ভালোবাসার অপমৃত্যু

ভালোবাসার অপমৃত্যু
তনু, ‘আমার ১৫ লাখ টাকা লাগবে।’ শুনো জামান, ‘টাকা কোথায় রেখেছি, ভুলে গেছি।’ আজ তো বউয়ের মতিগতি ভালো না, সরাসরি নাম ধরেই ডাকলো আমারে!আজকের দিনটাই মাটি হয়ে গেল! অফিসে না জানি কি আছে আমার কপালে!
আমি একটি প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকতা। সিনিয়র থেকে জুনিয়র সবাই আমায় বেশ সমীহ করে চলে। আমি মানুষটা একটু একরোখা ঠিকই কিন্তু কাজে কখনো ফাঁকি দেই না। কেউ যদি ফাঁকি দেয়?তাহলে রাগে কিছুক্ষণ গজগজ করি, তারপরে পুরো কাজটা এক দমে করিয়ে নেই। এই জন্য ম্যানেজার স্যারও আমার উপর খুবই খুশি। সারাদিন অফিসে কেমন যেন উদাস হয়ে বসে আছি, মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরে, ‘এতগুলো টাকা কোথায় রেখেছে তনুশ্রী?’ হয়তো খেয়ালের ভুলেই সকালে ওভাবে বলেছে! সবসময় অফিস থেকে বের হতে সন্ধ্যা আটটা, সাড়ে আটটা বাজে। আজ বিকেল হতেই মনটা বাসায় যেতে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্য হেলে পড়ছে, ঘড়ির কাঁটায় সোয়া পাঁচটা বাজে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলাম।
গাড়িতে উঠেই কেমন যেন অস্থির লাগছে, কখন যে বাসায় যাবো? একরাশ কল্পনায় আমি যেনো হারিয়ে গেলাম। এইতো সেদিন তনুশ্রীর সাথে আমার বিয়ে হলো। আদর করে আমি ওকে তনু বলে ডাকি। বেশ খামখেয়ালী আমার তনু, এরজন্য কতোদিন ওকে বকেছি আমি। কিন্তু তনু আমায় খুব ভালোবাসে, ওর ভালোবাসার কাছে বরাবরই আমি হেরে যাই। ওর স্বপ্ন ছিলো নিজের বাসায় থাকবে, বছর দুয়েক আগে সেই স্বপ্নও পূর্ণ করেছি। বনশ্রীতে ১৮০০ স্কয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট আমার তনুকে উপহার দিয়েছি। ওর হাতে যখন ফ্ল্যাটের চাবি দেই,ওর চোখেমুখে সে কি আনন্দ যেন সদ্য ফোটা বেলী ফুল দাঁড়িয়ে আমার সামনে। হঠাৎই ঝাপিয়ে পড়েছিলো আমার বুকে। সেই উষ্ণতা কি ভোলা যায়, সেই হাসিমুখ কি আমি ভুলতে পারি? কিন্তু আজ তনু কি করলো?
কলিংবেল দিতেই তপন দরজা খুলে দিলো। দেখতে দেখতে তপনও কতো বড়ো হয়ে গেলো। আমার ছেলেটা এখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র। দেখতে আমার মতো হলেও, তপনের চোখ দুটো একদম ওর মায়ের মতো হয়েছে। সমুদ্রের মতো গভীরতা আছে আমার তনুর চোখে, ওর কাজল কালো ঔ দুচোখে কতোবার যে আমি হারিয়ে গেছি তার কোন হিসাব নেই। আমায় দেখে তনু খুব অবাক, ব্রু কুঁচকে বলে, ‘আজ এতো জলদি এলে, শরীর খারাপ করে নি তো?’ আমার যে কেবল তোমার কথা মনে পড়ছিলো অফিসে। তোমার জন্যই তো ছুটে এলাম অফিস থেকে। তনু এবার একটু লজ্জা পেয়ে গেলো। লজ্জা পেলে ওর গাল যখন লাল হয়ে যায়, আমি তখন আরেকবার ওর প্রেমে পড়ে যাই। তনুর গলা খাঁকারিতে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে যাই, দেখি মা ছেলে দু’জনে মিলে হাসছে।
– ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি তোমায় চা বানিয়ে দিচ্ছি অগত্যা কি আর করা ফ্রেশ হয়ে চায়ে চুমুক দিয়েই বউকে বললাম ,
– টাকাগুলো কি খুঁজে পেলে?
– না পাই নি!
– একটু খুঁজে দেখো না কোথায় রাখলে?
– মনে নেই আমার!
– ইনকাম ট্যাক্সের ১৫ লাখ টাকা জমা দেয়া বাকী!
– তো আমি কি করবো?
– (জামানের মুখ রেগে লাল হয়ে গেছে) প্রতি মাসে বেতনের পুরো ৭২ হাজার টাকাই তো তোমার কাছে জমা রাখি, গত পাঁচ বছরে কি তোমার কাছে ১ টাকাও চেয়েছি? আমরা ফ্ল্যাট পার্টিশন করে যে ভাড়া দিলাম আর আমার টুকটাক শেয়ারের ব্যবসাতেই, আমাদের ছোট পরিবারের সংসার, আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালোভাবেই চলে যায়। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তুমি বেতনের পুরো টাকা আমার কাছ থেকে জমা রাখো, আর আজ তুমিই টাকা খুঁজে পাচ্ছো না?
– (তনুশ্রী একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো)
– তোমার কি কিছুই বলার নেই?
– তনুশ্রী এবার রেগে মুখ ভেঙচিয়ে না বললো!
– তোমাকে এক সপ্তাহের সময় দিচ্ছি, তনুশ্রী। যদি এক সপ্তাহের মধ্যেও সত্যিটা আমায় না জানাও, তবে আমায় হারাবে তুমি!
(এক সপ্তাহ পর)
দুইদিন ধরে আমি বাসায় যাই না, আমার তনু যে আমার বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ছেলেটা বারবার ফোন করেছে অবশ্য গতকাল, কিন্তু আমি যে নিরুপায়। হঠাৎ দুপুরে অফিসে আমার শালাবাবু হাজির। হন্তদন্ত হয়ে বললেন, ‘ আমিই তনুশ্রীর কাছ থেকে আপনার জমানো ৪৩ লাখ টাকা ধার নিয়ে ছিলাম। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছি। আমার বোন আপনার টাকা আত্মসাৎ করে নি। আমি আপনার সব টাকা ফেরত দিয়ে দেবো। ’ ও আমার বিশ্বাস ভেঙেছে, আমায় একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না! এই তনুকে তো আমি চিনি না। আমাকেও আপনার কোন টাকা ফেরত দিতে হবে না।
ম্যানেজার স্যারের রুমে আমার ডাক পড়লো, গিয়ে দেখি কক্সবাজারে আমার বদলির আদেশপত্র চলে এসেছে। স্যার অভিমানের সুরে বললেন, ‘আপনি কিন্তু থেকে যেতেই পারতেন ঢাকায়! সবাই ঢাকায় পোস্টিং নিতে মরিয়া থাকে, আপনি কিনা ঢাকা ছেড়ে স্বেচ্ছায় কক্সবাজার যাচ্ছেন! আমার সবচেয়ে দক্ষ কর্মী আজ বিদায় নেবে। একটা ফুলের তোড়া আমার হাতে দিয়ে স্যার বললেন, ‘ আপনার নতুন ব্রাঞ্চে পথ চলা আনন্দের হোক, শুভ কামনা রইলো।’
ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে, আমি তখন সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে। মনের জমা বেদনার ভার সইতে না পেরে সমুদ্রকে ফিসফিসিয়ে বললাম। বিশাল সমুদ্রের বুকে আমার কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হলো, থেকে থেকে সমুদ্রও গর্জন করে উঠলো। বিশ্বাস ভাঙার আর্তনাদে ভারী হয়ে গেছে সমুদ্রের তীর। হঠাৎ সমুদ্রের বুক চিরে সূর্য উঁকি দিলো। নীরবে কানে কানে বলে গেলো, ‘ বিশ্বাস ভাঙা মানুষকে আবারও বিশ্বাস করো না! এক ভুল জীবনে, ভুল করেও দু’বার করো না! ’

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত