা পশুর মতো বেঁচে আছে।

দীর্ঘদেহী মানুষটি বলল, তোমার ধারণা সত্যি নয়। মাত্র দুই সপ্তাহ পার হয়েছে তার মাঝে মানুষ নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। আমি কয়েকটি শহর ঘুরে এসেছি। সেখানে মানুষেরা রীতিমতো উৎসব করছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি কিছুক্ষণ দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে রইল তারপর একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখন আমাদের মানুষের সাথে মিশে যেতে হবে। দরকার হলে এখন আমাদের তাদের উৎসবে যোগ দিতে হবে।

দীঘদেহী মানুষটি বলল, তুমি বলেছিলে বিকেল তিনটার সময় নেটওয়ার্ক দখল হবে। দুই ঘণ্টার ভিতরে মানুষদের আঘাত করতে হবে। শহরগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। রবোমানবেরা তোমার কথা বিশ্বাস করে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে শহরের দখল নেবার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত নেটওয়ার্ক দখল হয় নি-বরং নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়েছে। সারা পৃথিবীর খবর জানি না কিন্তু বেশির ভাগ শহরে রবোমানদের ধরে ফেলেছে। কোথাও কোথাও মেরে ফেলেছে। কোথাও জেলে আটকে রেখেছে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি তীব্র দৃষ্টিতে দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এই সবকিছু জানি। তুমি কেন আবার এই কথাগুলো আমাকে শোনাচ্ছ?

তুমি আমাদের আনুষ্ঠানিক দলপতি। সেজন্যে শোনাচ্ছি। রবোমানবদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব তোমার হাতে ছিল। তুমি কী তোমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছ?

হ্যাঁ। আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি। এর চাইতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না।

তাহলে কেন পৃথিবীর সব রবোমানব দুই সপ্তাহের মাঝে ধ্বংস হয়ে গেল?

সবাই ধ্বংস হয়নি। তুমি কেন অসংলগ্ন কথা বলছ?

দীর্ঘদেহী মানুষটি এক পা অগ্রসর হয়ে বলল, আমি অসংলগ্ন কথা বলছি। রবোমানব হিসেবে আমি আমার দলপতির কাছে কৈফিয়ত চাইছি।

আমি তোমার কাছে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই। যেটা হয়েছে সেটা একটা দুর্ঘটনার মতো। আমরা কেউ ভুলেও চিন্তা করিনি মানুষ হয়ে মানুষেরা নিজেরা নিজেদের মাথায় গুলি করবে। নেটওয়ার্ক ধ্বংস করবে।

দলপতি হিসেবে তোমার সবকিছু চিন্তা করা উচিত ছিল।

মধ্যবয়স্ক মহিলাটি বলল, তুমি আমাদের দলপতি। তোমাকে সব দায় দায়িত্ব নিতে হবে।

নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটি হঠাৎ এক ধরনের বিপদ আঁচ করতে পারে, সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকায়, তোমরা কী বলতে চাইছ?

কেউ কোনো কথা না বলে তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

নিষ্ঠুর চেহারায় মানুষটি তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা রিভলবার বের করার চেষ্টা করে, কিন্তু তার আগেই দীর্ঘদেহী মানুষটি একটি লোহার রড দিয়ে নিষ্ঠুর মানুষটির মাথায় আঘাত করল। একটা কাতর শব্দ করে সে নিচে পড়ে যায়, তার হাতে তখনো রিভলবারটি রয়ে গেছে। দীর্ঘদেহী মানুষটি রিভলবারটি নিজের হাতে নিয়ে নিষ্ঠুর চেহারার মানুষটির মাথার দিকে তাক করল।

লাল চুলের মেয়েটি তার মাথার রুমালটি খুলে চুলগুলো তার পিঠে ছড়িয়ে পড়তে দিয়েছে। সে আংগুল দিয়ে চুলোর জটাগুলো মুক্ত করতে করতে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, নির্বোধের মতো কাজ করো না। গুলির শব্দ শুনলে মানুষ

সন্দেহ করবে। ওকে যদি মারতে চাও নিঃশব্দে মেরে ফেল।

মধ্যবয়স্ক মহিলাটি টেবিলের ওপর থেকে উত্তেজক পানীয়ের বোতলটা থেকে খানিকটা পানীয় ঢকঢক করে খেয়ে বলল, যদি ওকে মেরে ফেলবে বলেই ঠিক করেছিলে তাহলে আরেকটু আগে মেরে ফেললে না কেন? আমাদের আধবোতল উত্তেজক পানীয় বেঁচে যেত!

দীর্ঘদেহী মানুষটি লোহার রডটি নিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা রবোমানবের দলপতির দিকে এগিয়ে গেল। নিষ্ঠুর চেহারার দলপতি শূন্য দৃষ্টিতে দীর্ঘদেহী মানুষটির দিকে তাকিয়ে থেকে ফিস ফিস করে বলল, থুল সত্যি কথাই বলেছিল! আমাদের কেউ বেঁচে থাকবে না। আমরা সবাই সবাইকে মেরে ফেলব।

দীর্ঘদেহী রবোমানবটি লোহার রডটি ওপরে তুলে প্রচণ্ড বেগে নিচে নামিয়ে আনে। ঘরের দেওয়াল গোল ছোপ ছোপ রক্তে ভরে উঠতে থাকে।
টেবিলে কাচের জারে ডুবিয়ে রাখা মস্তিষ্কটিতে এক ধরনের বিবর্ণ রংয়ের ছোপ পড়েছে। লাল চুলের মেয়েটি সেদিকে তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারল মস্তিষ্কটিতে এক ধরনের সংক্রমণ শুরু হয়েছে। গত কিছুদিন সে নিয়মিত তার বাসায় আসে নি, মস্তিষ্কটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে পারে নি, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে নি। তারা ভেবেছিল রবোমানবেরা সারা পৃথিবীকে দখল করতে যাচ্ছে—আসলে হয়েছে ঠিক তার উল্টো। বনের পশুর মতো এখন রবোমানবেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বিজ্ঞান আকাদেমীর সভাপতি ঠিকই বলেছিল, ভয়ানক বিপদে রবোমানবেরা একে অন্যকে হত্যা করতে থাকে। এক ঘণ্টাও হয় নি তারা তাদের দলপতিকে হত্যা করেছে। নতুন দলপতি কে হবে সেটা নিয়ে বিরোধ হয়েছে, আরেকটু হলেই তাকেও হত্যা করে ফেলতো। অনেক কষ্ট করে সে বেঁচে এসেছে। সময় খুব কঠিন, নিজে বেঁচে আসার জন্যে তাকে অন্য সবাইকে খুন করে আসতে হয়েছে। সে নিজেও গুলি খেয়েছে, আঘাতটা কতোটুকু গুরুতর বুঝতে পারছে না, কোনো হাসপাতালেও যেতে পারছে না—নিজের বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছে।

লাল চুলের মেয়েটি ওঠে দাঁড়িয়ে যন্ত্রণার একটা শব্দ করে মস্তিষ্কের সুইচটি অন্য করে দিল। জিজ্ঞেস করল, তুমি জেগে আছ?।

মস্তিষ্কটি বলল, হ্যাঁ জেগে আছি। আমি আসলে জেগেই থাকি।

আমি কয়েকদিন আসতে পারি নি। তোমার পুষ্টি দিতে পারি নি।

আমি জানি। আমি বুঝতে পারছি আমার মাঝে এক ধরনের প্রদাহ শুরু হয়েছে। আমি খুব আশা করে আছি এখন আমি মারা যাব।

লাল চুলের মেয়েটি যন্ত্রণাকাতর শব্দ করে বলল, আমি তোমাকে মারা যেতে দেব না। আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব।

মস্তিষ্কটি বলল, তুমি এমন করে কেন কথা বলছ? তোমার কী কোনো যন্ত্রণা হচ্ছে?

হ্যাঁ।

কেন?

আমি গুলি খেয়েছি। আমার রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

তোমাকে কে গুলি করেছে? মানুষ?

না। লাল চুলের মেয়েটি বলল, আমাকে অন্য রবোমানব গুলি করেছে। যেই রবোমানবকে আমি হত্যা করেছি তারা আমাকে গুলি করেছে।

মস্তিষ্কটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন রবোমানব হয়ে রবোমানবকে হত্যা করতে গিয়েছ?

লাল চুলের মেয়েটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি সেটা বুঝবে না।

তোমরা কি পৃথিবী দখল করে নিয়েছ?

লাল চুলের মেয়েটি প্রশ্নের উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটি আবার জিজ্ঞেস করল, তোমরা কি পৃথিবী দখল করে নিয়েছ?

লাল চুলের মেয়েটি এবারেও প্রশ্নের উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটা তখন একটু হাসির মতো শব্দ করল। বলল, তার মানে তোমরা পৃথিবী দখল করতে পার নি! আমি জানতাম তোমরা পারবে না।

লাল চুলের মেয়েটি এবারেও কোনো কথা বলল না। মস্তিষ্কটি নরম গলায় বলল, তোমার জন্যে আমার খুব মায়া হচ্ছে। তোমার সাথে প্রতিদিন আমি কথা বলেছি, আমি জানি তুমি অসম্ভব নিঃসঙ্গ একটি মেয়ে। রবোমানবের কোনো বন্ধু নেই। কোনো প্রিয়জন নেই। কোনো আপনজন নেই। আমি যেরকম অসম্ভব নিঃসঙ্গ—আমার যেরকম কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার যেরকম শুরু নেই, শেষ নেই, আমি যেরকম অন্ধকার একটা জগতে থাকি, তুমি এবং তোমার মতো রবোমানবেরাও সেরকম অন্ধকার বোধহীন অনুভূতিহীন একটা জগতে থাক। তোমার জন্যে আমার মায়া হয়। মায়া হয় আর করুণা হয়। অসম্ভব করুণা হয়।

লাল চুলের মেয়েটি টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে বেঢপ একটা রিভলবার বের করে এনে ফিসফিস করে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু তোমার মতো বোধশক্তিহীন অনুভূতিহীন অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন একটা মস্তিষ্ক আমাকে করুণা করবে সেটি হতে পারে না।

তুমি কী করবে?

লাল চুলের মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটি আবার জিজ্ঞেস করল, কী করবে? তুমি কী করবে?

লাল চুলের মেয়েটি খুব ধীরে ধীরে রিভালবারটি নিজের মাথায় স্পর্শ করে। একবার চারিদিকে তাকাল তারপর ট্রিগারটি টেনে ধরে। ছোটঘরটিতে গুলির শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।

মস্তিষ্কটি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? কী হয়েছে এখানে?

কেউ তার কথার উত্তর দিল না। মস্তিষ্কটির চেতনা ধীরে ধীরে অবশ হতে শুরু করেছে। কেউ তাকে বলে দেয়নি কিন্তু সে জানে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। নিজের ভেতরে সে তীব্র একটি প্রশান্তি অনুভব করে। আর কিছুক্ষণ তারপরই সে এই অন্ধকার বোধশক্তিহীন চেতনহীন, আদি-অন্তহীন, মমতাহীন জগৎ থেকে মুক্তি পাবে।

সেই তীব্র আনন্দের জন্যে এই হতভাগ্য মস্তিষ্কটি অপেক্ষা করতে থাকে।

২৮.

খুব ধীরে ধীরে নীহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। পঞ্চম ঘাত কিনিস্কা রাশিমালা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সে ঘুমিয়েছিল, ঠিক যখন সমাধানটা তার মাথায় উঁকি দিতে শুরু করেছে তখন তার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল। যখন সে চোখ খুলেছে তখন হঠাৎ করে সমাধানটা সে পেয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই নীহার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

ক্যাপসুলের ভেতর মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। একটা মৃদু সংগীতের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে সেটি ভেসে আসছে কিন্তু নীহা জানে এটি ঠিক ক্যাপসুলের ভেতরেই তার জন্যে তৈরি করা সংগীতের ধ্বনি। নীহা তার হাতটি নাড়ানোর চেষ্টা করল, দুর্বলভাবে সেটি একটু নাড়াতে পারল। এখনো তার শরীরে শক্তি ফিরে আসে নি। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

নীহা তার চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করে। সে অনুভব করে সারা শরীরে এক ধরনের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এই উষ্ণতাটুকু তার শরীরটাকে জাগিয়ে তুলছে। কতোদিন পর সে জেগে উঠছে? শেষবার যখন জেগে উঠেছিল তখন সেটি ছিল একটি ভয়ংকর দুঃসংবাদের মতো। এবারে? এবারে নিশ্চয়ই ওরকম কিছু নয়। যদি সেরকম কিছু হতো তাহলে ক্যাপসুলের ভেতর এরকম মিষ্টি একটা সংগীতের ধ্বনি তাকে শোনানো হতো না। ক্যাপসুল থেকে বাইরে বের হওয়ার জন্যে সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।

শেষ পর্যন্ত ক্যাপসুলের ঢাকনাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। নীহা ভেতরে ওঠে বসে তারপর সাবধানে ক্যাপসুল থেকে নেমে আসে। একটু দূরে স্বচ্ছ কোয়ার্টজের জানালার পাশে নুট দাঁড়িয়েছিল, নীহার পায়ের শব্দ শুনে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। নীহা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, নুট! কেমন আছ তুমি?

নীহা ভেবেছিল মুট কোনো কথা বলবে না, মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেবে সে ভালোই আছে। কিন্তু তাকে অবাক কয়ে নুট কথা বলল, আমি ভালোই আছি নীহা! তুমি কেমন আছ?

আমিও ভালো আছি! কিনিস্কা রাশিমালার সমাধানটা মনে হয় পেয়ে গেছি!

চমৎকার। শীতলঘরে তোমার ঘুম কেমন হল?।

নীহা অবাক হবার ভান করে বলল, কী আশ্চর্য নুট! তুমি পর পর দুটি কথা বললে! প্রশ্ন করলে! এমনটি তো আগে কখনো হয় নি।

নুট হেসে ফেলল, বলল, আসলে কোয়ার্টজের এই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে গ্রহটাকে দেখে মনটা ভালো হয় গেছে। তাই কথা বলার ইচ্ছে করছিল। তোমাকে দেখে কথা বলে ফেলছি।

গ্রহ? নীহা অবাক হয়ে বলল, আমরা একটি গ্রহে এসেছি? কেপলার টুটুবি?

মনে হয়।

নীহা টলমলে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিস্ময়ের একটা শব্দ করল, বলল, কী সুন্দর! ঠিক যেন পৃথিবী।

কেপলার টুটুবি গ্রহটি তোমাদের পছন্দ হয়েছে জেনে ভালো লাগছে।

ট্রিনিটির কণ্ঠস্বর শুনে দুজনেই ঘুরে তাকাল। ট্রিনিটি বলল, এটি আমার খুঁজে পাওয়া তৃতীয় গ্রহ।

তৃতীয় গ্রহ? তুমি এর আগে আরো দুটি গ্রহে গিয়েছ? নীহা অবাক হয়ে বলল, আমাদের ডেকে তোলনি কেন?

গ্রহগুলিকে ঠিক করে উজ্জীবিত করতে পারিনি তাই তোমাদের ডাকিনি।

উজ্জীবিত? গ্রহকে উজ্জীবিত করে কেমন করে?

মানুষ প্রাণী গাছপালা বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করাকে বলি উজ্জীবিত করা।

এই গ্রহটিকে পেরেছ?

সহ্য সীমার ভেতরে নিয়ে এসেছি।

সেটা কী, বলবে আমাদের?

বলব। অবশ্যই বলব। তোমাদের আরো তিনজন জেগে উঠুক, তখন এক সাথে বলব।

ট্রিনিটির কথা শেষ হবার আগেই অন্য তিনটি ক্যাপসুলের ঢাকনা খুলে যায়। ভেতর থেকে টলমলে পায়ে ইহিতা, টুরান আর টর একজন একজন করে বের হয়ে আসে।

নীহা আনন্দের মতো শব্দ করে বলল, এসো তোমরা। দেখে যাও। আমরা কেপলার টুটুবি গ্রহে এসেছি। আমাদের গ্রহ।

শীতলঘর থেকে সদ্য ওঠা তিনজন টলমল পায়ে এগিয়ে এসে কোয়ার্টজের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, নিজের অজান্তেই তাদের মুখে দিয়ে আনন্দের একটা ধ্বনি বের হয়ে আসে।

ইহিতা বলল, দেখেছ, গ্রহটা ঠিক পৃথিবীর মতো!

ট্রিনিটি বলল, পুরোপুরি নয়। কিছু পার্থক্য রয়েছে, তোমাদের অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে।

কী পার্থক্য? টর জিজ্ঞেস করল, কোনো ভয়ংকর প্রাণী?

না। কোনো ভয়ংকর প্রাণী নেই।

তাহলে?

সূর্যটা বড়। দিনগুলো লম্বা। রাতের আকাশে চাঁদ দুটি।

সেগুলো খুব কঠিন কিছু নয়। দুটি চাঁদ ভালোই লাগবে মনে হয়।

আবহাওয়াতে বৈচিত্র্য কম। মাধ্যাকর্ষণ একটু বেশি, বাতাসে অক্সিজেনও একটু কম। আমি পৃথিবীর প্রাণীগুলো পাঠিয়েছি তারা বেশ মানিয়ে নিয়েছে। তোমরাও নিশ্চয়ই মানিয়ে নিতে পারবে।

টর বলল, আমি আর অপেক্ষার করতে পারছি না। আমি গ্রহটাতে নামতে চাই।

একটু প্রস্তুত হয়ে নাও, এই গ্রহটা হবে তোমাদের নতুন পৃথিবী। আমি সেটাকে তোমাদের জন্যে পাঁচশ বছর থেকে প্রস্তুত করেছি। দেখো তোমাদের পছন্দ হয় কি না।

স্কাউটশিপটা পুরো গ্রহটাকে একবার প্রদক্ষিণ করে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। সমুদ্রের বালুবেলায় স্কাউটশিপটা স্থির হয়ে দাঁড়াল। নিরাপত্তা বন্ধনী থেকে নিজেদের মুক্ত করে সবাই স্কাউটশিপের দরজায় এসে দাঁড়াল।

ইহিতা বলল, সবাই প্রস্তুত?

হ্যাঁ।

দরজাটি খুলব?

খোলো।

ইহিতা দরজার একটি বোতাম স্পর্শ করতেই মৃদু একটা শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল, সাথে সাথে এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস স্কাউটশিপে প্রবেশ করে। সেই নোনা বাতাসে সজীব এক ধরনের ঘ্রাণ। ঠিক তখন একটা বুনো পাখি তারস্বরে ডাকতে ডাকতে স্কাউটশিপের উপর দিয়ে উড়ে গেল।

ইহিতা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা সবাই কী এখন নামার জন্যে প্রস্তুত?

সবাই মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, প্রস্তুত।

চল তাহলে নামি।

চল।

নীহা জিজ্ঞেস করল, কে আগে নামবে?

তুমি। ইহিতা বলল, তোমার পদচিহ্ন দিয়েই এই নতুন পৃথিবী শুরু হোক। নীহা চোখ বড় বড় করে বলল, আমার পদচিহ্ন দিয়ে?

সবাই মাথা নাড়ল। টর বলল, হ্যাঁ তোমার। নতুন পৃথিবীটা শুরু হোক সবচেয়ে নিস্পাপ মানুষের পদচিহ্ন দিয়ে।।

নীহা একটু হাসল, তারপর বলল, ঠিক আছে। তাহলে আমি নামি।

নীহা তখন স্কাউটশিপের সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। শেষ ধাপে পৌঁছে সে হঠাৎ থেমে গেল। পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলল, আমি কি আরেকজনের সাথে তার হাত ধরে নামতে পারি?

ইহিতা হাসিমুখে বলল, অবশ্যই পার নীহা।

নীহা তখন লাজুকমুখে বলল, নুট তুমি কী আমার হাত ধরবে? তুমি আর আমি কী হাত ধরে একসাথে কেপলার টুটুবির এই নতুন পৃথিবীতে নামতে পারি?

নুট বলল, অবশ্যই নামতে পারি নীহা। অবশ্যই।

স্কাউটশিপের ভেতরে দাঁড়িয়ে সবাই দেখল নুট আর নীহা হাত ধরাধরি করে বালুবেলায় পা দিয়েছে। নরম বালুতে পায়ের ছাপ রেখে দুজন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

ইহিতা ফিসফিস করে বলল, দ্বিতীয় পৃথিবীর প্রথম মানব ও মানবী। তারপর সে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে তার চোখ দুটো মুছে নেয়।

কে জানে কেন তার চোখে পানি এসেছে?

গল্পের বিষয়:
সাইন্স-ফিকশন

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত