একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্নের অপমৃত্যু

একটি সম্ভাবনাময় স্বপ্নের অপমৃত্যু

মেয়েটার নাম দোলা । সদ্য এসএসসি পাস করেছে সে । খুবই মেধাবী নম্র ভদ্র একটি মেয়ে । গায়ে গতরেও ভাল । পরিবারের ছোট হওয়ায় বায়নাও ধরে বেশ ।

পূরণও হয় তাড়াতাড়ি । গ্রামের মেয়ে হলেও পোশাক আষাকে একটুও পিঁছিয়ে নেই । যতটুকুই আধুনিক ততটুকুই নিজ গৃহে ।

মাঝে মাঝে ইচ্ছেও করে একটু আঁধটু সেঁজেগুজে চলাফেরা করতে । কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেয়ায় ইচ্ছে গুলো অার পূরণ হয়না ।

ঢাকা পড়ে থাকে বাবার ধমকের নিচে ।

তারপর আবার দোলার মেজু দুলাভাই নাকি সদ্য দাড়ি টুপি পড়ে মুসল্লি সেঁজেছে । উনার নাম অাকাশ । প্রথম জিবনে প্রবাসী ছিলেন ।

কাড়ি কাড়ি টাকাও কামিয়েছন । তারপর বাংলাদেশে এসে নাকি সিনামা ইন্ডষ্ট্রিতে কিছু দিন কাজ করেছে । একটার একটা ছবি ফ্লপ মারায় এখন সে পাক্ষা মুসল্লি ।

দোলাকেও নাকি এখন নামায, পর্দা করতে তাগিদ দেয় । তবে কোন কারণে মেজু দুলাভাই এরকম সেঁজেছে দোলারও মাঝে মাঝে খটকা লাগে ।

যদিও দোলা মুখ ফোঁটে কিছু বলেনা । তবুও দোলার এরকম বেরসা ইঙ্গিত দুলাভাই ঠিকই বুঝে ।

কলেজ জিবন বেশ ভাল উপভোগ করছে দোলা । বন্ধু বান্ধবও বেড়েছে আগের চেয়ে ঢের । এখন দোলা শুক্রবারেও বাড়ি থেকে বের হয় ।

বাবা মা যদিই কিছু বলে, তখন দোলা কোচিং, প্রাইভেট এরকম বাহানা দেখায় । তাই তাঁরাও কিছু বলেনা। আর এ দিকে দোলা ইচ্ছেমত চলছে ।

মা বাবার একটাই চাওয়া যে, দোলা ভাল রেজাল্ট করবে । সে পড়াশোনা করে ডাক্তার হবে । অনেক সম্মান কামাবে । মা বাবা মুখ উজ্জ্বল করবে ।

এ বিধায় তাঁরা এত জোর খাটায়না দোলার বিষয়ে।

দোলার স্কুল জিবনেই শখ ছিল একটা ভাল মোবাইল ফোনের । যদিও কথা সেরেছে ঘরের ফোন দিয়ে । তবুও নিজের একটা ফোন হবে সে স্বপ্নটা অনেক দিনের ।

তাও আবার এখন সে কলেজ পড়ে । বন্ধু বান্ধবের ফোন থাকলেও এদিকে দোলা অনেকটাই দূর্বল । এবার দোলা চিন্তা করল যে করেই হোক একটা ফোন চাই ।

কিন্তু চাইলেই কি পাওয়া যায় । বাবার কড়া শাসন আর দুলাভাইয়ের সহীহ হাদীস তো আছেই । তবে দোলা কিন্তু চিন্তার কমতি রাখছেনা ফোনের জন্য ।

পাড়ায় তাকে চ্যাংড়া হিরু নামেই চিনে । তাকে দেখলেই ছোট বড় সবাই চ্যাংড়া হিরু করে চিল্লায় । ওর আসল নাম আমিনূল ইসলাম । সম্পর্কে দোলার চাচাতো ভাই ।

ভাব সাব খুব একটা সুবিধে না । সব সময় ইয়ারফোন, শার্টের বোতাম খুলে, ছিঁড়ে প্যান্ট পড়ে । তবে দোলার কাছে গেলে একদম অবুঝ শিশু হয়ে যায় চ্যাংড়া হিরু ।

যেন সুবোধ একটা ছেল । তবে দোলার কাছে কেন এরকম আচরণ করে সেটা চ্যাংড়া হিরু খুব ভাল জানে। একদিন দোলা বলেই ফেলল, আমিনূল ভাই, আপনার তো দুটো মোবাইল সেট ।

আমাকে একটা মোবাইল ফোন দিবেন ? চ্যাংড়া হিরু শোনে তো অবাক । মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি । তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে মোবাইলের সিম খুলে ফোনটা দিয়ে দিল দোলাকে ।

তবে পাড়ার মোটামোটি সবাই জানে চ্যাংড়া হিরু দোলার প্রেমে হাবুডুবু খায় ।

এখন অার রুখে কে দোলাকে । ক’দিনেই ফেসবুক ব্যবহার শিখে নিয়েছে কলেজ বন্ধুদের কাছ থেকে । দিনে কলেজে অার রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে চ্যাট করে ।

একদিন দোলার বড়ো বোন দেখে ফেলছিল । কিন্তু দোলার অাকুতি মিনতিতে আর কিছু হলনা । তবে সেবার বাবার কাছে না বলার জন্য দোলা বেঁচে গিয়েছিল ।
এদিকে চ্যাংড়া হিরুর তর সইছেনা কিভাবে দোলার সাথে কথার বলার একটা পদ্ধতি বের করবে ।

একদিন দোলার ফোনে কি যেন সমস্যা হল তাই গেল..
— আমিন ভাই, ফোনটা দেখেন না কি হল (দোলা)?
— আরে, এ কিছু না, দেখছি____ (চ্যাংড়া হিরু)
— এবার যাই, আমিন ভাই___ (দোলা)।
— আরে বস না একটু (চ্যাংড়া হিরু)।
— না না চ্যাটে কথা হবে ( দোলা)।
— তাই নাকি ফেসবুক ব্যবহার করিস (চ্যাংড়া হিরু)
খুশিতে আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেল চ্যাংড়া হিরু । আমার নায়িকা ফেসবুক ব্যবহার করে এ খুশি রাখব কোথায় ? এরকম হাজারো বাণী অনর্গল বলে যাচ্ছে চ্যাংড়া হিরু ।

এদিকে রাতে ফেসবুক অন করে বসে আছে চ্যাংড়া হিরু । কিন্তু কোন নোটিফিকেশন আসছেনা তাঁর ফোনে । সারা রাত বেচারা ফোনের দিকে চেয়ে চেয়ে কাটাল ।

আর অন্য দিকে দোলা নব্য ফ্রেন্ড হওয়া রাজাকে সময় দিচ্ছি । যতই সময় দিচ্ছে ততই রস জমে ক্ষীর হচ্ছে দোলা রাজার রসায়ন ।

চলতে থাকল দোলা রাজার আদান প্রদান । এবং আরো কত কিছু ।
চ্যাংড়া হিরুর মনে এক অাকাশ দুঃখ নিয়ে বসে অাছে । দোলার বাবা আর চ্যাংড়া হিরুর বাবার পারিবারিক দ্বন্দ্ব থাকায় কারো বাসায় কেউ যায় না ।

চ্যাংড়া হিরু চিন্তা করল এবার যেতেই হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ…
— আমিন ভাই, কি মনে করে (দোলা) ?
— এই তো এমনি (চ্যাংড়া হিরু) ।
— বসেন ভাই ।
— না, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিলি নাতো ?
— ও সরি সরি ।
মোবাইল ফোন দিয়েছি আমি অতচ আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেয়না দোলা । আর বন্ধু বানাবে অন্যদের । না না তা হতে পারেনা ।

দোলার এমন করাটা চ্যাংড়া হিরু অপমানবোধ মনে করল । কিন্তু এ অপমান রাখে কোথায় চ্যাংড়া হিরু । তেলে বেগুনে যেন আগুন ধরেছে বেচারার মনে ।

না এ অপমান মেনে নেয়া যায়না। এর বিহিত একটা কিছু করতেই হবে । ফন্দি এঁটে বসে রইল চ্যাংড়া হিরু । ঝোঁপ বুঝে কুপ দেওয়ার আশায় ।

কখন আসবে মাহেন্দ্রক্ষণ আর কখন প্রতিশোধ নেবে দোলার দেওয়া অপমানের ।

সামনে মাসে দোলার ফাইনাল পরীক্ষা । মা বাবার প্রেশারে এখন আর সেরম ফেসবুক চালাতে পারেনা দোলা । কিন্তু রাজা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে দোলার জন্য ।

দোলারও কি কম জ্বলে রাজার জন্য । বেচারী বাথরুমে গিয়ে হলেও দু’চার অক্ষর লেখে রাজাকে । এদিকে রাজা দোলাকে সব সময় দেখতে চায় ।

তাই সব সময় রাজাকে ছবি দিতে হয় দোলার । না হলে বেচারার মুড অফ থাকে । কিন্তু বাথরুমের ভিতর থেকে কি রকম আর ছবি দেয়াই যায় । নাছুড়বান্দা রাজা ।

ঔখান থেকেই ছবি দিতে হবে দোলার । কি আর করা । প্রেমিক বলে কথা । শালীন থেকে অশালীন ছবিও দিতে হচ্ছে দোলার । এভাবেই যাচ্ছে দিনের পর দিন ।

মা বাবা বিশাল স্বপ্ন নিয়ে বসে থাকে দোলার পড়ার টেবিলের পাশে । ক’দিন পরই পরীক্ষা । তাও আবার ফাইনাল পরীক্ষা বলে কথা ।

পরিবারের সবাই বেশ যত্ন আত্নি করছে দোলাকে । রোজ নিয়ম করে দুধ ডিম কলা আরো কত কিছু তো আছেই । তবুও দোলা ভাল রেজাল্ট করুক।

চ্যাংড়া হিরু ভেবে পাচ্ছেনা কিরা যায় দোলাকে । একদিন গেল দোলার রুমে । গিয়ে দোলার কলেজ ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বগলদাবা করে নিয়ে এল ।

এদিকে দোলাও পিছুপিছু ছুটে এল । এলেই আর কি হবে । কারণ চ্যাংড়া হিরু যা বলে তাই করে । সে দোলার ফেসবুকে ডুকে রাজাকে দেওয়া সব ছবি দোলার টাইমলাইনে পোষ্ট করল ।

পোষ্ট করতেই দু’চার জন দোলাদের বাড়িতে অাসল । এসে কেউ কিছু না বললেও বলতে আর কতক্ষণ । এ সব অপ্রীতিকর ছবি গুলো দেখেই দোলার বাবা অজ্ঞান হয় ।

এ অবস্হায় দোলা কি করবে ঠিক বুঝতেছেনা । একের পর এক লোকের আনাগুনা দেখে দোলা অাত্নহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় ।

দোলা ভাবছে আত্নহত্যা করা ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই । কারণ রাজাকে যে ছবি গুলো দিয়েছি ছিঃ ছিঃ__ ভাবতেই ঘেন্না হচ্ছে দোলার ।

যা ভাবা তাই করল দোলা । দোলার রুমের দরজা জানালা বন্ধ করে ফ্যানের সাথে ঝুলে রইল ।

বাহির থেকে দরজা ভেঙ্গে দেখে একটা ঝুলন্ত লাশ।

সেটা সদ্য পরীক্ষার্থী দোলারই লাশ ।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত