মধ্যবিত্ত ঘরের বড় মেয়ে

মধ্যবিত্ত ঘরের বড় মেয়ে

রাত ১০:০০ টা। খোলা আকাশের নিচে বিদঘুটে অন্ধকার পথে হেঁটে চলেছি। একা,,সম্পূর্ণ একা। আমাকে একা ই চলতে হয়। ভয়ে আমার বুকের মাঝে হৃদস্পন্দন বেড়েই চলছে কেবল,, কপালে ঘামগুলো এসে জড়ো হয়ে আছে। কিন্তু পা থামছেনা,,আমি চলছি, হেঁটে চলছি। রাত ১০:০০ টা হয়তো তেমন একটা বেশি রাত নয়, তবে আমার জন্য এটা অনেক রাত ই বলা চলে। কেননা, আমি যে একটি মেয়ে!!! কিন্তু আমি যে ঘরে বসে অন্য সকলের মতোন আরাম আয়েস করতে পারিনা!!!
কেননা,,আমি মধ্যবিত্ত,,হুমম আমি শুধু মধ্যবিত্ত ই নই, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে। আমাকে আরাম আয়েসে মানায় না,,আমাকে যে ছুটে চলতে হয়,, দূর হতে দূরে,, অন্ধকার রাতে ভয়ের মাঝেও বুকে একটুখানি সাহসের শক্তি নিয়ে যে আমাকে ছুটে চলতে হয়!!! কেননা,,আমার এই কষ্ট আর ছুটে চলার বিনিময়েই যে কিছু মানুষের মুখে হাসি ফুটে, কিছু মানুষ হাসতে শেখে,নতুন করে বাঁচতে শেখে, নতুন স্বপ্নের জাল বুনতে শেখে। আর আমি? আমার স্বপ্ন সেসব মানুষগুলো,,আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন ই হলো সেইসব মানুষগুলো। কিন্তু আমার এই ছুটে চলা বন্ধ হলেই নিমিষেই সেই মানুষগুলো হারাবে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা,, ভেঙে যাবে তাদের সাজানো স্বপ্ন। কেনো? কেননা,,,আমি মধ্যবিত্ত!!!
.
.
পরিচয়টা দিয়ে নেই ছোটো করে,,আমি লাবণ্য। অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী। বাবা,মা,ছোটো ভাই আর আমি মিলেই আমাদের পরিবার। বাবা ছোটোখাটো একটা চাকুরী করে,, কোনোরকমে চলে যায় আমাদের দিন।
আমি দু-চারটা টিউশনি করি,তাতে নিজের খরচ চলে যায় আর কিছু টাকা মা এর হাতে দেই। কিন্তু ফেলে আসা দিনগুলোই হয়তো খুব ভালো থাকে,,দিন বাড়ার সাথে সাথে চিন্তাগুলোও বেড়ে যায়। বাবার চাকুরীর হয়তো আর বেশিদিন নেই,তাছাড়া বয়সও হয়েছে। মায়ের শরীরটাও আগের মতোন এখন আর ভালো যায়না। শরীর বেশি খারাপ লাগলেও যেনো মা চেপে যায় ব্যাপারটা। কি করবে আর? ছোটো খাটো অসুখে ডাক্তারের কাছে যাওয়া যে মধ্যবিত্তদের কাছে আকাশ ছোঁয়ার মতোন!!! ভাইয়াটাও দিন দিন বড় হচ্ছে। খরচ বাড়ছে ওর ও। কিন্তু আমিও ভালো কিছু করার মতোন কিছুই পাচ্ছি না। অন্যদিকে পুরো পরিবারটাই আমার দিকে চেয়ে আছে,,নতুন স্বপ্নের জাল বুনছে,, নতুন আশায় বুক বাঁধছে।
.
.
বাড়িতে ঢুকতেই ছোটো ভাই টা দৌড়ে কাছে চলে আসলো।
– আপি আমার জন্য কি এনেছো?
– নে তোর জন্য চিপস আনলাম।
– বাহ আমার প্রিয় চিপস। তুমি অনেক ভালো আপি।
(জড়িয়ে ধরে)
– হুম,কিন্তু জিহাদ শোনো, প্রতিদিন এভাবে চিপস খেলে শরীর খারাপ করবে,এসব ভালো না,জাঙ্ক ফুড সব।
কিছুদিন এসব বন্ধ থাকবে কেমন,আবার পরে এসব কিনো দিবো।
– আচ্ছা আপি।
রুমে চলে এলাম ছোটো ভাইটাকে বুঝিয়ে দিয়ে এসে।
বাচ্চা মানুষ তো, খুব খুশি হয় কিছু পেলে,, তাই যত কষ্ট ই হোক না কেনো, ওর জন্য কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু মাসের শেষ হয়ে আসছে প্রায়, হাতে বেশি টাকা নেই বলে ওকে এসব বলে বুঝিয়ে আসলাম। অন্যদিকে কলেজেও যাওয়া হয়নি কিছুদিন, কাল একবার গিয়ে আসবো,এর পরে আর হাতে টাকা থাকবে না, যাওয়া ও হবেনা। অন্যদিকে টাকার জন্য কোথাও পড়তেও পারছি না। কখন জানি ঘুমিয়েই পড়লাম এসব ভাবতে ভাবতে।
.
.
শুরু হলো আরেকটা নতুন সকাল। আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের জন্য নতুন সকাল মানে একটা নতুন লড়াই,,নতুন যুদ্ধ,,আমরা সেখানকার যোদ্ধা। আর বেলাশেষে আমরা হত্যাকারী। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছার হত্যাকারী। তিলে তিলে শেষ হওয়া ই আমাদের মধ্যবিত্তদের পরিণতি হয়তো!!! তবুও আমাদের স্বান্তনা,আমরা অন্যদের মুখে হাসি ফোটাতে প্রস্তুত।
প্রতিদিনের এক ই রুটিনে পথচলা আমার। আমাকে চলতে হয় এই একই নিয়মে। বাসা থেকে একটু সামনেই একটা টিউশনি পেলাম। মাসে ৩০০০ টাকা করে দিবে। বেশ ভালোই লাগছিলো, পড়াতে কোনো কষ্টও ছিলোনা। কিন্তু কিছুদিন পড়ানোর পরে মেয়েটির মা কেমন যেনো করছিলো। ওনার কথাবার্তা আমার ভালো লাগতো না। একদিন তিনি আমাকে অকারণেই অনেক কথা শোনালেন। আমার কান্না পাচ্ছিলো ভীষণ, তবুও অনেক কষ্টে চেপে রেখেছিলাম। বাসায় এসে মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম সেদিন। এরপর সেই মহিলাটিকে ফোন দিয়ে বললাম ওনার মেয়ের জন্য অন্য টিচার খুঁজে নিতে। এরপর তিনি আমার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন,বলেছিলেন তবুও যেনো তার মেয়েকে পড়াই,, কিন্তু নাহ,, আমরা মধ্যবিত্ত হতে পারি,কিন্তু আমাদের কাছে বড়লোকদের টাকার চাইতে আমাদের সম্মানটুকুর মূল্য অনেক বেশি।
ছেড়ে দিলাম টিউশনিটা,,কিছু টাকা না হয় কম ই পেলাম ক্ষতি কি? সম্মান নিয়ে তো বাঁচতে পারবো? এটাই আমাদের মধ্যবিত্তদের আসল সম্পদ।
.
.
টিউশনির মাঝে পড়াশোনাটাও চালাতে হচ্ছে ভালো করে। ভালো কোনো চাকুরীও পাচ্ছিনা। কিন্তু চেষ্টা করে চলছি। হঠাৎ সেদিন মা এসে আমাকে বললো-
– একটা কথা বলবো তোকে মা?
– হ্যাঁ মা,বলো।
– না মানে বলছিলাম যে,রাতে টিউশনি টা না করলে হয় না?
– টিউশনি না করলে চলবো কিভাবে মা?
– দেখ না চেষ্টা করে,দিনে ভালো কিছু পাস কি না করার মতোন।
– কেনো মা? রাতে সমস্যা টা কোথায়? আর তেমন বেশি দেরি ও তো না। মাত্র ১০:০০ টা ই তো।
– না মানে, আশেপাশের লোকেরা বলে যে রাত করে মেয়ে মানুষ বাহিরে থাকে,ব্যাপারটা তো বেশি একটা ভালো না তাই আর কি।
– আচ্ছা মা তুমি ই আমাকে বলো,কে কি বললো কে কি ভাবলো তা ভেবে কি আমরা আমাদের চলাফেরা পরিবর্তন করে ফেলবো? সমাজের লোকেরা শুধু আমাদের বাহিরে যাওয়াটা ই দেখবে কিন্তু ঘরের ভেতরের ক্ষুধার্ত পেটের যন্ত্রণা বুঝবে না, একদিন না খেয়ে থাকলে কেউ আমাদের খাবার দিতে আসবেনা।
সমাজের লোক আমাদের বাহিরে যাওয়াটা ই দেখবে, দেখবে না বুকের ভেতরের জমাট থাকা কষ্টগুলো।
সমাজের কথায় আমাদের পেট চলবে না মা,,
আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই টা আমাদের ই করতে হবে।
– আচ্ছা,, তুই যা ভালো মনে করিস কর।
– হুমম।
মা চলে গেলো। বুঝতে পারছি না কার উপর রাগ করবো,মা এর উপর নাকি সমাজের লোকজনের উপর!!! হয়তো আজকে আমি ছেলে হলে সমাজের লোকেদের এসব কথা শুনতে হতো না,কিংবা আমার বাবার অঢেল সম্পত্তি, গাড়ি-বাড়ি থাকলে হয়তো আজকে আমাকে এসব কথা শুনতে হতো না,, আজকে আমাকে এসব কথা শুনতে হচ্ছে আমরা মধ্যবিত্ত বলে। আসলেই মধ্যবিত্ত লোকেরা সমাজে বড়ই অসহায়।
.
.
সেদিন টিউশনি থেকে ফিরবার পথে জুতাটা ছিঁড়ে গেলো। অবশ্য ছেঁড়ার ই কথা,,৭ মাস হয়ে গেছে এই একটা জুতা দিয়েই পার করে দিচ্ছি,,ভাবলাম কালকে টিউশনি থেকে এ মাসের বেতনটা পেলে নতুন জুতা কেনা যাবে। বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরতেই মা বললো, ভাইয়ের নাকি স্কুলের শার্টটা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন একটা শার্ট বানাতে হবে। কিছু টাকা লাগবে।
মুচকি হেসে মা কে বললাম- এতো চিন্তা করো কেনো? কালকে টিউশনি থেকে টাকা টা পেলেই কিনে দিবো।
রুমে চলে আসলাম আর ভাবলাম – মুচিকে দিয়ে জুতাটা সেলাই করে নিলে আরও কিছুটাদিন হয়তো চলে যাবে!!! শুয়ে আছি,, রাত ৩ঃ০০। চোখে ঘুম নেই,,আছে কেবলই হাজারো স্বপ্ন,, মাথায় হাজারো চিন্তা,, কষ্টে যেনো দমটা বন্ধ হয়ে আসছে।
এভাবেই তো কাটছে প্রতিনিয়ত দিনগুলো!!!
.
.
বয়স এখন ১৯ পার হয়ে গেছে। মায়ের সাথে নাকি পাশের বাড়ির লোকেরা বলাবলি করে,,মেয়েরতো বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে,, আর কবে বিয়ে হবে?
মা বাড়িতে এসে আমাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। সমাজে নাকি অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়।
খুব তাড়াহুড়ো করে সকলে মিলে আমার বিয়ে দিয়ে দিলো। কিন্তু কি কপাল আমার!!! আমার স্বামী প্রায়ই আমার গায়ে হাত তোলে,মারধর করে। তার কথা ই শেষ কথা। আমি চিৎকার করতে পারিনা,আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারিনা। কারণ আমি যে সমাজে থাকি,,, এসব ঘরের কথা যে বাইরের মানুষকে শুনতে নেই। তারা তো আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করবে,,তারা মজা নেবে,, তারা কেউ কখনো আমার চিৎকারের পেছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টটাকে বুঝবেনা। আমার মাথায় হাত রেখে শ্বান্তনা দেয়ার মতোন কেউ নেই। শত কষ্টের পরেও আমাকে আমার স্বামীর সাথেই থাকতে হয়।
.
.
ভেবেছিলাম এ কষ্ট থেকে মুক্তি পাবো কিভাবে?
ডিভোর্স দিয়ে দিবো,চলে যাবো এ অশান্তির সংসার থেকে। কিন্তু নাহ, এ সংসারের বাইরেও যে আরও একটা জীবন আছে। সেখানে সমাজের লোকগুলো যে আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবেনা,,তারা একটা ডিভোর্স হওয়া মেয়েকে যে এতো সহজে মেনে নেবেনা। প্রতিনিয়ত তারা ছোটো করবে আমাকে,, প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকবে অশান্তিগুলো। আমার মা,বাবা, ছোটো ভাইটাকেও যে জ্বলতে হবে সে অশান্তির আগুনে!!!!
কিন্তু এ সমাজ? এ সমাজ কি পারবে আমার প্রতিটা রাতের কান্নাগুলো দমিয়ে রাখতে? দূর করতে পারবে আমার প্রতিটা মূহুর্তের কষ্টগুলো? না পারবেনা,, সমাজের লোকেরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে। তারা অন্যের জন্য কিছু করে দেখাতে পারবেনা।
রাত টা গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে সমস্ত পৃথিবীটা!!! আমাকে নীরবে সব সহ্য করে যেতে হয়,, কেননা আমি মধ্যবিত্ত বলে!!!!
বিশাল আকাশের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা কথা ই মনে হলো–
“”আমি মধ্যবিত্ত!!!””
“”আমি মধ্যবিত্ত ঘরের বড় মেয়ে!!!””

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত