প্রায়শ্চিত্ত

প্রায়শ্চিত্ত
ক্লাসে স্যার তখন একটা বৃদ্ধা মহিলার গল্প শোনাচ্ছেন। গল্পটা এরকম যে বৃদ্ধা মহিলাটা তার ছেলেকে কষ্ট করে লেখাপড়া শেখায় কিন্তু ছেলেটা একসময় তার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। ছোট ছেলে কামাল তখন শেষের বেঞ্চে বসে কলম দিয়ে ছবি আঁকছিলো। স্যারের দিকে কামালের কোন মনোযোগ নেই। ব্যাপারটা একসময় স্যারের চোখে পরলো। স্যার হুংকার দিয়ে বলল….
–এই কামাল দাঁড়া।
কামাল ছবি একেই চলছে। তার কোনদিকে মনোযোগ নেই। স্যার যে রেগে আছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই কামালের। স্যার হাতে থাকা বেত দিয়ে টেবিলের উপর ঠাস করে বারি মেরে বলল….
-এই কামাল তোকে দাঁড়াতে বলছি।
কামাল বেতের ঠাসস শব্দ শুনে মুখ উচু করে তাকায়। রুহুল আমিন স্যার প্রচণ্ড রেগে আছেন। কামাল কলমের মুখাটা লাগিয়ে পকেটে রাখলো। তারপর বলল….
–জি স্যার বলুন?
কামালের এমন কথা শুনে ক্লাসের সবাই হেসে ওঠে। কামাল সবার হাসির রহস্য বুঝতে পারেনা। রুহুল আমিন স্যার রেগে গিয়ে বললেন….
–চুপ করো সবাই। বল কি পড়াচ্ছিলাম আমি।
-স্যার জানিনা।
–আমি যখন পড়াচ্ছিলাম আর তুই কি করছিলি?
-স্যার একটা ছবি আঁকছিলাম।
–কিইইই? আমি ক্লাসে পড়াচ্ছি আর তুই ছবি আঁকছিস? সামনে আয়…
-স্যার ছবিটা নিয়ে যাব?
–শুধু তুই আয় হারামজাদা।
কামাল মুচকি হেসে সামনে যায়। রুহুল আমিন স্যার কামালকে বলে হাত পাততে। কামাল হাত পাততেই স্যার ঠাসস ঠাসস করে কয়েকটা বারি মারে কামালের হাতে। বারি দিয়ে স্যার বলে….
–যা যায়গায় গিয়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।
কামাল মুচকি হেসে জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বারি খেয়ে হাত লাল টকটকা হয়ে গেছে কামালের। হাত থরথর করে কাঁপছে। ক্লাস ততক্ষণে একদম নীরব। সবাই অবাক হচ্ছে এই ভেবে যে বারি খেয়ে কামাল হাসছে কেন? রুহুল আমিন স্যার সোফায় বসে চা খাচ্ছেন। পাশেই তার বউ বসা। টিভিতে মিরাক্কেল চলছে। জমজমাট পরিবেশ। ঠিক তখন-ই পাশের রুম থেকে গোংরানির আওয়াজ এলো। মালিহা ( স্যারের বউ) রেগে গিয়ে রুহুল আমিন স্যারকে বলল….
–দেখো এই বুড়ির গোংরানির আওয়াজ আমার একদম সহ্য হয়না। তোমাকে কত করে বলছি এখন উনাকে এ বাড়িতে না রেখে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসো।
-আহা, মা’র বয়স হয়েছেতো।
–তো? তাই বলে বাড়িটাকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলবে?
-জাহান্নাম কই বানালো?
–দেখো এই বাড়িতে নাহয় তোমার মা থাকবে নাহয় আমি….
বলেই মালিহা সোফা থেকে উঠে হনহন করে চলে গেলো। রুহুল আমিন স্যার হতাশ হয়ে বসে রইলেন সোফায়। মালিহা অনেকদিন থেকেই বৃদ্ধাশ্রমের কথাটা বলছে। হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি। কি করবে বুঝতে পারছেননা। একবার বৃদ্ধা মায়ের কথা মনে পরছে আরেকবার বউয়ের কথা। শেষমেশ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো রুহুল আমিন স্যার। এক পা দুই পা করে মায়ের রুমে পা বাড়ায় রুহুল আমিন স্যার। তারপর মায়ের বিছানার পাশে বসে। মা বলল….
–কিছু বলবি বাবা?
-না মানে বলছিলাম আরকি….
–হুম বলে ফেল।
-আসলে মালিহা বলছে তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে। বাড়িতে একাএকা বোর হচ্ছো বরং ওখানে গেলেই কিছু সঙ্গী পাবে সময়ও ভালো কাঁটবে। আর আমিতো খোঁজখবর নিবই, মাস শেষে টাকাও পাঠাবো। নিজের সন্তানের মুখ থেকে হুট করে বৃদ্ধাশ্রমের কথা শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে রহিমা বানুর। মনে হচ্ছে কেউ কলিজাটা ছিরে নিয়ে যাচ্ছে। রুহুল আমিন স্যার আবার বলল….
–তুমি কি বলো মা? অনেক কষ্টে চোখের জল লুকিয়ে কাশতে কাশতে রহিমা বানু বলল….
-তোরা যেটা ভালো মনে করিস সেটাই কর। আর তোরা খুশী হলেই আমি খুশি।
মায়ের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মুখে হাসি ফুটে ওঠে রুহুল আমিন স্যারের। আর দেরি করেনা। কথাটা মালিহাকে বলতেই মালিহা আনন্দে আত্বহারা হয়ে যায়। সিদ্ধান্ধ নেয় আজ-ই মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে। তারপর বিকেল বেলা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে খুশি মনে বাসায় আসে রুহুল আমিন স্যার।
ক্লাস হৈ-হুল্লুড় চলছে। সবাই চিৎকার চেঁচামিচি করছে। কামাল ঠিক আগের দিনের মতনই ছবি আঁকছে। একটু পর ক্লাসে রুহুল আমিন স্যার প্রবেশ করলেন। সম্মান প্রদর্শনে সবাই দাঁড়িয়ে গেলো শুধু কামাল ছাড়া। রুহুল আমিন স্যার সেটা খেয়াল করলেন না। সবাইকে বসতে বলে বই খুলতে বললেন। ‘বৃদ্রাশ্রম’ গল্পের শেষের দিকে পড়ানো শুরু করলেন স্যার। একজনকে পড়তে বলবে ঠিক তখন-ই চোখ গেলো শেষের বেঞ্চে কামালের দিকে। স্যারের রাগ হুট করে বেরে গেলো। ধমক দিয়ে বলল….
–এই কামাল দাঁড়া। স্যারের ধমক শুনে উঠে দাঁড়ায় কামাল। মুচকি হেসে বলে….
-জি স্যার বলেন।
–কি করছিলি তুই আজকে?
-স্যার ছবি আঁকছিলাম।
–হারামজাদা তুই আজকেও ছবি আকছিস, সামনে আয়।
স্যারের কথা শুনে কামাল স্যারের কাছে যায়। স্যার বলল, ‘ছবি নিয়ে আয়।’ কামাল এবার ছবিটা নিয়ে আসে। রাগে গজগজ করতে করতে ছবিটা হাতে নেয় রুহুল আমিন স্যার। ছবিটা দেখেই চোখ আটকে যায় স্যারের। এত নিখুঁত আর্ট মনে হয় আর কখনো দেখেনি সে। আরো অবাক হলো ছবিতে একটা ছেলে একটা মহিলাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে যাচ্ছে এটা দেখে, এবং যে ছেলেটি মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে যাচ্ছে তার পাশে মার্ক করে লেখা ‘অমানুষ।’ হুট করেই বুকটা ধুক করে ওঠে রুহুল আমিন স্যারের। কামালের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় স্যার। কামাল মুচকি হেসে বলে….
–স্যার, আপনে বলেছিলেন যারা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে, মা বাবাকে সম্মান করেনা তারা অমানুষ। দেখছেন স্যার ছবিতে ছেলেটা তার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখতে যাচ্ছে তাহলে তো ছেলেটাও অমানুষ তাইনা স্যার? কামালের কথাটা সরাসরি বুকে গিয়ে লাগে রুহুল আমিন স্যারের। বুকে চিনচিন ব্যথার অনুভব হয়। মনে হচ্ছে জীবন থেকে মূল্যবান কিছু হারিয়েছে। কামাল বলল…..
–ছবিটা কেমন হয়েছে স্যার? রুহুল আমিন স্যার কিছু বলেনা। উনার চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। সাথেসাথে ক্লাস থেকে বেরিয়ে বাইক স্টার্ট করে স্যার। পিছন থেকে কামাল বলে…..
-স্যার ক্লাস নিবেননা? কোথায় যান? রুহুল আমিন স্যার ঝাপসা চোখে কামালের দিকে তাকায়। কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে….
–অনেক বড় একটা পাপ করেছিরে, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে যাচ্ছি।
বলেই বাইক চালিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের দিকে রওনা হয় রুহুল আমিন স্যার। আশ্রমের গেটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রহিমা বানু। তার মনে হচ্ছে ছেলেটা লুকোচুরি খেলছে, আবার তাকে নিতে আসবে। কোথাও একটা আশার আলো জ্বলছে…চোখ বেয়ে টুপ করে এক ফোটা চোখের অশ্রু গড়িয়ে পরে রহিমা বানুর। মায়েদের আন্দাজ যে কখনো ভুল হয়না।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত