পরিণাম

পরিণাম
ম্যাসেঞ্জারে দিশার পাঠানো নগ্ন ছবি ও ভিডিও দেখতে বদ্ধ কক্ষে মত্ত হয়ে উঠেছে রিহান ও তার বন্ধুরা। ওপাশের দিশা জানেই না এপাশে তার শরীরটাকে গিলে চলছে কয়েক জোড়া কামুক দৃষ্টি। সে হয়তো ভাবেওনি, বিশ্বস্ত রিহান একা নয়, সঙ্গে আরও কয়েকটা নোংরা মস্তিষ্ক মিলে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগে উন্মাদনায় মেতে উঠবে। বন্ধুদের মধ্যে একজন বলে উঠলো, ‘কী জিনিস পটাইলি রে মাম্মা! পুরাই মাথা নষ্ট।’ একজন আক্ষেপ করে বললো, ‘দোস্ত, আমাকে কিন্তু এখনো সেন্ড করিসনি।’ রিহান হেসে প্রত্যুত্তরে বললো, ‘শান্ত হও মামা। কথায় আছে তো, সবুরে মেওয়া ফলে।’ ‘কিন্তু ভাই যা’ই বলিস না কেন, এই মেয়েকে কিন্তু চাই।’ রিহান ভ্রু উঁচু করে প্রশ্ন ছুঁড়লো, ‘কিভাবে সম্ভব? বললেই কী সব হয়ে গেলো নাকি!’ শয়তানি হাসি হেসে রিহানের এক বন্ধু বললো, ‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে কী করতে হয় মামা?’ রিহান তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলে উঠলো, ‘বাঁকা করতে হয়।’
বদ্ধ কক্ষ জুড়ে নিকোটিনের ধোঁয়া, ক্লেদপূর্ণ কথাবার্তা আর হাসি ঠাট্টায় ভরে উঠেছে। কল্পনায় খুবলে খাচ্ছে সকলে মিলে দিশার শরীর’টাকে। ঠিক এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ। রিহান একা নয়, সকলেই বেশ বিরক্ত হয়ে উঠলো৷ দরজার এপাশ থেকে রিহান কড়া কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘কে? কী হয়েছে?’ ওপাশ থেকে এক ভদ্রমহিলা আতঙ্কিত কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘রিহান। তাড়াতাড়ি দরজাটা খোল বাবা। রুশার কী যেন হয়েছে রে।’ রিহান তার বন্ধুদেরকে ইশারা দিলে সবাই দ্রুত সিগারেটগুলো লুকিয়ে ফেললো। রিহান দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো। ‘মা, রুশার কী হয়েছে?’ চোখ ভরা জল নিয়ে রিহানের মা জবাব দিলেন, ‘কাল রাত থেকে দরজা বন্ধ করে রেখেছে। সকালে নাস্তা করতে ডেকেছি বললো, পরে খাবে। এখন দুপুর একটা বাজতে চললো।’ ‘রাতে খেয়েছিলো?’ ‘না। বলেছিলো, খিদে নেই।’
চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করলো রিহান, ‘তোমায় কিছু বলেছিলো?’ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রিহানের মা বললেন, ‘না। কিছুই বলেনি।’ খানিকটা কড়া স্বরেই রিহান বলে উঠলো, ‘তাই বলে তুমি কিছু জিজ্ঞেস করবে না?’ ‘আমি তো বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছি। কিন্তু ঘন্টা খানেক আগে রুশার বান্ধবী কল করে বললো, ও নাকি কিসব লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেছে আর তারপর ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছে। আমি সেই তখন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছি, দরজা খোলার নাম’ই নেই।’ ভয় পেয়ে যায় রিহান। তাড়াতাড়ি গিয়ে রুশার দরজায় অনবরত আওয়াজ করতে থাকে৷ কিন্তু রুশা দরজা খোলে না৷ রিহানের মা শঙ্কাযুক্ত স্বরে বললেন, ‘কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো না তো মেয়েটা?’ ‘শান্ত হও মা। আমি দেখছি।’ ‘এমনও সময়ে তোর বাবাও ব্যবসার কাজে ঢাকার বাহিরে। আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে রিহান।’ কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন রিহানের মা।
রিহানের কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। দুশ্চিন্তারা মগজটাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। বন্ধুদের সহযোগীতায় দরজা ভেঙ্গে রুশার কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখে মেঝেতে পড়ে আছে রুশা। যেন একটা মৃত লাশ। ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে রিহানসহ সকলে। ‘রিহান! রুশার কী হয়েছে? আমার মেয়েটা বেঁচে আছে তো?’ আঁতকে ওঠে রিহানের মা৷ নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না তিনি। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। ধরা ধরি করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো রিহানের দু’জন বন্ধু। রিহান নিজেকে শক্ত রেখে রুশার দিকে এগিয়ে যায়। রুশার পাশে ঘুমের ঔষধের প্যাকেটগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বুকের মধ্যে মোচড় দেয় রিহানের। খুব আদরের বোনটাকে এভাবে দেখে নিজেকে সামলে রাখতে বেজায় কষ্ট হচ্ছে তার। ‘রুশা বেঁচে আছে। এখনই একটা অ্যাম্বুলেন্স দরকার। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিতে হবে।’ বন্ধুদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলে উঠলো রিহান।
খানিক বাদে অ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। রিহানের মায়ের জ্ঞান ফিরলে তিনিও ছুটলেন সকলের সঙ্গে হাসপাতালে।
‘বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। হয়তো বাঁচানো সম্ভব হবে না। তবুও সৃষ্টিকর্তা চাইলে সব সম্ভব। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব। আপনারা উপরওয়ালাকে ডাকুন এবং নিজেদের মানসিকভাবে শক্ত রাখুন।’ ডাক্তারের কথায় হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন রিহানের মা। চোখ জোড়া ভিজে জল গড়ায় রিহানেরও। ঘটনা সম্পর্কে জানতে রিহান রুশার সবথেকে কাছের বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। ঘটনা শুনে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে রিহান। মাথায় যেন তার আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। রিহানের মুঠোফোনে একটা পর একটা কল দিয়ে যাচ্ছে দিশা। রিহানের এই দুঃসময়ে দূর থেকে সান্ত্বনা হয়ে পাশে দাঁড়ায় এই মেয়েটা। ‘রিহান, কী হয়েছিলো আমাকে বলবে একবার? রুশা কেন এমন করলো?’
মুঠোফোনের এপাশ থেকে রিহান কান্না জড়ানো গলায় বলে, ‘একটা ছেলের সঙ্গে রুশার সম্পর্ক চলছিলো। সম্পর্কটা খানিকটা গভীরতার দিকে মোড় নেয়। একপর্যায়ে রুশা ওই ছেলেকে ওর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রিহান। লাইনগুলো শেষ করতে পারছে না হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। দিশা সান্ত্বনার কথা শোনায়।’একপর্যায়ে রুশা ওই ছেলেকে ওর নগ্ন ছবি পাঠায়। পরে ভিডিও পাঠায়। তারপর ছেলেটা রুশাকে শারিরীক সম্পর্কের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।’ শঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে দিশা, ‘তারপর?’ ‘রুশা ভয় পেয়ে যায় আর সরাসরি না করে দেয়। তখন রুশাকে হুমকি দেওয়া হয়। যদি সে রাজি না হয়, তবে ভিডিও ভাইরাল করে দেওয়া হবে। রুশা এতে আরও ভয় পেয়ে যায়। কারো কাছে বলার সাহসটাও সে হারায়।’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে দিশা। চোখ বেয়ে জল গড়াতেই থাকে রিহানের।
জল মুছে আবার বললো, ‘ঘুমের ঔষধ খাওয়ার আগে ফেসবুকে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে একটা পোস্ট করে রুশা। ঘটনা সম্পর্কে একটা মেসেজ দেয় ওর এক বান্ধবীকে। ওখান থেকেই জেনেছি পুরোটা।”ওই ছেলেটার সম্পর্কে কিছু জানা গিয়েছে?”ছেলেটার ঠিকানাও টেক্সট করেছিলো রুশা ওর বান্ধবীকে। পুলিশ হয়তো এতক্ষণে গ্রেফতার করে ফেলেছে।’ দিশার চোখেও জল চিকচিক করে উঠলো। নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বললো, ‘জানো রিহান, এখন মনে হচ্ছে আমি খুব ভাগ্যবতী। কেননা আমি তোমার মত একজন বিশ্বস্ত মানুষ পেয়েছি জীবনে। আমি জানি, তুমি এমনটা কখনোই করতে না, করবেও না। আমি কী ঠিক বলেছি রিহান?’
গলার স্বর আঁটকে এলো রিহানের। যেন সে বাকরুদ্ধ। শত চেষ্টা করেও দিশার প্রশ্নের উত্তরে ‘হ্যাঁ’ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারছে না সে। রুশার বর্তমান অবস্থানে রিহান যেন দিশাকে দেখতে পাচ্ছে। বারবার সে ভয়ে কুঁকড়ে উঠছে। নিজেই নিজের ভেতরে নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে করা তার পরিকল্পনার পরিণাম এভাবে এতটা জঘন্য রূপ নিয়ে তার সামনে ফলে যাবে সে কল্পনাও করেনি।
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত