খুব মেঘ করে এলে…

খুব মেঘ করে এলে…

টিক টিক টিক টিক…অ্যাকাউন্টিং ক্লাসের বকবকানি থেকে মন সরিয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে মনোযোগ দিল তিতলী। মাত্র ১১ মিনিট পার হয়েছে! ক্লাস শেষ হতে এখনও অনেএক দেরি। মোবাইলে গেমস খেলা যায় কিছুক্ষণ। স্যারের দিকে চোখ রেখে সাবধানে ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করে তিতলী। নো মিসড কল…নো মেসেজ। মন খারাপ করব না করব না করেও মনটা খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে অনেকবার করে বুঝিয়েছে ও আর এগুলোকে পরোয়া করবে না। কিছুতেই কিছু হয় না। নিজের মানসিক শক্তিকে একবার মনে মনে গাল দিল তিতলী।

স্যারের বই বন্ধ করার সাথে সাথে ঝড়ের গতিতে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল তিতলী। আর এক মুহূর্তও ঐ ক্লাস থেকে বের হলে পাগল হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। ঠিক এসময় দেখে রেলিং-এ হেলান দিয়ে খুব আয়েশ করে সিগারেট খাচ্ছে অরিত্র। এক ছুটে ওর কাছে যাওয়ার ইচ্ছেটাকে গলা টিপে মারল তিতলী। খুব ধীরে সময় নিয়ে আগাতে হবে। এইটুকু সময়ের মধ্যে মাথায় গুছিয়ে নিল প্রশ্নগুলো। অরিত্রর সামনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বলল- হাই! অরিত্র ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে অন্যদিকে ফিরে বলে- রাত পোহালে পাখি বলে দে রে খাই দে রে খাই! ব্যস! মাথার ভিতরে গুছিয়ে রাখা কথোপকথন পুরাটা এলোমেলো হয়ে গেল। এত যত্ন করে যে নিজেকে গুছিয়ে উঠেছিল তিতলী, তার সবটুকু ভেঙ্গে পড়ল। চিৎকার করে তিতলী বলে- কি বল্লা! কি বল্লা তুমি?!

অরিত্র খুব অবহেলায় সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে তিতলীর গাল ধরে বলে উঠল- কেমন আছো, তিতলী পাখি? তিতলীর গগনবিদারী রাগটুকু জল হতে এটুকুই যথেষ্ট। তিন তিনটা মাস এই মানুষটাকে না দেখে ছিল তিতলী। ও কিভাবে রাগ করে থাকে! তিতলির মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে অরিত্রর সাথে রাগ হয়ে থাকে, অনেকক্ষণ। পারে না! ওর অনুভূতিগুলো নিয়ে এরকম টেবিলটেনিস খেলতে শুধু অরিত্রই পারে। রাগ কমে গেলে অরিত্রর দিকে ভাল করে তাকায় তিতলী। দাঁড়িগোঁফের জঙ্গলে ভরে গেছে সারামুখ। অরিত্রর সেই বাচ্চা বাচ্চা ভাবটা আর নেই। গা থেকেও কেমন যেন একটা পুরুষালি গন্ধ আসতেছে। কাছে ঘেঁষে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় তিতলী। মনে হল এই তিনমাস কেমন যেন অক্সিজেনের অভাবে ছিল ও। এখন শান্তি লাগতেছে।

হাঁটতে হাঁটতে প্রথম কথা তিতলীই বলে- কি ব্যাপার দাঁড়ি রাখছ নাকি? অরিত্র কিছুক্ষণ ঘ্যাঁসঘ্যাঁস করে দাঁড়ি চুলকিয়ে বলে- “হুঁ! যেখানে ছিলাম সেখানে দাঁড়ি কামানোটা বাহুল্য। খারাপ লাগে না। ভাবছি রেখেই দেব।” – তা কোথায় ছিলে এতদিন? – এতদিন আর কই! মাত্র তো তিনমাস। তিতলী তীব্র চোখে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলে,”তিনমাস আমার কাছে অনেক সময়!” অরিত্র বিকট হেসে চোখ নাচিয়ে বলে ওঠে,”কেন? এই তিনমাসে আর কারো প্রেমে পড়ে গেছ নাকি?” তিতলী খুব ঘাঁড় বাঁকিয়ে বলে,”পড়তেও তো পারি!” অরিত্র হেসে ওঠে। খুব রাগ হয়ে গেল তিতলীর- “কেন? তোমার কি ধারণা তুমি ছাড়া আমি আর কাউকে ভালবাসতে পারব না?” অরিত্র ওর থুঁতনীটা একটু নাড়া দিয়ে বলে,”তা না ভাবলে কি আর তোমাকে ছেড়ে এভাবে এতদিন থাকতে পারতাম?” তিতলী কিছু বলে না। কিছুক্ষণ পর অরিত্র নিজেই উত্তর দেয়-“কুষ্টিয়ায় ছিলাম। লালনের আখড়ায়।” তিতলী আবারো ঘাঁড় বাঁকা করে জিজ্ঞেস করে,”তা এবারের ডুব মারার উদ্দেশ্যটা কি?” অরিত্র একটু হেসে উত্তর দেয়,”প্রবৃত্তির বাসনাকে খুন করতে গিয়েছিলাম।” – খুন হল? – নাহ! এত কি সোজা? তবে কন্ট্রোল করতে পারি আর কি! -“তাই?” বাঁকা চোখে প্রশ্ন করে তিতলী। অরিত্র মুচকি হেসে বলে,”মনে তো হয়! নাহলে তোমাকে ছিঁড়ে খাওয়ার ইচ্ছেটা যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তাকে দমিয়ে রাখতে পারছি কি করে?” একটু লাল হয়ে যায় তিতলী। অন্য দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে- একটা ফোন করা যেত না? কিংবা চিঠি লেখা যেত না? “কি লিখতাম চিঠিতে? সব তো জানোই!” তিতলী একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আবৃত্তি করে- “খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে। তাই লিখো। করুণা করে হলেও চিঠি দিও। মিথ্যে করে হলেও বোল- ভালবাসি।” ওরা কেউ কিছু বলে না অনেকক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে গন্তব্যে পৌঁছায় তিতলী। অরিত্র তিতলীর গাল ধরে একটু আদর করে দেয়। চোখে চোখ রেখে আস্তে বলে,”ভালোবাসি” তিতলীর খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে এটা কি করুণা করে বলা? মিথ্যে করে বলা? তিতলী কিছু বলে না। কি দরকার এই দুর্লভ মুহূর্তটুকু নষ্ট করার। সেদিন সন্ধ্যা আর রাতে খুব কথা হয় ওদের দুজনের। জমিয়ে রাখা কথা। ভালবাসার কথা। কথা বলতে বলতে রাত ভোর হয়। তিতলী ফোন কানে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

পরদিন থেকে অরিত্রর ফোন আবারও বন্ধ…

অরিত্রর সাথে তিতলীর সম্পর্ক অনেকদিনের। দিন-তারিখ-বছর মনে নেই। শুধু মনে আছে এরকম ডুব দিয়ে একদিন ভেসে ওঠার পর তিতলী খুব রাগ হয়ে কেঁদে বলেছিল,”এরকম আর করবা না! জানো না আমি তোমাকে ভালোবাসি?” সেই থেকে শুরু। কিন্তু অরিত্রর ডুব দেয়া স্বভাব বন্ধ হয়নি। অরিত্রকে তিতলী চেনে খুব ছোটবেলা থেকে। অরিত্রদের পাশের বাসায় থাকতো ওরা। অরিত্ররা ছিল বিশাল বড়লোক। ছোটবেলায় একসাথে স্কুলে পড়েছে। প্রতিদিন বিকেলবেলায় তিতলীরা খেলতে নামত। শুধু অরিত্রকে দেখা যেত জানালার শিক ধরে কেমন লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত ওদের দিকে। অরিত্রকে কখনো খেলতে নামতে দেখেনি ওরা। তারপর থেকেই কেমন যেন মায়া পড়ে যায় ছেলেটার উপর। জানালার পাশে বসে প্রতিদিনই ছোটখাটো আড্ডা দেয়া হত তিতলী আর অরিত্রর।

একদিন তিতলীর বাবা বদলী হয়ে ঢাকার বাইরে চলে যান। তখন বিশাল বিশাল চিঠি লিখত ওরা। একদিন খবর পায় অনেক টাকা পয়সা রেখে অরিত্রর বাবা মারা গিয়েছেন। অরিত্রর মা ছিল না। তখন তিতলী ইন্টার পরে। অরিত্রর কথা ভেবে খুলনা থেকে ছুটে এসেছিল তিতলী। এসে দেখে অরিত্রর বাসার দরজায় বিশাল একট তালা। এরপর অনেকদিন চিঠি লিখেছে তিতলী। কোন উত্তর পায় নি। ততদিনে তিতলীর বাবা রিটায়ার করেছেন। তিতলীরা ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে সেখানে এসে উঠেছে। এইচ এস সি শেষ করে তিতলী তখন ঢাকাতেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ঢুকেছে। এরকম এক সময়ে আবার দেখা পায় অরিত্রর। ঠিক এরকমভাবেই ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। কয়েকদিন কথা হত খুব, খুব ঘোরাঘুরি হত। তারপর আবার ডুব। অনেক জিজ্ঞেস করেও অরিত্রর কাছে কোন উত্তর মেলেনি কেন ও এরকম ডুব দেয়। খুব এলেবেলেভাবে বলেছে অরিত্র- নিজেকে খুঁজি। তিতলী মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত অরিত্রকে। নেশা ছিল না ওর কোন। কলেজ শেষ করেনি কিন্তু অরিত্র যা জানত তার সিকি ভাগ অনেক বড় বড় মানুষকেও জানতে দেখেনি তিতলী। শুধু যদি এই ডুব দেয়াটা বন্ধ হত। দুমাস তিনমাস কোন খোঁজ থাকে না। তিতলীর ইচ্ছা করে মাঝে মাঝে বেঁধে রেখে দেয় অরিত্রকে। তবুও এই অদ্ভুত ভাবালুতাতেই কেন যেন অরিত্রকে মানায়।

এবারে অনেকটা সময় অরিত্র ডুব দিয়েছিল। প্রায় ছয়মাস কোন খোঁজ নেই। তিতলীর ভয় হতে থাকে অরিত্র কি একেবারেই হারিয়ে গেল! এদিকে ওর বাসা থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এসব নিয়ে যখন তিতলী বিশাল যন্ত্রণার মধ্যে আছে তখনই অরিত্র কে দেখা যায় আবারো তিতলীর ক্লাসের সামনে। এবার কোনদিকে না তাকিয়ে তিতলী দৌড়ে যায় অরিত্রর দিকে। অরিত্রকে খুব জোরে করে ধরে ওর বুকে মুখ গুঁজে তিতলী বলে,”এবার আর যেতে দেব না তোমাকে!” অরিত্র ওকে ধরে রাখে। আশেপাশের সব মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে।

কিছু দূর হেঁটে একটা সিঁড়ির উপরে বসে ওরা দুজন। তিতলীই নীরবতা ভেঙ্গে প্রশ্ন করে-“কোথায় ছিলে এতদিন?” অরিত্র উত্তর না দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে তিতলীকে জিজ্ঞেস করে-“কেমন আছো?” – ভাল না। অরিত্র তুমি ফিরবা কবে? – ফিরেই তো আসছি। – এভাবে না! একেবারে ফিরবা কবে? অরিত্র একটু ফ্যাকাসে হয়ে হাসে। তিতলী আবারো জোর দিয়ে বলে,”আমার বাসায় বিয়ের কথা বলতেছে! আমি আর কতদিন ঠ্যাকাবো?” অরিত্র কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিতলী আবারো প্রশ্ন করে,”কি হল? কিছু বল?” – কি বলব? তিতলীর কেমন যেন একটু রাগ হয়ে যায়- “কি বলব মানে? কিছু বলার নাই তোমার? আমার বিয়ে হয়ে যাবে আর তুমি কি করবা? লালনের আখড়ায় মাথা দুলাবা?” অরিত্র একটু ফ্যাকাসে হয়ে বলে,”হয়তো!” – হয়তো মানে? অরিত্র বলে ওঠে,”তুমি আমাকে কি করতে বল? বিয়ে করে সংসার পাতব?” তিতলী ক্ষেপে ওঠে,”তো কি করতে চাও? এভাবেই সারাজীবন কাটবে?” – আমার সারাজীবন কাটবে এভাবেই। – তাহলে এতদিনের সম্পর্কের মানে কি? অরিত্র চুপ করে থাকে। তিতলি কিছুক্ষণ পরে আবারো বলে,”তাহলে আমাকে নিয়ে ঘুরো! প্লিজ অরিত্র এভাবে সবকিছু শেষ করে দিও না। আমার সারাজীবন কেটেছে তোমার অপেক্ষায়। তুমি এখন বলছ যে সব কিছু ভুল?” অরিত্র খুব ফ্যাকাসে মুখে বলে,” তিতলী, আমি খুব চেষ্টা করেছি জানো তো? তোমার কাছাকাছি থাকার। কিন্তু তুমি যখনই খুব ভালবেসে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাও তখনই দূরে গিয়েছি। এত ভালবাসা আমি নিতে পারি না তিতলী। আমি এরকমই। অদ্ভুত। আমি জানি। বাবা কোথাও বের হতে দিত না আমাকে জানো? যখন বাবা মারা গেল প্রথম সুযোগেই ঘর থেকে পালালাম। ঘরের প্রতি ভালবাসা কখনো হয় নি আমার। তোমাকে ভালবেসেছি ঠিকই কিন্তু তুমি মানেই তো ঘর। একটা স্বপ্ন, একটা ভবিষ্যতের আশা। এর কোন কিছুই আমি চাই না। কিন্তু তুমি তো চাও, চাও না?”

তিতলী মাথা নিচু করে বসে থাকে। অরিত্র বলে যেতে থাকে,”তুমি ঘর চাও, একটা বাবু চাও। আমি রাস্তাতে থাকতে চাই তিতলী। বুক ভরে নিশ্বাস নিতে চাই। ঘরের মধ্যে আমার হাঁসফাঁস লাগে। তিতলী আমি খুব চাই তোমাকে আমার সাথে। আমি এরকম কেন বল তো?” তিতলীর কোলের ওপর রাখা হাতে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে। কেন যেন মনে হয় এরকমই হওয়ার কথা। অরিত্রকে ঘরের ভেতর মানায় না। পাগল পুরুষ…উদ্দাম পুরুষের মত এসে অরিত্র যেন সব কিছু নাড়া দিয়ে আবার চলে যাবে- এটাই যেন নিয়ম। অরিত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলে ওঠে-” খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে…” তিতলী মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘ জমেছে… বৃষ্টির লক্ষণ। অরিত্র মনে রেখেছে। তিতলীর মনে হয় এটা যেন অনেক আগের কথা। অনেক আগে তিতলী যেন অরিত্রকে এই কবিতাটা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল। ওরা অনেক হেঁটেছিল সেদিন। এটা যেন অনেক অনেক আগেকার কথা। অরিত্র উঠে পরে। তিতলী ওকে চলে যেতে দেখে। খুব ইচ্ছে করে ওকে ডেকে বলে, তোমার এসব দর্শন রাখো। সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন দেখ। আমি খুব ভালবেসে সব ঠিক করে দেব। এখন আসো বৃষ্টিতে ভিজি। এতদিন একসাথে আছি, অথচ আমরা একসাথে কখনো বৃষ্টিতে ভিজিনি!”

তিতলী কিছুই বলে না…অরিত্রকে হারিয়ে যেতে দেয়। খুব ভালবাসাও কখনো কখনো যথেষ্ট নয়…খুব ভালবাসা থাকার পরও যখন খুব মেঘ করে আসে তখন বড় একা লাগে…একা থাকতে হয়…

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত