ভাল থাকুক সে

ভাল থাকুক সে
আজ আমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের প্রেমিকার সাথে দেখা করতে এসেছি। মেয়েটা আমার সামনেই বসে আছে। লাল রঙের একটা থ্রীপিছ পড়ে এসেছে।সিল্কি চুল গুলো অল্প অল্প বাতাসে উড়ছে।চেহারাটা বেশ মিষ্টি। আমি ই আগে কথা বলে উঠলাম, হেলো কেমন আছেন? মেয়েটা কিছুটা অবাক হলো, ও ই আমাকে ফোন করে বলেছিলো দেখার করার জন্য। হয়তো তালহা আমার সম্পর্কে এমন কিছু বলেছে যা মেয়েটাকে আমার প্রতি আকর্ষণ বা হিংসে কোন একটা বাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটা এবার কথা বলে উঠলো..হেলো আপু, আমি সাথী, ইয়ে মানে তালহার প্রেজেন্ট লাভ। “প্রেজেন্ট লাভ ” কথাটায় বেশ জোর ছিলো কিন্তু শেষের দিকটা কেমন যেনো লাগলো। এটা কি অবহেলা না অনিশ্চয়তা? অবহেলায় ভালবাসার ক্ষয় হতে থাকে আর অনিশ্চয়তা ভালবাসাকে ভালবাসতে ভয় পাইয়ে দেয়। হঠাৎ খুব করে চাইলাম আমার ধারণা যেন ভুল হয়। এবার মেয়েটা সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করলো, আপু আপনাদের ব্রেকাপ কেন হয়েছিলো?
মেয়েটা তাহলে এই বিষয়ে খুব কৌতুহলী। অন্য কোন ফর্মালিটি মূলক কথাবার্তার প্রয়োজন বোধ করলো না সে।
আমি একটু হেসে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আমার ব্রেকাপের গল্প জানতে চাইছো কেন? আমার ব্রেকাপের চাইতে তোমার ওর প্রেমে পড়ার কারণ জানা থাকাটাই তো আসল। মেয়েটা সোজা উত্তর দিলো, আমি জানতে চাইছিলাম তালহার মত মানুষ কে কেউ কিভাবে না ভালবেসে থাকতে পারে? কেউ কিভাবে তাকে ভুলে যেতে পারে? ঠকিয়ে কষ্ট দিতে পারে এভাবে? কথা গুলোয় শুধু আবেগ না আরো অনেক কিছু ছিলো। যা মুহুর্তেই আমার মনের গত আড়াই বছরের কষ্টের ঘূর্ণিঝড়কে আবার নতুন করে জাগিয়ে দিলো।কি ই বা উত্তর দেবো প্রশ্ন গুলোর? আমি যে প্রতিদিন এই প্রশ্ন গুলো থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
আমি চুপ করে আছি বলে সে আবার বললো.. আপু কিছু মনে না করলে আমাকে একটু বলবেন, তালহার কোন ব্যাপারটা আপনার খারাপ লেগেছিলো? কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, ওর বেশি বেশি ভালবাসাটাই আমার খারাপ লেগেছিলো। মেয়েটাকে কিছুটা আহত মনে হলো। করুণ কন্ঠে বলে উঠলো, অথচ জানেন কতটা ভাগ্যবতি হলে তালহার মত মানুষের ভালবাসাটা বেশি বেশি পাওয়া যায়? আপনি খুব লাকি ছিলেন আপু। কিন্তু আমার তালহাটা এতটা লাকি ছিলো না হয়তো। মেয়েটার চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। আমি দেখার আগেই চট করে মুছে নিলো।কিন্তু আমিও তো একটা মেয়ে,আর মেয়েদের চোখে সহজে কিছু এড়ায় না। নাহ, আমার সকল সন্দেহের অবসান ঘটলো। এই মেয়েটা কাঁদছে। তালহার জন্য কাঁদছে। ওর চোখের চাইতে হৃদয়ের কান্নাটা যেন আমার সামনে অনেক বেশি ফুটে উঠলো।
ঠিক তখন ই বুঝতে পারলাম,সামনে বসা মেয়েটা আমাকে হিংসা বা ঘৃণা করছে না।বরং করুণা করছে। খাটি ভালবাসা পেয়ে হারানো একজন দূর্ভাগা হিসেবে সে আমাকে করুণা করছে। অনেক টা ঝাঁজের সাথেই বললো মেয়েটা, তালহার সাথে ব্রেকাপের কারণ কিন্তু এখনো বলেন নি। আমি বললাম, ব্রেকাপ করার কারন হলো, আমি তালহাকে কখনো ভালবাসি নি। আমি ওকে ব্যবহার করতাম। আমার একা মুহুর্ত গুলোতে তালহা আমাকে বিনোদন দিতো। ও কি তোমাকে সারা রাত কখনো গান শুনিয়েছে? মেয়েটা জিজ্ঞাসা আর কৌতুহলের দৃষ্টিতে তাকালো.. আমি উত্তর দিলাম.. আমার যখন ই ঘুম আসতো না, ও আমাকে সারা রাত ফোনের ওপাশ থেকে গান শোনাত। আমার কথা বলতে ইচ্ছে না করলে ও একাই বলে যেত সুন্দর তম সব কথা। নিজেই নিজের নাম দিয়েছিলো রেডিও বরই (কুল) গাছ।
ওর গান, কথা এসব শোনতে শোনতে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়তাম ফোনের এপাশে। আর ওপাশে তখনো চলতো আমাকে ঘুম পাড়ানোর অযথা আয়োজন।কারো উপর রেগে গেলে আমি তালহার উপর রাগ ঝাড়তাম। ও চুপ করে শোনতো।
যা বলতাম তাই করতো। ও আসলে আমার মন ভাল রাখার খেলনা ছিলো।ও শতবার ভালবাসি বললে আমি একবার তার রিপ্লাই দিতাম। কিন্তু তবুও ও বলতেই থাকতো। ওর সাথে প্রেম করার একমাত্র কারণ ছিলো সো আপ। আমার সকল বন্ধুরা যখন তার বিএফের কথা গল্প করতো তখন আমারো মনে হয়েছিলো একটা বিএফ দরকার। আর তাই তালহাকে ব্যবহার করতাম সেই জায়গাটাতে। আমার টাইম পাসের সবচাইতে ভাল উপকরণ ছিলো তালহা। যখন আর টাইম পাসের জন্য তার দরকার ছিলো না তখন ই ব্রেকাপ করে ফেলি। এবার ক্লিয়ার হলো?
কথা গুলো বলার পর আস্তে করে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লাম। যেন সামনের মেয়েটা বুঝতে না পারে। সাথীর চোখ গুলো জ্বলছে যেনো। চোখের সামনে ভালবাসার মানুষ সম্পর্কে এত অপমান জনক কথা সহ্য করা যেকোন মেয়ের জন্যই খুব ই কষ্টকর। ওকে দেখে এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো, ও যদি মানুষ না হয়ে বাঘিনী হতো তাহলে আমার উপর এখনই ঝাঁপিয়ে পড়তো। আর আমার দেহটাকে শত শত টুকরো তে পরিণত করতো। এবার মেয়েটা রেগে গেছে। আর রাগের সাথেই বললো, আপনি কোন ভাবেই তালহার ভালবাসা পাবার যোগ্য ছিলেন না।আপনি তালহা কে কি ভাবেন আর ও আপনাকে এখনো.. বাকী অংশ টুকো বলে নি। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি। বুকের মধ্যে একটা বিশাল ভূমিকম্প হলো। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো স্বার্থপর হয়ে যাই। দখল করে নেই যা আমার ছিলো। সাথীর কান্না ভেজা চোখ টুকো দেখে মনের ইচ্ছেকে মনেই গলাটিপে হত্যা করলাম।
আবার সাথী কথা বলে উঠলো, এবার তীব্র ভালবাসার সাথে আত্মবিশ্বাস মিশানো গলায় বললো.. চিন্তা করবেন না, আমি তালহার জীবনে আর কখনো কোন কষ্টকে প্রবেশ করতে দেবো না। আর আপনাকে পুরোপুরি ভুলিয়ে দিতে যা যা করতে হয় সব করবো। আমার তালহাকে আমি সুখে রাখবই। বলেই মেয়েটা দাড়িয়ে পড়লো.. চলে যাবার জন্য উদ্যোত হতেই আমি ওকে বসতে বললাম। অনেকটা ইচ্ছার বিরোদ্ধে গিয়ে আমার সামনে বসলো। তবে মুখ দেখে যে কেউ ই বুঝতে পারবে মেয়েটা আমাকে কেঁচোর চাইতে নিচু নজরে দেখছে। গায়ে মাখলাম না এসব। প্রশ্ন করলাম, এখন কি তালহার সাথে দেখা করতে যাচ্ছো? সাথী হ্যা বললো। উত্তর টা ইচ্ছের বিরদ্ধে দিয়েছে স্পষ্ট বুঝা গেলো।
আমি তখন বললাম, এভাবে যেয়ো না। বাসায় গিয়ে লাল জামাটা বদলে অন্য কোন সফ্ট রং এর জামা পড়ে যেয়ো। ও লাল রং টা সহ্য করতে পারে না। মেয়েটার দৃষ্টিতে কিছু একটা পরিবর্তন হলো খেয়াল করলাম। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ব্যাগে ছাতা আছে? ও বললো না, আমি বললাম ব্যাগে সব সময় ছাতা রাখবে, আর ওকে একটা ছাতা উপহার দিয়ে বলবে সব সময় সাথে রাখার জন্য। ওর বৃষ্টিতে খুব এলার্জি। ভিজলেই ঠান্ডা লাগে জ্বর আসে। আর ঐ আহাম্মক টা সব সময় ছাতা সঙ্গে নিতে ভুলে যায়। তাই একটু পর পর এটা মনে করিয়ে দেবে। সাথীর চোখে আগের করুণা যেনো অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমি বলতে থাকলাম, কথা গুলো বলা জরুরি। কারণ আজকের পর আর কখনো কাউকে এই কথা গুলো বলা হবে না আমার।
ওর জন্য রান্না করলে ঝাল একদম অল্প দেবে। ও বেশি ঝাল খেতে পারে না। আচারের মাঝে চালতার আচার টা ওর প্রিয়।এটা ইউটিউব দেখে বানানো শিখে নেবে। ও ঝড় ভয় পায়। ঝড়ের সময় ও সাথে থাকার চেষ্টা করবে, নয়তো ফোনে কথা বলবে তখন। ওর ইনসোমোনিয়া আছে। রাতে ঘুম আসে না। ওকে বলবে একশ থেকে উল্টো করে এক পর্যন্ত গুনে যেতে। এটা ইনসোমোনিয়ায় খুব ভাল কাজ করে। সাথীর চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি বদলে গেছে ততক্ষণে। করুণার পরিবর্তে রেসপেক্ট এসে বাসা বাধছে সেখানে। আর আমি বলেই চলেছি.. ও সুটকির গন্ধ সহ্য করতে পারে না। এটা খেয়াল রেখো। বলে দাড়িয়ে পড়লাম। তারপর বললাম.. আর ওকে স্মোক কম করতে বলো.. ও সুযোগ পেলেই বেশি স্মোক করে। যাই এখন, ভাল থেকো সাথী।
বলেই পেছন ঘুড়লাম, চোখ থেকে টুপ করে এক ফোটা জল পড়লো। আর কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবে বেচারা? পেছন থেকে কান্না জড়িত গলায় সাথী বলে উঠলো.. আপনি তালহার কাছে ফিরে যান আপু। আমি আপনাদের ভুল বুঝাবুঝি মিটিয়ে দিতে সাহায্য করবো। আমি মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই বললাম ” না গো আপু, অধিকার ছাড়িয়া দিয়া ধরিয়া রাখিবার মত বিরম্বনা আর হয় না।” বলেই হেটে চলে আসলাম আমার ভুবনে।হাজারো হাহাকারের মাঝে মনে শুধু একটাই শান্ত্বনা, যাক সঠিক মানুষটার সাথে এখন ভাল থাকবে সে। আমি যে শুধু এটাই চাই ভাল থাকুক সে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত