পাগলটা আমার বাবা

পাগলটা আমার বাবা

বালাবাড়ী রেলওয়ে ষ্টেশনে সবসময় একটা পাগলকে দেখা যায়,যে সবসময় এক জায়গায় বসে থাকে আর রেললাইনের দিকে তাকিয়ে কি যেন একলা বিড়বিড় করে বলে,কেউ হয়তো তাঁর এই বিড়বিড় করে বলা কথাকে বুঝতে চেষ্টা করেনা,আর করবেই বা কেন?এ যে একটা পাগল,তবে আমি ইদানিংকালে বেশ বোঝার চেষ্টা করতেছি কারণ পরীক্ষা শেষ কলেজটাও বন্ধ একাকি সময় কাটে না তাই প্রায়দিন পাগলের পাশে বসে তাঁর কথাগুলোকে বোঝার চেষ্টা করি তবে সবটা না বুঝলেও মা ডাকটা বেশ বুঝি এছাড়া অন্য কথা বুঝতে পারিনা। এভাবে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল এখন পাগলের সাথে আমার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ইশারায় কথা বলি মাঝে মধ্যে একটা রুটি এনে দুজনে ভাগ করে খাই,আমি খেতে চাইনি কিন্তু আমি না খেলে যে সে খায়না তাই ভাগ করে খাই।তাছাড়া আমারো অবস্থা ততোটা ভাল না যে প্রতিদিন ২টা করে রুটি কিনবো।প্রতিদিনের মত আজকেও একটা রুটি কিনে এনে পাগলকে খাওঢ়াবো ঠিক ঐ সময় একটা নারী কন্ঠ ভেসে আসলো
»»এই আপনি আমার বাবাকে কি খাওয়াচ্ছেন?
:-কে আপনি?আর কে আপনার বাবা?(অনেকটা অবাক হয়ে)
»»আমি বর্ষা,আর যাকে খাওয়াচ্ছে আমি তাঁর একমাত্র মেয়ে।
:-মজা করছেন?
»»মজা করতে যাব কেন?(একটু রেগে গিয়ে)
:-যদি তাঁর কন্যা হতেন তবে এতোদিন কোথায় ছিলেন?ইনি দিনরাত এখানে কেন পরে থাকেন?বাসায় নেন নি কেন?এটাই কি বাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা?
(একগাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম)
»»সে এক লম্বা ইতিহাস,আর আমি এখানে থাকিনা ঢাকা মেডিকেল পড়তেছি মাঝে মাঝে বাবাকে দেখতে এখানে আসা।(মেয়েটার চোখ দুটি ছলছল করছে)
:-যদি কিছু মনে না করেন তবে একটু বলতেন ইতিহাসটা কি?(একটু অনুরোধের সুরে)
»»শুনুন তবে,আজ থেকে ৯বছর আগের কথা।
—–~~—–
আমার পরিবার বলতে ছিল মা বাবা দাদী এবং আমি।আমার বয়স তখন ১০বছর মোটামুটি বুঝতে শিখেছি,প্রায়দিন আমার মা দাদীকে বকাঝকা করতো।এর কারন দাদী বৃদ্ধা মানুষ প্রতিদিন চলতে গিয়ে যেকোন একটা ভুল করতো আর মা সেটা নিয়ে বকাবকি করতো এমনকি মাঝে মাঝে বাবাকে বলতো যে তোমার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো।একদিন দাদী শোকেস থেকে দাদার রেখে যাওয়া কাঁসার থালাটা বের করতে গিয়ে শোকেসে রাখা অন্যান্য কাঁচের থালা গ্লাস মেঝেতে পরে যায় এবং ভেঙ্গে যায়।এ নিয়ে মা দাদীকে অনেক কটু কথা বলেন আমার ইচ্ছে করছিল প্রতিবাদ করি কিন্তু করতে পারিনি ছোট ছিলাম বলে।সামনে আমার সমাপণী পরীক্ষা সেদিন রাতে আমি পড়া পড়তে ছিলাম দাদী বিছানায় ঘুমিয়ে পরছে,ঐ সময় বাবা অফিস থেকে বাসায় আসেন। সারাদিন অফিস করে রাতে ফিরে বাবা অনেকটা ক্লান্ত হয়ে পরায় একটু শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন,কিন্তু মা বিশ্রাম নিতে দেন নি,দিনের বেলা ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে বড় করে সাজিয়ে বাবার কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন দাদী ইচ্ছা করে এমন করছে।বাবা সব শুনে নিরব ছিলেন হয়তো ভাবছিলেন যে সারাদিন এতটা পরিশ্রম করেও বাসায় এসে একটু শান্তি পান না। বাবার নিরবতায় মা আবার হুংকার ছেড়ে বলেন যে কাল থেকে এখানে হয় তোমার মা থাকবে নয়তো আমি থাকবো,মনে রাখবা অপশন ২টা আমি নয়তো মা,২জন একসাথে থাকবেনা।মায়ের হুংকারে বাবা আবারো নিরব থাকায় মা আর কিছু বলেন নি আর আমিও পড়ার টেবিল থেকে উঠে ঘুমিয়ে পরি।
~~~
পরদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি দাদী আমার পাশে নেই,ভাবলাম হয়তো ফযরের নামাজের পর আর ঘুমায়নি।কিন্তু আরো কিছু সময় পেরিয়ে গেল দাদীকে পাচ্ছিনা তাই দেরি না করে বাবা জিজ্ঞাসা করলাম
»»বাবা দাদী কোথায়?সকাল থেকে দেখছিনা।
:-বলিস কি মা?আমিও তো দেখিনি।চলতো দেখি তোর দাদী কোথায়?
.
বাবাসহ দাদীকে খুজতে বের হই,খুজতে খুজতে বাড়ির পাশে রেললাইনটার কাছে চলে আসি আর এসেই একটু দুরে তাকিয়ে দেখি রেল লাইনে একটা বৃদ্ধার দেহ কয়েক টুকরা হয়ে পরে আছে।বাবাসহ দৌড়ে কাছে আসি আর এসে মুখটা ঘুরিয়ে দেখি এ আর কেউ নয় আমার দাদী।বাবা দাদীকে দেখা মাত্র একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পরেন আর হুশ ফেরার পর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে নেই পাগল হয়ে গেছেন কোথাও আর যান না ঠিক এখানেই পরে থাকেন যেখানে দাদী রেলে কাটা পরেছে। দাদী মারা গেছে বাবা পাগল হয়েছে বাড়িঘর সব অগোছালো হয়েছে তাই একদিন ঘর ঝাড়ু দিতে একটা কাগজের টুকরা পাই আর তাতে লেখা ছিল,, বাবা,আমি বৌমার সব কথা শুনেছি,তাই আমি চলে যাচ্ছি কেন না তুই কখনো আমায় ছাড়বিনা,আর হ্যা বৌমা ও আমার কলিজার টুকরা বর্ষাকে দেখে রাখিস কষ্ট দিস না
বাপ।

তারপর কাগজটা যত্ন করে আমার বক্সে রেখেছি,এর কিছুদিন পর মা আরেকজনকে বিয়ে করে নেন আর ফুফু আমাকে ঢাকায় নিয়ে যান তার কাছে,আর বাবা এখানেই পরে থাকেন কোথাও যান না।আমি মাঝে মাঝে দেখতে আসি তবে বাবা আমাকে চেনেনা।তবে আমার বিশ্বাস একদিন চিনবেন।এখন ডাক্তারি পড়তেছি কারণ আমার বাবাকে যে ভাল করতেই হবে,তিনি যে মানসিক আঘাতে পাগল হয়েছেন আমি সেখান থেকে বাবাকে ফেরাতে চাই,আমার যে বাবার আদর পেতে ইচ্ছে হয়।।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত