শেষ চিঠি

শেষ চিঠি

তিনদিন পর আজ জানালা খুলে আকাশ দেখা হলো| বিশাল এই আকাশের নীচে এই আমি নিঃশব্দে বসে তানিয়াকে ভাবছি|আকাশের মতো যদি তানিয়াদের মনটা এতোটা বিশাল হতো তবে বোধয় এতোটা কষ্ট পেতে হতো না| এতোটা কষ্ট পেয়েছি,তানিয়ার অনুরুধে তার সাথে শেষ দেখাটা পর্যন্ত করিনি|এমনকি তানিয়ার দেয়া শেষ চিঠিটা এখনো বিছানার নিচে পড়ে আছে,খুলে দেখা হয়নি| কেনো দেখবো?কার জন্য দেখবো|তিনদিন হলো তানিয়ার বিয়ে হয়েছে|প্রতারক তানিয়া এখন অন্যের ঘরের লক্ষি বউ| ভালোবাসা তার কাছে তুচ্ছ ব্যাপার টাকার কাছে| একজন ইংল্যান্ড প্রবাসির ছেলের হাত ধরে আজ তার সুখের সংসারে হাবুডুবু খাচ্ছে তানিয়া|মেয়েরা কি আসলেই এরকম| প্রেম করে একজনকে আর বিয়ে করে প্রভাবশালী কোন ছেলেকে| কি যে অদ্ভুদ নেশা তাদের|মনটা কেমন করে উঠলো|?সামান্য ভবিষ্যত নিশ্চিতের আশায় ৭ বছরের রিলেশন ভেঙ্গে দিয়ে দিব্যি আজ অন্যের বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে| অথচ আমার চোখ বুক জুড়ে সে| এমন কেনো করলে তুমি তানিয়া? এত টাকা দিয়ে কি করবে তুমি? আমি যে চাকরীটা করি তা দিয়ে তো দুজনের সংসার ভালোই চলতো| মাথাটা কেমন ঝিম ধরে আছে|আর ভাবতে পারছি না|
আচ্ছা চিঠিতে কি লিখেছে তানিয়া|হয়তো সরি বলবে,নাহয় কিছু আবেগের কথা| আচ্ছা একবার কি চিঠিটি পড়া দরকার?
আস্তে আস্তে চিঠিটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলে পড়া শুরু করি…তানিয়া লিখেছে…

সুপ্রিয়
কতোদিন হয় তোমাকে দেখিনা|অনেকবার অনুরুধ করে শেষ দেখাটা হলোনা তোমার আমার| বিশ্বাস করো,বিধির অমোঘ বিধান আমি মেনে নিয়েছি|আসলে মেনে নেয়া শিখে গেছি| কত কিছুই না মেনে নিলাম| কষ্ট ? হুম হয়,অনেক হয়|কাউকে বুঝাতে পারিনা|বুকের ভেতর অভিমান জমে জমে পাথর হচ্ছে| কিন্তু বলতে ও পারিনা|কেউ যে শুনে না প্রিয়| ভেবেছিলাম,কেউ না বুঝুক,অন্তত পৃথিবীতে একজন আছে যে আমাকে বুঝে|কিন্তু এতোটাই অভিমানে দূরে থাকলে কিছুই তোমাকে জানানো হলোনা বলেই এই চিঠি লিখা| যখন এই চিঠিটি তুমি পাবে তখন আমি অন্য ভুবনে থাকবো| ভাবছো,খুব ভালো থাকবো তাই না| যদি মনে করো টাকাই সব তবে তাই নাহয় থাকবো| আমাকে বেঈমান,বিশ্বাসঘাতকিনী ভাবছো তাই না|অবশ্য ভাবতেই পারো কিন্তু আজ তোমাকে কিছু বলে যেতে চাই নিঃশব্দে|
প্রিয় তুমি জানো আমার বাবা ক্যান্সারের রোগি| আমার ভাই বোন দুটি পড়াশুনা করছে|আমাদের সংসার চলে আম্মার টিউশনির উপর ভর করে| আমি শত চেষ্টা করে একটি চাকরী পাইনি| বাবা ধুঁকে ধুঁকে মরছেন আর আমি অসহায় হয়ে শুধুই চেয়েই আছি,কিছুই করতে পারছি না|কি যে কষ্ট হতো প্রতিনিয়ত তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না| একটা অসহায় ফ্যামিলির করুন আর্তনাদ আমি রোজ রোজ শুনতে শুনতে পাথর হয়ে গেছি| আমি এতসব কষ্টের কথা তোমাকে বলে তোমার কষ্ট বাড়াতে চাইনি| আমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু বাবার অসুখ শুনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন|আমি এত কিছু জানতাম না| বাবার এতো ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন কিন্তু কোনদিন বাবা সাহায্যের কিংবা অসুখের কথা জানাননি|উনি ইংল্যান্ড থাকেন স্বপরিবারে| সেদিন বাসায় এসে সব দেখে বাবাকে অনেক গালমন্দ করলেন আর জড়িয়ে ধরে কাদঁলেন দুজন অনেক সময়| আমি শুধু দূর হতে বন্ধুত্বের ভালোবাসার নিদর্শন দেখছি আর অবিরত চোখের অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছি| বাবার অনেক না করা সত্ত্বেও বাবার ট্রিটমেন্টের দায়িত্ব নিলেন|
এর বেশ কিছুদিন পর একদিন বাবা আমার হাত ধরে অনেক্ষন কাদঁলেন আর কিছু কথা বললেন যা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম,শুধু চোখে জল রেখে নিজের রুমে বালিশ চাঁপা দিয়ে হাউমাউ করে কেদেঁছি|
বাবা আমাকে বললেন,জীবনে তোর কাছে কিছুই চাইনি,আজ চাইবো,তোকে না জানিয়েই আমি আমার বন্ধুকে কথা দিয়েছি তার ছেলের সাথে তোর বিয়ে|
প্লিজ মা তুই তো জানিস ও আমাদের জন্য কি করেছে| কিন্তু ও বিনিময় চায়নি|শুধু তোকে তার ছেলের বউ করার প্রস্তাব দিয়েছে,তাও তোর মতামত হলে|
কিন্তু আমি বলে দিয়েছি আমার মেয়ে লাখে একটা,সে অমত করবে না|তার ছেলেও তোকে পছন্দ করেছে|ওরা কাল আসবে তোকে দেখতে|
এখন আমার সম্মান তোকে রাখতে হবে মা|তুই না করিস না|আজ তোর কাছে হাত জোড় করে চাইছি|

আমি কি বলবো?শুধু বলেছি বাবা তুমি যা চাইছো তাই হবে|আর কিছু বলতে পারিনি|অনেক কষ্ট হয়েছে কিন্তু পারিনি আমি তোমার ভালোবাসার দাম দিতে|হ্যা আমি বেঈমান| কিন্তু এছাড়া আমার ফ্যামিলির জন্য আমি আর কি করতে পারতাম| আমার ভালোবাসা আমি ত্যাগ করেছি ফ্যামিলির জন্য|
আমি জানি তুমি আমাকে মাফ করবে না| এই কথাগুলো আমি নিজে সরাসরি বলতে চেয়েছি,কিন্তু তুমি দেখা করোনি|
আমি বউ সাজবো কিন্তু তোমার হতে পারবো না,এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কি হতে পারে?
অনেক কষ্ট হচ্ছে|বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিন্তু হাসি মুখে নিয়তি মেনে নিয়েছি| কষ্ট লাগছে একটা নিষ্পাপ তোমাকে দুঃখ দিচ্ছি| তোমার কোন দোষ ছিলোনা তবু তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি|এই পারলে মাফ করে দিও|
আমি জানি না,এই নশ্বর পৃথিবীতে কদিন থাকবো কিন্তু যতোদিন থাকবো এই দেহ,প্রান তোমারি নাম ঝপবে| হয়তো ভেতরের কান্না রেখে হাসি মুখে সংসার করবো|অভিনয়ে চলবে সংসারের দিনগুলো| কেউ জানবে না কিসের হাহাকার ভেতরে|
আমিতো জানি তুমি কতোটা হৃদয় জুড়ে আছো আমার|অনেক ভালোবাসিরে|
ভালো থাকিও তুমি|আমার অবহেলায় নিজেকে কষ্ট দিও না|মনে করো একটা নষ্ট মেয়ে তোমাকে ভুলে গেছে| পারলে ক্ষমা করো|আর দেখা হবে না|এটাই শেষ চিঠি,এটাই শেষ কথা|ভালো থাকিও|লাভ ইউ ফরএভার প্রিয়|
ইতি
এক নষ্ট মেয়ে
তানিয়া

চিঠি পড়ে নিজেকে সামলাতে পারি না|বুকের ভেতর তোলপাড় হচ্ছে|খোলা আকাশে এসে দাড়াঁই একা একা|খুব কান্না পাচ্ছে আজ|তানিয়া অনেক ভালোবাসিরে তোকে|শেষ দেখা হলো না|ভালো থাকিস,ভীষন ভালো থাকিস তুই|নিশ্চয় অন্য জনমে তুই আমার হয়ে জন্মাবি|

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত