সময় সমুদ্র

সময় সমুদ্র

জহির একটি স্বনামধন্য রেষ্টুরেন্টে কাজ করে। বড় ধরনের কোনো কাজ না, কাজটা হচ্ছে রেষ্টুরেন্টের ম্যানেজারের এসিস্ট্যান্ট টাইপ।

নানা ধরনের ফুট-ফরমায়েশ খাটার মতো টালটু-ফালটু ধরনের কাজ। জহিরের বয়স ৩৮।

আঠারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পরিক্ষায় অংকে ফেল করার পর থেকে গত বিশ বছরে সে কম করে হলেও ১৭টা কাজ বদল করেছে।

সবই ছোটখাটো চাকরী।
গত বিশ বছরে সে যত চাকরি করেছে তার মধ্যে রেষ্টুরেন্টের চাকরিটা যে শুধু ভাল তাই নয়, অসম্ভব রকম ভাল।
প্রতিদিন বিনা পয়সায় ভাল খাবার পাওয়া যাচ্ছে। এই সৌভাগ্য সহজ সৌভাগ্য না, জটিল সৌভাগ্য।

এমন সৌভাগ্য ক’টা মানুষের আছে? সে এখন নিজেই নিজের ভাগ্যকে ঈর্ষা করে।

পৃথিবীর খুব অল্প সংখ্যক মানুষই নিজের ভাগ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। জহির তাদের দলে।
ছোটবেলায় সে একবার গণককে হাত দেখিয়েছিল। গণক বলেছিল-‘৩০ এর পরের বয়সটা তোমার মহাসুখে কাটবে।

বিরাট সম্মান পাবে।’ এই রেষ্টুরেন্টে কাজ পাবার পর জহিরের ধারনা হয়েছে গণক মোটামুটি সত্যি কথাই বলেছে।

শুধু বিরাট সম্মানের জায়গায় ভুল করেছে। তাকে কেউ সম্মান করে না, সুযোগ পেলে চড়থাপ্পড় মারতে চায়।
গণকের কিছু ভুলত্রুটি হতেই পারে। এই ভুল ক্ষমা করা যায়।
জহির রাতে রেষ্টুরেন্টের বারান্দায়ই ঘুমায়।
মাদুর পেতে শুয়ে পড়লে এক ঘুমে রাত কাবার।
মেস করে থাকতে হচ্ছে না বলে কিছু টাকাও বেঁচে যাচ্ছে। তাছাড়া সে একা মানুষ।

মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকার মতো বিলাসিতা করার তার দরকারটা কি?
এখানে কাজ করতে এসে গত আড়াই বছরে তার আঠাশ হাজার তিনশ টাকা জমে গেছে —

অকল্পনীয় একটা ব্যাপার! টাকাটা ম্যানেজার সাহেবের কাছে জমা আছে।
চাইলেই উনি দেন। সম্প্রতি জহির চার হাজার টাকা নিয়ে একটা মোবাইল সেট কিনেছে।
যদিও তার কথা বলার মতো কেউ নেই তবুও কিনেছে। এই বয়সে কিছু ফুর্তি না করলে কবে করবে?

তাছাড়া ম্যানেজার সাহেব দুরে কোথাও গেলে কল করে খোঁজ খবর নেন।
জহির প্রতিদিন পত্রিকায় রাশিফল পড়ে।
তার বৃষরাশি। সে পত্রিকা হাতে নিয়ে রাশিফল বের করলো। রাশিফলে লেখা—
বৃষরাশির জন্য আজ যাত্রা শুভ। ভ্রমনের যোগ আছে। অর্থ প্রাপ্তির সম্ভবনা। শত্রুর কারণে সম্মানহানির আশংকা।
সম্মানহানির আশংকায় জহির চিন্তিত।
কারণ, সম্মান বলতে গেলে কিছুই নেই। যাও আছে চলে গেলে সমস্যা। রাশিফলের অধিকাংশ কথাই তার সাথে মিলে যায়।
মতিন সাহেবের ঘরের বেল বেজে উঠলো।
জহির প্রায় ছুটে গিয়ে ম্যানেজার সাহেবের ঘরে ঢুকলো। মতিন সাহেব বললেন, ‘তোমার খবর কি জহির?’
‘খবর ভাল স্যার।’
‘একটা কাজ করে দাও—এই খাবারের প্যাকেটটা আমার বাসায় দিয়ে আসো।’
‘জ্বি আচ্ছা স্যার।’
‘আমার বাসা চেন তো—আগামসি লেন।’
‘জ্বি স্যার চিনি।’
‘খুবই জরুরী। এই নাও টাকা। রিক্সা নিয়ে চলে যাও।’
মতিন সাহেব একশ টাকা নোট বের করে জহিরের হাতে দিলেন। জহির টাকা নিয়ে বের হলো।।।
মতিন সাহেবের বাসায় পৌঁছে জহির কলিং বেলের সুইচে হাত দিতেই শক খেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দরজা খুলে গেল।

জহির পা বাড়িয়ে ঢুকেই দেখলো সব অন্ধকার। মনে হলো সে শূণ্যে ভাসছে। তার কোনো ভর নেই।
এভাবে ভাসতে ভাসতে সে জ্ঞান হারালো…।
জহিরের জ্ঞান ফিরেছে। এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে এখন আরো উপরের দিকে যাচ্ছে। জহির মনে প্রাণে দোয়া ইউনুছ পড়া শুরু করলো।

চারিদিকে ধোয়া দেখা যাচ্ছে। জহির নিশ্চিত হলো সে মারা গেছে। কিছু টের পাবার আগেই দেহ থেকে পরানপাখি বের হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সওয়াল-জবাব পর্ব শুরু হবে।
অবস্থার উন্নতি হয়েছে। চারিদিক আলোকিত হয়েছে। তবে আলোর বর্ণটা অপরিচিত। এমন বর্ণের আলো জহির আগে কখনো দেখেনি।
ভবিষ্যতে যে দেখবে, এরকমও মনে হয় না।
‘তুমি কে?’
গম্ভির গলায় প্রশ্ন শোনা গেল। জহির আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই।
প্রশ্নটা বোধহয় তাকেই করা হয়েছে। আবার শোনা গেল,
‘তুমি কে?’
জহির প্রায় কেঁদে কেঁদে বলল, ‘স্যার আমার নাম জহির।’
‘-তুমি এখানে কিভাবে এসেছো?’
‘-স্যার আমি কিছুই জানি না। ম্যানেজার সাহেবের ঘরে ঢুকতে গিয়ে এখানে এসে পড়েছি। গরিবের রিকোয়েস্ট, আমার একটা ব্যবস্থা করেন।’
‘-তুমি এখানে এলে কি করে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
‘-স্যার আমাকে মাফ করে দেন। আমি কিভাবে এসেছি নিজেও জানি না। আমার অন্যায় হয়েছে। এই অন্যায় আর কোনোদিনই করবো না।

আমাকে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন, আমি আপনার জন্য খাস দিলে দোয়া করবো।’
‘-তুমি মাত্রা ভাঙ্গলে কি করে?’
‘-স্যার আমি কোনো কিছু ভাঙ্গিনাই। যা ভাঙ্গার আপনাআপনিই ভাঙ্গছে। যদি বলেন আপনার পায়ে ধরে ক্ষমা চাই।’
‘-তুমি কি বুঝতে পারছো কি ঘটেছে?’
‘-জ্বিনা স্যার, বুঝতে চাইও না।’
‘-তুমি ত্রিমাত্রিক জগৎ থেকে চতুর্থমাত্রিক
জগতে প্রবেশ করেছো।’
‘-স্যার আমি না জেনে ভুল করেছি। আপনি দেখা দেন আপনার পা ধরে ক্ষমা চাই।’
‘-তুমি ভয় পাবে বলেই দেখা দিচ্ছি না।’
‘-স্যার, এখানে আসার আগে যে ভয় পেয়েছি, এমন ভয় জীবনেও পাবো না।
আমাকে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।’
‘-তুমি মাত্রা কিভাবে ভাঙ্গলে সেটাই বুঝতে পারছি না।’
‘-স্যার, আমি সারাজীবন আপনার সার্ভেন্ট হয়ে থাকবো, আমাকে ফেরত পাঠান।’
‘-তোমার নাম যেন কি বললে—জহির?’
‘-জ্বি স্যার, জহির।’
‘-একটা জিনিস বোঝার চেষ্টা করো—তুমি তিনমাত্রার জগতের মানুষ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা দেখে অভ্যস্ত।

তোমারে চারমাত্রার প্রাণী সম্পর্কে ধারনা নেই।’
‘স্যার আপনি বাংলা বলছেন এটাই ভাল লাগছে। আপনার চেহারা খারাপ হলেও অসুবিধা নাই।’
‘-ঠিকাছে আমাকে দেখো।’
জহির একধরনের ধাক্কা অনুভব করলো। তারপর দেখলো তার সামনে যে আছে সে কাচের তৈরি। একদম স্বচ্ছ।

কখনো মনে হচ্ছে মানুষের মতো, কখনো যন্ত্রের মতো। এমন একটা কুৎসিত প্রাণীকে মানুষ মনে হবার কোনো কারণ নেই।

প্রাণীটি বললো, ‘তুমি কি ভয় পাচ্ছ?’
‘-জ্বি না স্যার। স্যার একটু পিসাব করবো।’
‘-কি করবে?
‘-প্রস্রাব করবো, বাথরুম কোন দিকে?’
‘-ও আচ্ছা বর্জ্য নিষ্কাশন। আমাদের এমন ব্যবস্থা নেই।’
‘-বলেন কি?’
‘-আমরা দেহধারী নই। আমাদের খাদ্য গ্রহনের যেমন প্রয়োজন নেই, বর্জ্য নিষ্কাশনেরও প্রয়োজন নেই।

এখন তুমি টয়লেটে যেতে চাচ্ছ আমার ধারনা একটু পর খাবার চাইবে।’
‘-সত্যি বলতি কি স্যার ক্ষিদে পেয়েছে।
সকালে নাস্তা করা হয় নাই। এতক্ষণ চক্ষুলজ্জায় বলতে পারিনাই। খাবার আছে?’
‘-না খাবার নেই।’
‘-এই জায়গা তো তাহলে সুবিধার না।’
‘-আমাদের জায়গা আমাদের মতো—
তোমাদের জায়গা তোমাদের মতো।’
‘-আপনাদের তাহলে পিসাবপায়খানা হয় না?’
‘-না।’
‘-তবুও গেষ্টদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল।’
‘-তোমাদেরতো এখানে আসার উপায় নেই।’
‘-একটা মিষ্টেক কথা বললেন স্যার। আমি এসেছি।’
‘-হ্যাঁ তুমি এসেছো। কিন্তু কিভাবে এসেছো বুঝতে পারছি না।’
‘-নিজের ইচ্ছায় আমি আসি নাই। যেখানে খাবার আর পিসাবপায়খানার ব্যবস্থা নাই
সেখানে কেউ নিজের ইচ্ছায় আসে? তাও যদি দেখার কিছু থাকতো। আপনাদের এখানে সমুদ্র আছে?’
‘-হ্যাঁ আছে তবে তোমাদের সমুদ্রের মতো
না। আমরা সময়ের সমুদ্রে বাস করি।
তোমাদের সময় নদীর মতো প্রবাহমান, আমাদের সময় সমুদ্রের মতো স্থির।’
‘-স্যার আপনার কথা বুঝলাম না।’
‘-তোমাকে বোঝানো সম্ভব না।
পদার্থবিদ্যায় জ্ঞান থাকলে সম্ভব হতো।’
‘-লজ্জা দিবেন না স্যার। আমি অতি মূর্খ।
এসব বুঝিনা। মূর্খ হবার সুবিধাও আছে, সবাই মূর্খকে পছন্দ করে।’
‘-ও আচ্ছা।’
‘-মতিন স্যার আমাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন তার কারণ একটাই—আমি মূর্খ।’
‘-জহির তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
‘-ঐযে বললাম মূর্খদের সবাই পছন্দ করে।
আপনি জ্ঞানি আপনাকে কেউ পছন্দ করবেনা। সত্যি বলতে আমি আপনাকে ভয় পাচ্ছি।’
‘-ভয়ের কিছু নেই। তোমাকে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করছি।’
‘-শুকরিয়া।আপনার পা থাকলে ভাল হতো, পায়ে চুমা দিতাম।’
‘-তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে যে কারণে তুমি ফিরে যাবার পর তোমার জীবন আনন্দময় হবে।’
‘-স্যার আমিতো আনন্দেই আছি।’
‘-আনন্দ থাকলেও তোমার জীবন অর্থহীন।
অন্যের ফরমায়েশ খেটে জীবন কাটাচ্ছো।’
‘-কি করবো স্যার? ম্যাট্রিক পরিক্ষায় অংকে ফেল করলাম।’
‘-তোমাকে পাঠাচ্ছি অংক পরিক্ষার আগের
রাত্রে। তুমি সেখান থেকে জীবন শুরু করবে।’
‘-সেটা কিভাবে সম্ভব?’
‘-সময় আমাদের হাতে। তোমার বুদ্ধিবৃত্তি উন্নত করে দিচ্ছি। পড়াশোনায় তুমি মেধার পরিচয় দেবে।’
‘-অংকটা নিয়ে স্যার বেশি সমস্যা।
বেড়াছেড়া লাগে।’
‘-আর বেড়াছেড়া লাগবে না।’
‘-স্যার এখন কি আমি যাচ্ছি?’
‘-কিছুক্ষণের মধ্যেই যাচ্ছো।’
‘-ম্যাডামকে আমার সালাম দিবেন।’
‘-তোমাকে আগেও বলেছি—আমরা দেহধারী নই। আমাদের মধ্যে নারীপুরুষের কোনো ব্যাপার নেই।’
‘-সব আল্লাহর ইচ্ছা। দোয়া রাখবেন স্যার।
স্লামালিকুম।’
প্রচন্ড ঘুমে জহিরের চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। সে গভির ঘুমে তলিয়ে গেল। পরিশিষ্টঃ জহিরের ঘুম ভেঙ্গেছে।

কাল সকাল দশটায় গণিত পরিক্ষা। এখন কিনা সে পড়া বাদ দিয়ে ঘুমাচ্ছে? কি সর্বনাশের কথা!!!

পিথাগোরাসের উপপাদ্যটায় একটু চোখ বুলাতে হবে। উপপাদ্যটা পরিক্ষায় আসবেই……..।

গল্পের বিষয়:
সাইন্স-ফিকশন
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত