স্বপ্ন ভঙ্গ

স্বপ্ন ভঙ্গ
কাতার নামক দেশে প্রবাসীর বেশে কাটিয়ে দিয়েছি জীবনের ২০ টি বছর। কাতারের রাজধানীর দোহাতে আমার নিজস্ব দোকান রয়েছে তাই দিয়ে জীবনের বাকি সময়টুকু কেটে যাবে। কিন্তু প্রতিবছর একবার বাংলাদেশে আসতেই হয়, কোন ব্যবসায়ীক কাজ নয়, নয় কোন স্বজনপ্রীতির জন্য। আমার জীবনের গল্পটি শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বিজয় স্বরনী রাস্তা থেকে। আমার একটি মেয়ে রয়েছে ফারিয়া নাম তার। কয়েকদিন পর তার বিয়ে হতে যাচ্ছে।
কি সব ফেসবুক টেসবুকে একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিলো তার সাথে। মেয়ে আমার কাতার এ থাকলেও তার মন বাংলাদেশেই পড়ে থাকে। প্রতিবছর আমার সাথে তাকেও নিয়ে আসি বাংলাদেশে। তাকে আমার পরিচিত সোবহান ভাইয়ের বাসাতে রেখে আমি বের হয়ে যেতাম আমার নিজ কাজে। তাই ফারিয়া কখনো জানতে পারেনি আমি কিসের জন্য দেশে যেতাম, আর দুদিন পরেই ফিরে আসতাম কাতারে। এবারো তাকে নিয়ে যাবো, এবার আমার দেশে আসার কারন দুটি হবে ফারিয়ার বিয়ে আর আমার উদ্দেশ্য। ফারিয়ার বিয়ের পর সে বাংলাদেশেই থাকবে আর আমি আবার কাতার ফিরে যাবো। সব কিছুই ঠিকঠাক এবার বিয়েটা হলেই হাফ ছেড়ে বাবার দায়ীত্ব থেকে বাচি।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে রোজকার মত কাতারের আকাশটাও লালবর্ণ ধারন করেছে। সময় যত গড়াচ্ছে ততই অন্ধকারে লুটিয়ে যাচ্ছে লাল আভাময় আকাশটি। এই আলো অন্ধকারের মিল বড্ড গোলমাল বাজায় আমার জীবনে। খানিকটা আলোর আশা অনেকটা অন্ধকারে ছায়া যেন জীবনের প্রতিমোড়ে আমি উপলদ্ধি করতে পারি। ইজি চেয়ারে দুলতে দুলতে চায়ের চুমুক যেন এক বিরতিহীন ক্লান্তিকে দূর করে দেয়। হটাৎ করে ফারিয়ার বিয়ের কথা মাথায় আসলো। কদিন বাদে মেয়েটি আমার সাথে থাকবে না, রাজকন্যার আদরে যাকে মানুষ করেছি, সে তার জীবন সংগী নিয়ে আমাকে রেখে চলে যাবে। বাবারা হয়ত এভাবেই বেচে থাকে। সারাজীবন লেগে যায় একটি মেয়েকে মানুষ করতে আর কিছু সময়ের ব্যবধানে সেই বাবা সারাজীবনের সঞ্চয় তুলে দেয় আরেকজনের কাছে। এ যেন কষ্টে মোড়ানো এক অজানা সুখ।
চোখের জল গড়িয়ে পড়লেও তাতে আনন্দের শেষ থাকেনা, ফারিয়ার কথাই ভাবছি, ফারিয়া পেছনে এসে কতক্ষন যাবত দাঁড়িয়ে ছিলো বলতে পারবোনা, আমাকে আলতো করে জরিয়ে ধরলো পেছন থেকে। তার স্পর্শে যেন বাবা হবার সুখ অনুভব করি, আমার চোখ থেকে চশমাটা নিয়ে সে পরিষ্কার করতে করতে বললো, ” বাবা কাল তো আমরা দেশে যাচ্ছি, এটা নয় আমরা প্রথমবার যাচ্ছি কিন্তু তুমি তো দেশের কারো সাথে আমার দেখা করিয়ে দিলেনা, এতগুলো বছরে।” মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম, তার হাত থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে পড়লাম আর বললাম, “কেউ নেই তো কার সাথে পরিচয় করাবো বল”। ফারিয়া একটু মনমরা হয়ে বলল, তুমি সব সময় বলো মা মারা গেছে কিন্তু মায়ের কি কোন আত্মীয় স্বজন নেই? আর এটাও কখনো বললে না মা কিভাবে মারা গেলো।
এখন তুই অনেক বড় হয়েছিস অনেক কিছু বুঝতে শিখেছিস। তোকে আমার সাধ্যমত পড়ালেখাও শিখিয়েছি, মানুষ করেছি। কাল হয়ত তুই অন্যকোন ঘরে চলে যাবি। সে ঘরের মানুষ এর সাথে থাকবি, তাদের সাথে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিবি। স্বামীর ভালোবাসা, পরিবারের স্নেহ কখনোই যেন কম না হয় আমি এই দোয়াই করি। তোকে কখনো বলা হয়নি তোর মায়ের কথা, আমি ইচ্ছে করেই বলিনি। আমি কখনো চাইতাম না তোর মনেতে কষ্টের দাগ পড়ুক, বাবা কিনা তাই হয়ত মেয়ের চোখের পানি দেখতে পারবোনা। কিন্তু এখন সময় এসেছে তোকে কিছু জানানোর, জানিনা তোর বিয়ে হয়ে গেলে এই সময়টা আবার কবে আসবে।
ফারিয়া আমার সামনের চেয়ারে বসে আছে আমি তার দিকে চোখ তুলে তাকালাম। আজ আমি তাকে যে কথাগুলো বলতে চাচ্ছি গত পঁচিশ বছর ধরে আমি এই কথা সব সময়, সব জায়গায়, সবার থেকে আড়াল করে রেখেছি। ফারিয়াকে খুবই মনোযোগী দেখলাম, তার চোখে উৎসাহ দেখলাম, সে অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনতে চাচ্ছে আমার কথা।
পুরানো কথা মনে উঠতেই চোখে যে চিত্রটি ভেসে উঠলো তা বড়ই নির্মম বড়ই যন্ত্রনার। ফারিয়ার বয়স তখন ৮ মাস, আমি সেন্ট্রাল জেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষন পর পর ফারিয়া কেঁদে উঠছে ক্ষুদার তাড়নায়। আমার হাতে রাখা ফিটার ভর্তি দুধ তার মুখে পুড়ে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতেও ব্যস্ত, আবার অন্যদিকে কিছুক্ষনের মধ্যেই রাবেয়ার লাশ নিয়ে আসবে একদল পুলিশ কর্মকর্তা সে ভাবনাতেও ব্যস্ত। কিছু পুলিশ সেন্ট্রাল জেল থেকে একটি খাটিয়াতে করে রাবেয়াকে নিয়ে বের হলো। তাদের গাড়িতে রাবেয়ার মৃত দেহ রেখে একজন পুলিশ আমাকে গাড়িতে উঠার আহবান জানালো। আমি ফারিয়াকে বুকে চেপেই জিপ এ উঠে বসলাম। গাড়ি সোজা আগারগাও বস্তির সামনে এসে দাঁড়ালো। রাবেয়ার মৃত দেহ আর আমাকে নামিয়ে দিয়ে তারা যে যার মত চলে গেলো।
গতকাল ভোরবেলাতে রাবেয়াকে আইনগত ভাবে ফাসি দেওয়া হয়েছে। ফারিয়া আমার বুকের উপরেই আছে খানিকটা ঘুমে মগ্ন সে। ইতিমধ্যে বস্তির অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে রাবেয়া কে দেখতে, আমি রাবেয়ার খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে, তার মুখ উন্মোচন করলাম। রাবেয়া কে দেখার সাথে সাথে ভয়ে দুইপা পিছিয়ে গেলাম।
আমার রাবেয়া এমন কেন দেখতে হয়েছে, তার সেই মন কেড়ে নেওয়া হাসি মুখে নেই। গলা ফুলে গিয়েছে, মুখে লালা উঠেছে, তার মায়াবী চোখদুটো যেন ফেটে বের হয়ে আসতে চায়। দুচোখ মেলে উপর আকাশ দেখে কি যেন বলতে চাচ্ছে সে কিন্তু সে ভাষা কেউ বুঝে না। মুখে হতাশা চোখে বেদনা রয়েছে, বুকে কি রয়েছে, বুকের মধ্যে যে মন আছে সেটা দেখতে পারছিনা কেন? না দেখতে পারলেও আমি জানি তার মনে কি রয়েছে। রাবেয়ার খাটিয়া ধরে ধপাস করে বসে পড়লাম। ফারিয়া আবার কেদে উঠেছে, এবার তার কান্না থামানোর ইচ্ছা জাগেনি আমার মনে। কাঁদুক, কাদলে মন হালকা হয়। যত চিৎকার করে কাদতে পারুক সে কাঁদুক আজ কাদার দিন। আজ কষ্ট গিলে খাবার দিন। আমি রাবেয়ার পানে এক নজরে তাকিয়ে রইলাম, যে চোখ কোনদিন কাদেনি সে চোখ থেকে বিরতিহীন ভাবে পানি ঝড়ে যাচ্ছে।
বস্তির এক মহিলা ফারিয়াকে আমার কোল থেকে নিয়ে গেলো, সেও মাস খানেক হলো মা হয়েছে। ফারিয়ার কান্না থামাতে আড়ালে গিয়ে ফারিয়াকে তার বুকের দুধ খাওয়াতে লাগলো। সেই সম্পর্কে হয়ত ফারিয়ার দুধমা সেই মহিলা। কিন্তু আমার নজর সেদিকে নেই, আমি দেখছি কি নিদারুন ভাবে এক প্রেয়সী খাটিয়াতে শুয়ে আছে ফাসির শাস্তি ভোগ করে। তার দেহে প্রান নেই, হয়ত প্রানটা আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করছে কিন্তু আমি দেখছিনা। আমাকে হয়ত সে দেখে, আমার কান্না হয়ত সে দেখে, আমাকে দেখে সেও হয়ত কাদে। আচ্ছা এই কাদা আর কাদানোর মাঝে পার্থক্য কি? কেউ কাদে, কেউ আবার কাদিয়ে হাসে। এর মাঝে সুখ আছে কি? সুখ কোথায় কাঁদতে, নাকি কাদাতে? বড্ড জঞ্জাল এ ঘেরা প্রশ্ন মনের মাঝে।
শত শত মানুষের ভিড় জমলো, এক আসামী নামের উপাধী পাওয়া নির্দোষ নারীর মৃত দেহ দেখতে। একে একে সবাই রাবেয়ার ভয়ংকর মুখ দেখে সরে যাচ্ছে, আমি খাটিয়া ধরেই বসে আছি। মৃত্যু পর্যন্তই তো গল্প শেষ নয়। মৃত্যুর আগে রয়েছে আরো গল্প, মৃত্যুর পর পরকালের গল্প। এই মুহুর্তে পরকালের গল্প কি হবে তা ভাবতে পারছিনা, রাবেয়ার প্রাণহীন দেহ দেখে একটি গল্প অবশ্য বলা যেতে পারে, মৃত্যুর আগের গল্প। আমার আর রাবেয়ার জীবনে ঘটে যাওয়া গল্প।
মনিপুরের এতিম খানাতে বড় হয়েছি, তাই বাবা মায়ের কোন হুদিস জানিনা। আমাকে যে লালন করেছেন তার নাম রেয়াজুল। আমার বাবা মা বলতেই রেয়াজুল চাচাই আছে। সে এই এতিম খানাতেই কাটিয়ে দিয়েছে তার বয়সকাল। বলতে গেলে একটা বিয়ে তো করেছিলো কিন্তু কখনো সন্তানাদি নেয়নি, এই এতিম খানায় যত ছেলেমেয়ে আছে সবই নাকি তার সন্তান। আমি তখন উঠতি বয়সী, হবে আর কি আঠারো উনিশ বয়স। রেয়াজুল চাচা একদিন এসে আমাকে বললেন, সামনে গিয়ে কি করবি কিছু কি ভেবেছিস?
০- তেমন করে কিছু ভাবিনি। তবে এতদিন টুকটাক কাজ করে যে টাকা গুছিয়েছি তাই দিয়ে একটি ব্যবসা শুরু করবো। ব্যবসার লাভের অর্ধেক এতিম খানায় দিবো আর বাকি টাকা নিজের জন্য রাখবো।
— তা কি ব্যবসা করবি? টাকাও তো বেশী নেই, আমার কাছে যে টাকা জমা দিয়েছিস তা হয়ত হাজার বিশ হবে।
০- এই টাকা দিয়েই কিছু করবো ভাবছি।
— যাই করবি বুঝেশুনে করিস।
কথাটি বলে রেয়াজুল চাচা চলে গেলেন। আমি ভাবতে লাগলাম কি করা যায়। অবশেষে ভাবনা কে আরো মজবুত করতে রাস্তায় বের হলাম, সামনের দিনগুলোকে কিভাবে আরেকটু ভালো করবো । মাঝে মাঝে মনে হতো, মানুষ কেমন উদ্ভট প্রানী, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কত পরিকল্পনা তার ভবিষৎ নিয়ে। কিন্তু এত কিছু পরিকল্পনা করেও তারা জানেনা সামনে তাদের সাথে কি হবে। একটি আশা আর একগুচ্ছ স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলে অজানা গন্তব্যের পথে। এক সময় গতিরোধ হয় তারা থমকে যায় জীবনের শেষ বয়সে এসে। হাজারো চেষ্টা করে শেষ জীবনের হিসেব মেলাতে, কিন্তু কোন যান্ত্রিক বস্তু সেই হিসেব মেলাতে পারেনা। জিতে গিয়েও খানিকটা ব্যর্থতার রেশ নিয়ে মানবজনম চলতে থাকে। তারপরেও মানবজনম সবার প্রিয় সবার থেকে শ্রেষ্ঠ।
অগোছালো কথা ভাবতে ভাবতে অনেক দূর হেটে চলে চলে আসলাম। ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম আমি বিজয়স্বরনী মোড়ে এসে উপস্থিত হয়েছি। বামে ফার্মগেট যাবার রাস্তায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি, ডানে চন্দ্রিমা উদ্যান। উদ্যানে রয়েছে অনেক মানুষ। কিছু মানুষ একা কিছুমানুষ আজ জোড়াশালিক সেজেছে। কেউ কারো কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে কেউ কাউকে বাদাম ভেংগে মুখে তুলে যাচ্ছে। কেউ আবার সেই বাদাম বিক্রি করছে পেটের দায়ে। এই উদ্যানে কোটিপতি থেকে রোডপতি সহ অনেক বিচিত্র প্রকৃতির মানুষের আনাগোনা দেখতে পেলাম। কিন্তু আমার চোখ যেখানে গিয়ে আটকিয়েছিলো সেখানে চোখ না আটকালে হয়ত আমার গল্পের মোড় আজ অন্যদিকে যেতো।
মেয়েটির হাতে অনেকগুলো গোলাপ, কিছু বকুল ফুলের মালা ও রয়েছে। কখনো প্রাইভেট গাড়ির গ্লাসের সামনে কখনো বাসে উঠে, কখনো উদ্যানে এসে ফুল আর মালা বিক্রি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। গোলগাল চেহারা, শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ, মাথায় চুলের খোপা করে একটি বকুল মালা ঝুলিয়েছে। চোখে তে হালকা করে কাজলটানা, কপালে ছোট একটি কালো টিপ। সেই টিপকে আমি বলবো নজরফোটা। মেয়েটির দিকে যেভাবে আমি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েছিলাম আমারই নজর লেগে যেতে পারে। তপ্ত রোদে কপাল বেয়ে ঘামের পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সুর্যের ঝলমল আলোতে সেই ঘামের ফোটা আমার কাছে মুক্তো মনে হলো। কি সুন্দর চিকচিক করছে আর তার গালে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছুক্ষনের জন্য মনেতে উদয় হলো, যদি পারতাম আহা পারিতাম তবে তার গায়ের মেশক হইয়া যাইতাম, আর কিছু না হোক, তার গালে ঘাম হয়ে, গড়াগড়ি তো খেতাম।
আমি তাকে দেখে অনুভুতির জগতে চলে গেলাম। মনেতে এক অজানা শিহরন আমাকে বাধ্য করছে তার দিকে তাকাতে, তার কথাই ভাবতে। হঠাৎ লক্ষ করলাম সে আমার দিকে এগিয়ে আসতেছে, একটু ঘাবড়িয়ে গেলাম। না জানি সে কি বলবে, আমি এতটাই ঘাবড়ে গিয়েছিলাম যে ভুলেই গিয়েছিলাম সে একজন ফুল বিক্রেতা। হয়ত সে ফুলের খরিদদার খুজতেই আসছে। তড়িঘড়ি করে লুকাতে চাইলাম, কিন্তু ততক্ষনে সে আমাকে ডাক দিয়ে বসলো, “স্যার ফুল নিবেন না” আমি পেছন ঘুরে তার কথা শুনে দাঁড়িয়ে গেলাম। সে তো ফুল বিক্রি করতে আসছে আমি কেন পালাচ্ছি।
আর তার সামনে আসা দেখে আমার হৃদয় এত ঘাবড়ে গেলো কেন? এই ঘাবড়ে যাবার কারন আবার সেটা নয়ত, যা দিয়ে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক প্রেমিক তার ভালোবাসার নামে ইতিহাস তৈরি করে দিয়েছে। বইতে একবার পড়েছিলাম প্রেম হতে নাকি এক সেকেন্ডই যথেষ্ট। আমার বেলাতেই কি বইয়ের কথা সত্য হতে হবে, না! না! আমি প্রেমে পড়িনি। তবে একটু ভয় পেয়েছি বটে। আমি কেন জানি তার দিকে তাকাতে পারছিলাম, উলটো দিকেই তাকিয়ে রয়েছি। সে আবার বলতে লাগলো, “না কিনলে বলে দেন আমি কিনবো না। চুপ করে থেকে আমার সময় কেন নষ্ট করেন।” এবার তার কথাতে একটু রাগ আর অভিমান মিশ্রিত ছিলো। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম “আমি তো আপনাকে ডাকিনি”
০- ডাকতে হইবো কেন? আপনি তো আমার দিকে তাকিয়ে আছিলেন। তাইতো আমি বুঝে গেছি আপনার ফুল লাগবো। বলেন কয়টা দিবো, একটা পাচ টাকা, দুইটা নিলে আট টাকা রাখতে পারমু।
— আমার তো ফুল লাগবে না, আমি ফুল দিয়ে কি করবো?
০- আপনার প্রেমিকারে দিবেন। নইলে বউরে দিবেন।
— আমার দুটোর মধ্যে একটাও নাই।
০- যখন ফুল কিনবেন না, তাইলে লাডাই এর মত চোখ বাইর কইরা তাকাই আছিলেন কেন?
— আমিও ফুল বিক্রি করবোতো তাই দেখছিলাম কিভাবে বিক্রি করতে হবে। আর কোথায় বিক্রি করবো।
মেয়েটি রেগে গেলো, মায়াভরা চোখে যেন আগুন জলে উঠলো, কোমরে দুহাত ঠেকিয়ে আমাকে বলতে লাগলো, “জাহান্নাম এর চৌরাস্তায় গিয়ে বিক্রি করবেন, এই রোডে আমি বিক্রি করি, এদিকে ফুল নিয়ে আসলে হাত পা ভাইংগা রোডে বসাই রাখুম” তার কথাশুনে আমি রিতিমত ভড়কে গেলাম। উত্তর দিতে চাইলাম কিন্তু সে অপেক্ষা না করে চলে যেতে লাগলো। আমি ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, আমি তো একটা ব্যবসার খোঁজে বের হয়েছিলাম, আর মুখ থেকে বের হলো ফুল বিক্রি করার কথা। এমনটা কেন হলো, তবে কি আল্লাহও চায় আমি ফুল বিক্রি করে এই, মেয়েটির আশেপাশেই থাকি। যে মেয়েকে দেখে মন শিহরিত হয়েছে, ভয় হয়েছে, কথা বলতেও লজ্জা লেগেছে। যাকে একবার দেখেই মনে হয়েছে এই শ্যামবর্ণধারী মেয়েকে হাজার বছর দেখে গেলেও দেখার তেষ্টা মিটবেনা। সে হেটে চন্দ্রিমা উদ্যানে প্রবেশ করতে লাগলো। আমি তার পিছু নিলাম, তার লক্ষ্য সামনের দিকে। যাকে পাচ্ছে তার কাছে গিয়েই ফুল এগিয়ে জিজ্ঞেস করছে ফুল লাগবে নাকি। আমি পেছন থেকে ডাক দিলাম শুনুন, সে ফিরে তাকিয়েই বলতে লাগলো, “কি হইছে”
০- এত রাগ হলে কি হয়। দুজনে মিলে ফুল বিক্রি করলে লাভ তো বেশী হবে তাইনা।
— নিজেই ফুল পাইনা আপনারে ফুল দিমু কোথা থেকে, আড়াই টাকার ফুল সাড়ে তিনটাকা দিয়ে কিনতে হয়। শুধু নগদ টাকা দিতে পারিনা বলে। কখনো একটা ফুলে এক টাকা লাভ হয় কখনো পঞ্চাশ পয়সা।
০- আমার কাছে টাকা আছে, আপনি যদি আমাকে বলে দেন কোথা থেকে ফুল আনতে হবে আমি সেখান থেকে নগদ টাকায় ফুল এনে আপনাকে আড়াই টাকাতেই দিবো। তখন তো আপনার ব্যবসা ভালো হবে।
এবার সে একটু নরম হলো, একটু কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো “কতটাকা আছে আপনার কাছে?”
০- যে টাকা আছে ফুল কিনতে পারবো।
— এখানে ১৫ জন হকার আছে সবাই সালাউদ্দিন ভাইয়ের থেকে বাকিতে ফুল আনে। সেগুলো বিক্রি করে টাকা দেয়। আপনি যদি সবাইরে নিয়া ব্যবসা করতে পারেন তাইলে আপনার লাভ ও কম হবেনা।
০- আপনি পারবেন সবার সাথে আমার কথা বলিয়ে দিতে।
— হুম পারুম। আর এক ঘন্টা পর সবাই ফুল নিতে যাইবো, আপনি এই এক ঘন্টা আমার সাথেই থাকেন। তারপর সবার সাথে কথা বলিয়ে দিবো।
আমি তার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলাম। এই এক ঘন্টা যেন আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় অতিবাহিত করেছি। পুরোটা সময় জুড়ে কথায় কথায় খিলখিলিয়ে হাসা। হাত বাকিয়ে খোপার চুল ঠিক করা, তেড়োবাকা নয়নে ফিরে ফিরে যাওয়া, আমাকে মেরেছে, একদম অন্তরে ঘা তুলেছে তার প্রতিমুহুর্তে। এই ঘায়ে ব্যথা নেই, কষ্ট নেই শুধুই সুখ রয়েছে।
ঘন্টাখানেক পর সে সবার সামনে আমাকে উপস্থিত করলো। আমার বলা কথাগুলো সবাইকে বললে সবাই যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে, এতটাই আনন্দিত হয়েছে। সবাই যখন আনন্দে পুলকিত, নতুন স্বপ্ন যখন সবার চোখে ভাসতেছে তখন মেয়েটি সবার উদ্দেশ্যে আবার বলে উঠলো “আচ্ছা গুদারাঘাট এর কোথা থেকে ফুল আনে কেউকি চিনোস” একটি ছেলে বলে উঠলো “আমি চিনি, কেন?” মেয়েটি মাথার খোপা ঠিক করতে করতে আবার বললো “সালাউদ্দিন ভাইয়ের থেকে ফুল আড়াই টাকায় কিনে যদি সে আমাদেরকে আড়াই টাকাতেই দেয় তাহলে তো তার লাভ হবেনা। গুদারাঘাট থেকে ফুল নাকি আরো কমে পাওয়া যায় সে যদি কমে কিনে কিছু লাভ রেখে আমাদের ফুল দেয় তাহলে তারও লাভ হবে আমাদের ও লাভ হবে।
” আমি মেয়েটির বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা না করে পারছিলাম না। রুপে গুনে সব দিকেই এগিয়ে সে। ছেলেটি বলে উঠলো, “গুদারাঘাট থেকে ফুল আনতে হইলে সন্ধ্যার মধ্যে কত ফুল লাগবো সেই টাকা বাগান মালিকের কাছে বুঝাই দিলেই ভোর বেলাতে ভ্যানগাড়ি করে ফুল পাঠিয়ে দিবে”। এবার আমি বলে উঠলাম, “ঠিক আছে আমি তাহলে বাসায় গিয়ে টাকা নিয়ে আসি। সন্ধ্যা হবার আগে আমি আর আপনি দুজন মিলে গুদারাঘাট চলে যাবো। সবাই আমার কথাতে সায় দিলো। আমইই বিদায় নিয়ে এতিমখানার উদ্দেশ্যে বের হলাম। পেছন থেকে মেয়েটি ডেকে বললো “স্যার আসবেন তো ফিরে? স্বপ্নটা আবার ভেংগে যাবে না তো?” আমি ঘুরে তাকালাম, তার চোখে আনন্দের অশ্রু এসে ভিড় করেছে। ছপছপ করছে জলের কণাগুলো কাজল নয়নের মধ্যে, বড় করে একটি নিশ্বাস ফেলে বললাম “মরে যাবো তবু আপনার চোখের স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দিবোনা।
কথাটি বলে শেষ করতেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো। জলের ফোটা গালে এসে জমতেই আবার তা মুক্তোর মত ঝলঝল করতে লাগলো, আমি এগিয়ে গেলাম তার কাছে। দুহাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলাম “নাম কি আপনার” মেয়েটি নিজের আচল দিয়ে চোখ পরিষ্কার করতে করতে বললো “রাবেয়া”। এক সেকেন্ড এর কম সময় লেগেছিলো তার নামটি বুকের মধ্যে স্বর্নখোদাই হয়ে লিপিবদ্ধ হতে। আমি দুষ্টামি করে বললাম “ওকে রাবু আপনি থাকেন আমি টাকা নিয়ে ফিরে আসছি।” সে আবার একটু খেপে গেলো, “আমার নাম রাবেয়া রাবু না” আমি মুখে চিলতে হাসি নিয়ে বললাম, আমি তো রাবু বলেই ডাকবো। কথাটি বলে বাস উঠে পড়লাম, আমি যতক্ষন তার চোখের সীমানা পেড়িয়ে না গেছি ততক্ষন তাকিয়ে ছিলো। তার চোখে একটি কথাই পেয়েছি বারবার ফিরে আসবেন, তাড়াতাড়ি আসবেন।
রেয়াজুল চাচার থেকে টাকা নিয়ে যথা সময়ে আমি সেখানে উপস্থিত হতেই সবাই ছুটে এলো, সাথে রাবেয়াও। সন্ধ্যা হতে বেশি সময় নেই। আমি তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে নিয়ে গুদারাঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আর রাবেয়া কে বলে গেলাম ফিরে এসে গল্প করবো।
সবাই প্রতিদিন কত টাকার ফুল বিক্রি করতে পারে তার ধারনা রাবেয়া আমাকে আগেই দিয়েছিলো। সেই হিসেব মত আমি পনেরো হাজার টাকার ফুল কিনলাম। ফুল কাল ভোরবেলা চলে আসবে আমাদের ঠিকানায়। তারপরেও আমার মন মানছিলোনা তাই ভাবলাম কাল ভোরে আমি এখানে আসবো আর প্রথম দিনের ফুল নিজেই সাথে করে নিয়ে যাবো। আমাদের ফিরে আসতে রাত হয়ে গিয়েছিলো, সবাই যে যার মত বাসায় চলে গেছে। তারা সবাই তালতলা তে থাকতো, আমি শওকত কে নিয়ে তাদের বস্তিতেই গেলাম। আমাকে দেখে রাবেয়া ছুটে আসলো, আমার কাছে আসতে আসতে অনেকটা হাফিয়ে উঠেছে মেয়েটি।
বড় নিশ্বাস নিতে নিতেই জিজ্ঞেস করলো “কত টাকার ফুল কিনলেন?” মুখে তার উৎসাহ এবং আনন্দ দুটোই দেখতে পেলাম। তার কৌতুহল দেখে মনটা সুখে ভরে গেলো, আমি কিছু বলার আগে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শওকত বলে উঠলো “আপা! ভাইজান পনেরো হাজার টাকার ফুল কিনছে! রাবেয়া জিভে কামড় কাটলো, আল্লাহ গো এত ফুল। এইবার আমাকে সুখের দিন ফেরায় কে, বলেই কুতকুতিয়ে নেচে উঠলো। বড্ড ভালো লাগছিলো এই পাগলীর আনন্দ দেখে। নিজের চোখেতেও প্রথম আমি আনন্দের অশ্রুর অনুভব করলাম। সেদিন সে পুটি মাছ রেঁধেছে আমাকে না খেয়ে আসতেই দেয়নি। সবার সাথে কথা হলো কাল ফুল আসারর সাথে সাথে ফুল গুলো বাছাই করতে হবে। তাই সিদ্ধান্ত হলো ফুল সরাসরি বস্তির এখানেই আসবে। সব কিছু ঠিকঠাক করে আমি বিদায় নিয়ে চলে আসলাম।
কালকের সুর্য আমি সহ আরো পনেরোজন মানুষের জীবনে নতুন এক স্বপ্ন, নতুন এক আশা নিয়ে পৃথিবীতে উদয় হবে। সেই আনন্দে সেই চিন্তায় ঘুমই হলোনা আমার। ফজরের আযান এর আগেই আমি গুদারাঘাট চলে গেলাম। সেখানে গিয়ে নিজ দায়ীত্বে সব ফুল ভ্যানে তুলে সোজা বস্তিতে এসে দাঁড়ালাম। আমি ভেবেছিলাম আমিই সবার আগে এসে পড়েছি কিন্তু না, আমি সবার শেষে এসে হাজির হয়েছি। কেউ বালতি নিয়ে, কেউ পানি নিয়ে, কেউ ফুলের কাটা, কাটার জন্য ছুড়ি নিয়ে অধীর আগ্রহে আমার আসার অপেক্ষা করছিলো। তাদের মনোবল, আত্মবিশ্বাস আর নতুন করে কিছু শুরু করার প্রয়াস দেখে, নিজেই নিজেকে বলতে লাগলাম আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে। গতকাল যদি মুখ দিয়ে ফুল বিক্রির কথা বের না হতো, তাহলে হয়ত আমি আজ এতগুলো মানুষের ভরসার পাত্র হতে পারতাম না।
আমাকে দেখে সবাই ভ্যান গাড়ির দিকে ছুটে আসলো, আমাকে রাবেয়া একটা কথাই বললো “আপনি মহাজন মানুষ ঐ চেয়ারে গিয়ে বসেন। আমরা সব করতাছি।” আমাকে সে আর কথা বলার সুযোগ দিলো না। সবাই যে যার মত কাজ করছে আপন মনে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সব কাজ শেষ এবার ফুল ভাগাভাগির পালা। রাবেয়া নিজে সবাইকে ফুল ভাগ করে দিলো। আমি রাজা হলে যে একজন রানী এই কথা প্রমাণ করতে সে বিন্দু পরিমান ছাড় দেয়নি।
নতুন দিনের উদ্যমে সবাই বের হয়ে গেলো রোজকার ব্যস্ত শহরে পেট বাচানোর তাগিদে। এভাবেই আমার ব্যবসা চলতে লাগলো। ধীরে ধীরে আরো লোকজন আসতে লাগলো আমার দলে। আমি সবার থেকে আড়াই টাকাই নেই একটি ফুলের জন্য। তারপরেও আমার অনেক লাভ থাকে। কম টাকায় ফুল দেই বলে আশেপাশের হকারি ব্যবসায়ীক গুলো আমার থেকে ফুল নেওয়া শুরু করলো। এখন রাবেয়া বাহিরে ফুল বিক্রি করতে যায়না। আমার সাথেই থাকে টাকা পয়সা আর ফুলের হিসেব রাখে।
ইতিমধ্যে আমার আর রাবেয়ার মধ্যে বোঝাপড়া হয়ে গেলো দুজন ব্যবসার পাশাপাশি একটি ছোট্ট সংসার সাজাবো। রাবেয়ার ও আমার মত কেউ ছিলোনা। তাই রেয়াজুল চাচা আমাদের দুজনের বিয়ে দিলেন। দিনে দিনে যেমন বাড়ছিলো ব্যবসা তেমনি ছিলো আমাদের দুজনের ছোট্ট সংসার। জীবনে যদি কালো মেঘের ছায়া না থাকে তবে নাকি জীবন কে বোঝা যায়না। সেদিনো এসে গেলো অন্ধকারের দিন, কালো মেঘের দিন। রাবেয়া গর্ভবতী ছিলো তখন। বাবা হওয়ার উল্লাসে আমি পুরো বস্তিবাসী কে মিষ্টি আর শিন্নি খাইয়েছিলাম। সুখে থাকা মানুষের উপর শকুনের নজর পড়বেই। সেরকম ভাবে আমাদের সুখে নজর পড়লো আকরাম নামক এক শকুনের।
সে এই এলাকার পাতিনেতা ছিলো, কিছু রাজনীতিবিদ লোকদের সাথে হাত থাকার কারনে, সবার উপরই জুলুম করতো সে। একদিন সে আমার কাছে এসে বললো, আমি যেন ফুলের দাম বাড়িয়ে দেই বর্তমান বাজার দর থেকে ১ টাকা হারে। আর সেই উপরিউক্ত টাকা তাকে চাদা হিসেবে দিতে হবে। আমি রাজী হলাম না। আমাকে শাসাতে লাগলো, ধমকাতে লাগলো তারপরেও রাজী হলাম না। এক পর্যায় তার সংগের একজন আমাকে চড় মেরে বসলো, আমিও রেগে গিয়ে তাকে ঘুষি বসিয়ে দিলাম।
তখন আকরাম আর চুপ থাকেনি দুজন মিলে আমাকে মারতে লাগলো, আমি আকরাম কে জোরে ধাক্কা দিলাম নিজেকে বাচানোর জন্য। আরো ক্ষেপে সে। একটি ছুড়ি নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসছে, আমি ঘাবড়ে গেলাম, এবার জান বাচানো ফরজ ভেবে সেখান থেকে পালাতে চাইলাম। কিন্তু তার সংগের জনের সাথে আমার এখনো ধস্তাধস্তি হচ্ছে। যার কারনে পালাতেও পারছিলাম না। আমি শরীরের সমস্ত জোর লাগিয়ে, তাকে ফেলে দিলাম। আর পাশে পড়ে থাকা লোহার রড হাতে নিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে, আকরামের মাথায় আঘাত করে বসলাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই আকরামের মাথা থেকে চিড়চিড় করে রক্ত বের হতে লাগলো। খানিক সময়ের ব্যবধানে আকরাম ঢলে পড়লো মাটির উপর। রাবেয়া এই কান্ড দেখে ছুটে আসলো। আমার হাত থেকে রড নিয়ে দূরে ছুড়ে মারলো। স্থানীয় লোকেরা গণ্ডগোল দেখে পুলিশকে আগেই খবর দিয়েছিলো। আমি থমকে গিয়েছিলাম, হাত পা অচল গিয়েছিলো এক নজরে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। গলাকাটা মুরগীর মত ছটফট করতে করতে আকরাম শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
এরই মধ্যে পুলিশের সাইরেন এর শব্দ পেয়ে কলিজা আরো শুকিয়ে গেলো। এরই মধ্যে রাবেয়া আমাকে বললো “আমার কসম, আমার পেটে এই সন্তানের কসম। পুলিশের সামনে তুমি একটা কথা বলবে না, তোমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে এই বস্তির মানুষ আবার না খাইয়া মরবো। একটা কথা বলবে না তুমি যদি মুখ খোলো তাহলে আমার আর তোমার এই সন্তানের মরা মুখ দেখবা তুমি।” আমি কি বলবো কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমার বলার শব্দগুলোকেও রাবেয়া কসমের জালে বন্দি করে দিলো।
পুলিশ আসলো, রাবেয়া সামনে এগিয়ে বলতে লাগলো, আকরাম আমার স্বামীরে মারতে ছিলো তাই আমি তাকে রড দিয়ে বাড়ি দিয়েছিলাম। পুলিশ আমার সামনে রাবেয়াকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেলো। আমি নিথর হয়ে চোখের জল ছেড়ে শুধু দেখছিলাম এক নারী তার ভালোবাসাকে বাচাতে, আরো বিশ পরিবারের মানুষকে বাঁচাতে নির্দোষ হয়েও দোষী বেসে হাতকড়ি হাতে পড়ে চলে যাচ্ছে। আমি ফারিয়ার দিকে তাকালাম, আমার চোখ ঘলিয়ে গেছে চশমার ভেতর থেকে টপটপ করে পানি ঝড়ছে। ফারিয়ার মুখটাও ঠিকমত দেখতে পারছিলাম না। চোখ থেকে চশমা খুলে ভালো করে তাকালাম ফারিয়ার দিকে সেও আমার মত কাদছে মেয়েটির চোখে দেওয়া কাজল পানির সাথে ধুয়ে আসছে, মসৃন উজ্জ্বল গালে কালো ছাপ ছাপ রেখে সে পানি মাটিতে তলিয়ে যাচ্ছে। আমি ফারিয়াকে কাছে টেনে নিলাম তার চোখের পানি মুছে দিয়ে কপালে একটি চুমু দিলাম। কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলতে লাগলাম।
তোর মায়ের ফাসির আদেশ হয় আমরা গোলা ফাটিয়ে যতই বলেছি আকরাম আমাদের উপর অত্যাচার করতেছিলো, আইন আমাদের সে কথা শোনেনা তোর মায়ের শাস্তি মাফ করেনি। তুই পেটে ছিলি বলে আরো এক বছর তোর মা পৃথিবীর আলো দেখেছিলো। তোকে জন্ম দেওয়ার আট মাস পর তোর মায়ের ফাসির আদেশ কার্যকর হয়। তুই এই আটমাস তোর মায়ের সাথেই আজতে ছিলি। এক জীবনের ভালোবাসা উজার করে দিয়েছে আমার জন্য তোর জন্য। খেটে খাওয়া ফুল বিক্রি করা হকার দের জন্য। জেলের এক মহিলা আমাকে বলেছিলো তোকে নাকি তোর মা সারাদিন চুমু দিতো, বুক থেকে এক মিনিটের জন্য সে তোকে সরাতো না।
যেদিন তোর মায়ের ফাসির দিন আসে, সেদিন তোকে আমার কোলে দিয়ে একটাই কথা বলেছিলো, আমার মেয়েকে আমানত হিসেবে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। যেভাবে পুরো বস্তিকে তুমি আগলে রেখেছো আমার মেয়ের বেলাতে যেন তাই হয়। তাকে অনেক পড়ালেখা করাবে, আমি তো পড়ালেখা করিনাই, তাই সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে অনেক বড় অফিসার বানাবো এটাই স্বপ্ন ছিলো। আমার এ স্বপ্ন যেন ভেংগে না যায়। আমি কাদো কাঁদো কন্ঠে বললাম “মরে যাবো তারপরেও তোমার চোখের স্বপ্ন ভাংতে দিবোনা”। আমার কথা শুনে তোর মা আবেগী হয়ে গেলো, কাছে এসে আমাকে আর তোকে এক সাথে জরিয়ে ধরলো। আমার কপালে গালে চুমু দিতে লাগলো। তার উষ্ণ ঠোটের সাথে চোখের জল একাকার করে দিলো আমার মুখমণ্ডল কে।
আমার বুকে দিয়ে আবার তোকে তার বুকে টেনে নিয়ে একাধারে কয়েকশো চুমু দিলো। তারপর দুজন পুলিশ এসে তোর মাকে নিয়ে গেলো। আমি তোকে বিকেল বেলা নিতে গিয়েছিলাম ভোর রাতে তোর মা কে ফাসি দেওয়া হবে। আমি কি করে তোকে নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরি। সারা রাত সেই জেলের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তোর মা যতক্ষন আমার সামনে ছিলো আমি পাষান হয়ে ছিলাম, যেতেই মরার চোখের পানি সাগরের ঢেউ হয়ে আসতে লাগলো। আর কোন ভাবেই তাকে বাধ মানাতে পারলাম না। শুধু আমি না তোর মায়ের মৃত্যুতে পুরো বস্তি কেদেছিলো সেদিন। হায়রে সে কি কান্না সবার, পুরো বস্তিতে শুধু আর্তনাদ আর আর্তনাদ। সকলের চোখের পানি সে নীল দরিয়াকেও হার মানিয়েছে। তাদের কান্নার শব্দের গুঞ্জনে আকাশ বাতাস ভারী হয়েছিলো সেদিন।
তোর মা চলে যাবার পর আমিও কেমন যেন মরে গেলাম। তোর চোখ দুটো একদম তোর মায়ের মত হয়েছে। তুই না থাকলে সেদিন আগারগাও এর বস্তি থেকে দুটো লাশ কবরে যেত, এক আমি আর তোর মা। কিন্ত তোকে রেখে মরলে তোর মায়ের স্বপ্ন যে ভেংগে যাবে। আমি তো আর তার স্বপ্ন ভাংগতে পারিনা। কিন্তু যে অলগলিতে তোর মায়ের স্মৃতি জরিয়ে ছিলো তা আমাকে বড্ড জালা দিতো। তাই দেশে থাকতে চাইনি। তোর বয়স যখন পাচ বছর হলো, তখন সমস্ত ফুলের ব্যবসা শওকত আর সোবহান ভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে, তোকে নিয়ে আমি কাতার চলে আসি। জুলাই মাসের ২০ তারিখে রাবেয়া আমাদের সবাইকে চলে যায়। তাই আমিমি প্রতি বছরের জুলাই মাসে দেশে যাই মিরপুর ১০ নম্বর করবস্থানে তোর মায়ের কবর দেখতে। আর সেই ফুল বিক্রিকারী হকার দের দেখতে। পুরানো কিছু বিষময় স্মৃতি থেকে রাবেয়ার ভালোবাসার স্মৃতিময় সুখ খুজতে।
এবার তোকে নিয়ে যাবো তোর মায়ের কাছে, যাবি মা তুই? ফারিয়া কথা বলতে পারছেনা। একটু খানি শব্দ আসলো তাও আটকে গেছে কোন কথা না বলে আমার বুকে এসে আমাকে জরিয়ে ধরে ফুফিয়ে কাঁদতে লাগলো। তার চোখের পানিতে আমার গায়ের পাঞ্জাবী ভিজে উঠলো। আমি ফারিয়ার তুলে বললাম, যাহ ব্যাগ গুছিয়ে ফেল। কাল বিকেলেই ফ্লাইট। সকালে সময় পাবিনা। ফারিয়া কথা না বলে, চোখ ডলতে ডলতে ভেতরে চলে গেলো। বড় করে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম। “রাবেয়া তোমার মেয়ের বিয়ে হতে যাচ্ছে, এবার কি তোমার স্বপ্ন পুরন হয়েছে। তাহলে আমাকেও তোমার কাছেই নিয়ে যাও। আর পারছিনা তোমাকে ছাড়া থাকতে”

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত