ভালোবাসা তোমায় বিদায় জানালাম

ভালোবাসা তোমায় বিদায় জানালাম
অবনি, তুমি কি বিশ্বাস করো পৃথিবীতে ভালোবাসা বলতে কিছু আছে?
– হুম বিশ্বাস করি। ভালোবাসা আছে বলেই তো শাহজাহান তাঁর ভালোবাসার চিন্হ হিসেবে তাজমহল বানিয়েছে। ভালোবাসা আছে বলেই তো চণ্ডিদাস দীর্ঘ বারো টা বছর একজন মানুষের জন্য মাছ ধরার অভিনয় করে গেছেন। ভালোবাসা আছে বলেই তো পৃথিবী এতো সুন্দর। ভালোবাসা আছে বলেই তো আমি তোমাকে এতো ভালোবাসি।
– কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এগুলো মোহ। মোহ কেটে গেলেই তুমি আমাকে ভুলে যাবে।
– না,আমি তোমাকে কখনো ভুলবো না। তোমার খারাপ সময়ে যদি এই পৃৃথিবীর কেউ একজন পাশে থাকে। সেই মানুষটা আমি হবো। আমি আর অবনি পাশাপাশি হাঁটছি। অবনির হাতটা ধরার লোভে রিকশা নেইনি। রিকশা নিলে কি আর ওর কোমল হাতটা ধরতে পারবো? অবনি আমার হাত খুব শক্ত করে ধরে আছে। হয়তো সারাজীবন এভাবেই ধরে রাখতে চায় তাঁর ভালোবাসার মানুষকে। হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে ওঠে। কানে তুলে নিতেই ছোট বোনের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। কি হয়েছে,বোন? তুই কাঁদছিস কেনো?
-ভাইয়া,বাবা এক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে আছে। তুই তাড়াতাড়ি আয়।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমি দৌড়াচ্ছি, অবনিকে রেখেই দৌড়াচ্ছি। যতদ্রুত সম্ভম দৌড়াচ্ছি। মৃত্যুর আগে বাবা আমাকে শুধু একটা কথায় বলেছিল। তোদের আপন বলতে আর কেউ রইলো না। তোর মা তো অনেক আগেই তোদের কে ছেড়ে চলে গিয়েছে। আজকে আমিও চলে যাচ্ছি। তুই তোর বোনটাকে দেখিস। তুই ছাড়া ওর আপন বলতে আর কেউ রইলো না। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমার কেনো জানি ওইদিন চোখ দিয়ে জল বের হয় নি। বুকের ভিতর অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করেছি শুধু। বাবা তেমন কোনো টাকা পয়সা রেখে যায়নি। যা আমাদের কাজে লাগতে পারে। তবে থাকার জন্য বাড়িটা রেখে গিয়েছেন। তিনি তীল তীল করে অনেক কষ্ট করে বাড়িটা কিনছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বাড়িতে বেশিদিন থাকা হলো না।
আমাকে জীবন যুদ্বে নেমে পড়তে হলো। আশেপাশের মানুষ শুধু সান্ত্বনাই দিবে। দুবেলা না খেয়ে থাকলে কেউ খাবার দিয়ে যাবে না। দুবেলা খাবার,বোনের লেখাপড়ার খঁরচ সবকিছু আমাকেই জোগাড় করতে হতো। আমি পড়ালেখা থেকে নিজেকে দূরে রাখলাম। অনার্স টাও শেষ করতে পারলাম না। এখন আর নিজেকে নিয়ে চিন্তা হয় না। বোনটাকে ভালো ভাবে বিয়ে দিতে পারলেই হয়। আমার কোনো একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সারাদিন টিউশনি করার পর মাঝে মাঝে কিছু সময় বিরতি পাই। সেই সময়টুকুতে চাকরির খোঁজ করি। যেখানে মাস্টার্স পাশ করা হাজার হাজার ছেলে চাকরি পাচ্ছে না। সেখানে অনার্স ফেল করা মানুষের চাকরি পাওয়াটা দুঃসাধ্য। তবুও নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হলেও খুঁজে যাই।
সেই সকাল থেকে উদ্যশেহীন ভাবে অনবরত হেটে চলেছি। এখন প্রায় দুপুর প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। মানিব্যাগ টা চেক করে দেখলাম বিশ টাকা আছে। এই টাকা দিয়ে অন্তত পেট ভরে কিছু খাওয়া যাবে না বুঝতে পারলাম। এমন সময় একজন পাঁচ বছরের ছেলেকে দেখলাম আমার কাছে কিছু চাচ্ছে। বুঝতে পারলাম ছেলেটা অনেক ক্ষুধার্ত। নিজের কথা না ভেবে যে বিশ টাকা সম্বল ছিলো সেটা ওকে দিয়ে দিলাম। বিকেলে যখন পেটের ভিতর প্রচন্ড ক্ষুধা অনুভব করলাম। তখন কোনো কিছু না ভেবে একটা হোটেলে গিয়ে বসে পড়ি। আর খাবার অর্ডার করে দেই। খাবার খাচ্ছিলাম এমন সময় দেখলাম,আমার সামনে অবনি বসে আছে। তখন মনে হলো যাক অন্তত হোটেলে আর কাজ করতে হবে না। ওভাবে উদ্ভটের মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলে কেনো? মনে হচ্ছিল যেকোন সময় পড়ে যাবে তুমি।
– আসলে অনেক ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই হয়তো ওরকম হয়েছে।
– তাই বলে নিজের একটু যত্ন নিবে না। আর তোমাকে কতো ফোন দিয়েছি তুমি জানো? তোমার সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু তোমার দেখা পাইনি। তুমি নাকি তোমার কোনো বন্ধুর সাথেও যোগাযোগ রাখো নি?
– ফোনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ টা নষ্ট হয়েছে আমার কারণেই। আমিই তাদের কাছে টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না টাকা চাওয়াটাই বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার কারণ হবে।
– এখন কি করছো?
– চাকরি খুঁজছি। আর টিউশনি করাচ্ছি। এমন সময় হোটেল বয় বিল নিয়ে হাজির। আমারও খাওয়া শেষ। অবনি আসলে আমার মানিব্যাগ ফাকা। খুব বেশি ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই সাত পাঁচ না ভেবে এসে বসে পড়েছি।
– তুমি মাঝে মধ্যে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করো না। যদি আমি না দেখতাম তোমাকে তাহলে কি হতো?
– কি আর হতো? ওরা আমাকে দিয়ে কাজ করিয়ে টাকা শোধ করে নিতো।
– চুপ করো।
এখন প্রায় বিকেল সন্ধ্যা। আমি আর অবনি হাঁটছি। সকালে যেমন উদ্যশেহীন ভাবে হেটেছি। তবে এখন উদ্যশে আছে,অবনির বাসার দিকে যাচ্ছি। কথা বলতে বলতে কখন যে অবনির বাসার সামনে এসে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।
চলে আসার সময় অবনি আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে দিলো। আর একটা রিকশায় উঠিয়ে দিলো। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো টাকাগুলো নিতাম না। তবে এখন টাকাগুলো অনেক কাজে দিবে। তাই আর না করলাম না। রিকশা নিয়ে বাসায় না গিয়ে সোজা বাজারে গেলাম। বাসায় তেমন কিছু নেই। সেই কবে চাউল কিনেছিলাম মনে নেই। এক বস্তা চাউল কিনলাম। আর বাকিটা টাকা দিয়ে বোনের জন্য কিছু শপিং করলাম। বাবা মারা যাওয়ার পর বোন কে কিছু দিতে পারিনি। বাসায় গিয়ে দেখলাম বোন একা একা খাবার টেবিলে বসে আছে। ভাইয়া,তুই কই ছিলি সারাদিন? দুপুরেও খেতে আসলি না। অনেক ভয় করে আমার তোকে ছাড়া।
– কিসের ভয়? আমি তো তোর সাথেই থাকি সবসময়। যেখানেই থাকিনা কেনো, আমার ভালোবাসাটা সবসময় তোর সাথে থাকে। এই দেখ তোর জন্য কিছু এনেছি।
– বাহ্,অনেক সুন্দর জামাগুলো। তুমি কি কিনেছো?
– আমার কিছু পছন্দ হয়নি। তবে কিনবো কাল একবার যাবো। আজকে তেমন সময় ছিলো না।
বোনটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আমিও ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙলো সকাল দশটায়। বোন রান্না করে রেখে কলেজে চলে গিয়েছে। হাতমুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসবো এমন সময় পাশের বাড়ির এক চাচাকে দেখলাম। একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
– কার বিয়ে?
– তোমার বোনের
– কিন্তু আমি তো এখন ওর বিয়ে দিতে চাই না।
– ছেলেটা ভালো, আমেরিকার একটা ইউনিভার্সিটি থেকে লেখাপড়া করেছে। ভেবে দেখো একবার। মা মরা মেয়ে আর কতো কষ্ট করবে।
– আচ্ছা আমি ভেবে দেখবো।
– তবে সমস্যা হলো ছেলের বাবা মা মেয়ে পক্ষের কাছ থেকে অনেক উপহার চায়।
বিকেল যখন বোনকে জিগ্যেস করলাম তোর কোনো ছেলেকে পছন্দ কি না। তাঁর উত্তর হলো না। বোনের বিয়ে হয়ে গেলো। খুব অনুষ্ঠান করেই বিয়ে হলো। বোনের স্বামীর বাড়িতে অনেক কিছুই দিলাম বোনের অজান্তেই। একবার ভাবলাম বাড়িটা বিক্রি করে দিলে আমার কি হবে? থাকবো কোথায়? আবার মনে হলো,আমারই তো বোন আর তাছাড়া সেতো এমনিতেই অর্ধেক পেতো। বোনের সুখের জন্য যদি এইটুকু না করতে পারি তাহলে কেমন ভাই হলাম।বোন তাঁর স্বামীর সাথে আমেরিকা চলে গেলো। আমিও বাসাটা ছেড়ে দিলাম যাদের কাছে বিক্রি করেছি। টিউশনি করে যা পাই সেটা দিয়ে ভালোই চলে যাচ্ছে। মেস ভাড়া, খাওয়া খরচা সবকিছু খুব ভালো ভাবেই চলে যাচ্ছে।
বাবার মৃত্যুর আজ দুবছর হয়েছে। অবনির সাথে এখনো আমার কথা হয়। তবে আগের মতো না। সেও হয়তো বিশ্বাস করেছে জীবনে তেমন কিছু করতে পারবো না। তাই আমার সাথে যোগাযোগ টা কমিয়ে দিয়েছে। বোন আমেরিকায় থাকলেও আমার খোঁজ খবর ঠিকই নিতো। সকালে কি খেয়েছি,রাতে কি খেয়েছি,শরীর কেমন। এভাবে আরো একটা বছর পাড় হয় গেলো। বোনের কোল জুড়ে ফুটফুটে একটা সন্তান জন্ম নিলো। সে এখন আর আগের মতো আমার খোঁজ নিতে পারে না। হয়তো খুব করে চায় অভাগা ভাইটার খবর নিতে। কেমন আছে জানতে চায়। কিন্তু তাঁরও যে সংসার আছে,বাচ্চা আছে। অবনির সাথে যোগাযোগ হয় না অনেক দিন হলো। মাঝে মাঝেই তাঁর বাসার সামনে দিয়ে হাঁটাহাটি করি। তাকে একটু দেখার জন্য কিন্তু অবনি আমার সাথে দেখা দিতো না। এভাবে কেটে গেলো আরো তিনটা বছর।
আজকে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। কিছুদিন হলো মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করি। তাই পরীক্ষা করাতে এসেছিলাম। ডাক্তার বলেছে আমার মাথায় একটা রোগ হয়েছে। নাম ব্রেইন টিউমার। উদ্যশেহীন ভাবে ঠিকানাবিহীন পাখির মতো অভিমানি আকাশটার দিকে তাকিয়ে হাঁটছি। এমন সময় দেখলাম দুই তিন বছরের একটা ছেলে দৌড়ে এদিকেই আসছে। হঠাৎ করেই দেখলাম অবনি দৌড়ে আসছে ছেলেটার পেছনে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর দেখলাম একটা ছেলের হাত ধরে অবনি চলে যাচ্ছে বাচ্চাটাকে নিয়ে। বুঝতে পারলাম অবনির স্বামী আর সন্তান। আমার চেহারাটা আর আগের মতো নেই। দাড়ি,গোফ, চুল এমন হয়েছে যে কি আর বলবো। তাই হয়তো অবনি চিনতে পারেনি কিংবা এতো বছর পর নতুন করে চিনতে চায়নি। অবনি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো চেনার চেষ্টা করছে আমাকে। আর কি চাই আমার?
আপন বলতে দুইজন মানুষ ছিলো আমার। যাদেরকে খুব ভালোবাসতাম আমি। আমার বোন আর অবনি। আজ তারা তাদের স্বামী আর সংসার নিয়ে অনেক সুখে আছে। আজ রাতটা খুব অন্ধকার মনে হচ্ছে। আমারও কেনো জানি মনে হচ্ছে এটাই হয়তো আমার শেষ রাত। আমার স্থায়িত্ব নেই পৃথিবীতে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ মাঝ রাতে কারো কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠি দেখি অনুভূতিরা গুমড়ে গুমড়ে কাঁদছে। যতোদিন বেঁচে থাকবো ততোদিনই হয়তো এই কান্নাটা আমাকে শুনতে হবে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত