স্বার্থপর

স্বার্থপর

-আম্মু,একটু বসো।আমি আসছি।
-কেনো,কোথায় যাবি মেহেদী?
-এসেই বলি?
-আচ্ছা।
.
এক প্রকার দৌঁড়ে রুম থেকে বের হলাম।কোন দিকে জানি যেতে দেখলাম?অপারেশন থিয়েটার এর দিকে গেলে কেমন হয়?মনের ভেতরটা কেমন জানি আনচান করছে।প্রায় এক দৌঁড়ে থিয়েটারের সামনে এসে আটকে গেলাম।ডাক্তার, দুটো মহিলাকে যেনো কি বলছে।মহিলা দুটো ঘাবড়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে।
-কি হয়েছে ?
একটা হৃদয়হীনা মহিলা মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো।অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে,সাথে টুপটাপ চোখের জলের বর্ষণ করছে।মহিলাটি বললো,
-নিধির পেটের বাচ্চা উল্টো দিক দিয়ে আসছে।শিঘ্রই অপারেশন করতে হবে।তা না হলে মা-বাচ্চা কাউকে বাচানো যাবে না।
-তাহলে?
-ডক্টর বলেছে দুই ব্যাগ বি-নেগেটিভ ব্লাড লাগবে।কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।তুমি একটা কিছু…………..
মহিলাটি আমার হাতে হাত রাখতে এসেছিলো,এক ঝটকায় হাত ছেঁড়ে পিছিয়ে এলাম।মহিলাটি কান্নার পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিলো।
.
পেছন ফিরে চলে আসছি।মা অসুস্থ্য,চেক-আপ শেষ হলে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। আমার এমন কেনো লাগছে?এতো অস্বস্তি,অস্থিরতা কেনো?নিধি তো আমার কেউ না।ও মরুক-বাঁচুক তাতে আমার কি এসে যায়?উফফ্,বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা করছে।সামনে হাঁটতে পারছি না,পা নড়ছে না।গলা শুকিয়ে গেছে।তার মানে কি আমি এখনো নিধিকে…….?
তাই বলে এতটা?
একবার মুখ দেখে কেনোই বা দৌঁড়ে গেলাম আমি?
.
নিচে নামতে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গেলাম।হাত কেঁটে গেছে,খুব দ্রুত রক্ত বের হচ্ছে।আশ্চর্য?একটুও ব্যথা হচ্ছে না কেনো? মায়ের সামনে যেতেই ব্যস্ত হয়ে উঠলো।ইমার্জেন্সি বিভাগে হাত ব্যান্ডেজ করতে নিয়ে এলো।
একটু অশ্রুমিশ্রিত চাহনি,
-এতোটা বেখেয়াল কেনো তুই?
-বেখেয়াল?আমি?
-হুম।
-হয়তোবা।
-কেনো?আর কোথায় গিয়েছিলি?
-নিধি……..
-নিধি?
.
আমার অস্ফুট কান্না মা ঠিকই দেখতে পেলো।আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।রিক্সায় তুলে দিয়ে কেনো জানি উঠতে পারলাম না।মা কিছু বললো না,একা বাসায় ফিরে গেলো।নীরবকে ফোন দিলাম।অপারেশন থিয়েটারের সামনে যেতেই মহিলাটি দৌঁড়ে আমার কাছে এলো।তার দেহে যেন প্রাণ ফিরে এলো।
-আংকেল কোথায়?
-রক্ত খুঁজতে গেছে।
-আর অপূর্ব?
-দেশের বাইরে।
-ওহ্।
-কিছু ব্যবস্থা করলে?
-হয়তো।
নীরবের আসতে দেরি হয় নি।সাথে এক ব্যাগ ব্লাড নিয়ে এসেছে,অারেক ব্যাগ নিজে দিলো।নিয়ে আসা ব্যাগটি নিয়ে বুকের কাছে চেপে ধরে আছি।নীরব বললো,
-দোস্ত,এমন করছিস কেনো?
কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
-ফ্রিজের থাকা ঠান্ডা রক্ত নিধির শরীরে ডুকলে তো ও অসুস্থ্য হয়ে পরবে, তাই না?তুই বল?
নীরব আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-শালা,তুই জীবনেও মানুষ হবি না।
কিছু বললাম না।
.
অপারেশন শেষ হলো এবং খুব ভালো ভাবেই শেষ হলো।সন্ধায় সবার আগে দেখতে গেলাম।কি অপূর্ব মায়াময়ী ঘুমিয়ে আছে।চুলগুলো আজও অগুছালো।আচ্ছা?কতোদিন হলো এই মুখটি দেখি না?বছর দুই তো হবেই।কতোটা পরিবর্তন মুখটায়।আগের চেয়ে অনেকটা সুন্দর হয়েছে।পাশে একটা ছোট্ট পরী হাত নাড়াচ্ছে।ইশ্,সৌন্দর্যটা আর দেখা হবে না।পরীটা আমার একটা আঙ্গুল মুঠো দিয়ে ধরলো,অসাধারণ এক অনুভূতি।নিধির চোখের এক কোণা থেকে কাজল এনে পরীটার কপালে দিলাম।পরীটা জিভ বের করে এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।হঠাৎ ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটি জেগে উঠলো।তার চোখে ভয়,আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে।হাসি পেলো,যে চোখ চোখের মায়ায় বারবার আমাকে খুন করতো, আজ সে চোখে ভয় !মৃদু একটা হাসি দিয়ে বের হয়ে এলাম।অন্য মহিলাটি আমাকে বললো,
-কে বাবা তুমি?
আবারো একটু হাসলাম।হেসে বললাম,
– আমি কেউ না।
মহিলাটি অবাক চোখে চেয়ে রইল।
.
দুই বছর আগের কথা,
এক শীতের সকালে ঘুমিয়ে আছি।হঠাৎ নিধি ফোন করে বললো দেখা করবে।খুব সকালে শিশির ভেজা ঘাসে এক ঘন্টার উপর হাঁটলাম।যত স্মৃতি সব মনে করে খুব হাসাহাসি করলাম দুজনে।সারারাত ফোনে কথা বললেও বিরক্ত বা ক্লান্তি কিছুই হতো না।ওই দিন খুব করে এক অচেনা নিধিকে দেখলাম।রিক্সা করে সারাদিন ঘুরলাম।গোলাপ ফুল দিয়ে নতুন করে প্রপোজ করলাম।একটা পায়েলও কিনে নিজের হাতে পড়িয়ে দিয়েছিলাম সেদিন।নিধি খুব খুশি হয়েছিল,এতটাই খুশি যে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।আমায় বললো,
-আচ্ছা,মেহেদী?ধরো, আমি হঠাৎ করেই তোমার জীবন থেকে হারিয়ে গেলাম।তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে?
-থাকতে পারবো কি না জানি না,তবে তোমাকে ছাড়া আমার খুব কষ্ট হবে নিধি।
.
নিধি কিছুই বলে নি,শুধু এক দৃষ্টে কিছু সময় তাকিয়েছিলো।তারপর আবার বলেছিলো,
-আমায় বিয়ে করতে পারবে?
-কখন?
-যদি বলি এখনি?
-তুমি যা চাইবে তাই হবে নিধি।
নিধি হঠাৎ করেই কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
-বাবা,আমার বিয়ে ঠিক করেছে মেহেদী,আজ রাতে বিয়ে।
-তুমি কি চাও?
নিধি কিছু সময় চুপ করে থেকে বলেছিল,
-চলো পালিয়ে যাই।
-ঠিক আছে তাই হবে।
-বাবা-মায়ের মুখটা খুব মনে পড়ছে।
.
নিধি বাড়িতে গিয়ে আর বের হয় নি।সারারাত ওদের বাড়ির পেছনটায় বসেছিলাম।সকালে স্বার্থপর মেয়েটাকে বিয়ের সাজে বউ রূপে সুন্দর সাজানো একটা গাড়িতে করে যেতে দেখেছিলাম।খুব কষ্ট হয়েছিল,স্পষ্ট মনে আছে।একটু কাঁদি নি,চোখটা যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল।মনে হচ্ছিল বুকের পাশে যে বামপাশটা আছে,সেখানটা থেকে কেউ খুবলে খুবলে মাংস খাচ্ছিল।চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়া কেউ দেখে নি সেদিন।এরপরে নিজের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করেছি কয়েকবার।হাতের মাঝে এতগুলো ব্লেডের কাঁটা দাগ,যে কেউ দেখলে শিউরে উঠবে।যখন ওর কথা মনে পড়ে খুব কষ্ট হতো,হাত কাঁটতাম।রক্ত বের হচ্ছে দেখলে কেন জানিনা খুব ভালো লাগতো আমার।আজ ছোট্ট পরীটা যখন আমার আঙ্গুল ধরেছিল,কেন জানিনা একটা অদ্ভুত ভালো লেগেছিল।স্মৃতির পাতা নাড়া দিয়ে কেনো এলো আজকের দিনটা?আমি তো তাকে ভুলতে শিখে গেছি।তাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছি।নিজেকে পরিবর্তন করতে শিখেছি,তবে জানার বড়ো ইচ্ছে ছিল,কি অপরাধ ছিলো আমার?আজ রাতে কি ঘুম আসবে আবার?হাতটা কি কাঁটবো?না থাক,মা বড্ড কষ্ট পাবে।
.
কিছুদিন পরের কথা,
শপিংমলে ঢুকতে গিয়ে কেউ একজনের সাথে ধাক্কা খেলাম।
-স্যরি।
-মেহেদী?
-আমি আসলে দেখতে পাই নি।
-কেমন আছো তুমি?
-কিছু মনে করবেন না।
-তোমার ছোট্ট পরীটাকে দেখবে না?
চুপ করে পাশ ফিরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি।হঠাৎ হাতটা ধরে পেছনে টান দিয়ে বললো,
-আমি নিধি,তোমার নিধি।প্লিজ একটু তাকাও এদিকে?
অন্য হাত দিয়ে হাতটা সরিয়ে বললাম,
-আমি ভুলে গেছি আমার জীবনে নিধি নামে কোনো কালো অধ্যায় ছিলো।আমি সামনে এগিয়ে যেতে চাই,অন্তত আমার মায়ের জন্য।ছোট্ট পরীটাকে না হয় দেখে রেখো।আর কখনো ঐ মুখটি নিয়ে আমার সামনে আসবে না,প্লিজ।
-ভুলে গেছো?ভালো করেছো।ভালো থেকো তুমি।
-হুম,আমি ভালো আছি।
.
সামনে হাঁটতে লাগলাম।আশ্চর্য! লোকজন সব আমার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেনো?আমার চোখে এতো জল কোথা থেকে এলো?আচ্ছা?আমি কি সত্যিই ভালো আছি?নিধির কথা কি একদম আমার মনে আসে না?তবে মাঝ রাতে হঠাৎ কেনো ঘুম থেকে জেগে উঠি?অকারণে কেনো চোখে জল আসে?কেনো একটু পরপর বেখেয়াল হয়ে যাই?আমার আচরণগুলো কেনো কেউ বুঝতে পারে না?কেনো মাঝে মাঝে নির্ঘুম রাত্রি কাঁটে আমার? আমি কি সত্যিই ভালো আছি?
হ্যা, হয়তোবা কারো কারো চোখে আমি ভালো আছি।
.
.
………………………………………….সমাপ্ত………………………………….

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত