কালো মেয়ে

কালো মেয়ে
এই মাত্র আমার প্রাণ প্রিয় বউ অবনিকে কবর দিয়ে আসলাম।অনেক খারাপ লাগছে।কিন্তু ক্ষুদ্র মানুষ হয়ে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কি ক্ষমতা আছে আমার?
ভাগ্যের চাকা ঘুরে চলেছে অনবরত। এই মৃত্যু নামক জিনিসটা একদিন সবাইকে পিষে ফেলবে।হয়তো কাউকে আগে আর কাউকে পরে।কিন্তু পিষবেই।আমরা মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নিতে পারিনা।এদিক সেদিক পালিয়ে বাঁচতে চাই।কিন্তু ওপরে একজন আছেন যথা সময়ে আমাদের কে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য। অবনিকে নিয়ে কত স্বপ্নই না দেখেছিলাম।কিন্তু স্বপ্ন সত্যি হয়না,আমার টাও হয়নি। দুুইবছর আগে অবনির সাথে আমার পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়।আমি অবনিকে কখনো দেখিনি।শুনেছি মেয়েটা দেখতে অনেক কালো।কিন্তু আমার কিছু করার ছিলোনা।বিয়েটা আমাকে বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে করতে হয়েছে। তারা নাকি অনেক আগে থেকেই অবনিকে পুত্রবধূ করে আনার স্বপ্ন বুনেছিলেন। সেটা আজ বাস্তবে রুপ দিলো। আমি বাসর ঘরে ঢুকতেই দেখলাম একটা কালো মেয়ে লাল শাড়ী পড়ে বসে আছে। আমার মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কালো মেয়েটা আমার ঘরে বসে আছে।
সবসময় যে মানুষটা ক্যাটরিনা, কাজল,সামান্থাকে নিজের স্বপ্নের রাজকন্যা ভেবে স্বপ্ন দেখতো প্রতিনিয়ত।সেই মানুষটাকে আজ এরকম বিস্ত্রী, কালো একটা মেয়ের সাথে সারাজীবন থাকতে হবে। আমি আপনাকে কখনো নিজের বউ হিসেবে মেনে নিতে পারবো না। আপনিও কখনো আমাকে স্বামী ভাবার বৃথা চেষ্টা করবেন না।আরো অনেক কিছু বলে নিচে শুয়ে পড়ি। হয়তো মেয়েটার অনেক আশা ছিলো বাসর রাতে স্বামীর সাথে সুখ দুঃখের গল্প করবে।ভালোবাসার কথা বলবে, ভালো লাগার কথা বলবে।কিন্তু তার কোনো কিছুই হলোনা। আমিও আমার স্বপ্ন ভঙ্গের রাতটাতে ঘুমাতে পারিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মেয়েটা চা করে ডাকছে। আমি চায়ের কাপটা ফেলে দিয়ে বললাম,কখনো আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না।আমি আপনাকে ঘৃণা করি। কিভাবে পারলেন একজন কালো মেয়ে হয়ে আমাকে বিয়ে করতে?
আমার সুন্দর জীবনটাকে নষ্ট করে দিলেন। আমি আপনাকে কখনোই আমার হৃদয়ে জায়গা দিতে পারবো না।কখনো আমার স্পর্শ পাওয়ার চিন্তা ভূলেও করবেন না। এসব বলে অফিসে চলে যাই। অনেক রাতে যখন বাসায় আসলাম।দেখলাম সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।শুধু মেয়েটাই জেগে আছে,খাবার টেবিল এ খাবার নিয়ে বসে আছে। আপনি যতই আমার জন্য অপেক্ষা করেন,ভালোবাসা দেখান।আমি কখনো আপনাকে ভালোবাসবোনা।আমি খাবার না খেয়েই শুয়ে পড়ি।মেয়েটাও হয়তো না খেয়েই শুয়ে পড়ে। দুঃখগুলো ভূলার জন্য নেশায় মগ্ন হয়ে পড়লাম।নিয়মিত সিগারেট, মদ, গাজা সবকিছুই খেতে শুরু করলাম শুধু নিজের কষ্টগুলোকে কবর দেওয়ার জন্য।
এভাবেই কেটে গেলো ছয়টা মাস।এই ছয় মাসে একদিন মাতাল হয়ে রুমে আসি।ওই রাতে নিজের বউকে ধর্ষণ করি।হ্যা,ধর্ষণ করি।সকালে বুঝেছিলাম মেয়েটার উপর কি অত্যাচারই না করেছি। কিন্তু মেয়েটা কোনো প্রতিবাদ করেনি।নীরবে সহ্য করে গেছে নিজের স্বামীর শারীরিক অত্যাচার। বাড়িতে গিয়ে দেখি আমার রুমটা এতো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে যে। আগে কখনো এতো সুন্দর কোনো রুম আমার চোখে পড়েছে বলে মনে হয়না।আমার সব আপনজনরা এসেছে। পরে মনে হল আজ আমার জন্মদিন।অথচ আমি ভূলেই গিয়েছিলাম। সবাইকে নিয়ে যখন কেক কাটলাম তখন অবনি মেয়েটা দূরে একা দাঁড়িয়ে আছে। পরে জানতে পারি এই সবকিছুই করেছে অবনি। আজ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।আমার দুইটা কিডনিই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমার আর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা হবেনা আমি বুঝতে পারছি।রিপোর্ট গুলো এমন জায়গায় রাখলাম যাতে কেউ খুঁজে না পায়।
আমি সবচেয়ে বেশি অন্যায় করেছি অবনি মেয়েটার সাথে।কখনো তাকে ভালোবাসিনি।বিনিমেয় সে ঠিকই ভালোবেসে গিয়েছে।কখনো স্বামীর কর্তব্য পালন করিনি,কিন্তু সে ঠিকই একজন আদর্শ স্ত্রীর ভূমিকা পালন করেছে সবসময়। আমি মরার আগে অবনি কে কিছু বলতে চাই,ক্ষমা চাইবো অবনির কাছে। আজকে বাসায় কেউ নেই।সবাই বাহিরে গিয়েছে।আজকেই অবনির সাথে কথা বলবো।ওর কাছে মাফ চাইবো। হঠাৎ করেই মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। মনে হয় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছি আমি।ফ্লোরে পড়ে যাই।জানিনা এরপর কি হয়েছিলো। প্রায় সাতদিন পর হাসপাতালের বেড এ নিজেকে আবিষ্কার করি।সবাই আমার দিকে চেয়ে আছে।সবার চোখে পানি।শুধু অবনি মেয়েটাকেই দেখছি না। তখনি ডাক্তার একটা চিঠি হাতে দিয়ে বলল,এটা আপনার জন্য। চিঠি টা খুুলে পড়তে শুরু করলাম।
প্রিয় স্বামী চিঠিটা যখন আপনি হাতে পাবেন তখন হয়তো আমি আপনাদের সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছি। ছোট বেলা থেকেই কারো আদর পাইনি,ভালোবাসা পাইনি।শুধু দেখতে কালো বলে।আর যদিও কিছু পেয়ে থাকি সেগুলো করুনা ছাড়া আর কিছুনা। আপনি যেদিন আমাকে কবুল বলে বিয়ে করলেন সেদিনই আমি আপনাকে আমার পৃথিবী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম বাকি জীবনটা আপনার দাসী হয়ে সেবা করে কাটিয়ে দিবো।কিন্তুু পরে বুঝতে পারলাম দাসী হওয়ার জন্যও যোগ্যতা লাগে।যেই যোগ্যতা টা আমার নাই কিংবা কখনো ছিলই না।
আপনি যেদিন মাতালে হয়ে আমার ওপর হিংস্র জানোয়ার মতো ঝাপিয়ে পড়লেন।সেদিন অনেক ভয় পেয়েছিলাম।অনেক কষ্টও হয়েছিল।কিন্তু সহ্য করেছি। আপনাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনি তাই।আমার শত কষ্টের বিনিমেয় যদি আপনি একটু আনন্দ পান।তাহলে আমি পৃথিবীর সব কষ্টই আমার করে নিতে পারি আপনার সুখের জন্য।
আপনি যখন মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন তখন আমার কি হয়েছিলো আমি জানিনা।বাসায় কেউ নেই।আমি কিভাবে আপনাকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম জানিনা।তবে আমি একাই নিয়ে গিয়েছিলাম। যখন জানতে পারলাম আপনার কিডনি দুইটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।তখন নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ে।আপনার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী।আমার মতো কালো একটা মেয়ে কখনোই আপনার স্ত্রী হবার যোগ্যতা রাখেনা।
তাই ঠিক করলাম আমার কিডনি দুইটা আপনাকে দিয়ে চলে যাব।সেই সৃষ্টিকর্তার কাছে যিনি আমাকে সুন্দর পৃথিবীতে অসুন্দর করে তৈরি করেছেন।প্রথমে ডাক্তার রাজী হয়েছিল না।পরে অনেক বলে কয়ে রাজী করিয়েছি।
এখন আর আপনার সামনে কোনো কালো মেয়ে আপনাকে নিজের স্বামী হিসেবে কখনো দাবি করতে চাইবেনা।আমিও কখনো দাবি করিনি।শুধু ভালোবাসতে চেয়েছি।বিনিমেয় চেয়েছিলাম আপনার চরণতলে একটু আশ্রয়।কিন্তু সেটাও পাইনি। আপনি আবার নতুন করে সুন্দর পৃথিবীতে সুন্দর কাউকে নিয়ে বেঁচে থাকেন এটাই আমার চাওয়া। ভালো থাকুন আপনারা এই সুন্দর পৃথিবীর সুন্দর মানুষগুলো।
ইতি
আপনার ঘৃণিত, কালো বউ
অবনি।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত