কর্মফল

কর্মফল
ভীড় দেখলেই মধ্য বয়স্ক রশিদ সাহেব কায়দা করে ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন আর সুযোগ বুঝে মহিলাদের শরীরে স্পর্শ করেন। বিষয়টা এমন যেন স্পর্শগুলো তিনি ইচ্ছাকৃত করছেন না, ভীড়ের কারণে লোকজনের ধাক্কা ধাক্কি আর চাপাচাপিতে তার দ্বারা অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে যাচ্ছে। আজ বাজারে ঢুকতেই দেখেন রাস্তাঘাট বেশ ফাকা। লোকজন থেকে লোকজনের দূরত্বও বেশ। কিছুদূর সামনে এগুতেই দেখলেন, অল্প বয়সী মেয়েদের বেশ ভীড় জমেছে একটা দোকানকে ঘিরে। রাস্তার এক লোকের থেকে জানতে পারলেন, দোকানটাতে বিভিন্ন রকমের আচার, চাটনি বিক্রি হচ্ছে বেশ কম দামে।
আচার আর চাটনির কথা শুনে তার মুখে জল জমেনি ঠিক কিন্তু এই ভীড়ের সুযোগ নেওয়ার জন্য তার চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো। আচার কেনার বাহানা করে ঢুকে পড়লেন ভীড়ের মাঝে। বেশ কৌশলে মেয়েদের শরীরে হাত ছুঁইয়ে যাচ্ছেন তিনি৷ যে মেয়েই নিজের শরীরে এমন খারাপ স্পর্শ অনুভব করছে, সে মেয়েই ওখান থেকে সরে দূরে দাঁড়াচ্ছে। রশিদ সাহেবকে দেখতে খুব হাসি খুশি আর ভদ্রলোক বলেই সকলের মনে হয়। যার কারণেই সম্ভবত কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করে উঠতে পারে না। হয়তো কেউ বুঝেও উঠতে পারে না, তিনি কাজটা সত্যি সত্যিই ইচ্ছেকৃত ভাবে করছেন। কখনো দেখা যায় যে, ভীড়ের মাঝে কেউ বুঝতেই পারে না কাজটা আসলে কে করেছে। আর এসব সুকৌশলের কারণে তিনি বারবার ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রয়ে যান।
ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় রশিদ সাহেব ঘন ঘন মার্কেটে যান। এই সময়গুলোতে লোকজনের ভীড় বেশি থাকে। সুযোগ বুঝে তিনি তার সাধ্যমত মনের তৃপ্তি হাসিল করে নিতে পারেন। বাড়িতে তার সুন্দরী স্ত্রী থাকলেও তার আকর্ষণ সবসময় অন্য নারীর উপরেই বেশি। তার এই কুৎসিত চেহারা সম্পর্কে তার স্ত্রী অবগত নন। একমাত্র ছেলেকে বেশ কড়া শাসনের মধ্যেই বড় করেছেন রশিদ সাহেব। ছেলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তার ধারণা তিনি একজন যোগ্য পিতা। কেননা তিনি তার সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করতে পেরেছেন। এ নিয়ে তিনি বেশ গর্ব করেন লোকেদের সঙ্গে। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পাশের এলাকাতেই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে অনেক রাত অব্দি মানুষের ভীড় থাকে। কেনা বেচাও বেশ ধুমধামে চলছে সেখানে। খবর পেতেই রশিদ সাহেব যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। খুব প্রয়োজন ছাড়া তিনি কখনো নিজের পরিবারকে নিয়ে এসব আয়োজনে আসেন না।
ঠিক বিকেল বেলায় তিনি একাই চলে এলেন মেলায়। এত মানুষের ভীড় দেখে ভীষণ খুশি হয়ে উঠলেন। আজ বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরবেন বলে ভেবে রেখেছেন তিনি৷ বাড়ির লোকজন কল করে যাতে বিরক্ত করতে না পারে, তাই তিনি তার মুঠোফোনটা বন্ধ করে রাখলেন। ভীড়ের মধ্যে কখনো খুব আস্তে, কখনো বা খুব দ্রুত হাঁটার ভঙ্গিমা করে আশেপাশের নারীকুলকে স্পর্শ করে যাচ্ছেন তিনি। তিনি তার এই জঘন্যতম কাজটাকে মনে মনে বেশ উপভোগ করে চলছেন। সন্ধ্যে হলে আরও বেশি সুযোগ পেয়ে গেলেন। সাহস বেড়ে যায় তার। অন্ধকারের মাঝে তার কলুষিত কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। প্রতিবারের মত এবারও সবার দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেলো তার অপকর্ম। খুশি মনে বাড়ি ফিরতে লাগলেন তিনি। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই অনুভব করলেন কিছু একটা গোলমাল হয়েছে বাড়িতে। রাস্তায় এখনো বেশ লোকজন রয়েছে। সবাই তার দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে আছে। তাকে নিয়ে বাজে টিপ্পনী কাটছে লোকেরা, এমনটাই মনে হতে লাগলো তার।
ঘটনা বুঝতে দ্রুত পা বাড়ায় বাড়ির দিকে। বাড়িতে প্রবেশ করলে দেখতে পায়, বিছানায় তার ছেলে হাত-পা, মাথা জুড়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। দূর্ঘটনা ঘটেছে ভেবে প্রথমে খুব ভয় পেয়ে যান রশিদ সাহেব। পরবর্তীতে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে, তার সন্তানটা বেঁচে আছে। রশিদ সাহেব তার স্ত্রী’কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে হয়েছে?’ তার স্ত্রী চুপ করে রইলেন। রশিদ সাহেব বাসায় ফেরার পর থেকেই খেয়াল করেছেন তার স্ত্রী একদম শান্ত হয়ে চুপচাপ এক কোণে বসে আছেন। যেন সন্তান বেঁচে যাওয়ায় তার স্ত্রী মোটেও খুশি নন। বরং মরে গেলেই তিনি খুশি হতেন। রশিদ সাহেব তার স্ত্রীর পাশে গিয়ে বসলেন। রশিদ সাহেব আস্তে তার হাতটা ধরতেই তার স্ত্রী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। রশিদ সাহেব চুপ করে তাকিয়ে রইলেন তার স্ত্রীর দিকে। তার স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওগো, এর থেকে যদি ছেলেটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যেত আমি এতটা কষ্ট পেতাম না।’
ঘটনা বুঝে উঠতে পারে না রশিদ সাহেব। প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে?’ রশিদ সাহেবের স্ত্রী কান্না জড়ানো গলায় ঘটনা সম্পর্কে বুঝিয়ে বললেন। পুরো ঘটনা শুনে রশিদ সাহেব ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লেন। তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, ঘটনাটা তার ছেলের সঙ্গেই ঘটেছে। রশিদ সাহেবের ছেলে বাসে করে বাড়ি ফেরার সময় এক মেয়েকে উত্যক্ত করলে বাসের যাত্রীরা মিলে তাকে টেনে হিঁচড়ে বাস থেকে নামিয়ে মারধর করে। মেয়েটার বুকে স্পর্শ করলে চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করে ওঠে মেয়েটা। তারপর যাত্রীরা সকলে মিলে গণধোলাই দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওখান থেকেই রশিদ সাহেবের স্ত্রী বাড়িতে নিয়ে আসেন। রশিদ সাহেবের ফোন বন্ধ থাকায় তাকে জানাতে পারেনি কেউ।
রশিদ সাহেবের স্ত্রী হাউমাউ করে আবার কেঁদে উঠলেন।
‘ওগো, আমরা আমাদের সন্তানকে মানুষ করতে পারলাম না। আমরা তো কোনো পাপ করিনি তবে আমাদের সন্তানটা কেন এমন হলো বলতে পারো? সৃষ্টিকর্তা কেন আমাদের এভাবে শাস্তি দিলেন?’ রশিদ সাহেব চুপ করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাকশক্তি যেন তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তার কাছে এই প্রশ্নের উত্তরে বলার মত কিছুই নেই। চোখ বন্ধ করে শুধু তিনি তার পাপের কথা মনে করছেন। সৃষ্টিকর্তা এভাবে তাকে তার কর্মফল ভোগ করাবেন, কখনো সে কল্পনাও করেনি।
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত