ভুল

ভুল
বিয়ের সাতাশ বছর পর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আমার আম্মা কে রেখে আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তেরো বছর বয়সে বউ হয়ে এসেছিলেন আম্মা এ বাড়িতে।
আম্মা এই মধ্য বয়সে এসেও আত্নহত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। আম্মা বলেন ওনার জীবন বৃথা, কোনো মূল্য নেই সে জীবনের যে জীবন জীবিত থাকা স্বত্বেও তার জীবন সঙ্গী দ্বিতীয় সঙ্গী খুঁজে নেয়। পাগলের মতো আচরণ করে এখন আম্মা প্রায়, হঠাৎ এতো বড় একটা আঘাত সহ্য করা যে কোনো মানুষের জন্যই অনেক কষ্টকর।
আমি একমাত্র ছেলে হয়ে কি করে আম্মার এতো কষ্ট দেখে চুপ করে বসে থাকি, আব্বার কাছে গেলাম কিছু কথা বলার জন্য কিন্তু বলতে পারলাম না কোনো এক অজানা দ্বিধায় আর কেমন একটা ঘৃণা লাগছিলো আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে।
যে ঘরটা এতো বছর ধরে আব্বা-আম্মার এখন সেটা শুধু আব্বার আর ওনার দ্বিতীয় স্ত্রীর, আম্মা অন্য ঘরে বসবাস করেন এখন। তিনদিন আব্বা দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে এ বাড়িতে থাকার পর কোথায় যেনো চলে যায়। আমার মেজো খালা এসে কয়েকদিন থেকে গেছেন আম্মার সাথে, আর বারবার বলেছেন আইন এর শরণাপন্ন হতে কেনো আম্মার অনুমতি ছাড়া আব্বা আবার বিয়ে করলেন। আম্মা ওনার কথায় সায় দেন নাই, যা হবার তা হয়েই গেছে এ নিয়ে আর বেশি বাড়াবাড়ি করতে চান না তিনি। আর সবশেষে নিজের ভাগ্যের কথা বলে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
খালার কাছে শুনেছি আম্মা নাকি অনেক ভয় পেয়েছেন যদি আব্বা ওনাকে তালাক দেন এই ভেবে। তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন তিনি , ওনার যে যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। আর তালাক এর পর তো এ বাড়িতেও থাকতে পারবেন না তিনি এসব ভেবে সবসময় ভীত, দিশাহীন হয়ে থাকেন আম্মা। প্রিয়তা(আমার স্ত্রী) আম্মাকে চোখে চোখে রাখে সবসময়, আমিও অনেক চিন্তিত থাকি বাইরে আসার পর আম্মাকে নিয়ে। পড়াশোনা শেষ হয়নি আমার তার পাশাপাশি পৈত্রিক সূত্রে ব্যবসা করার সুযোগ পেয়েছি তাই রোজ বাড়ির বাইরে আসতে হয় আমার।
আব্বা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর প্রথম তিনদিন আসি নাই সবসময় আম্মার সাথে থেকেছি।
আম্মার অনেক বড়ো দূর্বলতা তিনি রাতে এক ঘরে একা ঘুমাতে পারেন না। তিনরাত তো আমরা তিনজনই আম্মার সাথে ছিলাম পরে খালা এসে ছিলেন। এখন প্রিয়তা থাকে আমাদের মেয়েটাকে নিয়ে আম্মার সাথে, কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে। প্রিয়তা কয়েকদিন পর মুখে কিছু না বললেও স্পষ্ট বোঝা যায় সে কিছুটা বিরক্ত হয়তো ওর খারাপ লাগা বিরক্তির কারন নিজের স্বামীর সাথে থাকতে না পারাটা। তাহলে আম্মার মনের অবস্থা কি এই সময় এই ভেবে ছেলে হয়েও চোখ ভিজে গেছে আমার। আমরা যদি না থাকতাম তাহলে কি হতো আম্মার।
প্রায় পনেরো দিন হচ্ছে আব্বা এমন একটা পাপ কাজ করেছেন, আমি পাপ বলছি কারণ প্রথম স্ত্রী জীবিত ও সুস্থ সক্ষম থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করাকে আমি পাপ ও ঘৃণিত কাজ বলে মনে করি। আমি ছোটবেলা থেকে কখনও ওদের ঝগড়া করতে দেখি নাই, দু’জনের মধ্যে চমৎকার মিল ছিলো আর ভালোবাসাও ছিলো অনেক।প্রিয়তা প্রায় চিমটি কেটে আমাকে বলে দেখো আর শিখো আব্বা আম্মা এই বয়সে এসেও এতো রোমান্টিক। কোথায় হারিয়ে গেলো ওদের এতো ভালোবাসা, তাহলে বিয়ের পর নতুন সম্পর্কের যে একটা বন্ধন সৃষ্টি হয় বছরের পর বছর ধরে সেটা কি এতোই ঠুনকো। এসব বিষয় বড্ড বেশি ভাবায় আমাকে আজকাল।
আমিও কি কখনো প্রিয়তাকে ছেড়ে অন্য পথে পা বাড়াব, ছি! ছি! এসব কি চিন্তা আনছি আমি মাথায়। সবাই তো এক নয় যদি এক হতো তাহলে তো কতো মানুষই দু’টো করে বিয়ে করতো। আর আমাদের বংশে কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করছে আগে তেমনটা শুনি নাই আমি। এসব কথা ভাবছিলাম বারান্দায় বসে, হঠাৎ প্রিয়তা এসে বললো আব্বা বাড়ি ফিরছেন কিন্তু সাথে করে ওই মহিলার একটা ছেলে ও একটা মেয়ে কেও নিয়ে এসেছেন এ বাড়িতে। কথা টা শুনে উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার থেকে, হনহন করে হেঁটে আব্বার ঘরের সামনে গেলাম বেশ শোরগোল চলছে ভিতরে বাইরে থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
আমাকে দেখা মাত্রই আব্বা বললেন আমি এখন ব্যস্ত আছি কারো সঙ্গে কথা বলতে পারবো না চলে যাও। বুকের ভিতর গিয়ে কাঁটার মতো বিঁধল কথা গুলো। যে বাবা কিনা তার একমাত্র ছেলে সন্তান কে অসীম আদর করতো ভালোবাসতো আজ সেই বাবা এই কথা বলছে। চলে আসলাম সেখান থেকে আম্মার কাছে , আম্মা এই কয়দিনে বেশ শক্ত হয়ে গেছেন ওনার কপালের দোষ দিয়ে সব মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি আর এ সংসারে থাকতে চান না, না থেকেই বা কোথায় যাবেন।
আম্মার দুই ভাই অনেক আগেই মারা গেছেন, ভাতিজা দের সংসারে গিয়ে তো ঝামেলা করবেন না আম্মা। এ বাড়িতে আমাদের সাথে থাকতেও আপত্তি এখন ওনার, এতো বছর পরাধীন থেকে এখন স্বাধীনতা খুঁজতেছেন আম্মা যে ক’টা দিন বাঁচবেন উনি নিজের মতো করে বাঁচতে চান। ওনার আশেপাশে কোনো মানুষকেই সহ্য করতে পারছেন না উনি, অতিরিক্ত আঘাতে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে আম্মার। নিজেকে বোঝা মনে করছেন আম্মা সবার জন্য। আম্মা যদি আজ কোনো চাকরি করতেন কিংবা স্বাবলম্বী হতো নিজ অবস্থান থেকে তাহলে হয়তো এমন দিন দেখতে হতো না ওনাকে। যাই হোক আমি আম্মাকে বলে আমাদের কিছু আত্নীয়-স্বজন এবং গ্রামের চেয়ারম্যান মেম্বারদের ডাকলাম বাড়িতে।
এভাবে তো আর থাকা যায় না, যে কোনো একটা মীমাংসা টানা দরকার। পরের দিন চেয়ারম্যান সহ কয়েকজন আত্নীয় আসলেন আমাদের বাড়িতে , সবাই মিলে বারান্দায় বসা হলো। এবার আব্বাকে ডাকা হলো, আম্মা এক কোণে বসে আছেন নাতনি কে কোলে নিয়ে। আব্বা’র সাথে সেই মহিলা এবং তার সন্তানরাও সকলের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। আমার বড় চাচা তখন আব্বাকে বললেন সালাম আমরা শুধু তোকে ডেকেছি এদেরকে নয়। এই কথা শোনা মাত্রই আব্বা রাগে আগুন হয়ে গেলেন, আর বললেন আমি আর এই তিন জন মানুষ সবাই এক এরাই আমার সবকিছু এখন থেকে বলে বাচ্চা দু’টোকে কাছে টেনে নিলেন।
এই সময় আমার হিংসা হলো, ভেতরটা কেমন পুড়ছে আমার আব্বা অন্যের সন্তানকে এতো ভালোবাসে এ কিভাবে সম্ভব আমি তো তার একমাত্র বংশধর। আমার একটা বোনও আছে পালিয়ে বিয়ে করাতে ওর সাথে তেমন যোগাযোগ নেই আমাদের কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে যায় নাই বোনজামাই এর সাথে । সবার মধ্যে থেকে আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আমার মা এ সংসার এর জন্য অনেক কষ্ট করেছেন । আব্বা এতো বড় একটা ভুল কাজ করলেন, আপনারা এর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এটা আমার মা এবং আমার পক্ষ থেকে অনুরোধ আপনাদের প্রতি।
আব্বা এই কথা শোনার পর, সকলের সামনে আম্মা সহ আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বললেন অন্যথায় তিনি আমায় ত্যাজ্যপুত্র করবেন বলে হুমকি দিলেন। এক অজানা ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল আমার, উপস্থিত সকলেই চুপ করে বসে আছেন। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা ও বাড়ি থেকে চলে আসি আমার শ্বশুর বাড়িতে। আম্মা পাথর হয়ে গেছেন, তিলতিল করে যে সংসার গড়লেন সেটা মূহুর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। এতোদিন আম্মা আমার ঘর আমার সংসার বলে যা জানতেন তা আম্মার ছিলো না, তিনি নামে মাত্র অতিথি ছিলেন দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে সেখানে এখন তাই মনে হচ্ছে আমার।
কয়েকদিন পর আমরা আলাদা ভাড়া বাসায় উঠি সেই সাথে ছোট একটা ব্যবসা শুরু করি, বেশ ভালোই আছি আমরা। কিন্তু আম্মা যে ভালো নাই তা ওনার মুখ দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। হঠাৎ একদিন খবর পেলাম আব্বা খুব অসুস্থ, আম্মা তখন আব্বা কে দেখার জন্য পাগলের মতো হয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে প্রিয়তাকে সাথে করে হাসপাতালে পাঠালাম আম্মাকে, আমি গেলাম না আব্বা যদি আমাকে দেখে রেগে যান তাই। এরপর আরও অনেকদিন চলে গেলো। একদিন শুনলাম ওই মহিলা নাকি আব্বা কে কালোজাদু করে অসুস্থ করে রাখছে আর বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা সহ দামী জিনিসপত্র সব চুরি করে আব্বাকে একা রেখে পালিয়েছে।
সবাই ছুটে গেলাম বাড়িতে, আব্বা ফ্লোরে পড়ে আছেন অবচেতন অবস্থায় সবার আগে আম্মা ছুটে গিয়ে আব্বা’র মাথা টা কোলো তুলে নিলেন আর চিৎকার করে বললেন তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাক তোর বাবা জ্ঞান হারিয়েছে । আব্বা এতো কষ্ট দিলো আমাদের বিশেষ করে আম্মারে তা সব ভুলে গেছেন আম্মা আব্বা’র দূরাবস্থার কথা শুনেই, হয়তো ক্ষমাও করে দিছেন আব্বার সকল ভুল আর অন্যায় গুলোকে। আজ আম্মার চোখে পানি দেখতে পেলাম আমি, মনে মনে ভাবলাম হায়রে অবচেতন ভালোবাসা জয় হোক আপনার।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত