প্রতিদান

প্রতিদান
– ভাবি আপনার কাছে মোটা রশি আছে?
– কেন ভাবি মোটা রশি দিয়ে কি করবেন ? ভাইকে বাঁধবেন নাকি ? ওমা আপনি এমন চমকে উঠলেন কেন ? আমিতো ফাজলামি করলাম ভাবি ।
– না, না চমকাবো কেন ? আসলে বারান্দার কাপড় শুকানোর রশিটা ছিড়ে গেল তো তাই । আচ্ছা দাঁড়ান দিচ্ছি । আমি পাশের বাসার ভাবির কাছ থেকে রশিটা নিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম । ভাবির কথা শুনে সত্যি আমি ভয় পেয়েছিলাম । এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল ভাবি বুঝি সব জেনে ফেলেছে । মনে করে ঘুমের ঔষধ , ছুরি সব কিনলাম কিন্তু এই রশিটার কথা কেন যে ভুলে গেলাম ! বিকালেই আমি আমার স্বামী রাশেদের চায়ে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিলাম । ঠিক রাত দশটায় আমাদের ট্রেন । ষ্টেশনে যেতে লাগবে প্রায় এক ঘণ্টা । তাই রাশেদের মামলা আমাকে শেষ করতে হবে রাত আটটার মধ্য । চা খেয়ে বারান্দায় বসে আমার সাথে কথা বলতে বলতেই ওর ঘুম পেয়ে গেল । আমি একটু ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম । ব্যস রাশেদ বেঘোরে ঘুমাতে লাগলো । আমি ছুরিটা এনে ওর গলায় বসাতে যাব সে সময় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার হটাৎ কি যে হল ! মায়া লাগলো রাশেদের জন্য ।মায়া তো আসলে লাগারই কথা ।
ভালো আমি ওকে কখনো বাসিনি ঠিক । কিন্তু দুইবছর একসাথে ছিলাম তো । ঠিক করলাম মারবো না । খাটের সাথে ভাল করে বেঁধে রেখে যাবো । যদি ভাগ্য ভাল থাকে তাহলে বাঁধন খুলতে পারলে বাঁচবে । না হয় না খেতে পেরে এমনেতেই মারা যাবে । আমি রশি দিয়ে রাশেদকে বাঁধার কাজ শেষ করেই অনিক কে ফোন দিলাম । ওহ্ অনিকের কথা তো আপনাদের বলাই হয়নি । অনিক আমার জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিস । আমি অনিক কে সেই কলেজ জীবন থেকে ভালবাসি । অনিক ও আমাকে খুব ভালোবাসে । কলেজ জীবনে আমরা চুটিয়ে প্রেম করেছিলাম । বেশ কয়েকবার আমার সাথে অনিকের শারীরিক সম্পর্ক ও হয়েছিল । ভার্সিটিতে এসেই অনিক হঠাৎ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে ।
অনিকের সাথে আমিও কয়েকদিন রাজনীতিতে সময় দিয়েছিলাম । কিন্তু আমার বড়লোক বাবা একরকম জোর করেই রাশেদের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দেয় । আমি মন থেকে কখনো রাশেদকে মেনে নিতে পারিনি । রাশেদকে আমি অনিকের কথা বলেছি । ও শুনে বলল – ভাল কথা, বিয়ের আগে প্রেম করতে এখন বিয়ে হয়ে গেছে ভুলে যাও । আমাকে নিয়ে রাশেদ চলে এল সিলেটে । এইখানে রাশেদের পাথরের ব্যবসা আছে । গত দেড় বছরে আমি অনিকের সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি । কিন্তু কোথাও ওর কোন খবর পাই নাই । গত ছয়মাস আগে আমার ফেসবুকে অনিকের সাথে আবার আমার যোগাযোগ হয় । অনিক আমাকে জানায় ও আমাকে এখনো আগের মতই ভালোবাসে । আমাদের কোন সন্তান হয়নি জেনে ও বলল তাহলে তো তোমার কোন পিছুটান নেই মিরা।
তুমি আমার কাছে চলে এসো । আমরা বিয়ে করে নতুন ভাবে থাকবো । আমিও অনিকের কথায় রাজি হয়ে গেলাম । কিন্তু সমস্যা হল রাশেদ কে নিয়ে । রাশেদ আমাকে এত সহজে ডিভোর্স দিবেনা ।আমি অনিক কে বললাম সিলেটে চলে আসতে । আমি লুকিয়ে লুকিয়ে প্রায় প্রতিদিনই অনিকের সাথে দেখা করতাম । অনিক কে দেখে আমার খুব কষ্ট হয় । ও রাজনীতির সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে লিখাপড়াটা শেষ করতে পারেনি । এখন কোন চাকরিও করে না । টুকটাক এটা সেটা করে চলে । সিলেটে আসার পর অনিকের যাবতীয় খরচের টাকা আমিই দেই । বেচারা কিছুই করে না । আর ও তো আমার জন্য সিলেটে এসেছে । আমরা দুইজনে প্লান করলাম পালিয়ে আমরা প্রথমে যাবো ঢাকা । তারপরে পাসপোর্ট করে ভারতে পালিয়ে যাবো । কিন্তু সমস্যা হল টাকা । এই যে এতসব করতে তো টাকা লাগবে । কিন্তু অনিকের হাত খালি ।
একমাত্র ভরসা আমি । আর আমার টাকার উৎস তো রাশেদ । রাশেদ কখনো ব্যাঙ্কে টাকা রাখেনা । আমাদের বাসায় রাশেদের একটি আলমারিতে সব টাকা থাকে । কিন্তু সেই আলমারির চাবি থাকে রাশেদের কাছেই । ও আমাকে কখনোই ঐ আলমারি খুলতে দেয় না । এমনকি চাবিও আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে । তাই আমি ঠিক করলাম আগে রাশেদকে মারতে হবে । তাহলে আমি রাশেদের আলমারি থেকে টাকা নিতে পারব সহজে । যেই ভাবা সেই কাজ । আমি অনিক কে ফোন করে জানতে চাইলাম ও ষ্টেশনে এসেছে কিনা ? ও জানালো ও ষ্টেশনে চলে এসেছে । আমি তাড়াতাড়ি রাশেদের আলমারির চাবি খুঁজতে লাগলাম । বিরক্ত হয়ে গেলাম খুঁজতে খুঁজতে শেষ মেস ভাবলাম রাশেদের শরীরের কোথাও নেই তো !! ওর পরনের পায়জামা ধরে টান দিতেই দেখি ব্যাটা চাবি তার কোমরে বেঁধে রেখেছে । কি পরিমান ফাজিল লোক ।
নিজের ঘরেই এত লুকোচুরি । মেজাজ গেল খারাপ হয়ে । চাবি দিয়ে আলমারি খুলেই দেখি ভিতরে থরে থরে টাকার বান্ডিল । আমি দ্রুত একটি ব্যাগে সব টাকা ভরে নিলাম । সাথে নিলাম আমার এগারো ভরি গয়না । তারপরে নিজের ট্রলি ব্যাগ আর টাকার ব্যাগটি নিয়ে নিচে নেমেই একটি ক্যাব নিয়ে ষ্টেশনে চলে আসলাম । আশা করি আগামী কাল ভোরের আগে রাশেদের ঘুম ভাংবেনা । আর ঘুম ভাংলেই কি করবে । ওকে যে ভাবে বেঁধে এসেছি । একটু ভিতরে যেতেই দেখি অনিক দাঁড়িয়ে আছে । অনিক কে দেখেই আমার মন প্রশান্তিতে ভরে গেছে । আহ কি শান্তি । এত বছর পরে আমার ভালবাসার মানুষের সাথে আমি এক ঘরে থাকতে পারবো ।আর লুকিয়ে লুকিয়ে অনিকের সাথে দেখা করতে হবে না। যে টাকা এনেছি তা দিয়ে অনিক নিজেই একটা ব্যাবসা করতে পারবে ।
আমাকে দেখেই অনিক বলল – কি করলে তোমার স্বামীর ?
– কি আর করবো যা করার কথা ছিল তাই করেছি । রাশেদ কে যে মারি নাই সে কথা অনিক কে বললাম না । বললে যদি ও ভাবে রাশেদের প্রতি আমি মায়া করেছি । কি দরকার ! কিছুক্ষন পরেই ট্রেন চলে আসছে । আমি আগেই একটি এসি কামরার টিকিট কেটে রেখেছিলাম । অনিক আমার আর ওর সব ব্যাগ নিয়ে উঠে গেল । আমিও উঠলাম।
– অনিক তোমার কাছে পানি আছে ?
– হ্যাঁ , আছে তো এই নেও । বলেই অনিক তার ব্যাগ থেকে আমাকে এক বোতল পানি বাহির করে দিলো । আমার এত পিপাসা পেয়েছিলো যে একটানে অর্ধেক পানি খেয়ে ফেললাম । ট্রেন ছেড়ে দিবার পরেই অনিক এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল । আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম – আহ এখনি কেন ? এখন থেকে তো আমি সবসময়ের জন্য তোমার সাথেই থাকবো । অনিক আমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে বলল – না সোনা আর হয়তো কিছু সময় আমরা একসাথে আছি । তারপরেই তুমি যাবে উপরে আর আমি যাবো আমার স্বপ্ন পুরন করতে ।
– কি বলছ এই সব অনিক !! ফাজলামো করবে না একদম । এমনেতেই একটু টেনশন হচ্ছে ।
– কে বলল তোমাকে মিরা আমি ফাজলামো করছি ? আমি সত্যি বলছি । এই যে তুমি একটু আগে পানি খেলে সেই পানিতে আমি বিষ মিশিয়ে রেখেছিলাম । কিছুক্ষনের মধ্যই তুমি মারা যাবে । আর আমি তোমার আনা টাকা আর গয়না নিয়ে পরের স্টেশনেই নেমে যাবো । পুলিশ তোমার লাশ পাবার পরে খোঁজ করে জানবে তুমি তোমার স্বামীকে খুন করে পালিয়ে এসে ট্রেনে নিজেই আত্মহত্যা করেছো । আর ট্রেনের টিকিট ও তুমি কিনেছ অন লাইনে । তাই আমার কথা কেউ জানতেও পারবে না । আমার বুক গলা জ্বলতে লাগলো । আমি অনিককের গায়ে হাত দিয়ে বললাম আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম অনিক আর তুমি !!!
– কিসের ভালবাসা মিরা !! আমি কখনোই তোমাকে ভালবাসি নাই । তোমার বিয়ের আগেও তোমার টাকা দেখে তোমার সাথে সম্পর্ক করেছিলাম । তারপরে তোমার বিয়ে হয়ে গেল । কিন্তু তোমার মতো আর কোন মুরগি পেলাম না । আমাদের বন্ধু সোহেলের সাথে একদিন রাস্তায় দেখা । ও জানালো তুমি নাকি আমার খোঁজ করছ । আর ওর কাছেই জানলাম তোমার বরের নাকি অনেক টাকা । তারপরেই আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করি । ভেবেছিলাম তোমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে সরে পড়বো । কিন্তু তুমি নিজেই প্লান করলে স্বামীর টাকা নিয়ে পালাবার । তাই আমি ভাবলাম এইতো সুযোগ । নিজের জীবন পালটাবার । আমিও প্লান করলাম । তুমি টাকা নিয়ে আসলে আমি তোমাকে মেরে সব টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবো । আর আমার সাথে তোমার যোগাযোগ আছে এ কথা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না । আমি অনিক কে আকুতি করতে লাগলাম । অনিক তুমি আমাকে বাঁচাও । আমি তোমাকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলাম । তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না । আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি অনিক ।
– ভালবাসার কথা বলো না মিরা । যে মেয়ে প্রেমিকের জন্য স্বামীকে খুন করতে পারে সে মেয়ে করবে সংসার !! আবার যে অন্য কোন পুরুষের জন্য আমাকে তুমি খুন করবে না তার কি গ্যারান্টি আছে মিরা ? আমাকে মারার আগেই আমি তোমাকে মেরে দিলাম । আমার মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো । আমি মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছি । অনিক আমার সামনেই বসে আছে । কিন্তু ও আমাকে একবারের জন্য ও ধরল না । আমি অনিক কে বলতে চাইছিলাম আমি রাশেদকে মারিনি । কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোন কথাই বের হলনা । শুধু গো গো শব্দ ছাড়া ।
আমার শরীর নিথর হয়ে ট্রেনের এসি কামরায় পড়ে রইলো । অনিক আমার আনা টাকা আর গয়না নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে গেল । কামরা থেকে বের হবার আগে অনিক আমার মুখে একদলা থুথু ছিটাল আর বলল তোমার মতো মেয়েদের এমনি হবার দরকার । আমি চিৎকার করে বললাম – অনিক পাপ আমি একা করি নাই তুমিও আমার সাথে ছিলে । আমার পাপের প্রতিদান আমি পেয়ে গেছি । তুমিও বাদ যাবে না । প্রকৃতি তোমাকেও তোমার পাপের প্রতিদান দিবে । সুখি তুমি হতে পারবে না । আমি জানি আমার চিৎকার অনিকের কানে পৌঁছায়নি ।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত