ক্ষমা

ক্ষমা
কয়েক মাস আগের কথা জুম্মার দিন, আমি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছিলাম এমন সময় আমি ভুলবশত নীচে থুতু ফেলে বসলাম। পরক্ষণেই মনে হল যে আমি তো দেখে ফেলিনি এটা যদি কারো গায়ে পড়ে । আমি নিচে তাকালাম দেখি আমাদের বাসার নিচে একজন গরিব লোক বসে সাহায্য চাচ্ছিল। থুতুটি তার ঘাড়ের উপর পড়ে কিন্তু তখনও লোকটা বুঝতে পারে না । গায়ে থাকা মলিন পাঞ্জাবিতে সেটা আমার চোখে স্পষ্ট ফুটে উঠে। আমি মনে মনে ভাবতে থাকি ,” আমি কি করবো এখন ? দোষটা তো আমার আমি কি তার কাছে ক্ষমা চাইবো ? নাহ্ এটা কেমন যেনো।” আমি নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আবার মনেও হচ্ছিল লোকটার কাছে ক্ষমা চাইলে হয়তো আমি ছোট হয়ে যাবো।আমি রুমে চুপ করে বসে থাকি , আম্মু এসে বলে যে কি হয়েছে । আমি এই বিষয়টি আম্মুকে বলি । আম্মু কিছুটা রেগে বললেন,” তোমার কাজটি করার আগে মনে থাকা উচিত ছিল। এতটা বেপরোয়া কিভাবে হও তুমি? লোকটা কোথায়?” আমি আম্মুকে ব্যালকনিতে নিয়ে গিয়ে লোকটাকে দেখালাম ।
” যাই হয়েছে ভুল করে , আশা করি এমন যেনো না হয়। তোমার আব্বুকে এটা বলবে না তাহলে উনি হয়তো অনেক বকা দিবে। ” আব্বু জুম্মার নামাজের জন্য রুম থেকে বের হতে যাবে তখনই আমি আব্বুর সামনে এসে বললাম, ” আব্বু একটা কথা , তুমি তো নামাজে যাচ্ছো । আমাদের বাসার নিচে একজন গরিব লোক বসে আছে তাকে যদি কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করতে ।”
—” হুম, সেটা আর বলতে । তবে হঠাত্ তুমি নির্দিষ্ট করে কেনো বলছো ?” আমি আম্মুর কথা না শুনে আব্বুকে সব বলি।
—” আব্বু তুমি যদি বলো যে আমি ভুল করে থুতু ফেলেছিলাম আর তাকে কিছু টাকা দাও।”
আব্বু তখন তিক্ত কন্ঠে বললেন ।,” তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতার উপর আমার সন্দেহ আছে। তুমি কি মনে করো টাকা দিয়ে আমি বলবো যে চাচা আমার মেয়ে আপনার গায়ে থুতু ফেলেছে তাই সে আমাকে আপনাকে টাকা দিতে বলেছে । কমন সেন্স নাই তোমার? আমি জুম্মার নামাজে যাচ্ছি আর তুমি কিভাবে এর সমাধান করবে তা তোমার বিষয় ।” আব্বু কথটা শেষ করেই রুম থেকে বেরিয়ে চলে যায়। আমি বিছানাতে বসে পড়ি । আমার নিজের কাছে সত্যিই অনেক ছোট মনে হতে থাকে কারণ ভুলটা আমার আর তা আমাকেই সমাধান করতে হবে। আমি ওয়ারড্রপ থেকে বোরকা বের করে পড়ে নেই।
—” এখন কোথায় যাচ্ছিস ?” আম্মু বললো।
—” আমি এখুনি আসছি । একটা কাজ আছে।
বলেই রুম থেকে বেরিয়ে আসি। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে মনে হচ্ছিল যদি লোকটা রেগে যায় আর আমাকে অনেক কিছু বলে। ভাবতে ভাবতে বাসার নিচে চলে আসি। তখনও লোকটা বুঝতে পারেনি যে উনার পাঞ্জাবিতে থুতু লেগে আছে। আমি লোকটার দিকে এগিয়ে যেতে থাকলাম । অনেকটা যখন কাছাকাছি আমি আমার গতি পথ পরিবর্তন করে বাসার দিকে হাঁটতে থাকি। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, ” আমি কেনো ক্ষমা চাইবো ? আমার দোষ কোথায়? লোকটার সব দোষ সেই তো বাসার নিচে বসে আছে।
আর উনার কাছে ক্ষমা চাইলে তো আমি ছোট হয়ে যাবো । একজন ভিক্ষুকের কাছে ক্ষমা চাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” আমি বাসার মেইন গেটের প্রায় কাছাকাছি তখন আমার মন বললো,” বাহ্ সাথী বাহ্ । নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে কেউ ছোট হয় তা জানা ছিল না। ইগোতে লাগছে তাইনা যে এই ভিক্ষুকের কাছে কেনো তুমি ক্ষমা চাইবে। তোমার কোনো যোগ্যতা নাই যে এতটা অহংকারী হয়ে গেছ আর মনে রেখো অহংকার আল্লাহর পোশাক তোমার না।” আমি আবার পথ ঘুরিয়ে ভিক্ষুকের সামনে এসে দাদু বলে সম্বোধন করে বললাম, ” আসলে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম ।” লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ” কি হয়েছে বলুন।”
আমি আমতা আমতা করে বলতে থাকলাম,” আসলে , মানে, এই যে আমি ভুল করে নিচে না তাকিয়ে থুতু ফেলে ছিলাম আর সেটা আপনার গায়ে পড়ে । ” লোকটা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন,” আমি তো বুঝতেই পারিনি।” আমি লোকটার পাঞ্জাবি থেকে থুতু পরিষ্কার করে দিলাম আর বললাম, ” আমার ভুল হয়েছে আপনি কিছু মনে করবেন না । ক্ষমা করে দিবেন ।” লোকটা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,” অনেক বড় হবে তুমি । দোয়া করি তুমি সব সময় এমনি থাকো।” আমি লোকটার হাতে বিশ টাকা দিয়ে বললাম, ” এটা দিয়ে চা খেয়ে নিয়েন আর আমার জন্য দোয়া করবেন ।” কথাটা শেষ করেই আমি বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকি। লোকটার মুখে তখন একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠে ।
আসল কথা কি জানেন , ক্ষমা চাইলে কেউ কখনো ছোট হয় না। তবে আমরা অনেক সময় নিজেদের ভুল জেনেও অন্যের কাছে ক্ষমা চাইনা কারণ আমাদের ইগো সেটা করতে দেয় না। আমি আমার জীবনের একটা ঘটনা বললাম যদি কারো বুঝার ক্ষমতা থাকে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত