আত্মসম্মান

আত্মসম্মান
দ্বিতীয় বার মা হতে চলেছি আমি, চার মাস হবে। এর মধ্যে শ্বশুর বাড়ির সকলের এতো সেবাযত্ন, বিছানা থেকে ফ্লোরে নামতেই দেয় না আমাকে। একজন মহিলা সবসময় আমার পাশে থাকে কখন কি প্রয়োজন হয় আমার, শুধুমাত্র সেজন্য এছাড়া তিনি আর অন্য কোনো কাজ করতে পারবেন না। আমার স্বামীর(স্মরণ) কড়া আদেশ আমার চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়ার তিল পরিমাণ ক্রটি যেন না হয়। ব্যবসার কাজে শত ব্যস্ততার ভিতরেও তিনি এখন আমাকে পর্যাপ্ত সময় দেন পাশে থাকেন।
এমন একজন কেয়ারিং জীবনসঙ্গী প্রতিটি নারী আশা করে থাকেন মনে মনে। ভাবছেন আমি কতো ভাগ্যবতী এমন একজন জীবন সঙ্গী পেয়ে, তাহলে ভুল ভাবছেন উনি আমার এতো যত্ন নেওয়ার পিছনে একটাই কারণ একটা পুত্র সন্তানের। প্রথম সন্তান কন্যা হওয়ায় পর তিনি চান এবার পুত্র সন্তান আসুক পৃথিবীতে আমাদের তাই এতোকিছু। সবসময় বলেন পুত্র সন্তান বংশের প্রদীপ, আর ওনার এতো সম্পত্তি তার একজন যোগ্য উত্তরসূরী হতে পারে শুধুমাত্র পুত্র সন্তান। কিন্তু আমার সন্তানটি সুস্থ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখুক আমি সেটাই চাই, কন্যা কিংবা পুত্র সন্তান এ কথা কখনো আমার মস্তিষ্কে আসে নাই। সন্তান তো সন্তান’ই কন্যা- পুত্রের ভেদাভেদ করি না আমি সেখানে। আমার বড় মেয়ে সাবাহ্, ক্লাস ওয়ান এ পড়ে।
দশবছর আগে ভালোবেসে বিয়ে করেছি আমরা, শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়৷ আমাদের সম্পর্ক টা সহজেই মেনে নেয় দুই পরিবার। পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় বিয়ে হওয়ায়, বিয়ের পর পড়াশোনা সমাপ্ত করাটা বেশ জটিল হয়ে গিয়েছিলো আমার পক্ষে। তবুও আমি আমার জীবনে সফল হতে চেয়েছি এবং পেয়েছি, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করবার দুইবছর হবে। পড়াশোনা আর চাকরির ক্ষেত্রে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছি আমি স্মরণ আর আমার পরিবার থেকে। এভাবেই কেটে গেলো কয়েকমাস পৃথিবীতে আসলো আমাদের দ্বিতীয় কন্যা সন্তান, আলহামদুলিল্লাহ আমি অনেক খুশি। কিন্তু সাবাহ্’র আব্বু অনেক নারাজ, এই সন্তান কে তিনি মেনে নিতেই পারছিলেন না। আমি বারবার বুঝানোর পর, কিছুদিন পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। ছোট মেয়ের বয়স দুই বছর চলছে, এর মধ্যে আমাদের দাম্পত্য জীবনে অনেক ঝামেলা শুরু হলো।
স্মরণ পুত্র সন্তানের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। আমার পৃথিবী এলোমেলো হয়ে গেলো, ভালোবাসি আমি তাকে। তার সাথে অন্য কোনো নারী কে কিভাবে সহ্য করবো আমি এসব ভাবতেই কলিজা থেকে রক্ত ক্ষরণ শুরু হতো আমার। অনেক ঝগড়াঝাটি করে বাবার বাড়িতে চলে আসলাম মেয়েদের নিয়ে। কিছুদিন পর স্মরণ ও শ্বশুর বাড়ির সকলেই আমাদের বাড়িতে আসে। স্মরণ আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ায় ফিরে আসি সে বাড়িতে।
এভাবে আরও কিছু দিন কেটে যায়, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক আর আগের মতো নেই, কেমন যেনো মরিচার জন্ম হয়েছে আমাদের মাঝে। আমিও স্কুল আর সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি, স্মরণ ব্যবসা নিয়ে এভাবেই চলছে জীবন।
এরমধ্যে স্মরণ বাইক এ্যাকসিডেন্ট করে আঘাত পেয়ে চারদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকে। সেসময় বুঝতে পারি স্মরণকে কতোটা ভালোবাসি আমি এখনও । পাগলের মতো কান্নাকাটি শুরু করছিলাম ওকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে দেখে।
দিনরাত জেগে সন্তানদের বাড়িতে রেখে ওর সেবাযত্ন করেছি, আমাকে দেখে স্মরণ ও বদলে গেছে। এক মিনিট এর জন্য আমাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। হাসপাতাল থেকে যেদিন দু’জন এ বাড়িতে আসলাম, মনে হয় এই প্রথম বিয়ে করে এ বাড়িতে আসতেছি আমরা মনটা এমন ছিলো আমাদের। বেশ কিছু দিন স্মরণ বাড়িতে থাকলো ব্যবসার কিছু অবনতি ঘটেছে এতে। স্মরণ আজ রাতে কেঁদে কেঁদে আমাকে বলছে ভবিষ্যতে কি হবে আমাদের, একটা ছেলে সন্তান এর কতো প্রয়োজন আজ আরও ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। পুরুষ মানুষ এর কাঁদতে হয়না, কেঁদো না আর সন্তান আল্লাহর দান এতে দয়া করে মন খারাপ করো না তুমি। আল্লাহ নারাজ হবেন।চোখের পানি মুছে দিয়ে স্মরণকে বুকে জড়িয়ে নিলাম।
ত্রিশ বছর পেরিয়ে আবারও আমি অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে প্রেগন্যান্ট, স্মরণের খুশির শেষ নেই। পুরোপুরি বিশ্বাস এবারের সন্তান ছেলে হবে। আমিও আল্লাহর কাছে দোয়া করি আমাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য যা মঙ্গল তাই যেন হয় আমার জীবনে। কয়েকমাস পর আলট্রাসনোগ্রাফি করে সঠিক ভাবে জানতে পারে না ডাক্তার কি সন্তান হবে।
স্মরণ সবাইকে অবাক করে দিয়ে তখন আমাকে মেয়েরা সহ বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন, ও বাড়িতে আমাদের যা কিছু ছিলো সবকিছু পাঠিয়ে দিলো। ওই রাতটা খুব কেঁদেছিলাম, স্মরণকে বোঝানোর কোনো ক্ষমতা ছিলো না আমার। আমার এমন কঠিন সময় পাশে পাইনি ওকে। স্মরণের বক্তব্য ছিলো ছেলে সন্তান হলে আমাকে শ্বশুর বাড়িতে নিয়ে যাবে অন্যথায় নয়। কোনো দুশ্চিন্তা করি নাই আমি আমার ভিতরে বেড়ে ওঠা নতুন একটা প্রাণের কথা ভেবে। একটা সন্তান জন্ম দিতে নারীর কলিজা ফেটে যায়, সেই কলিজা ভেদ করে সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে। এই কষ্ট পুরুষ কিভাবে বুঝবে। তাই আমাকে ভালো থাকতে হবে আমার সন্তানদের জন্য।
আমার পরিবার এর সবাই আমার পাশে এখন এই পরিস্থিতি তে, আমি যাতে কখনো নিঃসঙ্গতা বোধ না করি সেই জন্য তাদের কোনো ক্রটি ছিলো না। যথাসময়ে সিজার করা হলো, আমার তৃতীয় সন্তান পৃথিবীর আলো দেখলো সেই সাথে মায়ের মুখ। স্মরণ যাতে কোনো ভাবে জানতে না পারে আমাদের কথা তার সবরকম ব্যবস্থা আগে থেকে করে রেখেছিলাম আমরা। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে আসার দুই দিন পর স্মরণ আসলো আমাদের বাড়িতে। আমাকে নিতে এসেছে আমার ছেলে সহ চারজনকে নিয়ে যাবে সে। হ্যাঁ তৃতীয় সন্তানটি পুত্র সন্তান আমার।
— আল্লাহ এতো দিন পর মুখ তুলে দেখলো আমার দিকে, বাড়ি চলো ময়না(আমি)। কই আমার মেয়ে দুটো তৈরি হয়ে নেও সবাই।
দেখি দেখি আমার ছেলে আমার কলিজা, বংশের প্রদীপ কার মতো হয়েছে। এতোক্ষণ একটা কথাও বলি নাই, যেই স্মরণ আমার ছেলের দিকে আসতে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে তখনি পাশে থাকা কাপ আর পিরিচ পরপর দুটোই ছুড়ে মারলাম ওর দিকে। এতোদিন পর এসেছেন সন্তান কে নিয়ে যেতে যদি ও মেয়ে হতো তাহলে কি করতেন আগে সেটা বলেন। চিৎকার করে হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে স্মরণ শুধুই ক্ষমা চাইতে লাগলো। এক পর্যায়ে সে আমার পা ধরে ক্ষমা চাইতে লাগলো। আমি ক্ষমা করি নাই, ওর দেওয়া যে আঘাত আমি পেয়েছি সেটা আর এ জীবনে মুছবে না।
আমি খুব জোরে চিৎকার করতে থাকায় আম্মা এসে ছেলেকে নিয়ে পাশের ঘরে যান, আর আব্বা ও ছোট ভাই স্মরণ কে আমার পায়ের কাছ থেকে তুলে বলেন, আমাদের সন্তান এবং তার সন্তানরা আমাদের বংশের প্রদীপ । তারা এখন থেকে আমাদের সঙ্গে থাকবে, সসম্মানে এ বাড়ি থেকে চলে যাও তুমি। যেতে না চাইলে জোর করে স্মরণ কে বের করে দেয় আব্বা। বিশ্বাস করেন আমার এতে এতটুকু খারাপ লাগে নাই। যে স্ত্রীর মর্যাদা, সন্তানদের ভালোবাসতে জানে না সে হয়তো মানুষ নয়। আর আমি তো আমার জীবনে সফল, আমি একাই মানুষ করতে পারবো আমার সন্তানদের। আমার পরিচয়ে বড় হয়ে উঠবে ওরা। ওই লোকটার প্রতি সকল শ্রদ্ধা, ভালোবাসার সেদিন এই ধ্বংস হয় যেদিন বলেছিলো ছেলে হলে সে ফিরে আসবে অন্যথায় নয়।
আমার কি কোনো আত্মসম্মান নেই, আমি কি পুতুল যে যখন যা ইচ্ছে হলো চাপিয়ে দিয়ে প্রথমে অসহনীয় কষ্ট তারপর নিজেই এসে ক্ষমা চাইবে। এমন ভুলের কোনো ক্ষমা নেই আমার কাছে। ক্ষমা করিও নাই তাকে আমি। আজ আমার বড় মেয়ের বিয়ে সম্প্রদান করলো আমার বাবা, ছেলে এসএসসি পরীক্ষায় সফল ভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে। ছোট মেয়ে মেডিকেল কলেজ এ পড়ার চান্স পেয়েছে। বড় মেয়ে কলেজের লেকচারার। এই তো সার্থক আমার জীবন, সার্থক আমার মাতৃত্ব। নিজের আত্মসম্মান নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে সন্মানের সহিত চলে আজ এই অবস্থানে আমরা।
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত