ঘৃণার ভালোবাসা

ঘৃণার ভালোবাসা
নিত্যদিনের রুটিন অনুযায়ী নূরীর মিষ্টি কণ্ঠের ধ্বনিতে আসাদের ঘুম ভাঙলো। প্রতিদিনকার মতোই ঘুমকাতুর কণ্ঠে আসাদ বলল, “আরেকটু।” নূরীও রোজকার মতো ফ্যান বন্ধ করে বলল, “ক’টা বাজে তা কি সাহেবের জানা আছে? অফিসে যেতে হবে না?” কথাগুলো বলে নূরী এগিয়ে এলো নাহিয়ানের দিকে, সে আসাদের বুকের সাথে লেপ্টে শুয়ে আছে। পিতার বুকে পরম নির্ভরতার সাথে ঘুমাচ্ছে।
পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি দৃশ্য। তবে এই দৃশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। নূরী ধাক্কা দিয়ে বলল, “নাহিয়ান, উঠো বাবা। স্কুলের সময় হয়ে গেছে।” আস্তেধীরে বাপ-বেটা উঠে পড়লো। নূরী নাস্তা বানানোর উদ্দেশ্যে রান্নাঘরে চলে গেল। বাপ-বেটা মিলে দাঁত ব্রাশ ও হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজ নিজ কাজের উদ্দেশ্যে তৈরি হলো। তারপর নাস্তার টেবিলে বসলো। নাহিয়ানের এলোমেলো টাই দেখে নূরী এসে ঠিক করে দিলো। তারপর আসাদের উদ্দেশ্যে বলল, “টাইটাও ঠিকমতো পরাতে পারো না। আর কতদিন শিখিয়ে দিব?” দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া নাহিয়ান বলল, “তুমি পরিয়ে দিলেই পারো। বাবা তো এসব পারে না।”
– আমার হাত দুটা, দশটা নয়। এখন তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। নূরী তাদেরকে খাবার পরিবেশন করলো। আসাদ খেতে লাগল। নূরী আরেকটা রুটি আসাদের পাতে দিলো। আসাদ বারণ করা সত্ত্বেও জোর করে দিয়ে বলল, “সারাদিন কত কাজ করো। পেটপুরে না খেলে শক্তি পাবে কোথায়?” জবাবে আসাদ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “তোমার কথা স্মরণ করলেই আমি শক্তি পাই।”
– চুপ। মুখে কিছু আটকায় না নাকি? ছেলের সামনে এসব কি বলো?
আসাদ মুচকি মুচকি হাসি দিলো। খাওয়া শেষে সে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের কতে হর্ন বাজাতে লাগল। স্কুলের সময় ঘনিয়ে আসছে। নূরী তাড়াতাড়ি ছেলেকে খাইয়ে দিলো। তারপর গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। আসাদ গাড়ি বের করবে এমন সময় নূরী অপেক্ষা করতে বলে ভেতরে গেল। নাহিয়ানের পানির ফ্লাক্স নিয়ে এলো। তারপর আদর দিয়ে নিত্যদিনের মতো কিছু উপদেশ দিলো। স্কুলে ভদ্রভাবে চলা, বাইরের কিছু না খাওয়া, আম্মু না আসা পর্যন্ত স্কুল থেকে বের না হওয়া ইত্যাদি। নাহিয়ানও রোজকার মতো মাথা দুলালো। আসাদ একটা ফ্লাইং কিস দিলো। নূরী মুচকি হাসি দিলো। তারপর আসাদ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। এই হলো তাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন।
অফিসে বসে আছে আসাদ। আজ কাজের চাপটা কম। মোবাইলের স্ক্রিনে নূরীর নাম্বারটা ভেসে আছে। আসাদ কল করতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না। কোনো এক অদৃশ্য কারণে সে কল বাটনে ক্লিক করতে পারছে না। আসাদ-নূরীকে দেখলে মনে হয় তাদের মাঝে অজস্র ভালোবাসা আছে। অথচ সত্যটা একেবারেই উল্টো। তাদের মাঝে বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই। নিত্যদিনের সকালের রুটিনটা নাটক মাত্র। যাতে নাহিয়ানের মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব সৃষ্টি না হয়। সংসারে যদি অশান্তি থাকে তবে তার প্রভাব সন্তানদের মাঝেও পড়ে। তাই নূরীই এই চুক্তি করেছে। হ্যাঁ, তাদের মাঝে একটি চুক্তি আছে।
আর সেই চুক্তির কারণেই নূরীর আচরণ এমন থাকে। তবে এই আচরণটা শুধুমাত্র লোকজনের সামনেই প্রদর্শন করা হয়। আড়ালে তারা যেন দুটা অপরিচিত মানুষ। কলেজে পড়াকালীন নূরীর একটা সম্পর্ক ছিল। যা ভার্সিটির শেষ দিকে এসে সমাপ্তি ঘটে। নূরীর বাবা ব্যাপারটা জেনে যায় এবং মেনে নেয়নি। জোরপূর্বক নূরীকে আসাদের সাথে বিয়ে দেয়। বিয়ের কিছু দিন পরেই নূরী ব্যাপারটা আসাদকে জানিয়ে দেয়। বলে দেয় স্বামী হিসেবে অন্যকাউকে মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। আসাদ ভেবেছিল সময়ের সাথে ব্যাপারটা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু হয়নি। বরং আসাদের স্পর্শের মাঝেও নূরী তার প্রাক্তনকে খুঁজে বেড়ায়। এরপর থেকে আসাদ কখনোই নূরীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেনি।
সবার সামনে হাসিখুশি থাকলেও আড়ালে দুজনের মাঝেই শুধু কষ্ট। কিছু বছর যাওয়ার পর নাতি-নাতনীর মুখ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকে আসাদের বাবা-মা। ব্যাপারটা নূরীও বুঝতে পারে। তখন নূরী সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে আসাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। সে জানায় একটার বেশি সন্তান নিবে না। আসাদ ভেবেছিল হয়তো সন্তান হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। নূরী সংসারী হয়ে উঠবে। সংসারী ঠিকই হয়েছে। কিন্তু আসাদ আজও নূরীর কাছে স্ত্রীর ভালোবাসা পায়নি। নাহিয়ান জন্মের পর নূরী স্পষ্টভাবে আসাদকে তার কাছে আসতে নিষেধ করে দেয়। আসাদও জোর করেনি। ভালোবাসা তো জোর করে আদায় করা যায় না। তার ঘরে সবকিছুই আছে। নেই শুধু প্রকৃত ভালোবাসা। পরিবারের চোখে যেন এসব না পড়ে তাই আসাদ একই এলাকায় অন্য একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।
অফিস শেষে আসাদ রাতে বাসায় ফিরলো। নূরীর আচরণ দেখেই আসাদ বুঝতে পারলো নাহিয়ান তার দাদা-দাদীর কাছে গেছে। যেদিন নাহিয়ান ঘরে থাকে না। সেদিন নূরীও আদর-সোহাগ দেখায় না। ভাত টেবিলে দেওয়াই আছে। আসাদ ফ্রেশ হয়ে তা খেয়ে নিলো। পরেরদিন সকাল সকালই আসাদ উঠে পড়লো। প্রতিদিনই সে তাড়াতাড়ি উঠে। যেদিন নাহিয়ান ঘরে থাকে সেদিন আসাদ ইচ্ছে করেই বিছানা ছেড়ে উঠে না। নূরীর মিষ্টি কণ্ঠের ডাকাডাকি শোনার জন্য। মিথ্যে ভালোবাসা হলেও সকালের পুরো ব্যাপারটা আসাদ খুব উপভোগ করে। আর মনে মনে ভাবে যদি নূরী এসব মন থেকেই করতো তবে কতইনা ভালো হতো! তবে আজ আর মিথ্যে ভালোবাসার কোনো প্রদর্শন নেই। নাস্তা করে আসাদ সকাল সকালই বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যায় আসার পথে নাহিয়ানকে নিয়ে এলো। যদিও সে আরও কিছুদিন থাকতে চেয়েছিল। কারণ তার স্কুল এখন বন্ধ। তবুও পড়ালেখার নাম দিয়ে আসাদ তাকে নিয়ে এলো।
শুক্রবার হওয়ায় আজ তারা ঘুরতে বের হলো। আসাদ সারাক্ষণ নূরীর হাত ধরে হেঁটেছে। নূরীও আসাদের বাহুডোরে আকড়ে ছিল। দেখলে মনে হয় সুখী দম্পতি। নাহিয়ানকে সাথে নিয়ে তারা অনেক মজা করেছে। স্বাচ্ছন্দ্যেই তারা পুরো বিকালটা একত্রে পার করেছে। তারপর ঘরে এসেছে। রাতে খাবার খেয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়লো। তবে ঘুম নেই আসাদের চোখে। সে অপলক দৃষ্টিতে নূরীর দিকে তাকিয়ে আছে। এক মায়াবী পরী তার পাশেই আছে। অথচ ইচ্ছে করলেও তাকে ছোঁয়া যাচ্ছে না। নাহিয়ান জন্মের কিছু মাস পরের একটি ঘটনা আসাদের প্রায়ই মনে পড়ে। সেদিন রান্নাঘরে রান্না করছিল নূরী। আসাদ এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। নূরী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “এসব কি? আপনাকে না বলেছি আমার কাছে আসবেন না। তবুও কেন শুনেন না?”
– দেখো, অতীত বাদ দাও। এখন তো আমাদের একটা সন্তানও আছে। তবে কেন অশান্তি করতে চাচ্ছো?
– কিসের অশান্তি? আমি কি আপনার দেখাশোনা করছি না? আপনার সন্তানের লালন-পালন করছি না? তবে কিসের অশান্তি?
– সমস্যা তো এই একটাই। নাহিয়ান আমার সন্তান, আমাদের নয়।
– আপনি অহেতুক ঝামেলা করতে চাচ্ছেন। আমি আপনাকে আগেই সব স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি।
– আমার কি ইচ্ছে করে না ভালোবাসা পেতে?
– ও তাই? চলুন বেডরুমে। আপনাকে আপনার অধিকার দেই।
– তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি শুধু এটা? মনের কোনো দাম নেই?
– আমার কাছে আপনি শুধু এটাই আশা করতে পারেন। এছাড়া আর কিছুই না।
– ঠিক আছে। আমি আর কখনোই ভালোবাসার দাবি নিয়ে আসবো না।
সেই থেকে আসাদ চাইলেও একান্তে নূরীকে স্পর্শ করে না। এভাবেই চলছে তাদের এই নাটকীয় ভালোবাসার নাটকীয় সংসার। আসাদ জানে না এই নাটকের সমাপ্তি কবে হবে। এখন তো আশাও ছেড়ে দিয়েছে। এই নাটক শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চলবে বলেই সে ধরে নিয়েছে।
নূরীর নাটকীয় এই জীবনে ঝড় এসে ভীড় করলো। সড়ক দুর্ঘটনায় আসাদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শহরের বাইরে একটা মিটিংয়ে যাওয়ার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পাওয়ার পর উভয় পরিবারের সবাই এসে হাজির হয়েছে। আসাদের হাত-পা প্লাস্টার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেখে নাহিয়ান খুব কান্না শুরু করলো। নূরীর চোখও টলমল করে উঠলো। ভালো না বাসলেও এই দীর্ঘদিনে আসাদের প্রতি একটা মায়া জন্মেছে। তাই তো আসাদের এই করুণ দশা নূরীর হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। হাসপাতালের ল্যাব থেকে এক্সরে রিপোর্ট নেওয়ার জন্য করিডোরে বসে আছে নূরী। এমন সময় নূরী অতি পরিচিত একটি কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পেল। সেদিকে তাকালো। রিয়াদকে দেখে তার সমস্ত শরীর হিম হয়ে গেল। নাতো পারছে চোখ সরাতে নাতো পারছে নিজেকে নড়াতে।
একই দশা রিয়াদেরও। দুজনই দুজনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। নূরীর সেই অতীতের মানুষটাই হলো রিয়াদ। নূরীর ধ্যান ভাঙল যখন একজন নার্স এসে তার হাতে রিপোর্টটা দিলো। রিয়াদ এগিয়ে এসে বলল, “কেমন আছ?” এতক্ষণে নূরী লক্ষ্য করলো রিয়াদের পাশে একটা তিন-চার বছরের বাচ্চা আছে। রিয়াদের সাথে এই হাসপাতালের ব্যবসা আছে। সেই সুবাদে ম্যানেজমেন্টের সাথে তার পরিচয় আছে। তাই রিয়াদের কথায় আসাদকে ভিআইপি কেবিনে স্থানান্তর করা হলো। তার চিকিৎসাতেও গুরুত্ব দেওয়া হলো। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার জানিয়েছেন আসাদের হাড়ে ফাটল ধরেছে। সারতে সময় লাগবে। দিন পনেরোর মধ্যে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বাসায় বিশ্রাম ও সেবায় থাকলেই হবে। মাসখানেক পর পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে আনতে হবে।
বছর চারেক আগে রিয়াদ বিয়ে করেছে। তার একটা মেয়েও আছে। নাম রিয়া। বর্তমানে রিয়াদ তার পরিবার নিয়ে এই শহরেই থাকে। আসাদের চিকিৎসার সুবাদে নূরী ও রিয়াদের মাঝে সম্পর্ক শিথিল হলো। প্রথম প্রথম নূরী ইতস্তবোধ করলেও আস্তে আস্তে তা দূর হয়ে গেল। এখন সে স্বাভাবিকভাবেই রিয়াদের সাথে কথাবার্তা বলে। রিয়াদের স্ত্রী মাইশাকেও সে দেখেছে। দুজনকে দেখলেই বুঝা যায় বেশ সুখের সংসার। রিয়াদের অতীতের ব্যাপারে মাইশা কিছুই জানে না। নূরীকে কলেজের বন্ধু হিসেবে মাইশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
আসাদকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। মাসখানেক পর প্লাস্টার খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। আপাতত বিশ্রাম ও ওষুধ চালিয়ে যেতে বলেছেন। আসাদের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল রাখে নূরী। নাহিয়ানও সারাক্ষণ আসাদের পাশে বসে থাকে। তার কিছু লাগলে এগিয়ে দেয়। গল্প করে। ওদিকে ফোন ও মেসেজিংয়ের মাধ্যমে নূরী ও রিয়াদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। পুরানো কিছু না বললেও দুজন দুজনকে নতুনভাবে জানতে লাগল। যেন দুটা অপরিচিত মানুষ পরিচিত হচ্ছে। আসাদের প্লাস্টার খোলার জন্য তাকে আবার হাসপাতালে নেওয়া হলো। সেদিন নূরী সবার অগোচরে ঘন্টাখানেক সময় রিয়াদের সাথে পার্কে বসে গল্প-গুজব করে কাটিয়েছে। পার্কটা হাসপাতালের পেছনেই।
হাঁটতে হাঁটতে রিয়াদ একবার নূরীর হাতটা ধরেছিল। নূরী অস্বাভাবিক কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও হাতটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই ছাড়িয়ে নিয়েছিল। প্লাস্টার খোলা শেষে তারা ফিরে এলো। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আসাদ নিয়মিত ব্যায়াম ও থেরাপি নিতে লাগল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নূরী। তার বুকটা ধুরুধুরু করে কাঁপছে। রিয়াদ এই শহরে এসেছে। নূরীর সাথে দেখা করতে চায়। ব্যাপারটা নূরী স্বাভাবিকভাবেই নিতো। কিন্তু রিয়াদ তাকে নীল শাড়ি ও কাচের চুড়ি পরে আসতে বলেছে। এই নিয়েই নূরী দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে। রিয়াদের কথামতো সাজবে কিনা তাই ভাবছে। অনেক চিন্তাভাবনার পর নূরী সেজেগুজে বের হলো। আসাদকে জানালো এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে। সমুদ্রের পাড়ে একটা বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে আছে রিয়াদ ও নূরী।
– তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে নূরী। একদম সেই কলেজের সময়ের পরীর মতো দেখাচ্ছে।
নূরী কোনো জবাব দিলো না। রিয়াদের এই প্রসংশায় সে কেমন যেন বিব্রতবোধ করছে। রিয়াদ তার হাতটা ধরলো। নূরী ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। রিয়াদ শক্ত করেই ধরেছে। কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর নূরী বলল, “কি করছো? কেউ দেখবে তো।”
– এখানে সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। দেখার মতো কেউ নেই।
– তারা আর আমরা এক নই। আমাদের পথ আলাদা।
– নিয়তি আমাদেরকে আবার এক করেছে কেন তা কি একবারও ভেবেছ?
– ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। আমার সংসার আছে। তোমারও আছে।
– আচ্ছা বাদ দাও এসব কথা। চলো সমুদ্রের মাঝে একটু হারিয়ে যাই।
নূরী রাজি হলো না। রিয়াদ অনেকটাই জোর করে তাকে নিয়ে গেল। সমুদ্রের পানিতে ভিজিয়ে দিলো। বেশ কিছুক্ষণ ভেজার পর তারা কূলে এলো। নূরী নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় আছে। আশেপাশের সবার নজর তার দিকে। রিয়াদ তার জ্যাকেট খুলে নূরীকে পরিয়ে দিয়ে বলল, “স্যরি আসলে আমার একদমই খেয়াল ছিল না। চলো সামনেই আমার বাসা। মাইশার অনেক শাড়ি আছে।” নূরী বড় বড় চোখ করে তাকালো। রিয়াদ বলল, “ভয় নেই। বাসায় মাইশা, রিয়া আছে।”
– আমি যদি এই পরিস্থিতিতে তোমার বাসায় যাই। তবে তোমার সমস্যা হবে না?
– ওটা আমি সামলে নিবো।
রিয়াদের বাসায় আসার পর নূরী বুঝলো সে একটা ফাঁদে পড়েছে। বাসায় কেউ নেই। রিয়াদ কিছুক্ষণ মোবাইলে কথা বলে জানালো রিয়াকে নিয়ে মাইশা ঘুরতে গিয়েছে। নূরী সন্দেহ করলো এসবই রিয়াদের পরিকল্পনা। আলমারি থেকে একটা নীল রঙের শাড়ি এনে রিয়াদ বলল, “তুমি এটা চেঞ্জ করে নাও।”
– একটা সত্যি কথা বলবে?
– কি কথা?
– আমাকে এখানে আনা তোমার পরিকল্পনা ছিল, তাই না?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিয়াদ বলল, “দেখো নূরী, তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি আজও তোমাকে ভালোবাসি। অতীতে যেমন ভালোবাসাকে অপবিত্র করিনি। আজও করবো না।”
– তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাওনি।
– হ্যাঁ, এটা আমার পরিকল্পনা ছিল। কারণ আমি জানি তুমি সুখে নেই। ওই ল্যাংড়া তোমাকে সুখে রাখতে পারছে না। ও তো এখন অকেজো হয়ে গেছে। অথচ এখন তোমার আনন্দের দিন।
– ছি রিয়াদ ছি। তোমার এতো অধঃপতন হয়েছে তা আমি ভাবতেও পারছি না।
– দেখো নূরী এসব নৈতিকতা বাদ দাও। তুমি চাইলে আমরা দুজনই সুখে থাকতে পারবো। তাছাড়া ব্যাপারটা শুধুমাত্র আমাদের মধ্যেই থাকবে।
– আমার ঘৃণা হচ্ছে এই ভেবে যে, তোমার মতো একটা কুলাঙ্গারকে আমি একটা সময় ভালোবাসতাম। আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবো না। নূরী চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। রিয়াদ বলল, “আমি তোমাকে বাধা দিতো না। এই নাও, আমার কার্ড। আমার মনের দরজা সবসময়ই তোমার জন্য খোলা থাকবে। আমি আজও তোমাকে ভালোবাসি।”
– ভালোবাসা শব্দটা তোমার মুখে মানায় না। তুমি যদি বলতে, আমার সাথে তুমি নতুন জীবন শুরু করতে চাও। তাহলেও আমি বুঝতাম তুমি আমাকে আজও ভালোবাসো। কিন্তু তুমি তো আমাকে তোমার রক্ষিতা হিসেবে চাইছো। এটা ভালোবাসা নয়। এটা লালসা। আর হ্যাঁ, যে মানুষ তার স্ত্রীর বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারে না। তার মুখে ভালোবাসা শব্দ মানায় না।
নূরী কথাগুলো বলে কার্ডটা রিয়াদের মুখে ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভেজা অবস্থাতেই নূরী বাসায় এলো। তা দেখে আসাদ বলল, “ভিজলে কিভাবে?” নূরী কোনো জবাব না দিয়ে কাপড় পাল্টাতে চলে গেল। নূরী তার সিম ফেলে দিলো। সেই সাথে রিয়াদের সব স্মৃতিও মন থেকে ছুড়ে ফেলে দিলো। আসাদ ঘুমিয়ে আছে। নূরী তার পাশে বসে আছে। নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। আসাদকে সে কখনোই ভালোবাসেনি। তবুও মানুষটা আজ পর্যন্ত তাকে অবহেলা করেনি। বরং সবসময়ই চেষ্টা করেছে তার মন জয় করার। সংসারে কোনো কিছুর অভাব রাখেনি। নূরী ভাবতে লাগল সে হীরা পেয়েও তার কদর করেনি। আসাদের ডাকে নূরীর হুঁশ ফিরলো।
– তুমি কাঁদছো কেন?
– স্বামীর এই দশায় আমি কি কাঁদতেও পারবো না?
আসাদ বোকার মতো নূরীর দিকে তাকিয়ে রইলো। নূরী উঠে দাঁড়ালো। আসাদ বলল, “আরেকটু বোসো না! দেখতে ভালো লাগছে।” নূরী চুপচাপ আসাদের পাশে এসে বসলো। তার কাঁধে মাথা রাখলো। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আসাদ বলল, “এটা ভালোবাসা নাকি করুণা?”
– এই ধরণের কথা বললে কিন্তু আমি চলে যাব।
– না মানে, আমি জানতে চাই আমার পাশে আমার স্ত্রী বসে আছে নাকি নাটকীয় স্ত্রী?
– তোমার পাশে নাহিয়ানের আম্মু বসে আছে। আর নাহিয়ানের আম্মু এখন নাহিয়ানের আব্বুর পাশে বসে আছে।
– কিন্তু নাহিয়ান তো শুধুমাত্র আমার ……
– আমাদের সন্তান।
আসাদ একটা মিষ্টি হাসি দিলো। কিছু মাস পর, আসাদ এখন পুরোপুরি সুস্থ। আবার অফিসে যাওয়া শুরু করেছে। তাদের সংসারে এখন ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। নাটকীয় ভালোবাসার পর্ব শেষ হয়েছে। এখন প্রকৃত ভালোবাসা চলছে। যা চলবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। একটা রেষ্টুরেন্টে রিয়াদ, মাইশা ও রিয়া লান্স করতে এসেছে। অফিসের কাজে আসাদও সেখানে এসেছে। তাদের দেখা হয়ে গেল। মাইশা জোর করায় আসাদও তাদের সাথে লান্স করতে বসলো।
মাইশা – ভাইয়া এখন সব ঠিক আছে তো?
আসাদ – হ্যাঁ, আমি এর জন্য আপনাদের কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবো।
রিয়াদ – আরে ওসব কিছু না। আপনার উপকার করতে পেরে আমাদেরই ভালো লেগেছে।
নূরীর সাথে রিয়াদ যে আচরণ করেছে তা সবই ছিল নাটক। আসাদের দুর্ঘটনাটাও একটা সাজানো নাটক। কিছু মাস আগে আসাদের সাথে রিয়াদের দেখা হয়। আসাদ তাকে আগ থেকেই চিনতো। পরিচয় পর্বের পর রিয়াদ জানায় সে তার স্ত্রী সন্তান নিয়েই সুখে আছে। অতীত নিয়ে সে আর ভাবে না। আসাদ নিজের সংসারের কথা সব খুলে বলে। তারপর রিয়াদের সাহায্য চায়। মাইশার কারণে রিয়াদ সাহায্য করতে রাজি হয়। তারপর পরিকল্পনা মোতাবেক সড়ক দুর্ঘটনার নাটক করা হয়। রিয়াদ নিজেকে নূরীর সামনে খারাপ ভাবে উপস্থাপন করে। হাসপাতালের ডাক্তার রিয়াদের পরিচিত ছিল। তাই কোনো সমস্যা হয়নি। রিয়াদের অসত্ আচরণ দেখে তার প্রতি নূরীর ঘৃণা জন্ম নেয়। আর সেখান থেকেই আসাদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত