অপেক্ষা

অপেক্ষা
আমাকে রেখে যখন আমার স্বামী অয়ন চলে যায় তখন আমার মেয়ের জন্মও হয়নি। তখন আমি কেবল ছয় মাসের গর্ভবতী। এক কুয়াশাছন্ন শীতের ভোরে অয়ন আমাকে ছেড়ে চলে যায়। ও জানতো আমার মেয়ে হবে। বরাবরই খুব চুপচাপ স্বভাবের ছিলাম তাই হয়তো তার চলে যাওয়াটাও চুপ করে সয়ে গেছিলাম। আমাদের বিয়েটাও ছিলো খুব স্বাভাবিক। বিয়ের আগে আমরা একে অপরকে চিনতাম না। এখনও মনে আছে যেদিন অয়ন আমাকে দেখতে আসে সেদিন সবার কাছে পারমিশন নিয়ে আমার সাথে শুরুতেই একা কিছু বলতে চায়। বাবা-মা আমাদেরকে ছাদে পাঠিয়ে দেয়। মুখোমুখি চেয়ারে বসে ছিলাম দুজন। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর অয়ন নিজেই বলে,
– নিলীমা, রাইট? আমি মাথা নিচুরত অবস্থায় যতটুকু সম্ভব মাথাটা উপর নিচু করে জানাই যে হ্যা আমিই নিলীমা। তারপর আবার অয়ন বলতে থাকে,
– হয়তো ভাবছো বাসার সবার কথা বলার আগেই কেন আমি আগে কথা বলতে চাই! ওহ সরি, তুমি করে বলে ফেললাম। আমি ছোটো করে জবাব দিই
-সমস্যা নেই।
– এবার আসি আসল কথায়। আসলে আমি তোমার সাথে আগে কথা বলতে চেয়েছি কারণ আমি তোমাকে পছন্দ করি। আর তাছাড়াও তোমার মতামত টা আগে জানা উচিৎ। কারণ বর্তমানে এমন অনেক মেয়ে আছে যারা বাবা-মায়ের ভয়ে নিজের রিলেশনের কথা বলতে পারেনা। একপ্রকার মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করতে হয়। এতে করে সারাজীবন মনের ভিতর একটা হাহাকার বিরাজ করে। মানুষটার কথা শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যায়। এতো স্মার্ট একটা ছেলের মনটা কত পরিষ্কার। চোখটা হালকা তুলে একটু দেখার চেষ্টা করলাম। ভদ্রতা মানুষের প্রধান চেহারা যেটা তার চোখে মুখে দেখা যাচ্ছিলো। বাহ্যিক চেহারার বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার চুপ থাকা দেখে জিজ্ঞাসা করে,
– তোমার কি কারো সাথে কোনো সম্পর্ক আছে? আমি মাথা দুদিকে নাড়িয়ে জানাই, “না”।
– দেখো আমি তুমি সত্যিটা বলতে পারো যদি কাওকে ভালোবেসে থাকো তো। আমি নিচে গিয়ে সবাইকে বলে দেবো যে আমি নিজেই বিয়েটা ভেঙ্গে দিচ্ছি। এবার আমি ভালোভাবে বললাম,
– ছোটো থেকে বাবা মা যেভাবে বড় করেছে, তাদের সাথে বেইমানী করার সাহস হয়নি। হ্যা কাওকে ভালো লাগতেই পারে তবে কাওকে ভালোবাসা বা কারো সাথে প্রেম করার মত দুঃসাহস আমি কোনোদিন করিনি। আমার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে,
– আলহামদুলিল্লাহ, চলো নিচে যাই।
মাত্র ১৫ দিন পরই ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা শেষ হয়। আমি অবশ্য বলেছিলাম যে, আপনি কোটিপতি বাবার একমাত্র ছেলে তাহলে এভাবে কেন বিয়ে করছেন? ও তখন বলেছিলো,
– সারাজীবন তো আত্মীয়স্বজন দাওয়াত করি। এবার ভেবেছি বিয়ের খরচ দিয়ে একটা এতিমখানায় আমরা সবাই একসাথে খাওয়া দাওয়া করবো।কে পারবে এমন মানুষকে ভালো না বেসে থাকতে! আমিও বেসেছি। তার প্রেমে পড়েছি, মুখ থুবড়ে পড়েছি। আজকে প্রায় ২৪ বছর হয়ে গেছে মেয়েটার বয়সও প্রায় ২৪ হলো। ডাক্তারি পড়া শেষ করে আজকে দেশে ফিরছে। একটু পর আমি ওকে আনতে যাবো এয়ারপোর্টে। ভাবছেন কোটিপতি বাবার মেয়ে ডাক্তারি কেন পড়লো!অয়ন যাওয়ার সময় আমার হাতটা ধরে বলেছিলো,
– নিলীমা, তোমাকে কতটুকু সুখ দিতে পেরেছি সেটা জানিনা তবে আমার জীবনের এরা গিফট তোমাকে দিয়েছি। আমাদের সন্তান। সমস্ত কিছু তো তোমার নামে লিখে দিয়েছি। কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল রেখো মেয়েকে পড়ালেখা শেষ করিয়ে যেন বিজনেসে বসিয়ে দিওনা। ওকে তুমি ডাক্তার বানিও। আমি চাই আমার মেয়ে সারাজীবন মানুষের সেবায় কাটিয়ে দিক। সেদিন তার বলা শেষ কথাটা ফেলতে পারিনি। হ্যা আমি তার কথা রেখেছি তবে সে কোনো কথায় রাখেনি। আমাকে আর আমার পেটের বাচ্চাকে ফেলে চলে গেছিলো। ডায়েরি টা বন্ধ করে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার সময় আয়না বলল,
-মা বাসার দিকে না যেয়ে আমরা কোথায় যাচ্ছি।
– চল গেলেই জানতে পারবি। কিছুক্ষণ পর একটা কবরস্থানের সামনে গাড়ি থামলো। আয়নাকে নিয়ে একটা কবরের সামনে দাড় করিয়ে বললাম,
– বাবার কবর জিয়ারত কর।
আয়নার কবর জিয়ারত শেষ হলে ওকে গাড়িতে গিয়ে বসতে বললাম। আমিও কবর জিয়ারত শেষে করে কবরের দিকে তাকিয়ে বললাম,
– তুমি তোমার কথা রাখোনি অয়ন, সারাজীবন একসাথে চলার শপথ করে ক্যন্সারের বাহানা দিয়ে আমাকে ছেড়ে তোমার সন্তানের মুখটা পর্যন্ত না দেখে চিরদিনের জন্য চলে গেলে। কিন্তু আমি আমার কথা রেখেছি অয়ন, তোমার কথা মত তোমার মেয়েকে ডাক্তার বানিয়েছি আল্লাহর রহমতে। নিজেকে হেফাজত করেছি এই আসায় যে মৃত্যুর পর হয়তো বিধাতা আমাদের এক করবেন। ততদিন তুমি ঘুমিয়ে থাকো মাঠির নিচে আর আমি একটা একটা দিন তোমার কাছে এগোতে থাকি।
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত