বেকার

বেকার
১৩ সেপ্টেম্বর, আজকের এই দিনে সালমান চৌধুরী তার ভালোবাসার মানুষটিকে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করেছিলো ৷ আবারো ইতিহাসের পুরনাবৃত্তি ঘটলো ৷ আজকে সালমান চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে রুমালী তার ভালোবাসার মানুষটির ডাকে সাড়া দিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে নিলো ৷ এইতো কিছুক্ষণ আগে রুমালী তার মাকে ফোন করে ব্যাপারটা জানিয়ে দিলো ৷
ভাবছেন সালমান চৌধুরী হয়তো মেয়ের এমন কাজকে সমর্থন করেছে, এবং বিষয়টা হাসিমুখে মেনে নিয়েছে, যেহেতু সেও অন্য একজনের আদরের কন্যাকে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করেছিলো ৷ মেয়ের এমন কাজে তার কষ্ট না পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো ৷ কারণ, সেও তো প্রেমিকার বাবার অনুমতি না নিয়েই বিয়ে করেছিলো ৷ কিন্তু না, সালমান চৌধুরী তার মেয়ের এমন কাজে কষ্ট না পেয়ে থাকতে পারছেনা ৷ কষ্টে তার বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে ৷ দম নিতে পারছেনা ঠিকভাবে ৷ যেনো তার শ্বাসনালীটা রুমালী নিজ হাতে কেটে ফেলেছে ৷ সালমান চৌধুরী অঝোর ধারায় চোখের অজস্র অশ্রুজল বিয়োগ করতে করতে বলছিলো, “এতো কষ্ট করে যাকে বড় করলাম ৷ কখনো কোনোকিছুর অভাব বুঝতে দিইনি, আরাম-আয়েশে রেখেছি, লেখাপড়া করিয়ে উচ্চশিক্ষিত বানালাম, সে আজ আমাকে এতো সহজে ভুলতে পারলো? সে কি শিক্ষিত মেয়ের মত কাজ করেছে?
সালমান চৌধুরী এসব বলছিলো আর হাউমাউ করে কাঁদছিলো ৷ আসলে কোনো বাবা, মা চাইনা তার মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করুক ৷ এটা পরিবারের মান-সম্মান ও মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে, সমাজের নিকট পরিবারের মানুষদের প্রতিনিয়ত অপমানিত হতে হয়, কলঙ্কিত হতে হয়; তেমনিভাবে পরিবারের মধ্যে ভালোবাসার বন্ধনও ছিন্ন হয়ে যায় চিরতরে ৷ সালমান চৌধুরী আজ থেকে ২৫ বছর পূর্বে শায়লা নামের মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে করেছিলো ৷ পালিয়ে বিয়ে করতে হবে, এটার পক্ষে শায়লার বিন্দুমাত্র মত ছিলোনা ৷ কিন্তু যখন সালমান চৌধুরী দীর্ঘ ৫ বছরের সম্পর্ক নষ্ট করার হুমকী দেয়,তখন আর শায়লা রাজি না হয়ে পারেনা ৷ বেকার ছেলের মায়ার জালে নিমজ্জি হয়ে বাবা, মায়ের ভালোবাসার ছায়া মাড়িয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে সে ৷ শায়লা বাবা, মায়ের মুখে কালিমা লেপন করে যখন সালমানকে বিয়ে করে নেয় তারপর থেকে সে তার বাবার নিকট মৃত সন্তান হিসেবে পরিগণিত হয় ৷
শায়লা তার বাবা, মায়ের নিকট যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে গেলে সালমান বাঁধা দেয় ৷ এরপরও দু একবার কন্টাক্ট করার চেষ্টা করেও শায়লা কথা বলতে পারেনি তার বাবার সাথে ৷ ২৫ বছরে শায়লা তার মায়ের সাথে অসংখ্যবার কথা বললেও বাবার কন্ঠস্বর সে আজও শুনতে পায়নি ৷ দূর থেকে তার বাবাকে সে দেখেছিলো ৷ কিন্তু সেই দেখাতে তার কষ্টটা কমেনি উল্টো বেড়েছিলো ৷ শায়লার মন চাইতো সংসার জীবনকে মাটিচাপা দিয়ে বাবা, মায়ের নিকট ছুটে যেতে আর তাদের পা ধরে ক্ষমা চাইতে ৷ কিন্তু সে তার স্বামীর কারণে পারেনি! আজকে শায়লার মেয়ে রুমালী যখন তাদের কথা ভুলে পালিয়ে বিয়ে করলো, তখন শায়লার নতুন করে উপলদ্ধি হলো যে সে কতবড় অন্যায় করেছিলো তার বাবা,মায়ের সঙ্গে ৷ সে খুব সহজে বুঝতে পারছে যে তার বাবা মা কতটা কষ্ট পেয়েছিলো তার ভুলের কারণে! শায়লা নিজের ভুলের কথা স্মরণ করে চোখের জল নির্গত করছে আর আর্তনাত করে মেয়ের নাম জপছে! মধ্যরাতে আবারো রুমালী তার মায়ের নম্বরে ফোন দিলো ৷ শায়লা বেগম দ্রুততার সহীত ফোনটা রিসিভ করে উদগ্রিব হয়ে বললো,
-মা, তুই কই এখন? কখন ফিরবি বাসায়? প্লিজ মা, ফিরে আয় তুই ৷ তোর বাবা সেই বিকেল থেকে বোবা হয়ে আছে, কথা বলছেনা ৷ খাওয়া দাওয়া করছেনা, এখনো কিছু মুখে নেয়নি সে! রুমালী তীক্ষ্ণকন্ঠে বললো,
-মা, আমাকে নিয়ে বাবাকে চিন্তা করতে নিষেধ করে দিও ৷ আমি ভালোই থাকবো!
-কি বলিস, তুই তার একমাত্র মেয়ে, তোর জন্য কষ্ট হবেনা তার?
-এতো কথা বলো কেন মা? তাকে কষ্ট পেতে নিষেধ করে দিবে, ব্যাস! আর তুমিও ভুলেও আমার জন্য কষ্ট পাবেনা বলে দিলাম ৷ নিশ্চয় তুমি এখন কাঁদছো, তাইনা? খবরদার কান্না করবেনা! শায়লা বেগম চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলো হাতের তালু দিয়ে মুছছিলো, এরপরও কাজ হচ্ছেনা ৷ চোখের পানি মুছে ফেলা সত্বেও তরতর করে অশ্রুজল ঝরতে ঝরতে চোখের নদী ভরাট করে ফেলছে ৷ শায়লা বেগম নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
-আমি কাঁদছিনা ৷ তুই প্লিজ ফিরে আয়!
-কি বলছো মা? কোনোদিন শুনছো বাসা থেকে প্রেমিকের জন্য পালিয়ে গিয়ে কোনো মেয়ে বাসায় ফিরে এসেছে? তাহলে আমি ফিরবো কিভাবে ভাবলে? আমি তো ইতোঃমধ্যে বিয়ে করে ফেলেছি!
-আমাদের কথা একটাবারও ভাবলিনা?
-তোমার এসব ইমোশোনাল কথা রাখো ৷ যে কারণে ফোন দিয়েছি সেটা শোনো,
আমার কিছু টাকা লাগবে ৷ ধারস্বরুপ নিবো, আমি চাকরিতে জয়েন হবো শীঘ্রই, প্রথম মাসের টাকা পেলেই তোমাকে টাকাগুলো দিয়ে দেবো ৷ তুমি প্লিজ, ২০ হাজার টাকা ম্যানেজ করো ৷
-তুই ফিরে আয় এসব পাগলামী বন্ধ করে ৷ তোর বরকে সঙ্গে নিয়ে আয় ৷ আমি তোর বাবাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করাবো!
-আমি ভালো করে জানি রাফাতকে বাবা কিছুতেই মেনে নিবেনা ৷ কারণ, সে বেকার!
-বেকার ছেলেকে কেন বিয়ে করতে গেলি? তোর মত শিক্ষিত মেয়ে বেকার ছেলেকে বিয়ে করবে ভাবতেই পারছিনা ৷
-সে চাকরি পাচ্ছেনা, ইন্টার পাশ করার পর স্টাডি বাদ দিয়েছিলো ৷ এরপর ব্যবসা শুরু করে অনেক বড় লস খায় ৷ যেকারণে রাফাতের বাবা তাকে আর ব্যবসার কোনো খরচ দেয়নি ৷ এরপর ছোটখাটো অনেক কোম্পানিতে জব নিয়েছে কিন্তু বসের অকথ্যা গালিগালাজ, আর কাজের বাজে অভিজ্ঞতার কারণে কোম্পানির কোনো কাজে সে স্থায়ী হতে পারেনি ৷ ১বছর ধরে বেকার থাকার পর আবারো সে কোম্পানির চাকরির জন্য ছুটছে কিন্তু পাচ্ছেনা চাকরি ৷ কি আর করবে সে? টিউশনি করে কোনোক্রমে চলার চেষ্টা করছে সে ৷ আমি তার দুরাবস্তা দেখে সিদ্ধান্ত নিই আর দেরি করবোনা বিয়ে করবো তাকে ৷ আর তাই বেশিকিছু না ভেবে অবশেষে বিয়ে করলাম তাকে ৷ আগে পরে বিয়ে যেহেতু করতেই হবে সেহেতু রাফাতের এই মসিবতের মুহূর্তে বিয়ে করলে কি সমস্যা? আমার চাকরির সুযোগ এসেও করিনি এতোদিন, কিন্তু এখন করতে হবে শুধুমাত্র রাফাতের জন্য! আমার তো মনে হয় সুখেই আমাদের দিন অতিবাহিত হবে! শায়লা বেগম নিচুস্বরে বললো,
-ভুল যা করার করেছিস ৷ দয়া করে আর ভুল করিস না ৷ ফিরে আয় তুই!
-সম্ভব না মা ৷ তোমাকে যেটা বললাম সেটার জবাব দাও, তুমি টাকাগুলো জোগাড় করে দিতে পারবে কি না?
-হুম, দেখছি কি করা যায়!
১ মাস পরের ঘটনা,
প্রতিবছর আজকের দিনে সালমান চৌধুরী তার মৃত বোনের কবরে জিয়ারত করতে আসে ৷ আজকেও জিয়ারত করতে এসেছে ৷ জিয়ারত করা শেষে রিকশা নিয়ে সে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছিলো ৷ রিকশা চলছিলো ৷ রাস্তার একপাশে ছোটখাটো বাজার অবস্থিত ৷ রাস্তা থেকে বাজারের দোকানপাট খুব ভালোভাবে নজরে পরে ৷ বাজারের মূলফটকে দুটা মনোহরি দোকান রয়েছে ৷ দোকান দুটার একপার্শ্বে ফুচকা ও চটপটি বিক্রি করা হয় ৷ সেই দোকানের পাশে বেশকয়টা চেয়ার রাখা হয়েছে ৷ একটা চেয়ারে সালমান চৌধুরীর মেয়ে রুমালী বসে আছে ৷ আরেকটাতে রুমালীর নানাজান জাফর আলী ও রুমালীর হাজবেন্ড রাফাতও বসে আছে ৷ রুমালী ও তার নানাকে দেখতে পেয়ে সালমান চৌধুরী হকচকিয়ে উঠলো এবং রিকশা থামিয়ে দিলো ৷ রিকশা থেকে নেমে সে চললো বাজারের দিকে! সালমান চৌধুরী ফুচকার দোকানের সামনে উপস্থিত হতেই রুমালী ও তার নানাজান স্তম্ভিত হয়ে গেলো ৷৷ সালমান চৌধুরী তার মেয়ের দিকে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রীতিমত কাঁপতে লাগলো ৷ একপর্যায়ে জোরালো কন্ঠে রুমালীকে বললো,
-ও, তারমানে বাবার চেয়ে নানা বড় হয়ে গেলে তোর নিকট? আর একারণে বাবাকে ভুলে নানার সঙ্গে থাকার চেষ্টা করছিস! ভালো, খুব ভালো ৷ কিন্তু, একটা কথা মনে রাখিস বাবা, মাকে কষ্ট দিয়ে কখনই সুখে থাকা যায়না!
রুমালীর নানাজান বলে উঠলো,
-তুমিতো আমার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঠিকই ভালো আছো ৷ তোমরা দুজনই বাবা, মাকে কষ্ট দিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলে ৷ কই তোমাদের সংসারে তো অশান্তি তৈরি হয়নি?
-তারমানে, আপনি আমার উপর প্রতিশোধ নিতে রুমালীর বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন? বুঝতে পারছি তো ৷
-আমি কি তোমার মত অকৃতজ্ঞ? তুমি তো সেই মানুষ যে আমার মেয়েটাকে পালিয়ে বিয়ে করার পর খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলে ৷ আমার মেয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলেও যোগাযোগ করতে দাওনি ৷ আমি এই আশায় থাকতাম যে একদিন অবশ্যই শায়লা আমার নিকট এসে ক্ষমা চাইবে, তুমিও আসবে ক্ষমা চাইতে; কিন্তু আমার মেয়েকে তুমি আসতে দাওনি, আর তুমি তো আমাদের দেখতেই পারতেনা ৷ সেই তুমি আমাকে তোমার সমকক্ষ ভাবছো কি করে? হ্যাঁ, এটা সত্য আমি রুমালীর বিয়ের ব্যবস্থা করবো, তবে সেই বিয়েটা পালিয়ে বিয়ে হবেনা ৷ দুই পরিবারের সম্মতিতে ধুমধাম করে বিয়ে হবে! সালমান চৌধুরী তার শ্বশুরের শুরুর দিকের কথাগুলো শুনে রেগে গেলেও শেষের কথাটা শুনে ভ্যাঁবাচেকা খেয়ে গেলো ৷ সে কথাটার সঠিক অর্থ খুঁজে পেলোনা ৷ তোড়জোর কন্ঠে বললো,
-রুমালীর বিয়ে দুই পরিবারের সম্মতিতে হবে মানে? তার কি পুনরায় বিয়ে হবে? রুমালীর নানাজান মুচকি হেসে বললো,
-হ্যাঁ, দুই পরিবারের সম্মতিতে হবে ৷ পুনরায় বিয়ে হবে মানে? তার কি আগে কখনো বিয়ে হয়েছে?
-তাহলে আপনি রুমালীর ব্যপারটা জানেন না? তাহলে এতোক্ষণ কাকে কি বললাম?
-চুপ করো, রুমালী তোমাকে বোকা বানিয়েছে এতোদিন ৷ সে বিয়ে করেনি ৷ তুমি অকৃতজ্ঞ হলেও রুমালী নয় ৷ সে বাবা, মাকে মর্যাদা দিতে জানে ৷ আর ভালো করে জানে কোনটা সঠিক পথ! এটা সত্য যে রুমালী একজনকে ভালোবাসে, এবং তাকেই বিয়ে করবে ৷ তবে ছেলেটা বেকার বলে তোমাদেরকে বিয়ের কথা বলতে পারছেনা ৷ এজন্য আমার কাছে এসেছিলো ৷ আমি কোনো সমাধান দিতে পারিনি ৷ পরবর্তিতে রাফাত একটা প্ল্যান তৈরি করে ৷ সে রুমালীকে পালিয়ে যাবার নাটকটা করতে বলে ৷ এটা এজন্যই করতে বলে যাতে এই খবর শুনে তুমি ২৫ বছর পূর্বের ঘটনা উপলদ্ধি করতে পারো ৷ এবং তুমি নিজের ভুলটা ধরতে পারো ৷ আর রাফাত ও রুমালীর বিয়েটা মেনে নাও ৷ কিন্তু না তুমি আজও তোমার ভুলটা ধরতে পারোনি ৷ যেকারণে, রুমালী ও রাফাতকে মেনে নাওনি ৷ আর তাছাড়া, আমার নিকট ক্ষমা চাইতেও আসোনি ৷ আমি তোমার সামনে উপবিষ্ট হয়েও একটাবার বললেনা আমি কেমন আছি ৷
কারণ তুমি অকৃতজ্ঞ! কোনো মেয়ের বাবা তোমার মত জামাই কামনা করেনা ৷ এরপরও আমি তোমাকে মেনে নিয়েছি ৷ শুধুমাত্র আমার মেয়েকে ভালোবাসি বলে ৷ আমার তো বয়স শেষ, আর কয়বছরই বা বাঁচবো ৷ জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে চাই ৷ কারো মুখে আমি আর দুঃখের রেখা দেখতে চাইনা ৷ খুব ইচ্ছা করে আমার মেয়ের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মনখুলে কথা বলতে ৷ জানিনা সেই সুযোগ হবে কিনা! রুমালীর নানা কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলো ৷ তার চোখে পানি ৷ অনবরত ঝরছে অশ্রুজল ৷ সালমান চৌধুরী তার শ্বশুরের কথা শুনে ব্যথিত হলো ৷ চেহারায় অনুশোচনার ছাঁপ বিরাজ করছে ৷ তার চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা পানি জরো হলো ৷ অকস্মাৎ, সে রুমালীর নানার পায়ের নিচে পরে গিয়ে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
-আপনি আমাকে ক্ষমা মার্জনা করুন আব্বাজান ৷ আমার এই উপলদ্ধি ২৫ বছর আগে আসা উচিত ছিলো কিন্তু আমি ভুলের মধ্যে পতিত হওয়াই সত্য সুন্দর ও সঠিক পথকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম ৷ আমাকে মাফ করুন দয়া করে! রুমালীর নানাজান ডুকরে কেঁদে উঠে বললো,
-আজ আর ক্ষমা চাইতে হবেনা ৷ আমি শুধু চাই তুমি রুমালী ও রাফাতের সম্পর্কটা মেনে নিয়ে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করো ৷ রাফাত বেকার ৷ এখনো কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে পারেনি সে ৷ শুধুমাত্র চাকরি হচ্ছেনা বলে সে বিয়ে করতে পারছেনা ৷ কিন্তু কতদিন অবিবাহিত থাকবে সে? রাফাতের চাকরি না হলেও রুমালী তো সরকারী চাকরি করছে, ১মাস হলো সে হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছে ৷ রুমালীর কথা সে রাফাতকে সঙ্গে নিয়ে সুখেই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে ৷ আর রাফাত তো খুব বেশিদিন বেকার থাকবেনা ৷ মূলধন নেই বলে ব্যবসায় যোগ দিতে পারছেনা ৷ আর কয়েক মাস পরই রুমালী মুলধনের ব্যবস্থা করতে পারবে ৷ তাই, আমি মনে করি ওদের দুজনের বিয়ে হওয়া দরকার ৷ রাফাতের বাবা তার বিয়ের ব্যপারে কোনো সিদ্ধান্তই নিবেনা, তবে রাফাতের মা তার সঙ্গে রয়েছে ৷ তার সঙ্গে কথা বলা যাবে ৷ কিন্তু এরপূর্বে তোমার সম্মতি দরকার,রুমালীর বাবা! রাফাত এখনো বেকার, কথাটি শুনে অসন্তুষ্টের রেখা সালমান চৌধুরীর চেহারাতে জরো হয়েছে ৷ রাগান্বিত চেহারায় রুমালীর দিকে তাকিয়ে তীর্যক কন্ঠে বললো,
-বিয়ে যেহেতু করিস নি ভালোই করেছিস ৷ তুই তো শিক্ষকতা করছিস ৷ তুই আর ভুল করবি কেন? টিচার হয়ে বেকার কাউকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে পারিস না ৷ তাকে ভুলে যা ৷ অনেক ভালো ছেলে পাবি তুই! রুমালীর নানাজান সালমান চৌধুরীর গালে সজোরে থাপ্পর লাগিয়ে দিয়ে বললো,
-এজন্যই লোকে বলে কুত্তার লেজ সোজা হয়না! সালমান চৌধুরীর চেহারা রক্তবর্ণ হয়ে গেলো ৷ রাগে অগ্নিশর্মা ৷ দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে সে রুমালীর নানাজানকে বললো,
-রাখ বুড়া ব্যাটা তোর জ্ঞান দেওয়া ৷ আমি বেকার ছিলাম বলে তুইও তোর মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিস নি, আর আজকে জ্ঞান দিতে আসছিস? ভাবছিস তোর নিকট ক্ষমা চেয়েছি বলে তোর সব কথা মেনে নেবো? কখনই না ৷ আমি ভুলেও আমার মেয়েকে বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবোনা! রুমালী জোরালো কন্ঠে বলে উঠলো,
-বাবা, তোমাদের কাউকে আমার দরকার নেই ৷ আমি যথেষ্ঠ ম্যাচিউর একজন মেয়ে! আমার নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতা রয়েছে ৷ আমি যাবতীয় বৈধ কাজ করার অধিকার রাখি ৷ আমি নিজ ইচ্ছায় বিয়েটাও করতে পারি ৷ আমি বিয়ে করেছি এটা তো জেনে গিয়েছিলো, যদিও সেটা মিথ্যা তথ্য ছিলো ৷ আমি রাফাতকে খুব শীঘ্রই বিয়ে করতে যাচ্ছি এটা তোমাকে জানিয়ে দিলাম!
রুমালী চেয়ার থেকে উঠলো, রাফাতও! রাফাতের হাত ধরে রুমালী চলতে লাগলো নতুন জগতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে ৷ রুমালী মনে মনে বলছিলো বেকারদের কোনো পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র নেই ৷ প্রতিটি বেকার যুবক হচ্ছে একক একটি পরিবার ৷ তাদের রাষ্ট্র, সমাজ নিজেকে ঘিরে ৷ তাদের পাশে দাঁড়ানোর মত কেউ নেই নিজের অস্তিত্ব ছাড়া!
এতোটুকু বলে রুমালী থেমে গেলো ৷ চাপা কষ্ট বুকে রেখে রুমালী মনে মনে বললো- আমিও তো রাফাতকে আপন করে নিতাম না যদি সে অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো গোপনে ভিডিও করে না রাখতো ৷ মূলত লোক লজ্জার ভয়ে, সম্মানের কথা ভেবে উচ্চশিক্ষিত মেয়ে হওয়া সত্বেও ইন্টার পাশ করা বেকার একটা ছেলের পিছু পরে আছি!
গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত